Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts

বিবিধ নিবন্ধ : ছুটির লড়াই : অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়




ছুটির সাথে পরিশ্রমের এক নিবিড় সম্পর্ক। পরিশ্রমে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লেই ছুটির কথা বেশি করে মনে পড়ে। অলস ব্যক্তির ছুটির প্রয়োজন হয় না। সব সময়েই সে ছুটিতে। কাজের কথা বললেই তার শরীর জুড়ে আলস্য। বিছানায় শুয়ে বসে, বা মোবাইলে গান শুনে, কিম্বা সিনেমা দেখে সে নিরবিচ্ছিন্ন ছুটি উপভোগ করে। কিন্তু ছুটির আসল মজাটা তার আর পাওয়া হয়ে ওঠে না। সপ্তাহান্তে ব্যস্ত কাজের দিনগুলো ফুরিয়ে গেলেই ছুটি খুব দামী হয়ে ওঠে। তখন মন সেই ছুটি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে চায়।

হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যখন জঙ্গলবাসী ছিল, তখন ছুটির কথা খুব সম্ভব তার মাথায় আসত না। পেট চালানোর তাগিদে সে বনের পশুদের পিছনে তাড়া করে শিকার ধরত। শিকার করা পশুর মাংস কেটে খাওয়ার উপযুক্ত করে তোলা ছিল আর এক শ্রমসাধ্য কাজ। তারপর শুরু হল কৃষিভিত্তিক যৌথ জীবন যাপন। সে জীবনেও ছিল অনেক পরিশ্রম।

কৃষিভিত্তিক যৌথ জীবন যাপন করতে করতে একদল মানুষের হাতে অতিরিক্ত শস্য ভাণ্ডার জমা হতে লাগল। সমাজে তাদের প্রতিপত্তি বাড়তে লাগল। তারাই সমাজে আধিপত্য বিস্তার করে ছোট ছোট রাজ্য তৈরি করে শাসন করতে লাগল। শস্য ছাড়া অন্যান্য সম্পদ সৃষ্টি করল মানুষ — যেমন সোনা, রুপো ও হীরে। সেই সব সম্পদের অধিকারী হল রাজা ও অমাত্যেরা। রাজ্যের প্রজারা চাষ আবাদ করে তার এক অংশ রাজাকে দিত খাজনা হিসাবে। এই খাজনা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে প্রজা রাজার কাছ থেকে সুরক্ষা আশা করত। রাজার সেনাবাহিনী সেই সুরক্ষা দিত প্রজাদের। 



ধীরে ধীরে ক্ষমতাশালী শাসকেরা লোভী হয়ে উঠল। যে সব রাজাদের সাম্রাজ্য বিশাল ছিল, সৈন্যবাহিনী, লোক-লস্কর, ঠাট-বাট বজায় রাখার জন্য তাদের অনেক অনেক সম্পদের প্রয়োজন হল। রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রজাদের অত্যাচার করে রাজস্ব আদায় করা হত। প্রজাদের মধ্যে ছিল কৃষক, পুরোহিত, সৈন্য ও কারিগর। নানাভাবে তাদের উপর চাপ দিয়ে কাজ করানো হত। কাজের কোনও নির্দিষ্ট বাঁধাধরা সময় ছিল না। আরও বেশি সম্পদ সৃষ্টি করবার জন্য দিনের বেশির ভাগ সময় মেহনতি মানুষেরা শাসকের স্বার্থে বেশি সময় কাজ করেই কাটাত। তখনো সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ছুটির দাবি নিয়ে রাজার বিরুদ্ধাচরণ করবার কথা মানুষ ভাবতেও পারত না। যদি কেউ সেই সাহস করে রাজা বা তার অমাত্যদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসত, বিচারে তার প্রাণদণ্ড হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। বেঘোরে প্রাণ দেওয়ার ভয়ে কেউ মুখ খুলত না।

মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে পৃথিবী পা রাখে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগদান করে শিল্প। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পালে সহসা প্রবল হাওয়া লাগে। নতুন নতুন আবিষ্কারের হিড়িক পড়ে যায় পৃথিবীর অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশগুলিতে— যেমন আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স ইত্যাদি। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝ পর্যন্ত সময়ে ঘটে গেল শিল্প-বিপ্লব। কৃষিকাজে সম্পদ জমা হতে সময় লাগত। কিন্তু শিল্পের উন্নতির ফলে অত্যন্ত দ্রুত সম্পদ সৃষ্টি হতে লাগল সমাজে। এর ফলে একশ্রেণীর মানুষের হাতে অজস্র সম্পদ জমা হতে লাগল। অপরদিকে শিল্পে যে সমস্ত শ্রমিক জড়িত ছিল তারা আরও গরিব হতে থাকল। আরও বেশি সম্পদ লাভের আশায় মালিকেদের অধিকাংশই শ্রমিকদের দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে নিতে লাগল। অতিরিক্ত শ্রমের কারণে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও জীবনধারণের মান হয়ে গেল অনেক নিম্ন মানের। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিল অসন্তোষ।

১৮৮৬ সালের পয়লা মে আমেরিকাতে শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বে দিনে আট ঘণ্টার কাজের দাবীতে এক ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করার পর একদিনের ছুটির দাবীতে প্রায় চার লক্ষ শ্রমিক এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। চৌঠা মে শ্রমিকদের একটি দল শান্তিপূর্ণ সভা করে হে মার্কেট স্কোয়ারে। ভিড়ের মধ্যে কেউ পুলিশকে লক্ষ করে বোমা ছোঁড়ে এবং ছ’জন পুলিশ ঘটনাস্থলে মারা যায়। এই ঘটনার সাথে সাথে পুলিশ ধর্মঘটী শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে গুলি চালায়। ফলে বেশ কিছু শ্রমিকের মৃত্যু হয়, অনেকেই গুরুতরভাবে আহত হন। আমেরিকার ইতিহাসে এই ঘটনা ‘হে মার্কেট বিপর্যয়’ বলে কুখ্যাত।

হে মার্কেট ঘটনায় প্রচুর শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়। চারজন শ্রমিক নেতার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে শ্রমিকেরা আরও একত্রিত হয়। বহু সংগ্রামের পর, ১৮৮৮ সালে আমেরিকায় শ্রমিকদের আট ঘণ্টার কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শ্রমিকদের দিনে আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন ও আট ঘণ্টা বিশ্রামের মঞ্জুরি দিয়ে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ক্রমশ অন্যান্য দেশও শ্রমিকদের এই অধিকারের আইন করে স্বীকৃতি দেয়।

ছুটির প্রয়োজনীয়তা মানুষ কবে থেকে বুঝতে পেরেছে, সে বিষয়ে সঠিক সাল তামামি বলা মুশকিল। কৃষিজীবী মানুষ ফসল ঘরে তোলার পর আনন্দ উৎসব পালন করত, সেকথা আমরা সবাই জানি। আমাদের দেশে যেমন আসামে বিহু, পাঞ্জাবে লোহড়ি ও বৈশাখী, দক্ষিণ ভারতে ওনাম এবং পশ্চিমবঙ্গে ও উত্তর ভারতে মকর সংক্রান্তি পালন করা শুরু হয় ফসল কাটার উৎসব উপলক্ষে। এই উৎসবগুলিতে নাচ গান, খাওয়া দাওয়া, পরিবার পরিজনের সাথে সময় কাটানোর জন্য বিভিন্ন রীতি রেওয়াজের প্রচলন দেখে বোঝা যায়, এই উৎসব অতি প্রাচীন।

একটানা কাজের একঘেয়েমি মানুষের শরীর ও মন দুটির উপরে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। এমনকি বিরামহীন কাজের ফলে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। সপ্তাহান্তে ছুটিই হোক, বা গ্রীষ্ম ও শীতকালীন ছুটি, মানুষের মন আবার নতুন উদ্যম নিয়ে কাজে যোগ দিতে উৎসাহ পায়। কিন্তু কেবলমাত্র আলস্যে ছুটি অতিবাহিত করলে তার কোনও ফল লাভই হয় না।

বিবিধ নিবন্ধ : পুজো আসছে : অভিনন্দন চক্রবর্তী



"বাবু, এই বাবু ওঠ ওঠ! আরে আমি রেডিও চালিয়ে দিয়েছি তো, শুনবি না? এক্ষুণি শুরু হবে কিন্তু শঙ্খের আওয়াজ, মহালয়া যে আজ! পুজো এসে গেল বাবু, উঠে পড়। তোর দিদিভাইও কিন্তু উঠে গেছে ঘুম থেকে"।
আকাশবাণী কলকাতায় চ্যানেল সেট করে আট বছরের ছেলেকে ডাকতে ডাকতে বিছানার দিকে এগিয়ে যান শর্বরী দেবী। ঘড়ির কাঁটা তখন চারের ঘর ছুঁই ছুঁই।

মায়ের ডাকে চোখ কচলে মায়ের দিকে তাকালো জয়। আরে আজই তো মহালয়া। আজ কিছু শোনাবে মা রেডিওতে, কাল রাতেই ভাত খেতে খেতে বলছিলো। কিন্তু খুব ঘুমও যে পাচ্ছে!

"ওওও মা আরেকটু শুই না! ঘুম পাচ্ছে তো খুউউউব"।

"আরে আজ কি ঘুমালে চলবে? দুপুরে ঘুমোস আবার। এখন শোন মন দিয়ে লক্ষ্মীসোনা আমার। মহালয়া না শুনলে বুঝবি কী করে যে পুজো আসছে? শুনতে হয় বুঝলি? দেখবি, বড় হয়ে একদিন বুঝবি এর জাদু। হয়তো থাকবি দূরে কোথাও, আমেরিকা বা লন্ডন বা দিল্লী, কিন্তু আজকের দিনে ঠিক ফিরে আসবি বারবার। সবসময় মনে পড়বে এই আজকের দিনটা। বলবি যে হ্যাঁ, মা ঠিকই বলেছিল ওইদিন। এই মহালয়ার গল্প তুইও একদিন শোনাবি কাউকে"।
ছেলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেন শর্বরী দেবী। তাঁর মনে পড়ে যায় নিজের ছোটবেলার কথা। এইভাবেই তাঁকেও মহালয়ার ভোরের এই অনুষ্ঠানের মাহাত্ম্য বুঝিয়েছিলেন তাঁর মা।

মায়ের কথা এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল জয়। যদিও ঘুম এখনও লেগে চোখে কিন্তু ভালোই লাগছিলো বেশ শুনতে। এখন হঠাৎ মায়ের মুখে এই দূরে থাকার কথা শুনেই দিদিভাইয়ের বালিশের পাশ কাটিয়ে ও এগিয়ে গেল মায়ের দিকে। 
"ধ্যাৎ মা কী যে বলো! আমি তোমায় ছেড়ে কোথাও যাবোই না। আমি তো এখানেই থাকব তোমার কাছে। কোথাও গেলে তো তুমি, বাবা আর দিদিভাইও যাবে সাথে। কই তোমার আঁচল কই? দাও ওটায় মুখ গুঁজে শুনবো। আচ্ছা মা সত্যিই কি পুজো এসে গেল ? আর এখন রেডিওতে কী হবে গো বলো না!"

ছেলের কথা শুনে হেসে ওঠেন শর্বরী দেবী। পায়ের কাছে গোটানো চাদরটা টেনে নিতে নিতে বলেন, 
"হ্যাঁ বাবু, আর সাতদিন পরেই পুজো। দুর্গাপুজোর ঠিক সাতদিন আগে, মহালয়ার ভোরে প্রতি বছর নিয়ম করে এই অনুষ্ঠান হয় রেডিওতে। আর তুই কি জানিস এটা কবে থেকে হচ্ছে? সেই ১৯৩১ সাল থেকে। শ্লোকপাঠ, স্তোত্রপাঠ আর অনেক গান সবই হবে এখন। 'মহিষাসুরমর্দিনী' নামের এই অনুষ্ঠানের সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক, আর গেয়েছেন আরও অনেকে। যখন গানগুলো হবে আমি বলবো সবার নাম এক এক করে। সব মনে রাখতে হবে কিন্তু, নাহলে ......"
মায়ের কথার মাঝেই জয় জিজ্ঞাসা করে,
"আচ্ছা মা এটা কি ওই বড় বাড়িটাতেই হচ্ছে যেটা এবার শীতকালে ইডেন গার্ডেন্স যাওয়ার সময় বাবা দেখিয়েছিল আর বলেছিল এটা আকাশবাণী কলকাতার অফিস?"
ছেলের কথা শুনে তার বুদ্ধির তারিফ করে শর্বরী দেবী বলেন,
"হ্যাঁ ওখান থেকেই সম্প্রচার করা হচ্ছে এটা রেকর্ডিং-এর মাধ্যমে। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত কিন্তু সরাসরি সম্প্রচার হত জানিস? এখন রেকর্ডিং বাজানো হয়। নে এবার শোন চুপটি করে। বাবাও শুনছে দ্যাখ নিচে শুয়ে। ওই যে শুরু হচ্ছে শঙ্খের আওয়াজ।"


শঙ্খের আওয়াজের মাধ্যমে মহালয়া শুরু হয়ে যায় ছোট্ট ঘরটিতে তথা গোটা ভারতবর্ষে। মায়ের আঁচলে মুখ গুঁজে থাকা ছোট্ট জয়ের শরীরে অজান্তেই খেলে যায় শিহরণ। তার হঠাৎ মনে পড়ে যায় রোজ সন্ধ্যেবেলা মা'ও তো এভাবেই শঙ্খ বাজায়। শুরু হয় মহালয়ার প্রথম গান-


'যা চণ্ডী .....
মধুকৈটভাদি দৈত্য দলনী ......'


শুরুতেই এইরকম একটি গানে অল্প ঘাবড়ে যায় জয়। চণ্ডী শব্দটি ছাড়া আর কোনো শব্দই চেনা লাগে না তার।
"মা এই গানটার মানে কিছুই বুঝতে পারছি না। যা চণ্ডী মানে কি মা"?

"এখনই তো বুঝবি না বাবু, আরেকটু বড় হ। তবে হ্যাঁ এই গানটা মা দুর্গাকে নিয়ে। তাঁর প্রতি স্তুতি। তিনি আসছেন আর ক'দিন পর সব ভালো হবার বার্তা নিয়ে। তিনি দৈত্যদলনী অর্থাৎ ওই যেসব বড় বড় ভয়ঙ্কর দৈত্যরা যারা সবকিছু বিনাশ করে দেয়, মা দুর্গা তাদের শাস্তি দেন। তাদের দমন করেন।"

এবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় জয়ের কাছে। কিন্তু মা বললো না তো এটা কার গাওয়া! সে জিজ্ঞাসা করে "এই গানটা কার গাওয়া মা"?

"এই গানটা? এটা অনেকে মিলে একসাথে গেয়েছেন বাবু। কেউ একা গাননি। এইবার শোন এই গানটা শেষ হবার পরেই শোনা যাবে ওঁর কণ্ঠস্বর। যা শোনার জন্য আপামর বাঙালি অপেক্ষায় থাকে সারা বছর। ওঁর নাম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বুঝলি? ওঁর গলায় জাদু আছে। এবার শুরু হবে ওঁর স্তোত্রপাঠ। অনেক কিছু বলবেন উনি মন দিয়ে শুনিস। আর ফাঁকে ফাঁকে খুব ভালো ভালো গানও হবে। ওই যে শোন শুরু হচ্ছে।"

মায়ের কথা শুনে ভালো করে গুছিয়ে শোয় জয়। আড়চোখে একবার দেখে পাশে শুয়ে থাকা দিদিভাইকে আর নিচে বাবাকে। দুজনেরই চোখ বন্ধ। বুঝতে পারে না সে ওঁরা শুনছে কিনা। তখনই রেডিও থেকে ভেসে আসে এক কণ্ঠস্বর-


"আশ্বিনের শারদপ্রাতে
বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির ,
ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা ....."


কিছু কিছু বুঝতে পারলেও পুরোটা বোঝে না জয়। "কীরকম রাগী রাগী কণ্ঠস্বর গো মা! আচ্ছা উনিও কি এটাই বলছেন যে পুজো আসছে?"

"হ্যাঁ রে বাবু। মা দুর্গাকে নিয়েই বলছেন উনি। এই আশ্বিন মাসেই তো পুজো হয়। তাই উনি শুরুতে বললেন আশ্বিনের শারদপ্রাতে। ওই যে শোন উনি বলছেন ধরণীর অন্তরাকাশে জাগরিত মায়ের আগমন বার্তা। এই যে দেখিস না বাইরে কী সুন্দর পুজো পুজো ভাব, আকাশে সাদা মেঘের সারি, মাঠে কাশফুল দুলছে! কেমন আনন্দ হয় তাই না? বুঝে যাই আমরা যে পুজো আসছে। এটাই বলা হচ্ছে এখানে। আগামী কয়েকদিন সব দুঃখ কষ্ট ভুলে সবাই আনন্দ করবে। কারোর কোনো কষ্ট থাকবে না।"

মনের মত একটা ব্যাখ্যা পেয়ে খুব খুশি হয় জয় আর সাথে সাথে মনে পড়ে পিছনের মাঠে কাশফুলের কথা। "ওওওও এইবার বুঝেছি মা। জানো মা ওই পিছনের মাঠেও অনেক কাশফুল হয়েছে। খুব সুন্দর লাগে দেখতে। সেদিন তো আমি স্কুলে এঁকেও ছিলাম কাশফুল। আচ্ছা মা আর গান হবে না এরপর?"

