গল্পের ঝুলি : মামাবাড়িতে গোয়েন্দাগিরি : স্বর্ণদ্বীপ চৌধুরী



কোকিলের কুহুতান জানান দিয়েছে, বসন্ত এসে গেছে, আর সঙ্গে এনেছে স্কুলপড়ুয়াদের কাঙ্খিত সময়। অন্যান্য সমবয়সীদের মতো প্রতি বছর এই সময়টায় পিকলুও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে পরীক্ষা শেষ হওয়ার। শরীর খারাপ হয়ে পড়াশোনার ক্ষতি যাতে না হয়, তাই মায়ের কড়া দাওয়াই মেনে পরীক্ষার দুই মাস আগে থেকেই পিকলু বাইরের সব খাবার থেকে বঞ্চিত থাকে, সে স্কুল ছুটি হলে ঘন্টুর দোকানের এগরোলের স্বাদই হোক, বা কমলা ভান্ডারের ফিশ-ফ্রাইয়ের সুগন্ধ, সুস্থ থাকতেই হবে অতএব এইসব ‘নৈব নৈব চ’। আইসক্রিম, মোগলাই, ফুচকা শুধুমাত্র দূর থেকে দেখেই সাধ মেটাতে হয়। একবার ক্লাসমেট অতনুর সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে ঘুগনি খেয়েছিল বটে, কিন্তু পেট ব্যথা হয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার পর যে পরিমাণ বকুনি পাওনা হয়েছিল, তার পর থেকে ওইসব অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি আকর্ষণও কমে গেছে।

যাবতীয় সংযম বজায় রেখে ঠিক ঠিক মতো পড়ে লিখে বার্ষিক মেধাযুদ্ধ যেদিন শেষ হয়, সেদিন সন্ধেবেলা পাওনা আইসক্রিম ওর কাছে রূপকথায় পড়া ট্রেজার হান্টের শেষে পাওয়া গুপ্তধনের থেকে কম মূল্যবান নয়, আর সঙ্গে ওই একটি বেলা পড়াশোনা থেকে নিস্তার তার প্রাপ্য। না, ওর বাকি বন্ধুদের মতো রেজাল্ট না বেরোনো অব্দি, প্রায় মাসখানেক পড়াশোনা থেকে বিরতি পাওয়ার আশা নেই, সেই সুখ পিকলুর কপালে জোটে মাত্র একটি সন্ধের জন্যে।

পিকলুর মা তারই স্কুলের শিক্ষিকা, তাই পরের দিন থেকেই পরের বছরের সব অস্ত্রে শান দেওয়ার কাজ শুরু করে দিতে হয়, বিশেষতঃ অঙ্ক।

পিকলু অঙ্কে কিঞ্চিৎ কাঁচা, তাই তার মা অন্য সব পড়াতে কিছু কিছু ছাড় দিলেও অঙ্কের স্যারের যাতায়াত তাদের বাড়িতে চলে বছরের বারো মাস-ছয় ঋতু জুড়ে। দুর্গাপুজোতেও স্যারের ছুটি নেই, ছুটি নেই পিকলুরও।

রেহাই মেলে কেবলমাত্র কয়েকটা দিন, মামার বাড়ি গেলে।

পিকলুর মামারবাড়ি শহর কলকাতার কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার গঙ্গার তীরবর্তী এক ছোট শান্ত শিল্পাঞ্চলে। প্রতিবছর পরীক্ষা শেষ হলে পিকলুর মা দিন তিনেকের জন্যে তাকে এখানে ঘুরতে নিয়ে আসেন। দুই মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে তিনটে দিন যে কোথা দিয়ে ভ্যানিশ হয়ে যায়, টের পাওয়া যায় না মোটে।

গ্রামাঞ্চলের মধ্যে গড়ে ওঠা এই একটুকরো ছোট্ট শহুরে বসতি তাদের কলকাতার পাড়ার চেয়ে অনেক বেশী প্রিয় পিকলুর কাছে। কলকাতায় থাকলে স্কুল থেকে বাড়ি আর বাড়ি থেকে স্কুল এই বাঁধা নিয়মে চলতে চলতে এক সময়ে বড় একঘেয়ে লাগে পিকলুর, সঙ্গে রয়েছে স্কুল ফেরতা টিউশনের বিড়ম্বনা। আগে তাও বিকেলে মাঝে মধ্যে খেলতে যাওয়ার সময় পেতো, এখন সেটুকুও আর হয় না, পড়াশোনার চাপে। 

“হাজার হোক ক্লাস সিক্স বলে কথা, এবার তো একটু জোর দিতে হবে নাকি, আর তিনটে বছর, তারপরেই ঠিক হয়ে যাবে আমাদের পিকলুবাবু কোন দিশায় রথ চালাবেন”, বলেন ওর বাবা।
তার ওপর পিকলু ক্লাসের এক থেকে তিনে থাকা ছেলেমেয়েদের মধ্যে একজন, এর আলাদা চাপ সামলাতে সামলাতে প্রাণ কাহিল। তাই মামারবাড়ি বড় প্রিয় পিকলুর, ওখানে গেলে পড়তে বসতে হয় না, মা আর মামী দুজনে বসে বসে গল্প করে অধিকাংশ সময়ে, আর ওরা তিন মামাতো-পিসতুতো ভাই সারাদিন নানারকম খেলা নিয়ে মত্ত থাকে। অন্তাক্ষরী থেকে কুমীর ডাঙ্গা, ব্যবসায়ী থেকে ক্রিকেট কী নেই সেই খেলার তালিকায়! মাঝে মাঝে ওরা গঙ্গার ধারে বেড়াতে বেরোয়, পুরানো বাজারের নাড়ুবুড়োর দোকান থেকে চপ কিনে ঘাটে বসে খেতে খেতে মাঝিদের ভাটিয়ালী গানের সুর শুনতে শুনতে কৈশোরের মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে থাকে দূরে ভেসে যাওয়া জেলেনৌকোর টিমটিমে আলোর দিকে, আবার সন্ধে পেরিয়ে গেলে শ্মশানকালীর মন্দিরে আরতি দেখে, বাতাসা প্রসাদ হাতে নিয়ে খেতে খেতে মামার কারখানার কোয়ার্টারের লোহার বেড়া টপকে, মাঠ পেরিয়ে পড়িমরি করে বাড়ি ফেরা, দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো কেটে যায়। মাঝে মধ্যে সকালে বেরিয়ে ওরা তিনজনে মিলে আশেপাশে মাঠে চরে বেড়ানো ছাগলছানা ধরে এনে, কাছে থাকা এক শিবমন্দিরের চাতালে বসিয়ে তাদের গাছের পাতা এনে খাওয়ায়, ওদের সঙ্গে খেলা করে। সেবার ওর মামাতো দাদা টুবান সকাল বেলা ছাগলছানা ধরে তাকে পাতা খাওয়াতে খাওয়াতে বলেছিল বিকেলে আবার আসতে, পাতা খাওয়াবে, কী আশ্চর্য্য ব্যাপার, ওরা ভুলে গেলেও ছাগলটা ভোলেনি। বিকেলে খেলতে বেরিয়ে সেই ছাগলকেই মন্দিরের সামনে সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখে তিনজনেই সে কী খুশি! যদিও একটু খটকা লেগেছিল, যে টুবানের ভাষা বুঝে ঠিক ঠিক কাজ কী করে করলো সে, বা আদৌ সেই সকালের সুজন কিনা, তবে খেলতে খেলতে সেসব চিন্তা আর মাথায় আসেনি অতো। বাড়ি ফিরে বড়দের সেই ঘটনা জানাতে তাদের সে কী হাসি! ওরা যদিও কিছু বুঝে উঠতে না পেরে সেইদিকে আর মন না দিয়ে নিজেদের মত টিভি খুলে বসে যায়। বড়দের ভাবগতিক মাঝে মাঝে বড় দুর্বোধ্য লাগে! এবারেও পরীক্ষা শেষ হতে পিকলু মায়ের গলা জড়িয়ে আদুরে গলায় মামারবাড়ি যাওয়ার বায়না করতেই মা গম্ভীর মুখ করে চুপ করে রইলেন। পিকলু এর মর্মার্থ উদ্ধার করতে না পেরে আবার জিজ্ঞাসা করতে মা ততোধিক গম্ভীর মুখে জানালেন, তাঁর এবার অনেকগুলো খাতা দেখা বাকি রয়ে গেছে, তাই এবার হয়তো যাওয়া না-ও হতে পারে।