ছেলের আগ্রহ দেখে হেসে ওঠেন শর্বরী দেবী। তাকে আশ্বস্ত করে বলেন "হবে তো বাবু। এরপর আরও একটা ছোট্ট গান হবে সবাই একসাথে গাইবে। আর তারপর আবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণবাবুর কন্ঠস্বর। উনি তখন মা দুর্গার বিভিন্ন রূপের কথা বলবেন। শোন মন দিয়ে।"



মন দিয়ে এরপরের কথা শুনতে থাকে জয়। কাল সকালে উঠেই দিদিভাইকে ধরতে হবে যে ও মা দুর্গার কতগুলো রূপের নাম জানে।
"মা আমি কিন্তু অনেকগুলো নাম মনে করে নিয়েছি। মহামায়া, সনাতনী , শক্তিরূপা, গুণময়ী আর তারপর ওই যে কী যেন, নাহ্ আর মনে পড়ছে না মা!"
মুখ ব্যাজার করে বলে ওঠে জয়। ধ্যুৎ এইতো মনে করল পাঁচটা নাম, কী করে যে ভুলে গেল শেষেরটা!


"থাক থাক আর মনে করতে হবে না, আজ এগুলোই যথেষ্ট। এগুলো সবই মা দুর্গার নাম। এই নামগুলোই বললেন উনি আর বললেন মা দুর্গার বিভিন্ন রূপের কথা। কখনও তিনি দুষ্টের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন, আবার কখনও তিনি পরম স্নেহময়ী। এবার কিন্তু খুব মন দিয়ে শোন। এবারই হবে সেই গানটা যে গান একদিন তুইও শোনার জন্য পাগলের মত সারা বছর অপেক্ষায় থাকবি বড় হয়ে। ওই দ্যাখ তোর বাবাও উঠে বসল গানটা শোনার জন্য। মহালয়ার সব গানের মধ্যে এই গানটা সব থেকে বেশি জনপ্রিয়"।


'বাজল তোমার আলোর বেণু ,
মাতল যে ভুবন ....
বাজল তোমার আলোর বেণু'



"শুনলাম গো মা। আর এবার কিন্তু আমি অল্প অল্প বুঝেছি মা। এটাও মা দুর্গাকে নিয়ে। মা দুর্গা যে আসছেন, সবাই মেতে উঠেছে সেই নিয়েই তো বলল তাই না?" একনাগাড়ে কথাগুলো বলে মায়ের দিকে তাকিয়ে জয় দেখে মায়ের চোখে জল।
"আরে আরে! একি মা, তোমার চোখে জল কেন? ধুৎ, আমি বন্ধ করে দিচ্ছি রেডিও। শুনব না মহালয়া। তুমি কাঁদছ যে!"

ছেলের কথা শুনে চোখ মুছে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শর্বরী দেবী বলেন,
"ওরে না রে পাগল, কাঁদছি না রে। এ তুই এখন বুঝবি না। বড় হ', তারপর আস্তে আস্তে দেখবি এই গানটা শুনলেই কেমন অনুভূতি হয় ভিতরে। শরীরে কাঁটা দেয়। চোখে জল আসে যেটা কান্না নয়। এইটাই মজা এই গানের। আর এই গানটি কে গেয়েছেন বল তো ? ওঁর নাম সুপ্রীতি ঘোষ। খুব সুন্দর গলা ওঁর। নে এবার শোন খুব ভালো করে। আসল কথা কিন্তু এবারই শুরু হবে। কীভাবে ওই মহিষাসুরের জন্ম হল আর কীভাবে মা দুর্গা ওই দুষ্টু অসুরকে বধ করেছিলেন সেটাই এখন বলা হবে পুরো। মন দিয়ে শোন। আর শুধু শুনলেই কিন্তু হবে না, মা দুর্গার মত আমাদের সবাইকে এইভাবেই দুষ্টু অসুরদের হারাতে হবে"।

মায়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে কেমন যেন আনমনা হয়ে গিয়েছিল জয়। সে বলে ওঠে,
"ওই যেরকম ওইদিন টিভিতে দেখাচ্ছিল ওই লোকটা কেমন মারছিল সেই গুন্ডাটাকে, ওইভাবেই মা?"

"সবসময়ই যে মারপিট করে তা নয়। ভুল শুধরে দিয়ে তারপরই শাস্তি দিতে হবে। নে এবার শোন পরের গানটা। দেখি তো এই গানটা শুনে তোর কিছু মনে পড়ে কিনা!"
কথাগুলো বলে ছেলের দিকে তাকান শর্বরী দেবী। রেডিওতে শুরু হয় পরবর্তী গান।

'জাগো তুমি জাগো
জাগো দুর্গা জাগো দশপ্রহরণধারিণী ,
অভয়া শক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো।
জাগো তুমি জাগো ....'



গানটা শেষ হতেই লাফিয়ে উঠে জয়।
"মনে পড়েছে মনে পড়েছে মা, এই জাগো জাগো গানটা সেই ওই পাড়ার ক্লাবের ফাংশনে গেয়েছিল না বাবা একবার?"

ছেলের কথা শুনে হাততালি দিয়ে ওঠেন শর্বরী দেবী। ছেলেকে আদর করে বলেন,
"আরে তোর মনে আছে ? ঠিক বলেছিস বাবু। তখন খুব ভালো গান গাইত তোর বাবা। এখানে এই গানটা গেয়েছেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। এখানে আহ্বান জানানো হচ্ছে মা দুর্গাকে। ওই দ্যাখ শুনতে শুনতে ঘুমিয়েই পড়েছে তোর বাবা। তোর বাবার সবথেকে প্রিয় গানটা তো শুনলই না। একটু পরেই হবে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের 'তব অচিন্ত্য রূপচরিত মহিমা'। তোর বাবার খুব প্রিয় ওই গানটা। জানিস তোর বাবা অনেক রাতে ফিরেছিল কাল। ফিরে তোকে কত আদর করল।  নতুন জামাও এনেছে তোদের জন্য জানিস ? কাল সকালে উঠেই তোরাও অনেক অনেক আদর করে দিস বাবাকে আর বলিস যে জামা খুব পছন্দ হয়েছে"।

নতুন জামার কথা শুনে মনটা নেচে ওঠে জয়ের। গতবার মোট সাতটা জামা হয়েছিল তার। সে বলে ওঠে "এখনই যাব মা বাবার পাশে?"

"না বাবু এখন না। এখন বাবা একটু ঘুমাক। সারাদিন তোর আর তোর দিদিভাইয়ের জন্যই এত পরিশ্রম করে। বলে যে আমার বাবু আর মামণি একদিন অনেক বড় হবে। আচ্ছা, এই জাগো গানটা ভালো করে বুঝতে পারলি তো? জানিস, বড় হয়ে চারিদিকে অনেক কিছু দেখবি। কোনোটা ভালো বা কোনোটা খারাপ। খারাপ কিছু দেখলেই কিন্তু মা দুর্গার মত আমাদের ভিতরে ভিতরে জেগে উঠে সেই খারাপকে ভালো করার জন্য এগিয়ে যেতে হবে বুঝলি? এই গানটাতে দ্যাখ কী বলছে। জাগো দুর্গা জাগো দশপ্রহরণধারিণী , অভয়া শক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো। মা দুর্গাই আমাদের শক্তি বুঝলি বাবু ? আমাদের বল দেন ,শক্তি দেন। তবে আমাদের সকলের মধ্যেই কিন্তু মা দুর্গা আছে। আমাদেরও মা দুর্গার মত বিনাশ করতে হবে যত্তসব বাজে পচা জিনিসকে।"



মায়ের কথাগুলো মন দিয়ে শুনে জয় বলে,
"জানো মা কাল স্কুলের ওই বদমাশ বিল্টুটা না খুব মারছিল পাপাইকে। আমি দেখতে পেয়েই গিয়ে থামিয়েছি ওকে। সরিয়ে দিয়েছি ঠেলে আর বলেও দিয়েছি স্যারকে।"

"এইতো লক্ষ্মীসোনা আমার! একদম ঠিক করেছিস বাবু। তবে পরশু স্কুলে গিয়ে কিন্তু ভাব করে নিস বিল্টুর সাথে। ওকে বলিস যে এরকম করতে নেই, আর হ্যাঁ, ওকেও বলতে ভুলিস না যে পুজো আসছে। খুব ভালো করে যেন ও কাটায় পুজো।"
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন শর্বরী দেবী।

"বলে দেব মা। ও মা এবারই কি অসুর বধ হবে"?

"হ্যাঁ রে, শোন বাকিটা মন দিয়ে"।

মা দুর্গার বিভিন্ন রূপের মতো এবার তাঁকে দেওয়া অস্ত্রগুলির কথাও মনে রাখা শুরু করে দেয় জয়। পাশাপাশি মনে রাখে সকলের নামও।
"এইতো এবার সবাই কী কী অস্ত্র দিল মা দুর্গাকে সেটাই তো বলছে, তাই না মা? এবারই কি যাবে মা দুর্গা অসুরকে মারতে?"

"হ্যাঁ বাবু। এবারই যাবে মা দুর্গা অসুরকে মারতে। আচ্ছা কে কী কী অস্ত্র দিল সব মনে করে নিয়েছিস তো? কাল সকালে উঠেই দিদিভাই আর বাবাকে বলে দিস। ওরা তো ঘুমিয়েই পড়ল, জানতেও পারল না কে কিী অস্ত্র দিল।"

মনের মতো একটা হোমটাস্ক পেয়ে খুব খুশি হয় জয়। "হ্যাঁ মা বলে দেবো। জানো মা আমি গতবার দেখেছিলাম ওই মন্দিরের প্যান্ডেলের মা দুর্গার দশটা হাতে দশটা অস্ত্র। মা এবারও যাব তো আমরা ঠাকুর দেখতে? জামাগুলো কই মা?"

"আরে আছে রে আছে, সব বাক্সে তোলা আছে।" ছেলেকে আশ্বস্ত করেন শর্বরী দেবী।
"কাল সকালে উঠে আমরা দুজন মিলে একবার রোদে মেলে দেব জামাগুলো বুঝলি বাবু? আর তোর গত বছরের যে ছোট হয়ে যাওয়া জামাগুলো আছে ওগুলো তোর হাতে দেব, তুই ওই পাশের বস্তিতে পিলু, মানিক, লাল্টুদের দিয়ে আসিস বুঝলি? ওরা এবার জামা কিনতে পারেনি। খুব মন খারাপ ওদের, এই পুজো কিন্তু ওদেরও। ওরাও চায় মজা করতে। নতুন জামা তো আর দিতে পারব না, তোদের বাবা আর একা কত পারবে! ওগুলোই দেব তোকে। তুই ওদের হাতে দিস, আর হ্যাঁ, বলে দিস যে পুজো আসছে, এই জামাগুলো যেন ওরা পরে পুজোয় আর খুব আনন্দ করে। দেখবি খুব খুশি হবে ওরা। এটাও কিন্তু মা দুর্গাই শেখান আমাদের, জানিস? সব সময় সবার পাশে থাকতে হয়। একসাথে থাকতে হয়, বুঝলি?"


"বুঝেছি মা। তুমি দিও, আমি দিয়ে আসব ওদের। খুব মজা হবে। আচ্ছা মা অঞ্জনাপিসিকেও একটা শাড়ি দিলে হয় না? রোজ কত কষ্ট করে আসে আমাদের বাড়ি। আমার খেলনাগুলোও গুছিয়ে দেয়। অঞ্জনাপিসিকেও একটা শাড়ি দাও না মা! দিয়ে বোলো যে পুজো আসছে। খুব যেন মজা করে"।

ছেলের মুখে এই কথা শুনে ভীষণ খুশি হন শর্বরী দেবী। "আরে আমার বাবুটা তো হঠাৎ করে বড় হয়ে গেল দেখছি! আয় আয় আদর করে দিই একটু। আমি কাল সকালেই বের করে দেব তোর অঞ্জনাপিসির জন্য শাড়ি।"
কথাগুলো বলে ভীষণ আনন্দিত হন শর্বরী দেবী।

"মা মা, ওই শোনো মা দুর্গা হারিয়ে দিল দুষ্টু অসুরকে। কি মজা।"
বিছানায় শুয়েই হাততালি দিয়ে ওঠে জয়।

"হ্যাঁ বাবু। অসুর পরাস্ত হল এবার। দুষ্টের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করলেন মা দুর্গা। এবার আমাদের দায়িত্ব এই পৃথিবীকে রক্ষা করার। মা দুর্গা সব সময় আসবেন না। আমাদের ভিতরের মা দুর্গাকেই এবার করতে হবে যা করার। আর আমি জানি আমার বাবুসোনা ঠিক তাই করবে বড় হয়ে। কী তাই তো? এ কি রে, চোখ বন্ধ কেন? ঘুম পাচ্ছে বাবা? আহারে ছোট্ট সোনা আমার সেই কত সকালে উঠে মহালয়া শুনেছে আমার সাথে। নে, এবার ঘুমো। পুরোটাই তো শুনেছিস প্রায়। বাকি আছে শুধু শেষ গান 'রূপং দেহি রণং দেহি'। ওটার মানে আমি কাল বুঝিয়ে দেব।"
ছেলেকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে কোলবালিশটা এগিয়ে দেন শর্বরী দেবী।

"আচ্ছা মা ওই নমো চণ্ডী গানটাও খুব ভালো লাগলো। ওটা কে গেয়েছে বললে না?" ঘুমচোখে প্রশ্ন করে জয়।

ঘুম পাওয়া সত্ত্বেও ছেলের এই আগ্রহ দেখে হেসে ওঠেন শর্বরী দেবী।
"ওই গানটা? ওটা গেয়েছেন বিমলভূষণ, আর ওই যে আরও একটা গান হল 'হে চিন্ময়ী' ওটা গেয়েছেন তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ওঁর গানও খুব পছন্দ করে তোর বাবা।"

"মা দুর্গা রাগ করবে না তো মা পুরোটা শোনার আগেই ঘুমিয়ে পড়লে?"

"না না  মা দুর্গা কখনো আমার বাবুর মত লক্ষ্মী ছেলের ওপর রাগ করতে পারেন? মা দুর্গা তো আরও খুশিই হয়েছেন তুই এত সকালে উঠে প্রায় পুরোটা শুনেছিস বলে। নে ঘুমিয়ে পড় এবার। সকালে উঠে জামাগুলো রোদে দিতে হবে তো, নাহলে পুজোয় পরবি কী করে ? কাল সকালে লুচি বানাবো তোদের জন্য। পুজোর ক'টা দিন রোজ তোর আর তোর দিদিভাইয়ের প্রিয় খাবারগুলি বানাবো। এবার পুজোয় খুব মজা করব আমি, তুই, দিদিভাই আর তোর বাবা। খুব ভালো কাটবে এবার আমাদের পুজো। আমাদের মত আর যারা যারা আছে তাদের সবার পুজো। চাদরটা টেনে নে ভালো করে। ঠান্ডা লেগে যেন জ্বর না হয় দেখিস। জ্বর হলেই সব মাটি কারণ পুজো আসছে।"

(সমাপ্ত)


ছবি : সুকান্ত, স্বর্ণদ্বীপ, অনিন্দ্য, উইকিপিডিয়া

বিবিধ নিবন্ধ : ক্যাথিড্রাল অফ বুকস - বইয়ের মন্দির : অরিন্দম দেবনাথ



বেশ কিছুকাল আগেও পাড়ায় পাড়ায় ছোট গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরির দেখা মিলত। কিন্তু অর্ন্তজালের দাক্ষিণ্যে পাঠকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ছোট ছোট লাইব্রেরিগুলো বেমালুম হাওয়া হয়ে গেছে পাড়ার গলি ছেড়ে। এমনকি বিশ্বের তাবড় তাবড় লাইব্রেরিতেও পাঠকের সংখ্যা দিন দিন পড়তির দিকে।

বিশ্বের বেশ কিছু সুবিশাল লাইব্রেরির অন্যতম হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মারিল্যান্ডে অবস্থিত জর্জ পিবডি লাইব্রেরি। ছাপা বইয়ের পড়তি পাঠকের দিনে এই লাইব্রেরির আকর্ষণ খুব একটা কমেনি। বরং এই লাইব্রেরি হয়ে উঠেছে মারিল্যান্ডের বাল্টিমোরে আগত পর্যটকদের অবশ্য গন্তব্যস্থল। এই লাইব্রেরিকে পুস্তকপ্রেমী ও গবেষকরা ভালবেসে বলেন “ক্যাথিড্রাল অফ বুকস” – বই মন্দির। অতি শান্ত পরিবেশের এই পুস্তকাগারে গেলে মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠবে।মনে হবে এসে পড়েছি কোনও উপাসনাস্থলে।

​১৮৫৭ সালে মার্কিন মানবদরদী ধনকুবের জর্জ পিবডির তিন লক্ষ মার্কিন ডলার দানের অর্থে পিবডি ইন্সটিটিউট তৈরির সূচনা হয়। ঠিক ছিল ১৮৬০ সালে চালু হয়ে যাবে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তার লাইব্রেরি । কিন্তু গৃহযুদ্ধে জর্জরিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত উদ্যোগ। ঢিমে তালে চলতে থাকে কাজ। ১৮৬৬ সালে চালু হয় পিবডি 
ইন্সটিটিউটের একটি অংশ। ১৮৬৯ সালে জর্জ পিবডির মৃত্যুর পর তাঁর কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন পিবডির বন্ধু তথা অনুগামী বে স্টাটের।


১৮৭৮ সালে চালু হয় লাইব্রেরি। সবার জন্য উন্মুক্ত এই লাইব্রেরিতে পড়াশুনা করার জন্য কোন অর্থ দিতে হত না। প্রথম দিকে পিবডি 
ইন্সটিটিউটের একটা অংশ হলেও পরে এটি সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা নেয়। সে সময়কার স্থানীয় এক স্থপতি এডমণ্ড জি লিন্ড পাঁচতলা লাইব্রেরিটির পরিকল্পনা এমনভাবে করেছিলেন যে,পাঁচতলা লাইব্রেরির প্রশস্ত রেলিং দেওয়া বারান্দায় বসে কোন কৃত্রিম আলো ছাড়াই নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করতে পারতেন পাঠক। ৬১ ফুট উঁচু লাইব্রেরির মাঝখানের ছাদটা তৈরি হয়েছিল পুরু কাঁচ দিয়ে। সেই কাঁচ দিয়ে দিনের আলো এসে পড়ত বারান্দা সহ লাইব্রেরির ঠিক মাঝখানের বিশাল ফাঁকা অংশে। পর্তুগীজ ‘বারোক’ , ফরাসী ‘রোকো’ ও রোমান ‘গ্রেকো’ স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এই লাইব্রেরির নক্সা বানিয়েছিলেন স্থপতি লিন্ড। সোনার কারুকার্য করা লম্বা থাম। সাদা কালো পাথরের মেঝে, বিশেষ নক্সার ঢালাই লোহা দিয়ে তৈরি জালি ঘেরা প্রশস্ত ঝুল বারান্দা। আঠারো থেকে বিংশ শতকের প্রথমদিকের তিন লক্ষেরও বেশি চামড়ায় বাঁধানো দুষ্প্রাপ্য বই আছে এই লাইব্রেরিতে। বিশ্বের গবেষকদের কাছে এই লাইব্রেরি এক অমূল্য সম্পদ।

​দূরদর্শী জর্জ পিবডি শুধু প্রাসাদসদৃশ একটি লাইব্রেরির বাড়ি তৈরি করেই ক্ষান্ত ছিলেন না, তিনি তাঁর সংগ্রহের অসংখ্য বইও দিয়ে গিয়েছিলেন এই লাইব্রেরিতে। এই লাইব্রেরিকে জনপ্রিয় করতে একের পর এক সাহিত্যের আলোচনা সভা ও শিল্পকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন পিবডির উত্তরসূরিরা। এমন কোনও বিষয় নেই যা সম্পর্কে বই নেই এই লাইব্রেরিতে। জন্মলগ্নে এই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ানদের সেই সময়কার শ্রেষ্ঠ মার্কিন লাইব্রেরিগুলোতে পাঠানো হয়েছিল তাদের সংগ্রহ ও পরিচালন পদ্ধতি দেখার জন্য। এই লাইব্রেরি শুধুমাত্র লাইব্রেরির জন্মের সমসাময়িক সময় থেকেই বই সংগ্রহ করেনি, এখানে রক্ষিত আছে অতি প্রাচীন অনেক সংগ্রহ। যেমন এই লাইব্রেরিতে আছে চোদ্দ শতকে গরুর চামড়ার ওপর হাতে লেখা সঙ্গীত বিষয়ক বই।

​২০০২ সালে এক লক্ষ মার্কিন ডলার খরচ করে আমূল সংস্কার করা হয়েছে এই লাইব্রেরির। আর্থিক সচ্ছলতা বাড়াতে বর্তমানে এই লাইব্রেরির নিচের পঠনপাঠনের জায়গাটি লাইব্রেরির নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। অনেকে পুস্তকপ্রেমী তাদের বিয়েকে স্মরণীয় করে রাখতে এই লাইব্রেরিতে আয়োজন করেন তাদের বিবাহ অনুষ্ঠান।

​এই লাইব্রেরির জন্মলগ্ন থেকে শুধু এখানে বসেই বই পড়া যায় । তাই খোয়া যায়নি একটি বইও।


তথ্যসূত্র :

george-peabody-library-wedding-venue
peabodyevents.library.jhu.edu/history

wikipedia.org

বিবিধ নিবন্ধ : ভালো থাকার কথা : লীনা রায় মল্লিক



আজ আমার ছোট্ট বন্ধুদের সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। আচ্ছা বলো তো দেখি, তোমাদের মধ্যে কতজন খুব তাড়াতাড়ি রেগে যাও? এই ধরো, মোবাইল ফোনে কোনও গেম খেলতে গিয়ে হেরে গেলে, আর সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ একেবারে তুঙ্গে। জিনিসপত্র সব ছুঁড়ে ফেলে দিলে রাগের চোটে। কিংবা হয়তো স্কুলে গিয়ে টিফিন বক্স খুলে দেখলে মা তোমার প্রিয় খাবারটা দেবেন বলেও দেননি। আর সঙ্গে সঙ্গে তোমার মাথা হয়ে গেল প্রচণ্ড গরম। আরও এরকম অনেক ছোট ছোট ঘটনা নিশ্চয়ই আছে, যখন হঠাৎই খুব রাগ হয় তোমাদের। আবার ধরো হঠাৎ খুব মন খারাপ। যে কারণে রাগ হয়, ঠিক সেই একই কারণে রাগের পরিবর্তে মন খারাপ হয় কি কখনও? এতো বেশি মন খারাপ যে আর কিছু ভালোই লাগে না। পড়ায় মন বসে না? খেলতে যেতেও ইচ্ছে করে না? দিনের পর দিন শুধুই মন খারাপ? অনেক সময় হয়তো বুঝতেই পারছো না যে কেন এত মন খারাপ হচ্ছে? তাহলে এবার বলি শোনো। কয়েকটা কথা মনের মধ্যে ভালো করে গেঁথে নাও ।


প্রথমত, আমাদের জীবনটা হল খুব সুন্দর। সব সময় এটা মনে রাখবে। তাই এই সুন্দর জীবনকে সুন্দর ভাবে কাটানোর দায়িত্বটাও কিন্তু আমাদেরই। আর এই সুন্দর ভাবে জীবন কাটানোর প্রথম চাবিকাঠি হল নিয়মানুবর্তিতা, যাকে ইংরাজিতে আমরা বলি 'ডিসিপ্লিন'। সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে সারাদিন যদি সব কিছু নিয়মমাফিক করতে পারো, তাহলে দেখবে পড়াশোনা, খেলাধুলা, গান, ছবি আঁকা, ঘুম এবং আরও অনেক কিছুর জন্য খুব সহজেই সময় বের করে নিতে পারছো। ইংরাজিতে একে বলে 'টাইম ম্যানেজমেন্ট'।

দ্বিতীয়ত, সব সময় মনে রাখবে যে জীবনে হারা আর জেতা – দুটোই থাকবে। জেতার আনন্দকে যেমন উপভোগ করতে হবে, হারের কারণটা বিশ্লেষণ করে খুঁজে বের করতে হবে যে ঠিক কী কারণে তুমি ব্যর্থ হয়েছো। তারপর নতুন উৎসাহ নিয়ে নিজের দুর্বলতা আর ত্রুটিগুলোকে নিজের শক্তিতে পরিবর্তিত করে জীবনে এগিয়ে যেতে হবে। হেরে গেলে মন খারাপ করে বসে থেকেও কোনও লাভ নেই।


তৃতীয়ত, সব সময় নিজের মনের উপরে নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করবে। আমরা কতটা ইতিবাচক ভাবে সমস্ত ঘটনাকে গ্রহণ করি আর কতটা নেতিবাচক ভাবে, সেগুলো নির্ভর করে আমাদের 'মানসিক বুদ্ধি'র উপরে। ইংরাজিতে যাকে বলে 'ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স'। যার ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স যত বেশি, সে তত বেশি সহনশীল, পরোপকারী, ইতিবাচক, পরিণত, সংবেদনশীল, ধৈর্যশীল, সহযোগিতাপরায়ণ এবং সে অতি সহজে মানসিক শান্তি ও ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। তাই সব সময় চেষ্টা করবে কীভাবে নিজের এই ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সকে বাড়ানো যায় । নিজের সাথে কথা বলো, নিজেকে জানতে শেখো অন্তর্দর্শনের মাধ্যমে। ইংরাজিতে একে বলে 'ইন্ট্রোস্পেক্সন'। নিজের মানসিক পরিস্থিতিকে আগে নিজে বোঝার চেষ্টা করো। যেহেতু তোমরা ছোটো, তাই এই ব্যাপারে মা- বাবা-দাদু- দিদা- শিক্ষক- শিক্ষিকা বা বাড়ির অন্য কোনও অভিভাকক-অভিভাবিকার সাহায্য নিতে পারো। প্রয়োজন হলে ধ্যান করতে পারো বড়দের তত্ত্বাবধানে। ইংরাজিতে একে বলে 'মেডিটেশন'। খেলাধুলা ও শরীরচর্চার মাধ্যমে তোমরা মনের জোর ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারো। তাহলেই দেখবে আস্তে আস্তে অতিরিক্ত রাগ আর মন খারাপের হাত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে। 



আজ এইটুকুই থাক । আবার একদিন বসবো তোমাদের সাথে আর শুনে নেব যে তোমাদের মধ্যে কতজন নিজের অতিরিক্ত রাগ আর মন খারাপকে জয় করতে শিখে গেছো।

ভালো থেকো আমার ছোট্ট বন্ধুরা।


(সমাপ্ত)

বিবিধ নিবন্ধ : ক্ষুধার রাজ্যে... : অনিন্দ্য রাউৎ



“ চল, চল, চল বের কর। আরো কত বস্তা? ”

“ আরো পাঁচ বাকি। ঘোটনকে দেখেছিস? কোথায় গেলো ও? শেষ মুহূর্তে কেস খাওয়াবে না তো? ”

“ না না চিন্তা করিস না, ওই তো খবর দিলো, এতটা রিস্ক নিলো। নিশ্চয়ই বাড়ি আগলাচ্ছে। ”

“ সত্যি ওর বাপ জানলে ...”


এক এক করে বস্তাগুলো বেরোতে থাকে গুটি গুটি পায়ে। ছোট ছোট দেহগুলো এমনভাবে বস্তাগুলোকে বের করছে, এই অন্ধকারে দূর থেকে দেখলে মনে হয় বস্তাগুলো নিজের পায়ে হেঁটে হেঁটে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে উঠে যাচ্ছে। ভিন্ন বয়সের দুইজোড়া সজাগ চোখ কড়া নজরে সবটা দেখছিল। টেনশন হচ্ছে, চাপ বাড়ছে। মাঝে মাঝেই চোখ চলে যাচ্ছে বারান্দার পেছনে থাকা বন্ধ দরজাগুলোর দিকে, যদিও বাইরে থেকে হুড়কো টানা, তবু যদি ঘুম ভেঙে যায়, দরজায় ধাক্কা পড়ে তাহলে কেলেঙ্কারি। বারান্দায় দাঁড়ানো বয়স্ক মানুষটি বলে উঠলেন,

“ কেমন লাগছে দাদুভাই? ”

“ ভয় করছে দাদা। তবে খুব ভালোও লাগছে। ”

“ আমারও। খুব ছোটবেলায় বাবামায়ের মুখে শুনেছি বিভিন্ন জমিদার বা মহাজনদের বাড়িতে বিপ্লবীরা খাদ্যের সামগ্রী বা আনাজ লুন্ঠন করতেন। আজ যেন নিজে সেই রোমাঞ্চ টের পাচ্ছি। ”

কিশোর ছেলেটির চোখ চকমক করে উঠলো। মনে হচ্ছে শেষ বস্তাটিও বেরিয়ে যাচ্ছে। দোতলার বারান্দা থেকে ওরা দেখলো, গেটের বাইরের গাড়িটার হেডলাইট জ্বলে উঠলো।

“ দাদা, আমরা পেরেছি। ”


ঘোটনের ভালো নাম কেউ তেমন জানে না। ভালো নাম একটা আছে বটে, ব্রজ লাহিড়ী। কিন্তু কেউ একবার ‘ঘোটন’ নামটা শুনলে আর অন্য নামে ডাকতে চায় না সে স্কুলেই হোক আর পাড়ায়। ঘোটনদের সম্ভ্রান্ত পরিবার, মূলতঃ তার বাবার জন্যই। দেশের স্বাধীনতার আগে তাদের বিশেষ কিছু ছিল না। তার ঠাকুর্দাও এক সাধারণ স্কুল শিক্ষক ছিলেন চাকুরিজীবি হিসাবে। কিন্তু বাবা বিশ্বেশ্বর লাহিড়ী ঐ পথে হাঁটেননি। তাঁর নিজস্ব বড় মুদির দোকান আছে এই মফস্বলে, যেখানে সংসারের যাবতীয় সামগ্রী পাওয়া যায়, এমনকী কানাঘুষোয় শোনা যায় তিনি চড়া সুদের কারবারও করেন। ঘোটন স্বাভাবিকভাবেই কোনোদিন এসব ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি। তার মন পড়ে থাকে খেলার মাঠে বা তাদের বাড়ির পেছনের পুকুরে, ওখানে যে ছিপ ফেলে ভালো মাছ ধরা যায়। বাবার সঙ্গে সারাদিনে তার তেমন দেখা হয় না, তাই মানুষটা সম্পর্কে এক অজানা ভয় আর শ্রদ্ধা মিশে থাকে। বাবা বেশি স্নেহও করেন না, দরকারি কথা ছাড়া সেও তাই পারতপক্ষে বাবার কাছে ঘেঁষে না। ঘোটনের কাছে তার ঠাকুর্দাই হলো সবকিছু, তার নিজের দাদা।


অন্যদিনের মতো ঘোটন স্কুল থেকে ফিরে কিছু খেয়ে নিয়ে দৌড় লাগালো মাঠের দিকে। আজ ক্রিকেট ম্যাচ আছে। তেমন ভালো ব্যাটিং, বোলিং না পারলেও টিমের সেরা ফিল্ডার ও। ওর দুইপাশে চারহাতের সীমানায় কোনো বল গলতে পারে না। কিন্তু মাঠে গিয়েই মাথায় বজ্রপাত। টিমের অন্যতম সেরা দুই ব্যাটসম্যান আজ খেলতে আসেনি, কানু আর ভানু। কানু-ভানুদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো নয় বলে খেলার যাবতীয় সরঞ্জামের খরচ ক্লাবই বহন করে। সেই ব্যাট, প্যাড সব মাঠের এক পাশে শোয়ানো। ওদের দেখা নেই।

“ কেউ গেছিলি ওদের বাড়িতে? ” ঘোটন জিজ্ঞেস করলো।

বাবুল বললো, “ হ্যাঁ, আমি যখন ডাকতে গেছিলাম ওরা বাড়ি ছিল না, কী কাজে বেরিয়েছে যেন। ওরা তো ক্রিকেট-পাগল, তাই ভেবেছিলাম, ঠিক চলে আসবে। ”

হতাশায় সবার কাঁধ ঝুঁকে গেল। এত ভালো দুজনকে ছাড়া ওরা খেলবে কি করে?