পিকলু বেশ কয়েকবার অনুরোধ উপরোধ করলেও খুব একটা কাজ দিলো না। অবশেষে বিমর্ষচিত্তে সবে যখন বই নিয়ে বসতে যাবে প্রতিদিনের মতো, তখনই বাবার আবির্ভাব ঘটলো হঠাৎ। সব শুনে তিনি বললেন, মা যাবে না তো কী হয়েছে, পিকলুর বাবা তাকে রেখে আসবেন মামারবাড়ি, আর মায়ের পরীক্ষার খাতা চেক করা হয়ে গেলে, মা গিয়ে তাকে নিয়ে আসবেন বাড়িতে।

পিকলু তো মহাখুশি, মা একটু আপত্তি করছিলেন বটে, বেশ কিছুদিন পড়াশোনা বন্ধ থাকবে এই ভেবে, কিন্তু পিকলুর মুখের দিকে চেয়ে শেষমেশ অনুমতি দিতেই হলো।

প্রতিবারের মতোই মামারবাড়ি আসার পর্বে এবারেও রাস্তা যেন ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিয়ে যাচ্ছে, শেষ আর হয় না। অনেক অপেক্ষার পর ক্যালসিয়াম কারখানা পেরিয়ে বাজার ছাড়াতেই পিকলুর প্রায় আনন্দে নাচতে ইচ্ছা করছিল, একেবারে অসম্ভবকে বাস্তব হতে দেখার আনন্দে। ক্যালসিয়াম পেরিয়ে, কার্বাইড কারখানা পেরিয়ে, ভাঙাচোরা পিচের রাস্তা ধরে, একটু এগোতেই সেই চেনা রঙের কারখানার গন্ধ আর তার থেকে সামান্য দূরেই খোলা গ্যালারি সবাই যেন সানন্দে অভিবাদন জানাচ্ছে পিকলুকে, 'অনেকদিন বাদে এলে বন্ধু, কদিন কাটিয়ে যেও আমাদের সঙ্গে’। 

অন্যবারের মতো গঙ্গার ধারে মামার কোয়ার্টারে পৌঁছে রিক্সা থেকে নামতেই, টুবান-বুবান ছুটে এলো, তারাও উদগ্রীব হয়ে প্রতীক্ষা করছিল, কখন আসবে তাদের খেলার সঙ্গী। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পায়নি, এবারটা অন্য বছরের মতো, শুধু খেলে বেড়িয়ে কাটবে না পিকলুদের।

টুবানের সেবছর মাধ্যমিক পরীক্ষা থাকায়, খেলতে বেরোনোয় কিছু কিছু বিধিনিষেধ ছিল তার, তবে বুবান আর পিকলুর জন্য কোনোরকম বারণ ছিলো না। তাই পৌঁছে প্রথম দিকে তাদের খেলায় টুবানের অনুপস্থিতির জন্য একটু একটু দুঃখ হলেও, প্রাণোচ্ছল বুবানের সান্নিধ্য সেই মনখারাপ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। অন্যবারের মত এবারেও দুইজনে মিলে মন্দিরের আশেপাশে ছাগল ধরা, গঙ্গার ধারে বেড়ানো এসব করে দিব্যি সময় কাটছিল, তাল কেটে গেল বুবান হঠাৎ জ্বরে কাবু হয়ে পড়তে। ডাক্তার-বৈদ্য দেখিয়ে তার জ্বর নেমে তো গেল দু'দিনেই, কিন্তু দুর্বল শরীরে বাইরে খেলতে যাওয়া বা বেড়ানো কোনোটাই সম্ভব নয়। অগত্যা পিকলুবাবুরও বন্দীদশা।

এরকমই একদিন সকালে, বুবান যখন জ্বরে কাহিল, পিকলু মামীকে বলে একটু বেরোলো, মন্দিরের চত্বর থেকে একটু বেড়িয়ে আসবে বলে। বাংলার গ্রামে বসন্ত বড় সুন্দর, পলাশরাঙানো সাদা মন্দিরের পাশে বাঁধানো বটগাছের গোড়ায় এসে বসতেই পিকলু লক্ষ্য করলো, মন্দিরের পুরোহিত মশাই মূল মন্দির লাগোয়া তুলসীমঞ্চের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে কী যেন করছেন খুব সন্তর্পণে আর মাঝে মাঝে এদিক ওদিক দেখছেন।

পুজোর কিছু করছেন  
হয়তো, এই মনে করে সেদিকে বিশেষ মন না দিয়ে কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে উঠে বাড়ি ফিরে এলো পিকলু। পরের দিন বুবানের শরীর কিছু ভালো থাকায় সেও অনুমতি পেলো পিকলুর সঙ্গে সকালে একটু বেড়িয়ে আসতে। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে এসে মন্দির সংলগ্ন বটের বেদীতে বসে ছাগলছানা নিয়ে খেলতে খেলতে হঠাৎই পিকলু লক্ষ্য করলো, পুরোহিতমশাই আগের দিনের মতোই কিছু একটা করছেন এবং খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে এদিক ওদিক দেখছেন, ভাবখানা এমন, যেন কেউ লক্ষ্য না করে তিনি কী করে চলেছেন সেইদিকে। 

চাপা গলায় বুবানকে সবটা বললে সে কিছুক্ষণ সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে দেখলেও সেভাবে কিছু সন্দেহজনক লাগলো না তার। সেদিনের মতো ইতি টেনে দুজনেই সেখান থেকে উঠে এলেও ঠিক হলো পরের দিন আবার তারা একই সময়ে সেখানে গিয়ে নজর রাখবে।

পরেরদিন সকাল সকাল উঠে সবে দুই ভাই বেরোতে যাবে, এমন সময় মামীমা হাঁক দিলেন,

"আজ লুচি হয়েছে, শিগগির শিগগির মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নে, গরম গরম খেয়ে নিবি।"

টুবানের সেদিন সকালের টিউশন পড়ার ছুটি থাকায়, সে-ও একসঙ্গে বসে গেল, তিনভাই জমিয়ে লুচি খেতে খেতে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দিলো অনেকটা সময়, রহস্যের উৎস সন্ধানে যাওয়ার আর হলো না সেদিন, তবে পরেরদিন বুবান আর পিকলু ঠিক সময়ে আবার সেখানে হাজির হলে আবারও পুরোহিতের অদ্ভুত আচরণ দুজনের মনেই সন্দেহের উদ্রেক করে জানান দিলো, ওই তুলসীমঞ্চের মধ্যে কিছু একটা রহস্য আছে।

পুরোহিত চলে যেতে দুজনেই কিছুটা সময় ব্যবধান রেখে সন্তর্পণে এসে দাঁড়ালো আপাতভাবে নিরীহ তুলসীমঞ্চের সামনে। সিমেন্টের বাঁধানো ছয়কোণবিশিষ্ট তুলসী মঞ্চের সেভাবে কোনো বিশেষত্ব নেই, কেবল একদিকে তুলসীমঞ্চের দেওয়ালে পাথরে খোদাই করা একটি ছোট শীতলামূর্তি লাগানো আছে, প্রদীপ দেওয়ার কুলুঙ্গির পাশে। পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া একটা প্রদীপ রাখা রয়েছে কুলুঙ্গিতে। দুই ভাই একে অপরের মুখের দিকে চেয়ে আন্দাজ করলো, অসংলগ্ন কিছুই ঠাওর করা যাচ্ছে না এখান থেকে, অতএব রহস্য সমাধানের চেষ্টা শিকেয় তুলে তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরাই মঙ্গল, কেন না বেলা বাড়ছে, এরপরে স্নান খাওয়া করতে আরো দেরি হলে বকুনি তো জুটবেই, দু-চার ঘা পিঠেও পড়তে পারে।


বাড়ি ফিরে জানা গেল, পিকলুর মা ফোন করেছিলেন, দিন তিনেক বাদে আসবেন তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে, পিকলু-বুবান দুজনেই খুব খুশি, এবারে তিন দিনের জায়গায় বেশি সময় পাওয়া গেছে, এত সৌভাগ্য প্রতিবার হয় না।