খেলা শুরু হলো, আর ফলও হলো আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করে। ওরা গোহারান হেরে ভূত হয়ে যে যার বাড়ি ফিরে গেল। ঘোটনের খুব মনখারাপ। এভাবে কেউ হারে? ব্যাটিং করতে নেমে একজনও দাঁড়াতে পারলো না, কানু ভানু থাকলে নিশ্চয়ই এরকম হতো না। কানু ভানুর কথা মনে হতেই ওর খুব রাগ হলো দুজনের ওপর। এভাবে কেউ শেষমুহূর্তে ডুবিয়ে দেয়? এই ওদের খেলার প্রতি, বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা? ওদের জবাব দিতে হবে। ঘোটন দ্রুত সাইকেল বের করে কানু ভানুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।


“ মা, এই কুড়ি টাকা। ”

“ মোটে কুড়ি টাকা? এত মাল বয়ে দিলি আর মোটে কুড়ি টাকা! এই টালির বাড়িটাও আর রাখতে দিবি না তোরা? যা, দূর হয়ে যা। ”

কানু আর ভানু আর কোনো কথা বলতে পারল না। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এলো। ওরা যে সারাদিন খাটলো, মা একবারও তা দেখলো না? সারাদিন না খেয়ে খিদেয় পেটে খুব ব্যথা হচ্ছে, তাও টের পেল না মা? আজ খেলার মাঠে না গিয়ে সব বন্ধুদের কাছে বিশ্বাসঘাতক হয়ে দাঁড়ালো যে ওরা, সেটাও দেখলো না বুঝি মা? ওরা কি আর কোনোদিনও খেলতে যেতে পারবে মাঠে? পারবে কোনোদিন আর স্কুলে যেতে? বাবার শরীর ঠিক হচ্ছে না, মা বিরক্ত ওদের ওপর আর ওরা যেন ঠিক ঠাহর করতে পারছে না কেন হয়ে চলেছে এরকম।

এক কামরার ঘর ওরা থেকে বেরিয়ে এসেই ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। ঘোটন? এখন? এখানে?

ঘোটন যতটা রাগ করে এসেছিল সেইমতো কিছুই করতে পারলো না। দরজায় টোকা দিতে গিয়ে ঘরের সমস্ত কথা ওর কানে গেছে। ওর মাথায় শুধু এটাই ঢুকছে না, কানু ভানু মাল বইতে কেন গিয়েছিলো?

ঘোটন কানু ভানুকে নিয়ে চলে এলো চৌমাথার ধারের বটগাছের তলায়।

“ কি হয়েছে তোদের? খেলার মাঠে আসিসনি কেন? ”

দুজনেই চুপ থাকে। কোনো কথা বলে না। ঘোটন অন্য প্রশ্ন করে, “ তোরা খেলতে না এসে মাল বইতে কেন গেছিলি? কি হয়েছে বল না। ”

এবারও দুজনে চুপ। ভানু যেন উশখুুশ করতে থাকে। হঠাৎ বলে ফেলে, “ ঘোটন কিছু খাওয়াবি? খুব খিদে ...”

কানু শক্ত করে ভানুর হাত চেপে ধরে। ভানু চুপ করে যায়।

ঘোটন বুঝতে পারছে বড়সড় কিছু গন্ডগোল হয়েছে কিন্তু কি হয়েছে তা ঠিক বুঝতে পারে না। পকেটে হাত দিয়ে দেখে একটা দশটাকা রয়েছে। ও কানুর বারণ উপেক্ষা করে মুড়িমাখা কিনে আনে।

“ বল না কানু, কি হয়েছে? তোরা আজ খেলতে এলি না, মাল বইতে গেছিলি, আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। ”

কানু না চাইতেও একমুঠো মুড়ি মুখে চালান করে। দুই ভাই পুরো মুড়িটা শেষ করে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ঘোটনের দিকে। “কিছু জানতে চাস না ঘোটন। তুই এই খাওয়ালি এতেই সব মিটে গেল। আর কিছু জানতে চাস না।”

ঘোটন আরো অবাক হয়ে যায়। “ কি মিটে গেল? আমি কি করেছি? ”

“তুই নয় তোর বাবা।” ভানু চোয়াল শক্ত করলো। কানু ভানুকে একটা ধাক্কা মেরে বললো, “চুপ থাক তুই। ঘোটন আমরা আজ আসি।”

ঘোটনের সব গুলিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্নরকম অনুভূতি কাজ করছে। ওর বাবা কি করলো? একটা ভয় চেপে বসছে মনে। ওর জানার আগ্রহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ও কানুর হাত ধরে আটকে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “ কি করেছে আমার বাবা? ”

দুজন কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর কানু বলে উঠলো, “শোন ঘোটন, তুই জেনে কিছু করতে পারবি না কিন্তু তবু জেনে রাখ, আশা করি তুই এরকম খারাপ কোনোদিন হবি না।

তোর বাবা চড়া সুদে কারবার করে। ধারবাকিতে জিনিস দিয়ে তার ওপর চড়া সুদ লাগায়। মেটানোর সময় দেয় অল্প। নিজে লোক লাগিয়ে অন্যের জমির ফসল তুলে নেয়, তারপর সে সাহায্য চাইতে এলে তাকেই উল্টে তার নিজের জমি তোর বাবাকে দিয়ে দেওয়ার জন্য টোপ দেয়, মানতে না চাইলে সুদের হার আরো বাড়িয়ে দাম মেটাতে বলে, ফেরত দিতে না পারলে জমি বন্ধক দিতে বলে। তারপর ধীরে ধীরে অন্যের বাসভূমি, চাষের জমি গ্রাস করে। আমার বাবার সঙ্গেও তাই হয়েছে। এই সপ্তাহের মধ্যে টাকা না দিলে আমাদের বাড়ি ভেঙে দেবে তোর বাবা।”

“কী যা তা বলছিস? মুখ সামলে কথা বল।”

“তোকে বলেইছিলাম তুই পারবি না সাহায্য করতে, তবে আমি যা বলছি তা ১০০% সত্যি।”

ঘোটনের চোখে জল চলে আসে কষ্টে, অপমানে। ওর বাবা এরকম? যা কানাঘুষো শুনতো ও ওর বাবার সম্পর্কে বাবা কী তার থেকেও বাজে?

কানু ভানু উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাড়ি ফেরার জন্য পেছন ফিরতেই ঘোটন বলে ওঠে, “ দাঁড়া, আমি তোদের সাহায্য করবো। চল আমার সঙ্গে, দাদার কাছে। ”


ঘোটনের ঠাকুর্দা ওরফে দাদা শিবেশ্বর লাহিড়ী আদর্শবাদী মানুষ। দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করে এখন অবসর নিয়েছেন। বহু ছাত্রছাত্রীদের মানুষ করতে গিয়ে বুঝেছেন কোথাও একটা তাল কেটেছে। তাঁর নিজের ছেলেই হয়তো সৎ পথে নেই। নাতি ঘোটন আর তার দুই বন্ধুর সব কথা শুনে তিনি তাই বিশেষ আশ্চর্য হলেন না। শুধু মনটা তীব্র এক যন্ত্রণায় ছেয়ে গেল। ছোটবেলার অনেক কথা মনে পড়তে লাগলো, ওঁর বাবার শোনানো অনেক কাহিনী। নিজের মনকে শান্ত করতে ঘোটন আর তার দুই বন্ধুর কাছে আউড়ে গেলেন অনেক কথা যা ঐ তিন কিশোরের কাছে সম্পূর্ণ অজানা।

“জানো দাদুভাইরা, মানুষই মানুষের চিরশত্রু। যুগ যুগ ধরে এমনটাই হয়ে চলেছে। একজন মানুষ বাকি সবাইকে ঠিক তারই মতো মানুষ বলে মনে করতে পারে না। ১৯৪২-৪৩ সালে যখন সারা বিশ্ব প্রমাদ গুণছে যুদ্ধের ভয়াবহতায়, তখন এই ভারত বা তথা বাংলায় এসে পড়ে সম্পূর্ণ অন্য এক সমস্যা। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যায় খাদ্যের অভাবে, অপুষ্টিতে, ম্যালেরিয়া আরো নানান রোগের মহামারীতে ,যা মূলতঃ হয়েছিল কিছু মানুষের দুরভিসন্ধি বা চক্রান্তে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় দুর্ভিক্ষ সাধারণত দেখা যায় প্রকৃতির খেয়ালখুশি চলনের ফলে। কিন্তু আমি যে দুর্ভিক্ষের কথা বলছি তার জন্য প্রধানত দায়ী ছিল মানুষদের ভূমিকা। মনুষ্যকৃত দুর্ভিক্ষ। জিনোসাইড বা সুপরিকল্পিত ভাবে মানুষ মারার অবস্থা তৈরি করা যা আপাতভাবে সবার চোখে প্রাকৃতিক মনে হলেও আসল কারণ আলাদা।


বছরের পর বছর বৃষ্টির অভাব, অপর্যাপ্ত চাষযোগ্য জমি, বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ফলনের উন্নতি না হওয়ায় সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলছিল। এর ফলে ভূমিহীন কৃষকদের সংখ্যা বেড়েই চলেছিল। আর এর মধ্যে একটা বিশাল অংশ ধারদেনায় ডুবে থাকতো মহাজনদের কাছে, ব্রিটিশ সরকারের কাছে। এই অবস্থাটা ভীষণভাবে ব্যাপকতা পায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ফলে। ইংরেজরা মিত্রবাহিনীর নামে যথেচ্ছ ভাবে ভারতীয়দের নিজেদের আপন যুদ্ধে ব্যবহার করতে শুরু করলো। নাহলে ভারতের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। সেনাবাহিনীর খাবারের জোগানের জন্য জমি দখল হতে লাগলো একের পর এক। বড়লোকরা আর ইংরেজদের প্রিয়পাত্ররা ফসল বাজারে ছাড়ার পরিবর্তে নিজেদের ঘরে জমাতে শুরু করলো। জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে লাগলো জোগানের অভাবের ফলে। ভারতে চালের এক অংশ তখন মায়ানমার বা বার্মা থেকেও আসতো। কিন্তু ১৯৪২ সালে জাপান বার্মা দখল করার পর সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলো ভারতের সঙ্গে, যেহেতু ভারত ইংরেজ অধীনস্থ ছিল। উপরন্তু ব্রিটিশ সরকার শুধুমাত্র মিলিটারি, সরকারি চাকুরে আর বিশেষ কিছু শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে সরবরাহ সীমাবদ্ধ রেখেছিল। ”

“ দাদা, তাহলে কি সাধারণ মানুষ কিছুই পেতো না? ”

“ পেতো দাদুভাই, তবে অন্যরকমভাবে, অনেক বেশি দামে, ব্ল্যাক মার্কেট বলে যেটাকে। যেখানে দামের কোনো নির্দিষ্ট মূল্য নেই। লোকদের মধ্যে প্যানিক বাড়লো কারণ খাবারই পৌঁছোত না তাদের কাছে। বার্মা থেকে চালের জোগান বন্ধ হওয়া এবং তৎকালীন সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দেওয়া শুরু করলো মানুষরা। যেসব বাঙালিদের খাবার কিনে খেতে হতো তাদের পক্ষে রোজকার দিন কাটানো মুশকিল হয়ে গেল। তাই মনে করা হয় এক নির্দিষ্ট ভূমিহীন কৃষক বা শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৩০% মানুষই মারা গেছিলো এই দুর্ভিক্ষে।

অনেকেই মনে করেন তখনকার ব্রিটেনের নেতা উইনস্টন চার্চিলের ভারতের প্রতি বিদ্বেষী মনোভাব এই দুর্ভিক্ষ ঘটার অন্যতম কারণ। চার্চিল ভারতীয়দের থেকে খাবার ছিনিয়ে ব্যবহার করেছিল তার দেশের সেনাবাহিনীর পেছনে। অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা গম ব্যবহার করা যেতো ভারতীয়দের জন্য কিন্তু তা কাজে লাগানো হলো মধ্যসাগরে অবস্থিত সেনাবাহিনীর জন্য। আর শুধু এই নয় ব্রিটিশরা কানাডা এবং আমেরিকা থেকে খাদ্য সরবরাহের সুযোগও প্রত্যাখ্যান করে। যদি চার্চিলের জায়গায় অন্য কেউ থাকতো তাহলেও হয়তো ভারত বিভিন্ন দেশ থেকে ত্রাণের সুযোগ সুবিধা পেতো। কিন্তু চার্চিল ভারত এবং ভারতীয়দের ঘৃণা করতো। বিভিন্ন জায়গায় তার উক্তিতে এই কথা স্পষ্ট যে ভারতীয়রা মারা গেলে তার কিছু যায় আসে না। প্রথম কিছু মাস চার্চিল মনেই করেনি আদৌ এই বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়েছে। মানুষের পর মানুষ মারা যাওয়ার পরও তার নজর এড়িয়ে থাকতো। তাই কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি এই দুর্ভিক্ষ রোধ করার জন্য। ৩০ লক্ষ প্রাণের আর্তি সামান্য আঁচড়ও কাটতে পারেনি চার্চিলদের মনে।”

“দাদা, দুর্ভিক্ষ শেষ হলো কিভাবে তাহলে?”

“ প্রকৃতি, প্রকৃতিই এই বাংলাকে আবার শস্যশ্যামলা করে তুলেছিল ১৯৪৪ সালে। সাধারণ ফলনের থেকে অনেক বেশি ফলন হয়েছিলো সেইবার। এত মানুষের বলিদান হয়তো ভূমি মা আর বেশিদিন নিতে পারেননি।

খারাপ মানুষরা চিরকাল সমস্যা জিইয়ে রাখতে চায়, তারা চায় অন্যদের কন্ট্রোল করতে। যাতে অন্য মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তারা ফুলেফেঁপে ওঠে। তখনও এই কাজ করতো কিছু মহাজনরা আর এখন আমার নিজের ছেলে করছে। তখন বিপ্লবীরা রুখে দাঁড়িয়েছিল আর এখন আমরা রুখে দাঁড়াবো কানু ভানুর পরিবারের প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে। খাবার অনেক দামি দাদুভাই। সামান্য এক গ্রাস খাবার না পেয়ে কোটি কোটি মানুষ মারা গেছে, যায়। তাই তোমায় খাওয়ার সময় খাবার নষ্ট না করতে বলি। ঐ নষ্ট হওয়া খাবার অন্য মানুষের কাছে বেঁচে থাকার উপকরণ। ”

ঘোটন বলে ওঠে, “আমি আর কোনোদিন খাবার নষ্ট করবো না দাদা। তুমি শুধু কানু ভানুর পরিবারকে বাঁচিয়ে দাও।”

“ হ্যাঁ, আচ্ছা বল তো তোদের কতজন বন্ধু আছে? রাত্রিবেলা বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে? ”


হ্যাঁ, এইভাবেই কানু ভানুর পরিবার তাদের ন্যায্য অধিকার আবার পেয়ে যায়। ঘোটন, দাদু আর ঘোটনের বন্ধুরা মিলে ঘোটনের বাবার গুদামঘরে মজুত থাকা বস্তার পর বস্তা লুট করে। পৌঁছে দেওয়া হবে বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে যারা কষ্টে আছে, যাদের খাবার জোগাড় করতে দিনের পর দিন চলে যায়।

“প্রাচীন যুগে খাবারের সংস্থান করতেই প্রতিটা দিন চলে যেতো। মানুষ সারাদিন ঘুরতো আর খাদ্য সংগ্রহ করতো। কিন্তু তারপর কৃষিকাজের আবিষ্কার হয়, খাদ্যের জন্য আর জায়গায় জায়গায় ঘুরতে হতো না, ধীরে ধীরে বাসস্থান গড়ে তুললো এক নির্দিষ্ট জায়গায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়, সর্বোপরি মানুষ খাবার জোগাড় করা ছাড়াও অনেককিছু ভাবার সুযোগ পেলো। গান, খেলাধুলো, পড়াশুনো সবকিছু এক এক করে জায়গা নিতে থাকে মানুষের মধ্যে। তাই আজও যদি মানুষকে খাদ্যের জন্যই জীবন দিতে হয় তার থেকে বড় অক্ষমতা মানবসমাজের আর নেই। একটা মানুষের উচিত আরেক মানুষ যাতে ভালোভাবে বাঁচে তার সুযোগ করে দেওয়া। বুঝলে দাদুভাই?”

“হ্যাঁ দাদা, আমি কোনোদিন কারোর ক্ষতি করবো না। একসঙ্গে থাকবো। কিন্তু এখন কি করবো দাদা? বাবাকে ...”

“হ্যাঁ, তোমার বাবাকে তার ভুল বোঝাতে হবে। যাতে সে নিজে আবার সৎ পথে ফিরে আসে। ঠিক বোঝাতে পারবো আমরা দুজন মিলে। আর এখন চলো, তোমার বাবা জেগে ওঠার আগেই আমরা সিন্দুক থেকে জমি বন্ধক রাখার দলিলগুলো সরিয়ে ফেলি। তুমি কাল খুঁজে খুঁজে দিয়ে আসবে। পারবে না দাদুভাই?"