পরেরদিন টুবানের কোনো টিউশন না থাকায় ঠিক হলো বিকেলে তিনজনে মিলে যাবে গঙ্গার ধারে জেটিতে বসে হাওয়া খেতে। পরদিন ছিল রবিবার, দুপুরে পেট ভরে মাংস-ভাত-চাটনি খেয়ে একটু ঘুমিয়ে বিকেলে গঙ্গার ধার থেকে ঘুরে আসতে আসতে একটু সন্ধে হয়ে গেল, গঙ্গার পাড়ে বসে দুই ভাইয়ের কাছে মন্দির সংলগ্ন তুলসীমঞ্চ আর পুরোহিতের গতিবিধির গল্প শুনে টুবানের আগ্রহে তিন ভাই পৌঁছালো শিবমন্দির। নিজেদের মত তদন্ত করার মতলবে আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতে লক্ষ্য করলো সাঁঝের নির্জন পরিবেশের সুযোগ নিয়ে পুরোহিতমশাই আবার তুলসীতলায় তার গোপন কাজে মনোনিবেশ করেছেন, সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে ষন্ডামার্কা দুটো লোক, এবং আজ পুরোহিত নয়, তারাই আশেপাশে নজর রাখছে। টুবান-পিকলু-বুবান তিনজনেই তাদের ভীষণ চেহারা দেখে ভয়ে ওদিকে না এগোলেও তাদের চোখ এড়ায়নি ওদের উপস্থিতি। চটপট কাজ শেষ করে তিনজনেই সেখান থেকে সরে গেলে এরা তিন কিশোর আবারও কিছুক্ষণ সতর্ক থেকে তুলসীমঞ্চটা মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেও কিছুই উদ্ধার করতে না পারলেও এটুকু বুঝলো কিছু তো গোলমাল আছেই।

এরপরের দুইদিন সেইভাবে ঐদিকে যাওয়ার সুযোগ না হলেও মন পড়েছিল সেদিকেই। তৃতীয় দিন সকালে পিকলুর মা এলেন তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে, কিন্তু মামা আটকে দিলেন এবার।

“দুটো দিন থেকে যা ছুটকি।”

সাধারণভাবে মামা এরকম আবদার করেন না বলে দাদার কথা পিকলুর মা সঞ্চিতা ফেলতে পারলেন না। বিকেলে তিন ভাইকে নিয়ে পিকলুর মা বাজারে এসেছিলেন ঘুরতে ঘুরতে, হঠাৎই দেখা হয়ে গেল মায়ের ক্লাসমেট পেশায় পুলিশ ইন্সপেক্টর দীপঙ্কর মামার সঙ্গে। দীপঙ্কর মামা ওখানকার থানায় রয়েছেন, গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন কোনো কাজে, পিকলুর মাকে দেখে নেমে পড়লেন আড্ডা দিতে।

ওদিকে দুই বন্ধুর কথাও শেষ হয় না, এদিকে এই তিনমূর্তি তো ভীষণ অধৈর্য্য হয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। ক্ষিদেও পেয়ে গেছে বেশ, অনতিদূরে দেখা যাচ্ছে ওখানকার বিখ্যাত কালিকা মিষ্টান্ন ভান্ডার, সবাই মিলে সঞ্চিতাকে একটু তাড়া দিতে যাবে, এমন সময় কানে এলো, দীপঙ্কর বলছেন, "জানিস, এখানে এখন ছেলেপুলে মানুষ করা দায় হয়েছে, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা সব, নাক টিপলে দুধ বেরোয়, তারাও সব হেরোইনের নেশা করছে, আর জোগান দিচ্ছে স্থানীয় কিছু লোক।"

পিকলুর মা সবে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ বুবান জিজ্ঞাসা করলো,

"হেরোইন কী জিনিস গো?"

"এক ধরনের নেশা করার জিনিস রে, সাদা সাদা পাউডারের মত। খুব খারাপ জিনিস, মানুষের শরীরের কিছু রাখে না। আমরা জানি এখানেই কেউ এই ব্যবসা চালাচ্ছে, কিন্তু ধরতে পারছি না।”

এরপর আরও কিছুক্ষণ কথা বলে, সঞ্চিতা বাচ্চাদের নিয়ে আরো কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে এলেন বাড়িতে, পথে আসার সময় টুবান বললো ওর কিছু দরকার আছে, তাই এক বন্ধুর বাড়ি হয়ে সে ফিরবে কিছু সময় বাদে।

বুবান আর পিকলু বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুয়ে বসে বসে কম্পিউটার গেম খেলতে খেলতেই টুবান ঢুকলো ঘরে, কিছুটা ঘেমে হাঁফাতে হাঁফাতে। বড়রা কাছাকাছি না থাকায় জেরার মুখে পড়তে হয়নি, তবে টুবানের অবস্থা দেখে দুই ভাই বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল।

“শোন, ওই একই জিনিস আমি আবার আজ দেখলাম।”

“কোন জিনিস?”

“পুরোহিত মশাই আর ওই লোকদুটো কিছু একটা করছিল তুলসীমঞ্চের কাছে বসে। আর ওরা চলে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম হাতে রয়েছে একটা গামছার পুঁটলি। আমি প্রায় সামনে পড়ে যাওয়ায় একটা লোক আমার দিকে বিচ্ছিরিভাবে তেড়ে এসেছিল। আমি ঘুরপথে পালিয়ে এসেছি। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা সুবিধার লাগছে না।”

“আচ্ছা দাদা, কাল দীপঙ্কর মামা বলছিল কিছু বেআইনি নেশার ব্যবসা চলছে এখানে, আর স্থানীয় কেউ মদত জোগাচ্ছে, এরা সেইসব কিছুর সঙ্গে যুক্ত না তো!”

“মন্দ বলিসনি। হতেও পারে, তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত এমন কিছু রয়েছে ওখানে যা ওরা কাউকে জানতে দিতে চায় না।”

“কিন্তু প্রমাণ ছাড়া আমাদের কথা কেউ বিশ্বাস করবে না তো!”

“ঠিক, তাই আমি ঠিক করেছি, কাল সকালে পড়তে না গিয়ে, ওখানে বট-অশ্বত্থ গাছের পেছনে লুকিয়ে নজর রাখবো। তোরা ঘুম থেকে উঠেই চলে আসবি। দেরি করবি না।”


উত্তেজনায় তিনজনেই প্রায় নিদ্রাহীন কাটালো পুরো রাত। ভোরের আলো ফুটতেই প্রথমে ব্যাগ নিয়ে টুবান ও একটু পরে পিকলু আর বুবান চলল গোপন অভিযানে। ইদানীং প্রায় প্রতিদিন সকালে ওরা বেরোতো বলে বাড়ির বড়দের কাছে কিছুমাত্র বিসদৃশ ঠেকলো না, বুবান বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় পকেটে নিয়ে নিলো গিফ্ট পাওয়া ম্যাগনিফাইং গ্লাস। গোয়েন্দাদের দেখেছে টেলিভিশনে ওই দিয়ে অকুস্থলের তদন্ত করতে।

পৌঁছে দেখে টুবানের বন্ধু রনিও এসে উপস্থিত সেখানে। রহস্যের গন্ধ পেয়ে ডিটেক্টিভ বই পাগল রনিও এসে হাজির হয়েছে সেখানে। পুরোহিত এলো ঠিক ঠিক আন্দাজ করা সময়ে, এসে বসে তার কাজ সেরে উঠে যাওয়ার কিছু পরে ওরা চারজন সতর্ক পদক্ষেপে এসে দাঁড়ালো আপাতভাবে গোবেচারা তুলসীমঞ্চটার সামনে।

রনির বুদ্ধিতে টুবান আর রনি মিলে হঠাৎই তুলসীমঞ্চের গাঁথনির দেওয়ালে টোকা মেরে মেরে বাজাতে লাগলো। পিকলু আর বুবান মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে যখন অদ্ভুত এই বাজনার অর্থ, রনি হঠাৎ বলে উঠলো, "টুবান টের পেলি?"

“হ্যাঁ, শীতলা ঠাকুরের ঠিক পেছনে জায়গাটা ফাঁপা রয়েছে, টোকা দিলেই বোঝা যায়।”

“কিন্তু দেখে তো মনে হয় না কেউ খোলে এই জায়গাটা।”

“সেটাই তো…”

সেই সময়েই রনির পিসিকে সেই রাস্তায় আসতে দেখে তদন্তে বিরতি দিতে হলো চারজনকেই। ঠিক হলো দুপুরবেলা যখন সব ফাঁকা থাকে, তখন এসে আবার ওরা দেখবে কিছু সূত্র মেলে কিনা।

দুপুর হতেই, কাউকে কিছু না বলে, চুপিসাড়ে চারজনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে তুলসীমঞ্চের কাছে আসতেই দেখে, সেই গুন্ডামত দুজন লোক পুরোহিতের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করতে করতে বেড়া টপকে কোথায় যেন যাচ্ছে। ভরদুপুরে তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলতে দেখে একটু অদ্ভুত ঠেকলো চার জনেরই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি উদগ্রীব তারা তখন মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগিয়ে কীভাবে রহস্যের পর্দা উন্মোচন করা যায় সেই নিয়ে। সবাই যখন উপায় ভাবছে তখনই ঘটলো এক কান্ড।