“ঠিক পারবো দাদা।” ঘোটনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

“ঐ দেখো খাবারের গাড়ি চলে যাচ্ছে দূরে। বিভিন্ন মোড় ঘুরে তোমার বন্ধুদের খাবারের গাড়ি পৌঁছে যাক সবার বাড়িতে, একা আমরা না, সবাই আমরা ভালো থাকি।”




তথ্যসূত্র :
Churchill's Secret War by Madhusree Mukherjee,
ibtimes.com,
Wikipedia - Bengal famine

ছবি :
Sketch by Zainul Abedin : 1943 Famine
childrenarewaiting.org

বিবিধ নিবন্ধ: ভারতের আনাচে কানাচে : শাশ্বত বসু



পৃথিবীর সবথেকে প্রাচীন মহাকাব্য গ্রন্থগুলির মধ্যে মহাভারত অন্যতম। মহাভারত আজ থেকে আনুমানিক প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে আমাদের দেশ ভারতবর্ষে লেখা হয়েছিল। লিখেছিলেন ব্যাসদেব বা বেদব্যাস নামের একজন ঋষি। তা এই মহাভারতের মধ্যে অনেক আশ্চর্যজনক ও মজার মজার কাহিনী আছে। তবে বুঝতেই পারছো বন্ধুরা, পাঁচ হাজার বছর আগের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া খুব শক্ত। গবেষণা করে দেখা গেছে, মহাভারতে লেখা অনেক কিছুই সত্যি। প্রত্নতত্ত্ববিদ S. R Rao তাঁর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে গুজরাটে সমুদ্রের তলায় অভিযান চালিয়ে অদ্ভুত এক মহানগরীর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। সেই মহানগরীর নাম ছিল দ্বারকা, যার সময়কাল ও ভৌগোলিক অবস্থান মহাভারত অনুযায়ী মিলে যায়। তারপর ১৯৯৯ সালে তিনি "The lost city of Dwarka" নামে একটি বইও লেখেন এবং মহাভারতকে ঐতিহাসিক সত্য বলে ব্যাখ্যা করেন। ইংল্যান্ডে প্রকাশিত "History Today" পত্রিকার ৫২তম ভলিউমের নভেম্বর ২০০২ সংখ্যায় লেখা হয়েছিল, ৭৫০০ বছর আগের ভারতের এই সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের কথা। এছাড়াও মহাভারতে আরো যেসব জায়গার নাম ও বর্ণনা আছে সেসব জায়গা এখনো ভারতে রয়েছে। বেশ কিছু নদী, পাহাড় ইত্যাদির নাম যেগুলি মহাভারতে পাওয়া যায় সেসব এখনো আছে। তবে সে যাই হোক, চলো আমরা সেই মহাভারতের একটা মজার ঘটনা দিয়ে আলোচনা শুরু করি। আনুমানিক ৩১০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে অর্থাৎ ৫১০০ বছরেরও আগে হস্তিনাপুর বলে একটি রাজ্য ছিল। সেখানে রাজা ধৃতরাষ্ট্র তাঁর ভাই পাণ্ডুর ছেলেদের অর্থাৎ পাণ্ডবদের অর্ধেক রাজ্য দিয়ে পাঠিয়ে দেন খাণ্ডব নামের একটি জঙ্গল এলাকায়। এই খাণ্ডব জঙ্গল আজকের দিল্লীর কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। আর নিজের পুত্রদের জন্য অর্থাৎ কৌরবদের জন্য রাজধানী হিসাবে রাখলেন হস্তিনাপুরকেই। তা পাণ্ডবরা সেই জঙ্গল পরিষ্কার করে গড়ে তুললেন এক অপূর্ব সুন্দর নগরী। নাম হলো ইন্দ্রপ্রস্থ। ময় নামের একজন শিল্পী বা স্থপতি (architect) তৈরী করলেন অদ্ভুত এক মহল যা নাকি ছবির মতো সুন্দর ছিল। যে দেখতো সেই অবাক হয়ে যেত, তাকিয়ে থাকতো মুগ্ধ হয়ে। কিছুদিন পরে পাণ্ডবরা কৌরবদের নিমন্ত্রণ করলেন ইন্দ্রপ্রস্থে আসার জন্য। কৌরবদের রাজা দুর্যোধন সেই মহল দেখে খুব অবাক হলেন আর পড়লেন নানারকম বিপদে। তিনি দরজা মনে করে মহলে ঢুকতে গিয়ে ধাক্কা খেলেন পাথরের দেওয়ালে। তারপর মহলের ভিতরে মেঝে মনে করে পা রাখলেন একটি জলাশয়ের উপর। দেখে যে বোঝার উপায় নেই সেখানে জল আছে! তিনি যখন বুঝলেন তখন যা হওয়ার হয়ে গেছে, তিনি পড়ে গেলেন জলের মধ্যে, ভিজে গেলেন পুরোপুরি। এমনিতেই তিনি খুব রাগী ছিলেন, এই ভাবে বোকা বনে যাওয়ায় তো ভীষণ রেগে গেলেন। পরে তিনি পাণ্ডবদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, যা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ নামে পরিচিত আর কুরুক্ষেত্র নামের জায়গা ভারতে এখনো আছে, সে অবশ্য অন্য কথা। যেটা আমাদের আলোচনার বিষয়, সেটা হলো এই অদ্ভুত মহল আর স্থাপত্য। যা কিনা রাজা হয়েও দুর্যোধন বুঝতে পারেননি দেখে। আমরা দেখলে যে কী অবস্থা হতো, তা আর না ভাবাই ভালো।

তোমরা অনেকেই হয়তো ভাবছো সেই সব অদ্ভুত সুন্দর সৃষ্টি কোথায় গেল? কিছুই কি আর নেই? সত্যি কথা বলতে এত পুরোনো দিনের জিনিস আজ খুঁজে পাওয়া শক্ত, তবে পাঁচ হাজার না হোক, এক-দেড় হাজার বছরের পুরোনো স্থাপত্য গুলিও কিন্তু কম আশ্চর্যের নয়। সেগুলি কিন্তু সারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে রয়েছে। গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি কিংবা ডিসেম্বরের ছুটিতে আমরা প্রায় প্রতি বছরই এদিক ওদিক বেড়াতে যাই। একটু খোঁজ খবর করে রাখলে এমন অনেক জায়গায় টুক করে ঘুরে আসাই যায় যেখানে অনেক অবাক করা পুরোনো স্থাপত্য আছে। এমনই এক জায়গার নাম খাজুরাহো। মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড নামে পরিচিত অংশে এই শহরটি অবস্থিত। চান্দেল রাজারা বংশ পরম্পরায় এখানে প্রায় একশোর কাছাকাছি মন্দির তৈরী করেন। সবই প্রায় ১২০০ থেকে ১০০০ বছর আগে। আমি যখন প্রথম খাজুরাহো পৌঁছালাম, দূর থেকে বিরাট উঁচু আর বড়সড় আকারের একটা মন্দির দেখতে পেলাম। নাম কন্দরীয় শিবের মন্দির। তার আশেপাশে তার থেকে ছোট আরো অনেকগুলো মন্দির রয়েছে।

         কন্দরীয় শিবমন্দির ,খাজুরাহো - দূর থেকে

দূর থেকে দেখে মনে হলো, ভালো, তবে সব পুরোনো মন্দির তো এরকমই অনেকটা হয়, হয়তো কিছুটা ছোট। আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও তো পুরোনো মন্দির কিছু আছে। কিন্তু কাছে যেতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। চোখের সামনে যা দেখছি, তা যে আগে কোনওদিন দেখিনি!

 কন্দরীয় মহাদেব মন্দিরের একটি দেওয়ালের অংশ - কাছ থেকে 

দূর থেকে যাকে সাধারণ দেওয়াল মনে হচ্ছিল, কাছে যেতে বুঝলাম সেগুলো অসংখ্য মূর্তি দিয়ে তৈরী। এই মূর্তির কাজকে বলে ভাস্কর্য। এমনভাবে মূর্তিগুলি খোদাই করা আছে সমস্ত মন্দিরের দেওয়াল জুড়ে, যে কোথাও কোন অমিল নেই, নিখুঁত সামঞ্জস্য (symmetry)। এতটাই নিখুঁত বলে দূর থেকে বোঝার উপায় নেই যে এত এত মূর্তি রয়েছে সারা দেওয়ালগুলো জুড়ে। আর কী সুন্দর সব মন্দিরের রঙ!

                    খাজুরাহো মন্দিরের ভাস্কর্য

হরেক রকমের পাথর দিয়ে তৈরী মন্দিরগুলোয় সূর্যের আলো পড়ে কখনো সোনালি, কখনো খয়েরি, কখনো লাল দেখায়। একটা পাথরের সঙ্গে আরেকটা পাথর ইন্টারলক পদ্ধতিতে আটকে এই বিরাট মন্দিরগুলো তৈরি হয়েছিল। ইন্টারলক মানে হলো একটি পাথরের খাঁজে আরেকটি পাথরকে আটকে দেওয়া। এইভাবে সবথেকে উপরের চূড়ার বিরাট আকারের ভারী পাথরটা তুলে নিচের পাথরের খাঁজের মধ্যে ঠিক জায়গা মতো আটকানো যে কত কঠিন, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। শোনা যায়, কোনও এক ইংরেজ সাহেব এখান দিয়ে যাওয়ার সময় মন্দিরগুলো দেখতে পান। তিনিও আমার মতই অবাক হয়ে বলেছিলেন, এমন সৃষ্টি কী করে সম্ভব!

খাজুরাহো মন্দিরগুলোতে যেমন পাথরের সাথে পাথর আটকে গড়ে তোলা হয়েছে, মহারাষ্ট্রের ইলোরা তে যে আশ্চর্যজনক কৈলাস মন্দির আছে, সেটি আবার একটি বিরাট পাথরকে কেটে বানানো। অর্থাৎ একটি মাত্র বিরাট পাথর (ছোট টিলার আকারের) থেকে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে সুন্দর সুন্দর মূর্তি ও কারুকার্য বিশিষ্ট এই মন্দির তৈরি হয়। তাও আবার দোতলা। এই rock-cut পদ্ধতিকে বলা হয় monolithic structure; তোমরা তো জানোই mono মানে হলো single বা এক। পৃথিবীতে এত বড় monolithic structure আর কোথাও নেই।

                       কৈলাস মন্দির ,মহারাষ্ট্র

শুধু স্থাপত্য আর ভাস্কর্যের সৌন্দর্যই নয়, সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই এত বছর আগে কেমন করে একটা টিলার মত বড় পাথর কেটে এমন নিখুঁত মন্দির তৈরি করা হলো। আমরা তো বইতে পড়েছি, আজ থেকে হাজার বছর আগে ছেনি আর হাতুড়ি ছাড়া নাকি কোনও যন্ত্র ছিল না! কিন্তু ছেনি হাতুড়ি দিয়ে তো এরকম পাথর কাটা অসম্ভব! আরো একটা প্রশ্ন হলো, এত বড় পাথর কাটার পর যে কয়েক'শ টন পাথর বাদ গেল, সেগুলো গেল কোথায়! ওই বিপুল পরিমাণ ভারী পাথর সরিয়ে ফেলাও তো সহজ নয়। কেবলমাত্র গলিয়ে বা বাষ্পীভূত করে দিলেই তা সম্ভব কিন্তু এমন পাথর গলানো তো যন্ত্র ছাড়া অসম্ভব! এই সব প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায়নি এবং কৈলাস মন্দির তার দীর্ঘস্থায়ী রহস্যজনক সৌন্দর্য নিয়ে একইভাবে আজও বর্তমান। কবে যে এই মন্দির নির্মাণ হয়েছে তা সঠিক জানা নেই তবে অনেকে বলেন রাষ্ট্রকূট বংশের রাজাদের সময় প্রায় ১৩০০ বছর আগে এই মন্দিরটি নির্মিত হয়। পৃথিবীতে আজও এরকম স্থাপত্য তৈরী করা সম্ভব হবে না। এ এক বিরল সৃষ্টি এবং আশ্চর্য! খাজুরাহো ও ইলোরা দুই ধরনের টেকনিক ব্যবহার করে তৈরি হলেও মনে রেখো, দুই ক্ষেত্রেই সামান্য ত্রুটি হলেই কিন্তু সেটা আর নিখুঁত করা সম্ভব হতো না। ইন্টারলকে গোলমাল হলে মানে ঠিকমত খাঁজে খাঁজে না বসলে পাথরগুলো অসমঞ্জস বা অসমান হয়ে পড়তো। আবার পাথর কাটায় কিছু পরিমাপের ত্রুটি হলে কৈলাসও তার সৌন্দর্য হারাতো।

দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকে হয়সালেশ্বর মন্দির আরেক বিস্ময়কর কীর্তি।


            হয়সালেশ্বর মন্দিরের একটি অংশ

বলা হয়, হয়সাল রাজবংশের রাজারা প্রায় ৯০০ থেকে ১০০০ বছর আগে এই মন্দির নির্মাণ করেন। এখানেও সমস্ত দেওয়াল জুড়ে অসংখ্য ভাস্কর্য রয়েছে, কোথাও রামায়ণ কোথাও মহাভারত, কোথাও বিভিন্ন পৌরাণিক ঘটনার ছবি মূর্তি রূপে ছড়িয়ে রয়েছে মন্দিরের আনাচে কানাচে। সৌন্দর্যের কথা সবটা তো লিখে বলা যায়না, তোমরা নিজের চোখে দেখলে তবেই বুঝবে। আমরা বরং অন্যকিছু বিষয় নিয়ে কথা বলি।

                    অদ্ভুত মূর্তি - হয়সালেশ্বর

এই অপরূপ স্থাপত্য ভাস্কর্য তো অনেক মন্দিরেই লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু এখানে কিছু অদ্ভুত মূর্তি রয়েছে। যেমন, একজন ব্যক্তি চোখে দূরবীন জাতীয় কোনও কিছু লাগিয়ে এক চোখ বন্ধ করে কিছু দেখছেন, আবার একদল মূর্তি অদ্ভুত পোশাক পরে রয়েছেন অনেকটা বর্তমান মহাকাশচারীদের মত। তৎকালীন সময়ে এরকম আধুনিক বিষয়ের কল্পনা করাও কি সম্ভব? এছাড়াও এখানে আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় দেখা যায়, সেটা হলো পাথর কাটার সূক্ষ্মতা।

                হয়সালেশ্বর মন্দিরের একটি স্তম্ভ

লম্বা লম্বা স্তম্ভগুলির গায়ে অতি সূক্ষ্ম অসংখ্য বৃত্তাকার অংশ দেখা যায় যেগুলি ছেনি হাতুড়ি দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। আবার একেকটি মূর্তির গায়ে ও মাথায় এমনভাবে পাথর কেটে অলঙ্কার, মুকুট ইত্যাদি তৈরী করা হয়েছে যা ৩ মিলিমিটারের চেয়েও ছোট ছোট ছিদ্র বিশিষ্ট।

       অতি সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত মূর্তি ,হয়সালেশ্বর

অনেকেই মনে করেন বর্তমানের অত্যাধুনিক লেদ মেশিনের মতো কোন যন্ত্র ছাড়া এত সূক্ষ্ম ছিদ্র ও পাথর কাটার কাজ সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেও সেই একই প্রশ্ন ৯০০ বছর আগে কি এত আধুনিক মেশিনের ব্যবহার ছিল! আমাদের প্রচলিত ইতিহাস তো তা স্বীকার করে না। কিন্তু নিজের চোখকেও তো অস্বীকার করা চলে না। তাহলে কি করে সম্ভব হলো এই সৃষ্টি! উত্তর অজানা!


ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় কিছু সূর্য মন্দির আছে। তার মধ্যে গুজরাটের সূর্য মন্দির ও উড়িষ্যার কোনারক অন্যতম। আনুমানিক ৭৭০ বছর আগে কোনার্কের মন্দির তৈরী হয়। এই মন্দিরটিও ভাস্কর্যের প্রাচুর্যে ভরপুর। পাথর দিয়ে তৈরি একটি ১০০ ফুট উঁচু রথ, তাতে বিশাল বিশাল চক্র ও ঘোড়ার মূর্তি। সর্বমোট ২৪ টি চক্র এই মন্দিরে রয়েছে। বলা হয় সূর্য মন্দির আজকের দিনের মত সাধারণ মন্দির নয়, এগুলি বিদ্যাচর্চার, বিশেষত জ্যোতির্বিজ্ঞানের মডেল।

এখানে ২৪ টি চক্র দিয়ে দিনের ২৪ ঘন্টার হিসাব বোঝানো হয় এবং সূর্য ঘড়ির মতো একেকটি চক্রকে বোঝানো হয়েছে। এই সময়ের হিসাব ও দিন রাত্রির হিসাব যে ভারতবর্ষেই প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছে সে নিয়ে কোনও সংশয় নেই। আমরা সবাই জানি পৃথিবীকে সময় ও অঙ্কের হিসাব ভারত প্রথম জানিয়েছিল। অনেকের মতে এখানে সূর্যকে মূর্তি রূপে কল্পনা করে সাতটি ঘোড়ায় টানা রথে তার পরিভ্রমণ বোঝাতে এমন মূর্তির ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে শিল্পগুণ ও সৌন্দর্যও একইরকম ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

কর্ণাটকের হাম্পি তে সাজানো রয়েছে আরেক বিস্ময়। সেখানের বিজয় বিট্ঠল মন্দিরে রয়েছে মিউজিক্যাল পিলার, মানে যার পিলারগুলোতে আঘাত করলে বাদ্যযন্ত্রের শব্দ হয়।

বলা হয় রাজা দেবরায়ের আমলে আনুমানিক ৫০০ বছর আগে এই মন্দিরটি তৈরী হয়েছে। এখানে ৫৬ টি মিউজিক্যাল পিলারের সন্ধান পাওয়া যায়। একে অনেকে সা-রে-গা-মা পিলারও বলেন, কারণ একেকটি স্তম্ভের চারপাশে সাতটি অপেক্ষাকৃত সরু স্তম্ভ আছে, যেগুলিকে আঘাত করলে গানের যে সাত সুর (সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি) আছে সেরকম সুর তৈরী হয়। একটি ভাস্কর্যে দেখা যায় একজন মানুষ একটি ঢোল নিয়ে রয়েছেন। সেই ঢোলে আঘাত করলে আশ্চর্যজনক ভাবে ঢোলের বা ড্রামের শব্দ হয়। প্রত্যেকটি পিলার কিন্তু একই রকম দেখতে গ্রানাইট পাথর দিয়ে বানানো। অথচ প্রত্যেকটা থেকে এমন বিভিন্ন সুর ও শব্দ কী করে তৈরি হচ্ছে সে এক আশ্চর্যের কথা। ইংরেজ আমলে কিছু সাহেব এমন অদ্ভুত পিলার দেখে আশ্চর্য হয়ে এই পিলারগুলোর মধ্যে থেকে দুটি পিলার খুলে নিয়ে যান পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য। কিন্তু তাঁরা সেগুলোর মধ্যে কোনও তফাৎ খুঁজে পাননি। একই পদার্থ দিয়ে তৈরি একইরকম আকার ও আয়তনের স্তম্ভকে কোন পদ্ধতি ও পরিমাপের তারতম্য অনুসারে বানিয়ে এমন ভিন্ন ভিন্ন শব্দ তৈরি হচ্ছে, তা আজও বিস্ময়।

কয়েকটি মন্দির নিয়ে আলোচনা হলো মাত্র। এছাড়াও আরো অনেক অনেক মন্দির স্থাপত্য সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে যাদের সম্পর্কে বলেও শেষ করা যায় না। কখনো সময় সুযোগ হলে তোমরা দেখে এসো আর লিখে ফেলো তোমাদের অভিজ্ঞতার কথা। কিশলয় তো রইলো তোমাদের জন্য। আরেকটি কথা মনে রাখা দরকার যে এই সমস্ত প্রাচীন মন্দিরগুলি কিন্তু মোটেও ধর্ম চর্চার জায়গা ছিল না। এগুলি ভারতীয় আদর্শ, সমাজ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান ছিল। বর্তমান সাধারণ মন্দিরের সাথে এই সমস্ত মন্দিরকে গুলিয়ে ফেললে ভুল হয়। এগুলি অনেক চিন্তাভাবনা ও প্রাচীন ভারতীয় বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি। সেগুলি বুঝতে হলে অনেক গভীরে গবেষণার প্রয়োজন। আধুনিক ভাষায় এই স্থাপত্য ভাস্কর্য রীতির বিষয়ে পড়াশোনাকে বলে "iconography"; সম্ভব হলে কোনওদিন সে বিষয়ে আলোচনা করা যাবে। আসলে আজকের ভারতীয় সমাজের প্রেক্ষাপটে প্রাচীন ভারতকে বোঝা খুব কঠিন। বারবার বৈদেশিক শত্রুর আক্রমণে আমাদের দেশীয় বিদ্যা চর্চার কেন্দ্রগুলি ও সমাজের প্রতিরূপ মন্দিরগুলি ভীষণ ভাবে আক্রমণের মুখে পড়ে। প্রচুর মন্দির, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ধ্বংস হয়েছে, তা সত্ত্বেও অদ্ভুত পদ্ধতিতে তৈরী পাথরের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। অনেক উদাহরণ দেশ জুড়ে আজও রয়েছে। যে কয়েকটি উদাহরণ তোমাদের সামনে তুলে ধরলাম তা থেকে এটুকু বুঝতে হয়তো সুবিধা হবে যে আমাদের দেশ কত উন্নত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পরাধীন হয়েছি, অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু নিজেদের সংস্কৃতিকে বুঝতে চাইলে এই মন্দিরগুলি সম্পর্কে জানা উচিত। যুক্তি, দর্শন এমনকি গ্রন্থ সম্পর্কেও সন্দেহ আসতে পারে কিন্তু স্থাপত্য ভাস্কর্য সূর্যের মতই জ্বলজ্বল করতে থাকা প্রমাণ, দ্বিধাহীন সত্য। স্থাপত্যকে জানলে, নিজের দেশের প্রাচুর্যকে কিছুটা জানা হয়। তখন জানার ইচ্ছে আরো বাড়তে থাকে আর পরম শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় বলতে গর্ব হয়, "আমরা ভারতবাসী।"


তথ্য সূত্র:-

১) মহাভারত - হিন্দী অনুবাদ সহিত - গীতাপ্রেস

২) Ancient Indian Architecture - from blossom to bloom - Dr. sanjeeb Maheswari & Dr. Rajib Garg

৩) Temple architecture and sculpture - NCERT

৪) Phenomenal travel videos (youtube channel) - Praveen Mohan


ছবি : শাশ্বত বসু
হাম্পি ও কোনার্ক : গুগল

বিবিধ নিবন্ধ : দিশারী : স্বর্ণদ্বীপ চৌধুরী




স্কুল থেকে ফিরে একরাশ বিরক্তি নিয়ে সোফার ওপর ধপাস করে বসে পড়লো পুপুন ওরফে সাম্য চ্যাটার্জী। স্কুলের টিচারদের নতুন নতুন বায়নাক্কার ধাক্কা সামলাতে সামলাতে, ক্লাবের মাঠে ক্রিকেট-ফুটবল বা ভুট্টোদের ভূতুড়ে ভাঙা বাড়িতে লুকোচুরি খেলা, টিভিতে টম অ্যান্ড জেরী দেখা, তুতুলদের বাড়িতে ক্যারামের আসর সব বন্ধ হয়ে আসছে একে একে। বাকিদেরও অবস্থা যে এর থেকে খুব যে আলাদা, তা নয়। ক্লাস সেভেনের ছাত্র পুপুন, স্কুলের পর এক্সট্রা ক্লাস করে যখন বাড়ি ফেরে, খেলার ইচ্ছা থাকলেও সঙ্গী জোটে না,কারণ সবাই তো কোনো না কোনো টিউশনে ব্যস্ত।

বাড়ি এসে যে একটু কার্টুন দেখবে তারও উপায় নেই, সোমবার আর শুক্রবার থাকে ক্যারাটের ক্লাস, মঙ্গলবার ড্রইং টিচার আসেন, আর বুধবার, বৃহস্পতিবার অঙ্ক আর সায়েন্সের স্পেশাল টিউশন। ক্লাস টেনের পর, সায়েন্স নিয়ে না পড়লে নাকি ভবিষ্যৎ অন্ধকার, তাই চাকুরিজীবী পুপুনের বাবা-মা এই বন্দোবস্ত করেছেন। শনিবারটুকু তাও দাদা আসে বাড়ি, হোস্টেল থেকে, ওর সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, খুনসুটি করে, টিভি দেখে সময় কেটে যায়, নাহলে রবিবার বাবা মায়ের দুজনেরই ছুটি, আর ওদের সারাদিন কেবল খবরের চ্যানেল দেখতে ইচ্ছা হয়। ব্যস! টিভি দেখার আশায় ছাই দুই ভাইয়ের। এত খুনজখম আর মিছিল-মিটিংয়ের নিউজ দেখে কোন লাভ যে আখেরে হয় তা বোঝা দুঃসাধ্য, প্রশ্ন করলে বলে,"তোমরা এখনো ছোট, এসব বোঝার বয়স হয়নি!”, ধুত্তোর, আর ভাল্লাগেনা!

গোদের ওপর বিষফোঁড়া, পরশু স্বাধীনতা দিবসের দিন স্কুলে সারাদিন নানারকম প্রতিযোগিতার আয়োজন। এফ ব্লকের বিল্টু, তাতাই সবাই মিলে প্ল্যান করেছিল, প্যারেড করে ছুটি হয়ে গেলে, ঘুড়ি ওড়াবে সবাই মিলে, সব ভেস্তে গেল।

তার বদলে মুখে চামচ নিয়ে তাতে চেরিফল ধরে রেখে লাগাতে হবে দৌড়। ইশ! চেরি এমনিতেই ভালো লাগে না পুপুনের। কিন্তু সে তাও একরকম, সমস্যা হয়েছে স্পিচ কম্পিটিশন নিয়ে। বিপ্লবীদের নিয়ে কিছু কিছু তথ্যসমৃদ্ধ, স্বল্পসময়ের বক্তৃতা দিতে হবে,হিস্ট্রি বইয়ে যা লেখা আছে তার বাইরে থেকে,এই হচ্ছে কম্পিটিশনের নিয়ম। এসব সে এখন পাবে কোথায়! বাবা-মায়ের সময় নেই, ওদের বললে বলবে স্কুলের টিচারদের জিজ্ঞাসা করে নিও, আর ওখানেই গোলমাল। হিস্ট্রি টিচার,ভাস্বতী ম্যাম এমনিতেই পুপুনদের গ্রুপটাকে সুনজরে দেখেন না, কেবল কথায় কথায় চটে যান , তাই কোনো প্রয়োজন থাকলেও ওঁর কাছে যেতে একটুও ইচ্ছা করে না ওদের। কাছে দাদা থাকলে তাও গুগলে দেখে বলে দিত, সেও পরীক্ষার জন্য আসছে না, তাই নিজেই বসলো কিছুক্ষণ বাড়ির কম্পিউটার চালিয়ে, কিন্তু নানারকম ভাবে গুগল করেও সেই গান্ধী-নেহেরু আর নেতাজির কথা ছাড়া সেইভাবে কিছু পেলো না। ওই সব তো হিস্ট্রি বইতেও আছে, কিন্তু ওর বাইরে খুঁজতে হলে ঠিকঠাক নাম জানা প্রয়োজন, তাও জানা নেই।

উপায় কিছু বের করতেই হবে, এইরকম ভাবনা চিন্তা যখন চলছিল,এমন সময় বাড়ির ল্যান্ডলাইনটা বেজে উঠলো। রিসিভ করতেই, তাতানের গলা, “পুপুন আমার দাদু এসেছে, মা মালপোয়া বানাচ্ছে, চট করে চলে আয়”।

মালপোয়া খাওয়ার নিমন্ত্রণ পেয়েই, পুপুনের প্রচণ্ড ব্যাজার মেজাজ নিমেষেই ফুরফুরে হয়ে গেল, হাত মুখ ধুয়ে সময় নষ্ট না করে, প্রায় ছুটেই বেরোলো, পাশের ব্লকের বিল্ডিংয়ে থাকা তাতানের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে, কোনওরকমে বাড়িতে চাবি লাগিয়ে।

পৌঁছে দেখে মালপোয়ার গন্ধে, ঘর ভরপুর, তবে বানানো শেষ হয়নি, তাই তাতান দাদুর কাছে বসে গল্প করছে। সেও বসে গেল সঙ্গে। এই কথা, সেই কথার পর, স্কুলের প্রসঙ্গ আসতেই, তাতান আর পুপুনের অভিযোগের পর অভিযোগ শুরু হলো স্কুলের বিরুদ্ধে, দুজনেই ক্লাসমেট, তাই একই সমস্যাতে জেরবার। দুই কিশোরই ক্লাস টিচারের নতুন দাবির কথা জানাতে, দাদু সান্তা ক্লজের মতো হো হো করে হাসতে থাকলে, এরা দুজন কিছুই ঠাহর করতে না পেরে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো।

হাসি থামিয়ে দাদু বললেন, “আচ্ছা, এই কথা! বেশ আমি তোমাদের দুজনের জন্যেই কয়েকটা গল্প বলবো, নিজেরা নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নিও, এর থেকে কে কোনটা স্কুলে বলবে, তা হলেই হয়ে যাবে।” দুজনেই মহাখুশি, গুছিয়ে বসলো দাদুর দুই পাশে।

গরম, মুচমুচে মালপোয়াতে এক কামড় বসিয়ে, দাদুও বলতে শুরু করলেন।


“সে বহু আগেকার কথা, ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায়, আঞ্চলিক শক্তিরা শাসন করছে তখন।

বিথুর পরগণার মন্ত্রী, যাদের মারাঠি ভাষায় বলা হতো পেশোয়া, তার সভার উপদেষ্টামণ্ডলীর বিচক্ষণ সদস্য ছিলেন মোরোপন্থ তাম্বে। তাঁর একমাত্র মেয়ে, মাত্র চার বছর বয়সে মাতৃহারা হয়ে বাবার তত্ত্বাবধানে বড় হতে লাগলো। পোশাকি নাম ‘মণিকর্নিকা’ হলেও, আদর করে ডাকা হয় ‘মন্নু’, তবে দস্যিপনার জন্যে কেউ কেউ ‘ছাবিলি’ বলেও ডাকে। দুই অসমবয়সী বন্ধু, ধোন্দু পান্থ আর রামচন্দ্র পাণ্ডুরং টোপে’এর সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে খেলতে গিয়ে একদিন ঘটে গেল বিপদ। ক্ষিপ্ত ঘোড়া, ধোন্দুকে ফেলে তো দিলোই, লাফাতে লাফাতে পিষেই বুঝি দেয় তাকে, এমন সময় মন্নু তড়িৎগতিতে ঘোড়া থেকে নেমে এসে ঘোড়ার পা টেনে সরিয়ে, ধোন্দুকে বের করে আনে ওর নিচে থেকে। ভীত-সন্ত্রস্ত ধোন্দু গুরুতরভাবে আহত হয়ে কাঁপতে থাকলেও, সাহসী মন্নু তাকে এই বলে বোঝাতে থাকে, যে চোট খুব সাংঘাতিক কিছু নয়, একদিনেই সেরে যাবে। মন্নু নিজেও আহত হয়েছিল, কিন্তু সেসব দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই বন্ধুকে সাহস জোগাতে থাকে, কিছুদিনের মধ্যে দুজনেই সেরে ওঠে।



এরপরেও আরেকবার এক ক্ষিপ্ত হাতিকেও অসম্ভব দুঃসাহস দেখিয়ে, শান্ত করে মন্নু। বড় হতে হতে তলোয়ার চালানো, তীরন্দাজি সবেতেই দক্ষতা অর্জন করে এই মন্নু, ওরফে মণিকর্নিকা। মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে মন্নুকে বিয়ে করেন ঝাঁসির মহারাজা রাজা গঙ্গাধর রাও নেওয়ালকার। কিন্তু সুখের জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয় না, এক ছেলে শৈশবেই মারা গেলে, মহারাজা তার ভাইয়ের ছেলেকে দত্তক নেন রাজত্ব রক্ষা করতে। মহারাজের মৃত্যুর পর বালক রাজকুমার দামোদর রাওকে রাজা ঘোষণা করা হলে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ শাসকরা তা আমল দিতে অস্বীকার করেন, এবং ষাট হাজার টাকা মাসোহারার বদলে রাজ্যপাট ত্যাগ করতে পরামর্শ দেন। সময়টা ১৮৫৭, একেই টালমাটাল চারিদিক, রাইফেলের কার্তুজে গরু-শুয়োরের চর্বি লাগানো থাকে এরকম কথা শুনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিপাইরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে, শুরু হয় প্রচণ্ড সংঘর্ষ। এরই মধ্যে ইংরেজ লর্ড ডালহৌসির ভ্রান্ত নীতির বলি হওয়া থেকে, ঝাঁসির রাজত্বকে রক্ষা করতে অস্ত্র ধরেন মনিকর্নিকা। নেতৃত্ব দিতে গিয়ে, লড়তে লড়তে প্রাণ দেন তিনি। এঁকে অবশ্য আমরা এখন অন্য নামে চিনি…”

“ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ” চিৎকার করে উঠলো তাতান।

“বাহ্, কি করে জানলি?” পুপুনের গলায় বিস্ময় প্রকট, বইয়ের পাতার ধারকাছ দিয়ে যায় না তাতান, কী করে সম্ভব হলো তাহলে! তাছাড়া ওদের হিস্ট্রি বইতে এত্ত গল্প তো লেখা নেই।

“আরে এই গল্প নিয়েই তো কঙ্গনা রানাওয়াতের সিনেমা বেরোচ্ছে।” হাসতে হাসতে বলে তাতান, আর ওর উত্তর শুনে বাকি দুজনও হাসতে থাকে।

দাদু আবার শুরু করলেন,”ধোন্দু আর রামচন্দ্রকেও তোরা চিনিস, তবে অন্য নামে, একজন নানা সাহেব, আরেকজন তাঁতিয়া টোপে। এরা তিনজনেই সিপাহী বিদ্রোহের পুরোধা হিসেবে কাজ করেছেন, এবং ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তেই লক্ষ্মীবাঈ প্রাণ দিয়েছিলেন। তাঁর সাহসে, দুর্দমনীয় মনোভাবে, অপরপক্ষে থাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরাও অবাক হয়ে গিয়েছিল। তাঁর বীরত্বের কথা মাথায় রেখেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজের মহিলা রেজিমেন্টের নাম রেখেছিলেন ঝাঁসি কি রাণী রেজিমেন্ট।


এবার বলি শোন, আরেকজনের কথা, স্কুলে আড্ডাবাজ কিন্তু মেধাবী বলে পরিচিত উত্তর কলকাতার দত্তবাড়ির এই ছেলে সঠিক উত্তর দেওয়া সত্ত্বেও বেতের মার জুটলো স্কুলে, ভূগোলের মাস্টারমশাইয়ের কাছে। ছেলেটি যত বলে সে যা উত্তর দিয়েছে, তা নির্ভুল, মারের তীব্রতা ততই বাড়ে। অবশেষে ছাড়া পেয়ে, প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বাড়ি ফিরে মা’কে সব জানালে, মা তাকে বলেন, "তুমি যা বলেছ, তা তো মিথ্যে নয়, তাই যে যাই বলুক, দুঃখ করছো কেন। সত্যের জন্যে সবকিছু ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোনোকিছুর জন্যে সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।"


মায়ের এই শিক্ষা ভোলেনি সেই ছেলেটি, পরবর্তীকালে আরেকটি এরকম ঘটনা তার প্রমাণ। পারদর্শী বক্তা নরেন্দ্রনাথ যখন গল্প বলা শুরু করতো, শিক্ষক কি পড়াচ্ছেন সে সব ছেড়ে, বন্ধুরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই দিকেই মগ্ন হয়ে গেলেও, নরেন্দ্রনাথ দুই দিকে সমান মনোযোগ রেখে চলতো। এরকমই এক দিন, গল্পের গুনগুন শিক্ষকের কানে যেতে একে একে তিনি পড়া ধরা শুরু করলেন এবং পড়া না শুনে গল্প করার শাস্তিস্বরূপ দাঁড় করিয়ে দিতে লাগলেন। একে একে সবার পালা হয়ে নরেন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি নির্ভুল উত্তর দিলেও বাকিদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রইলেন। শিক্ষক এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, পড়া পারলেও, তিনি যে গল্প করছিলেন একথা তো মিথ্যা নয়, তাই তাঁরও শাস্তি প্রাপ্য।…”

“ইনি বিবেকানন্দ, আমি জানি।” পুপুন বলল।

“ঠিক বলেছ দাদুভাই। ভবিষ্যতে আরেকজনের মধ্যেও মায়ের এই শিক্ষা তিনি দেখেছিলেন, এবং তাই অনেক পরীক্ষার পরে, তাঁকেই গুরু হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। ওঁর ভাবাদর্শেই তো রামকৃষ্ণ মিশন তৈরি, যেখানে তাতানের মামাতো দাদা বান্টি পড়াশোনা করে। জানো, শিকাগোতে যখন গিয়েছিলেন বিবেকানন্দ, তখন অনুষ্ঠানসূচিতে তাঁর বক্তৃতা সবার শেষে রাখা হতো, কারণ প্রথমেই তাঁর বক্তৃতা হয়ে গেলে দর্শকেরা সবাই চলে যেত, বাকিদের কথা শোনার জন্য কাউকে বসিয়ে রাখা যেত না। "সবশেষে স্বামী বিবেকানন্দ কিছু বলবেন", এইটুকু ঘোষণা ছিল যথেষ্ট, সবাইকে ধৈর্য্য ধরে বসিয়ে রাখার জন্যে।”

“দুজন হলো, আর এই দুটো আমার কিন্তু!” তাতান আবদারের স্বরে বললো।

“এবার তুমি যা যা বলবে সেগুলো পুপুনের, আমার এর চেয়ে বেশি আর মনেও থাকবে না।” বলেই দুষ্টুমি ভরা হাসি নিয়ে দুটো মালপোয়া তুলে নিলো সে।

পুপুন আর দাদু দুজনেই হেসে উঠলো তাতানের কাণ্ড দেখে, দাদু আবার বলতে শুরু করলেন।


“বেশ, এবার তাহলে পুপুনবাবু, মন দিয়ে শোনো। পরাধীন ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের এক গ্রামের কথা বলছি। ছোট্ট ছেলেটি বাবার হাত ধরে গ্রামের মধ্যেই বেড়াতে বেরিয়েছিল। পরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হওয়ায় বাবা দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলতে লক্ষ্য করলেন, ছেলে নেই পাশে, বাবার হাত ছাড়িয়ে একটু দূরে গিয়ে মাটি খুঁড়ছে আপনমনে। জিজ্ঞাসা করা হলে ছেলে জানায়, বন্দুকের গাছ লাগাবে সে, যাতে বিপ্লবীদের আগ্নেয়াস্ত্রের অভাব না থাকে। সরল শিশুমনের আপাতভাবে অবান্তর চিন্তা সেদিনই ইঙ্গিত করেছিল, স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত থাকা বাঙ্গা গ্রামের বিপ্লবী কিষান সিংয়ের এই সন্তান, ভবিষ্যতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক শক্ত খুঁটি হয়ে উঠবে। কিষান ও তাঁর ভাই অজিত সিং দুজনেই স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত ছিলেন, এবং তাই বাড়িতে ইংরেজ শাসক বিরোধী পরিবেশেই বড় হয়ে উঠছিল ছোট্ট ছেলেটি।


ব্রিটিশ শাসকদের প্রতি অনুগত হওয়ায় খালসা হাই স্কুলের কর্তৃপক্ষকে বিশেষ পছন্দ ছিলো না এই পরিবারের, তাই দয়ানন্দ সরস্বতীর আর্যসমাজের স্কুলে ভর্তি হয় ছেলেটি। ক্লাসে একদিন যখন সবাই বড় হয়ে কে কী হবে তাই নিয়ে কথাবার্তা চলছে, কেউ বলছে ডাক্তার, কেউ সরকারি অফিসার, কেউ বা আবার ব্যবসায়ী হবে, এইসব বলছে, ছেলেটি নির্দ্বিধায় বললো, "এইসব তো সামান্য ব্যাপার, আমি ব্রিটিশদের ভারত ছাড়তে বাধ্য করবো। বিপ্লবী হবো।" এর পরে বড় হয়ে বহুবার ইংরেজ পুলিশদের চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেছেন ছদ্মবেশ ধরে, কিন্তু চেনা তো দূর, সন্দেহ পর্যন্ত করেনি কেউ।”

তাতান, পুপুন একে অপরের দিকে চেয়ে উত্তর না পেয়ে, দাদুর দিকে ফিরে তাকাতে তিনিই বললেন, "এই ছেলে হলেন শহীদ ভগৎ সিং, জেনারেল সৌন্ডার্সকে খুন এবং দেশদ্রোহিতার অভিযোগে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।”

“আচ্ছা অজয় দেবগণের সিনেমার কথা বলছো।”

তাতান বলে। দাদু আর পুপুন মুখ টিপে হাসতে হাসতে তাতানের মায়ের গলা পায়, “হ্যাঁ কেবল টিভি আর সিনেমা, এই তো আছে তোর জীবনে, পুপুনকে দেখে কিছু শেখ।”

তাতানকে দেখে অবশ্য বোঝা গেল সে পাত্তা দেয়নি, বরং গুছিয়ে বসে আরেকটা মালপোয়া চালান হলো মুখে।


দাদু আবার শুরু করলেন,”এবারে যাঁর কথা বলবো তাঁর কথা আমরা অনেকেই ভুলে গেছি, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তোরা হয়তো নামও শুনিসনি।


মাস্টারদা সূর্য্য সেনের সহকারী হিসেবে কাজ করার আগে থেকে ইনি বিভিন্ন ইংরেজ বিরোধী কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জানিস, ইনি আবার ছোটবেলায় ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের গল্প শুনে শুনে ভীষণ ভাবে অনুপ্রাণিত হতেন। চট্টগ্রামের এক ক্লার্কের ঘরে পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন এই প্রীতিলতা, ডাকনাম ‘রানি’। অসম্ভব মেধাবী ছাত্রী আর দুঃসাহসী এই মানুষটির গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি তিনি জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারেননি, ব্রিটিশ সরকারের বিপক্ষে যাওয়ায়, তাঁর সার্টিফিকেট তাঁকে দেওয়া হয়নি। জালালাবাদের পাহাড়ে বিপ্লবীদের নৃশংসভাবে মেরে দেওয়ার প্রতিশোধ নিতে, পাহাড়তলি ইউরোপিয়ান ক্লাবে আগুন লাগিয়ে দেন তিনি আর তাঁর সঙ্গীরা, পাঞ্জাবী যুবকের ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, কিন্ত ধরা দেবেন না এই মনস্থির করেই সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। কলকাতা ময়দানের কাছে এক মূর্তিও আছে এঁর।”


দুজনেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে শুনতে নিশ্চুপ হয়ে গেছে দেখে নৈঃশব্দ্য ভাঙতে এবারও দাদুই প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা বল তো ভারতের কনিষ্ঠতম শহীদ কে?”

“ক্ষুদিরাম বসু” সমস্বরে উত্তর দিলো দুই বন্ধু।

“না রে, আমরা একটু ভুল জানি, ব্রাহ্মণী নদীর এক মাঝির ছেলে বাজী রাউৎ হলেন ভারতবর্ষের সর্বকনিষ্ঠ শহীদ।


১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ পুলিশরা ওড়িশার ভুবন গ্রাম থেকে সাধারণ নিরপরাধ কিছু মানুষকে প্রজামণ্ডল নামক বিপ্লবী সংগঠনে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। প্রজামণ্ডলের কিছু নেতা এর প্রতিবাদে পুলিশ স্টেশন ঘেরাও করে, এবং ক্ষিপ্ত জনতাকে শান্ত না করতে পেরে, পুলিশ গুলি চালালে দু’জন মারা যায়। জনতা আরো ক্ষেপে যায়, পুলিশরা এই অবস্থায় নীলকণ্ঠপুর ঘাট হয়ে ধেনকানাল পালাতে চেয়ে ব্রাহ্মণী নদীর তীরে ওই ঘাটে এসে উপস্থিত হয়। সমস্ত ঘটনার খবর পাওয়া বাজী ব্রিটিশ পুলিশকে ঘাট পারাপার করাবে না এই জেদ নিয়ে প্রথমে তর্কবিতর্ক এবং তার থেকে পুলিশ ক্ষেপে গিয়ে তার ও তার চার সঙ্গীর ওপর গুলি চালায়, যার পরিণাম মাত্র বারো বছর বয়সে মৃত্যু।”

গোলগোল চোখ করে তাতান প্রশ্ন করে “আচ্ছা দাদু, একটা কথা বলো, এই যে তুমি এত্ত গল্প বললে, তুমি কোথা থেকে জেনেছো? গুগল করলে?”

“না না, আমি খুব বই পড়তে ভালোবাসি ভাই। বই পড়ে পড়ে জেনেছি, আমাদের সময়ে গুগল কোথায় ছিল?” সহাস্যে জবাব দাদুর।

গল্প করতে করতে খেয়াল করে ওঠা হয়নি, কখন সাতটা বেজে গেছে, আজ পড়তে যাওয়া হলো না , বাবা -মায়েরও ফেরার সময় হয়ে যাওয়ায় হাতে দুটো মালপোয়া নিয়ে পুপুন পা বাড়ালো নিজের ফ্ল্যাটের দিকে। পড়তে যাওয়া হয়নি বলে বকুনি নাচছে কপালে, কিন্তু একটা টেনশন আর নেই, তাতানের দাদুর দেওয়া তথ্য কাজে লাগিয়ে, ওর আর তাতানের প্রতিযোগিতায় হিরো হওয়া পাকা করা হয়ে গিয়েছে। বাড়ি ফিরে, সব ক'টা তথ্য গুছিয়ে লিখতে বসলো পুপুন, আর মনে মনে এটাও ঠিক করলো, আসছে পুজোয় জামা নয়, খানকতক বই চাইবে উপহারে।

(সমাপ্ত )


তথ্যসূত্র :

www.hindujagruti.org, youtube, www.nuaodisha.com, www.historydiscussion.net, wikipedia, www.towardsfreedom.in

বিবিধ নিবন্ধ : খেলা যখন জীবন : অনিন্দ্য রাউৎ





ফুলব্যাকে খেলার সুবিধা হলো, উঠে গোলের দুর্দান্ত পাস দেওয়া বা গোলও করা যায় আবার নেমে এসে বিপক্ষের উইঙ্গার বা স্ট্রাইকারের পা থেকে বল কেড়েও নেওয়া যায়। দুইদিকেই সমান মজা, সমান গুরুদায়িত্ব, সমান চ্যালেঞ্জ। ব্যাপারটা কঠিন, কিন্তু এটাই আমার করতে ভালো লাগে।

এখন যেমন পেছন থেকে দৌড়ে এসে সামনে এগোতে থাকা বিপক্ষ দলের প্লেয়ারের পা থেকে বলটা ছোঁ করে ছিনিয়ে আমি এগোতে থাকলাম সাইডলাইন ধরে উল্টোদিকে। বলের দিকে দৃষ্টি রেখেও বুঝছিলাম মাঝবরাবর মিত উঠছে। আমি মাঝমাঠ পেরিয়ে বলটা চিপ করে তুলে দিলাম, বলটা বিপক্ষ প্লেয়ারদের মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে পড়লো মিত-এর কাছে, মিত অনায়াস দক্ষতায় বলটা বুক দিয়ে রিসিভ করে মাটিতে পড়তে না দিয়েই থ্রু দিলো রোহনকে। রোহন ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে গিয়ে পৌঁছতে না পৌঁছতেই দেখলাম ও পড়ে গেলো মাটিতে। ঠিক কি হয়েছে বুঝলাম না, তবে সেন্সগুলো ঠিক কাজ করে এ সময়ে। তাই চেঁচিয়ে উঠলাম, “ফাউল … ফাউল … পেনাল্টি … পেনাল্টি" বলে।

আমার মতো আরো সবাই চিৎকার করে উঠেছে। রেফারি দেখলাম কনভিন্সড। পেনাল্টির নির্দেশ দিল। আমরা সবাই ছুটে গেলাম বক্সের কাছে। দাঁড়ালাম বক্সের লাইন বরাবর, ওদের ডিফেন্ডাররাও দাঁড়িয়ে। রোহন বল হাতে নিয়ে বসালো পেনাল্টি স্পটে। ওদের গোলকিপার বিশ্ব আমার স্কুলের বন্ধু, শুধু অন্য পাড়ায় থাকে। দেখলাম ওর চোখ স্থির, কোনোদিকে তাকাচ্ছে না। রোহন এগোলো, খুব জোরে শট নিলো গোলের ডান দিকে কোণ বরাবর। বিশ্ব শরীর ছুঁড়ে দিয়ে পুরোটা হাত বাড়িয়েও বলের নাগাল পেলো না। বল জড়িয়ে গেল জালে। খুব ভালো শট। আমরা উৎফুল্ল হয়ে জড়িয়ে ধরলাম একে অপরকে। রেফারির বাঁশি বাজলো আর কিছুক্ষণ পরেই। হইহই করে উঠলাম সবাই। ম্যাচ জিতে গেছি, রোহনের করা একমাত্র গোলে। খুব আনন্দ হচ্ছে। নূতন সংঘের সঙ্গে এই ম্যাচ হওয়ার কথা অনেকদিন থেকে হচ্ছিল। অপেক্ষায় তেতে ছিল সবাই। আজকের জয় তাই অন্যতম ভালোলাগা।

মাঠ থেকে বেরিয়ে কিটস গুছিয়ে ক্লাবঘরের দিকে যখন যাচ্ছি তখনও রাজাদাকে দেখতে পেলাম না। রাজাদা আমাদের গাইড করে। কোচই বলা যায়। আজ খেলা চলাকালীন অনেককিছুই বলছিলো কিন্তু শেষ হতেই দেখি আর নেই। হয়তো ক্লাবেই আছে। সবাই সেদিকেই যাচ্ছে।
ক্লাবে ঢুকতেই দেখি টিভিতে একটা ম্যাচ চলছে। কিছুক্ষণ দেখেই বুঝলাম কোন ম্যাচ।

জার্মানির ক্লিন্সম্যানের ডাইভ, অন্যায্য রেডকার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার মনজন

দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়। কী অন্যায়ভাবেই না পেনাল্টি দিয়ে জার্মানিকে জিতিয়ে দেওয়া হয়েছিল ১৯৯০ এর বিশ্বকাপ! আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে দেখে খারাপ লাগেই। ক্লাবে এরকম অনেক পুরনো ম্যাচের সিডি থাকে। তবে আজ রাজাদা হঠাৎ মাঠ ছেড়ে তাড়াতাড়ি এসে এই ম্যাচ দেখছে কেন? আমার রাগই হলো।
“রাজাদা, হঠাৎ এই ম্যাচটা কেন? খুব বাজে ম্যাচ এটা। ক্লিনসম্যান কেমন হলিউড অভিনেতার মতো পড়ে গিয়ে মনজন কে রেড কার্ড দেখানোর ব্যবস্থা করলেন, তারপর আবার ভলারের নাটক করে ডাইভ মারা আর জার্মানির পেনাল্টি পাওয়া। এরকম জঘন্য ফাইনাল আর হয়নি।”
১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনাল

রাজাদা টিভি থেকে চোখ সরিয়ে ঘুরে তাকালো। ততক্ষণে মিত, অভি, সান, দ্বীপ, আবির, শুভদা, রোহন আর বাকিরা জার্সি খুলে বসে পড়েছে এদিক ওদিক।
“ খারাপ লাগছে তোর? তোদের সবার বুঝি খারাপ লাগছে? ”
মিত বললো, “ হ্যাঁ, ভুল জিনিস খারাপ লাগবে না?”
“ তাহলে আজ যখন রোহন নিজে অভিনয় করে পড়ে গেল তখন পেনাল্টির দাবিতে গলা ফাটালি কেন?”

আমার দূর থেকে সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু ঐ মুহূর্তে পেনাল্টি চাইবো না? যেখানে হারানোর সুযোগ … নিজের কথা নিজেরই মনে বাধলো। আবার আমিই আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায় নিয়ে বলছিলাম? চুপ করে থাকলাম।

রাজাদা বললো, “ শোন, জানি অনেকদিন পর সুযোগ পেয়েছিস নূতন সংঘের সঙ্গে খেলার, আগেরবারের হারের বদলা নেওয়ার। কিন্তু মাঠে পা দিলে আসল যেটা মাথায় রাখা উচিত সেটা হলো স্পোর্টসম্যান স্পিরিট। ব্যাপারটা সবাই আমরা মুখে বলি কিন্তু কেউ প্র্যাকটিস করি না। সেটাই সবচেয়ে হতাশাজনক। আর নিজেরা না করলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কী করে শেখাবো? নিজের মনের প্রতি সৎ থেকে খেলা। অভ্যাস করলে খুব সহজ, দেখবি। আজ তোদের কিছু ঘটনা বলি। কিছু তোদের জানা আর কিছু অজানা। তাহলে হয়তো আরও ভালো করে বুঝবি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সঠিকভাবে খেলা, পারলে তোরাও বাকিদের বলিস।

১৯৩৪ সালে যখন বিশ্বকাপের আয়োজন ইউরোপে এলো তখন ইউরোপে টালমাটাল অবস্থা। দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে খেলা সবটাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতো। এই বিশ্বকাপেই কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় আয়োজক দেশ ইতালি এবং স্পেন।

সেই প্রথমবার সবার সামনে এসে পড়ে ফুটবলের নোংরা দিক। ভীষণরকমের মারামারি চলে দুই দেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে। রেফারির ভূমিকা ছিল নগণ্য। কিংবদন্তী গোলকিপার রিকার্ডো জামোরা, যাঁর নামে স্প্যানিশ লিগে এখন বেস্ট গোলকিপারকে ‘জামোরা ট্রফি’ দেওয়া হয়, তিনি গুরুতর আহত হন ইতালির গোলের সময়। অনেক খেলোয়াড়কেই সেদিন স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়তে হয় এবং এদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইতালির মারিও পিজ্জিওলো। তাঁর পা ভেঙে যাওয়ায় তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয় এবং দুর্ভাগ্যবশত তিনি জীবনে আর কোনোদিনই খেলতে পারেননি। কী খারাপ, তাই না?
সেদিনের ঐ ম্যাচ ড্র হয়। তখন এখনকার মতো অতিরিক্ত সময়ে খেলা বা পেনাল্টি শুটআউট হতো না। তাই ইতালি এবং স্পেনের মধ্যে আবার ম্যাচ হলো এবং এই ম্যাচেও চললো মারামারি। শেষ অব্দি ইতালি ১-০ এ জিতে যায় স্পেনের রিকার্ডো জামোরার অনুপস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে। রাজনীতির প্রভাব মাঠে বা মাঠে খেলার প্রভাব রাজনীতিতে পড়েছিল কি না জানি না, তবে স্পেন - ইতালির মধ্যে সম্পর্কেও অস্থিরতা বেড়েছিল এরপর। এই একই বিশ্বকাপে রেফারির বিরুদ্ধে ইতালিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অনেক অভিযোগও উঠেছিল।

এটা গেল ১৯৩৪, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালে আবার বিশ্বকাপ হয়। প্রায় প্রতি টুর্নামেন্টেই কিছু কিছু ম্যাচে মারামারি, বাজে রেফারিং, দর্শকদের মধ্যে হাতাহাতি ঠিক হয়েছিল। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দেখা যায় ১৯৬২ চিলি বিশ্বকাপে। সেই বছর যখন বিশ্বকাপ চিলিতে অনুষ্ঠিত হয় তখন ইউরোপের অনেক দেশেরই তা পছন্দ হয়নি, আর হয়তো সবার আগে নাম ছিল ইতালির। ইতালির সাংবাদিকরা চিলিকে এবং তার মানুষদের গরিব, অপুষ্টিতে ভোগা, নিরক্ষর, আবর্জনা, আস্তাকুঁড়ের দেশ বলে অভিহিত করেছিল। চিলির মানুষরা এটাকে একদমই ঠিকভাবে নেয়নি। তারাও ইতালিকে নানা বাক্যবাণে আক্রমণ করে।
বিশ্বকাপ ১৯৬২, চিলি - ইতালি ম্যাচ

সান্তিয়াগোতে যখন ম্যাচ শুরু হয় এই দুই দেশের মধ্যে তখন উত্তেজনা চরমে। ভাবতে পারবি না তোরা, প্লেয়াররা একে অপরকে ঘুষি, লাথি, ল্যাং, কনুই দিয়ে মারা, পায়ে পাড়া দেওয়া সব করেছিলেন, আর করেছিলেন বড় খোলাখুলি। চিলির প্লেয়ার লিওনেল স্যাঞ্চেজ ইতালির মারিও ডেভিডকে ঘুষি মারেন এবং তা রেফারির নজর এড়িয়ে যায়, ডেভিড কিছু মিনিট পর স্যাঞ্চেজের মুখে লাথি মারতে যান এবং রেফারি দেখতে পেয়ে ডেভিডকে মাঠ থেকে বের করে দেন। যদিও ডেভিড লাথিটা মিস করেছিলেন। এর আগেও ইতালির আরেক খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। মারামারি এমনই পর্যায়ে যায় যে সবাইকে সামলানোর জন্য পুলিশকে তিন-তিনবার মাঠে নামতে হয়। ভাব শুধু! এটা বিশ্বকাপের ফুটবল ম্যাচ?

আচ্ছা, তোদের সেই ঘটনাটা বলেছিলাম যখন অস্ট্রিয়া এবং জার্মানি নিজেদের মধ্যে আক্রমণহীন, বোরিং ফুটবল খেলে দুই টিমই নিজেদের পরের রাউন্ডে ওঠা নিশ্চিত করেছিল?”

অভি বলে উঠলো, “ না রাজাদা। জানি না তো ? কি ব্যাপার?”

“১৯৮২ বিশ্বকাপে গ্রুপ স্টেজে অস্ট্রিয়া-জার্মানি ম্যাচের আগেই অস্ট্রিয়া কোয়ালিফাই করে গিয়েছিল পরের রাউন্ডে। অপরদিকে জার্মানির ওঠা অনিশ্চিত ছিল কারণ আলজেরিয়া ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছিল। জার্মানির হার বা ড্র মানে জার্মানি বেরিয়ে যায় বিশ্বকাপ থেকে এবং আলজেরিয়া কোয়ালিফাই করে পরের রাউন্ডে। কিন্তু সন্দেহ করা হয় দুই টিম নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নিজেদের ওঠা নিশ্চিত করেছিল, ফলস্বরূপ এক জঘন্য বোরিং ফুটবল ম্যাচ দেখে দুই দেশের দর্শকরা।
১৯৮২ বিশ্বকাপ - জার্মানি-অস্ট্রিয়া ম্যাচ

দুই দেশের দর্শকরাই এই ধারহীন ম্যাচ দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তারা ভেবেছিল ১৯৭৮ এর মতোই দারুণ একটা ম্যাচ হবে। কিন্তু কিছুই হয় না,সারা ম্যাচ জুড়ে চলে ব্যাকপাস, মাঝমাঠে পাস। জার্মানি ১-০ গোলে জিতে যায়। জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া দুই টিমই তাই কোয়ালিফাই করে। তোরা একবার ভাব আলজেরিয়ার অবস্থা! ঐ দেশের মানুষদের কীরকম লেগেছিল! আলজেরিয়ার মানুষরা ঐ ম্যাচকে “শেম অফ গিয়ন” নামে পরিচিতি দেয়। এটাও কিন্তু স্পোর্টসম্যান সুলভ আচরণ নয়। ফিফার দুই দেশের বিরুদ্ধে কিছু স্টেপ নেওয়া উচিত ছিল। কাউকে হারানোর জন্য অন্য কোনো টিমকে জিতিয়ে দেওয়া খুব ন্যক্কারজনক। যাইহোক, আর তারপর ১৯৯০ তে জার্মানির এই প্লে অ্যাকটিং করে জিতে যাওয়া।”

“সে তো মারাদোনাও হাত দিয়ে গোল করেছিলেন।” শুভদা বলে ওঠে।


মারাদোনার 'হ্যান্ড অফ গড'

“আমি সেটাও সমর্থন করি না শুভ। খুবই বাজে করেছিলেন। বা যখন মারাদোনা ড্রাগ টেস্টে পাশ করতে পারেননি, যতই তা বিতর্কের বিষয় হোক, যা আজ অব্দি প্রমাণিত তাতে মারাদোনার এই আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। বা সুয়ারেজের চেলিনিকে কামড়ে দেওয়া, সবই খুব অন্যায়।”

“ আর জিদানের ঢুঁসো?” রোহন বলে উঠলো।

২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল, জিদানের হঠকারিতা

“ হ্যাঁ। ফুটবল মাঠে যখন নামি তখন অনেক অনুভূতি বাইরে রেখে আসা শ্রেয়। হ্যাঁ, আমরা মানুষ, তাই আবেগ দিয়ে কাজ করি, ভালোবাসি, খেলি। কিন্তু মাঠে মাথাটাকে শান্ত রাখতেই হয়, উচিত। সবাই চায় খারাপটা করতে, কিন্তু সেই প্ররোচনায় আমরা পা দেবো না বা সতীর্থদেরও বোঝাবো যাতে না দেয়। জিদান হয়তো সারাজীবন আফশোস করেছেন ঐ গুঁতো দেওয়ার পর। নাহলে কে বলতে পারে ফ্রান্স দ্বিতীয়বারের জন্য বিশ্বকাপ পেতো না?"

“ সত্যিই কী অদ্ভুত। কি থেকে কী হয়ে যায়! এত বড় স্টারের কেরিয়ার শেষ হয় এইভাবে! ভাবা যায়?”

“হয়তো হ্যাঁ, ভাবা যায়। আমরা মানুষ। সমস্ত ইমোশনকে কন্ট্রোল করে কিছু করা আমাদের সহজাত নয়। বরং অনুভূতি মিশিয়ে কিছু করলেই সেই কাজ আমরা ভালোভাবে করতে পারি। শুধু দেখতে হবে অনুভূতি আমায় বিপথে চালিত করছে না তো? মানুষ প্রথম যখন খেলা শুরু করে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল শরীর ও মন সুস্থ রাখা। তারপর আসে প্রতিযোগিতা, জিতলে পুরস্কৃত করবার প্রথা। লড়ে জেতার প্রবণতা সেই আদিম যুগ থেকেই মানুষের মজ্জাগত। তাই প্রতিযোগিতাহীন কোনো খেলা মানুষদের ভালো লাগেনি। তবে এই অব্দিও কিছু খারাপ ছিল না। খারাপ শুরু হলো তখনই যখন মানুষ জেতার নেশায় পাগল হয়ে অপর দলের প্রতি অন্যায় আচরণ শুরু করলো। হ্যাঁ, খেলায় জেতাটা আমাদের লক্ষ্য কিন্তু তার থেকেও বড় লক্ষ্য মানবিকতা বজায় রাখা।

এই পৃথিবীতে সবার সমান অধিকার। শুধু কোনোভাবে আমি বেশি সুবিধা পেয়েছি মানে এই নয় যে আমি অন্যদের হেয় করবো, তাদের বেড়ে উঠতে দেবো না। বাইরের জগতে এই অন্যায় প্রায় দেখা গেলেও খেলায় এ ঘটনা নিন্দার অযোগ্য। হ্যাঁ, ফুটবল খেলায় বডি কন্ট্যাক্টস থাকবেই। বল ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ট্যাকল হবেই। কিন্তু খেয়াল সেটুকু রাখতে হবে যে সেই ট্যাকল, সেই চেষ্টা যেন কোনোভাবে ইচ্ছাকৃত আঘাতের জন্য না হয়। আমাদের মন টের পায় ঠিক দেখবি, ইচ্ছাকৃত কিছু করার আগেই আমাদের মন সেটা টের পায়।
আজ যখন রোহন নিজে ডাইভ মারলো ও জানতো ও ভুলটা করছে? তাই না রোহন?”

রোহন মাথা নিচু করে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লো।

“সেটাই, যখনই আমরা এই অনুভূতি টের পাবো তখনই আমরা নিজেদের আটকাবো, থামিয়ে দেবো। ফুটবলার থেকে শুরু করে রেফারি, কোচ, দর্শক সবাইকে এটুকুই মাথায় রাখতে হবে যে খেলা আমাদের জীবনের প্রতিফলন। জীবনে আমরা যেমন অন্যের খারাপ সময়ে তার পাশে দাঁড়াই, যেমন অন্যকে নিজের আনন্দে ডেকে নিই, কেউ অন্যায় করলে তাকে শাস্তি দেওয়ার আগে ভাবি না যে সে আমার নিজের কেউ হয় কিনা, ঠিক সেইরকমই হলো খেলার মাঠ, এখানেও সবসময় সঠিকটা করতে হবে।



তোরা দেখেছিস, এই সেদিন আইসল্যান্ডের প্লেয়ার পেনাল্টি মিস করার পর নাইজেরিয়ার এক প্লেয়ার এসে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। বা মেসি যখন তেমন কন্ট্যাক্ট না থাকতেও পড়ে যান তখন নিজেই রেফারিকে ফ্রি কিক দিতে বারণ করেন বা ইজিপ্টের এক শারীরিকভাবে অক্ষম দর্শককে নিজেদের কাঁধে তুলে খেলা দেখার ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলেন অন্য দেশের দর্শকরা।


"সকলের তরে সকলে আমরা...."
এটুকুই শিখবো আমরা, এটুকুই মেনে চলবো দর্শক হয়ে, খেলোয়াড় হয়ে। আর কিছু না। অন্যের ন্যায্য অধিকার আমরা অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেবো না। দোষ করলে তা স্বীকার করার ক্ষমতা রাখবো। কেউ হেরে গেলে তার পাশে দাঁড়িয়ে তার মনোবল বাড়াবো। জেতাটাই সব নয়, তার জন্য মারামারি, অন্যায় কোনোকিছুই আমাদের জিতিয়ে দেয় না। আরো নামিয়ে দেয় নিজেদের চোখে।

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে রেফারির নির্দেশে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া প্রথম জার্মান প্লেয়ার এরিক বারবার নিজের দোষের জন্য অনুতাপ করেছেন, কেন তিনি সেদিন মাথা গরম করে সুইডেনের প্লেয়ারকে লাথি মেরেছিলেন। না মারলেই পারতেন। এইটুকুর খেয়াল তো রাখতে হবে আমাদের। কি, তাই তো? ”

আমরা সবাই সমস্বরে হ্যাঁ বললাম। দেখি রোহন মাথা নিচু করে আছে।

রাজাদা ডাকলো, “ রোহন, তুই নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিস, সেটাই যথেষ্ট। মনখারাপ করিস না আর। এই ব্যাপার রিপিট করিস না তাহলেই হবে। পারলে নূতন সংঘে একবার গিয়ে কথা বলে আসিস। ”
“ হ্যাঁ, রাজাদা। আমি যাব। আমি ক্ষমা চেয়ে আসবো ওদের থেকে। ”
আমি বলে উঠলাম, “ শুধু তুই না, আমরা সবাই যাবো।” সবাই আমার সঙ্গে সহমত হয়ে “হ্যাঁ, যাবো” বললো।

রাজাদার মুখে একঝলক হাসি খেলে গেল। জেতা-হারা হয়তো এক বিশেষ রকমের আনন্দ-দুঃখ দেয়, কিন্তু সঠিকভাবে, সৎ ভাবে ভালো খেলার চেষ্টা করলে, মাঠে সবার অনুভূতির খেয়াল রাখলে হয়তো মনে অনেকটা শান্তি থাকে।




(সমাপ্ত)


তথ্যসূত্র :
The Illustrated History of Football World Cup 1930-2018 by German Aczel
www.wikipedia.org
https://thesefootballtimes.co

ছবি : Wikipedia, Getty Images, Pinterest