প্রদীপের সলতের দৈর্ঘ্যের মাঝ বরাবর অব্দি জ্বলতে নেই, এই কথা মা-ঠাকুমার মুখে বাড়িতে শুনে এসেছে পিকলু অনেকবার, ওঁরা বলেন,

"প্রদীপের বুক জ্বললে অকল্যাণ হয়।" 

আজও তুলসীমঞ্চের প্রদীপের সলতের বুক জ্বলতে দেখে হাত দিয়ে সেটা ঠিক করতে গিয়ে হাতে ছ্যাঁকা খেয়ে তড়িঘড়ি হাত সরাতে গিয়ে পিকলু প্রদীপে দিলো এক ধাক্কা, আর সঙ্গে সঙ্গে মৃদু ঘর্ঘর একটা শব্দ করে সরে গেল শীতলাঠাকুরের পাথরে খোদাই করা মূর্তিখানা, আর দেখা গেল একটা ছোট্ট প্রকোষ্ঠ আর তার ভেতরে অনেক গুলো ছোট ছোট সাদা সাদা পাউডার ভরা প্যাকেট। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাহীন তদন্তের অপ্রত্যাশিত ফলাফল দেখে অবাক হবে না আনন্দিত, সেসব বুঝে ওঠার আগেই চারজন দেখল পুরোহিত হন্তদন্ত হয়ে একাই ফিরে আসছে সেইদিকে। প্রকোষ্ঠে রাখা প্যাকেটের ভেতরে কী রাখা আছে সেই বিষয়ে সম্যক ধারণা নেই, এদিকে সম্ভাব্য রহস্যের সমাধান এত কাছে পেয়েও ফসকে যাবে, এও হতে দেওয়া যায় না। তাই চটজলদি পরামর্শ করে নিয়ে ওরা ঠিক করল, একবারে সবাই মিলে ছুট লাগালে পাছে সন্দেহের উদ্রেক হয়, তাই বুবান আর পিকলু তুলসীমঞ্চের পেছনেই লুকিয়ে থাকবে খেলতে আসার অভিনয় করে, শীতলার মূর্তিটা আগের অবস্থায় রেখে, আর রনি আর টুবান গিয়ে ঢুকবে মূল মন্দিরে, পুজো দেওয়ার ভান করে।

পুরোহিত সেখানে এসে দুই ক্ষুদে গোয়েন্দাকে ওখানে দেখে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছে বোঝা গেল,

“এই তোদের এখানে কী চাই রে?”

“আমরা তো খেলছি গো। লুকোচুরি খেলছি।”

“আঃ, এখন কেউ লুকোচুরি খেলে? যা বলছি, পালা এখান থেকে। যত্তসব বেয়াড়া বাচ্চাকাচ্চা।”

পুরোহিতের তাড়া খেয়ে দুজনে ছুটতে ছুটতে সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা চললো দীপঙ্করকে খবর দিতে, স্থানীয় পুলিশচৌকিতে। টুবান আর রনিকে মন্দিরে থাকতে বলা হয়েছিল আগেই, পুরোহিতের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে। তারা পরীক্ষার জন্য পুজো দেওয়ার বাহানায় পুরোহিতকে ব্যস্ত রাখতে রাখল। ওদিকে  পিকলু-বুবানের মুখে সব শুনে দীপঙ্কর এবং আরো দুজন কনস্টেবল এসে হাজির হল মন্দিরের চত্বরে। পুলিশ দেখেই পুরোহিত পালাবার চেষ্টা করেও টুবান আর রনি ঘিরে রাখায় শেষরক্ষা হলো না। হাতেনাতে ধরা পড়া প্রৌঢ় পুরোহিতকে দিয়েই তুলসীমঞ্চের রহস্য সবার সামনে ফাঁস করানোর পরে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। দীপঙ্কর জানালেন তুলসীমঞ্চের থেকে উদ্ধার করা পাউডারের প্যাকেট আসলে হেরোইন, স্থানীয় একটি সমাজবিরোধী দল এই ব্যবসা চালাচ্ছে, আর এই পুরোহিত ছিলেন এদের দলের এক প্রধান সহায়ক।

এদিকে গোলমাল শুনে পিকলুর মা আর মামীও এসেছেন, এবং কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বাড়ির ছোটদের কাণ্ড শুনেছেন। গ্রেপ্তারপর্ব মিটে যেতে ওদের চারজনকে থানায় যেতে হয়েছিল, প্রাথমিক সাক্ষ্য দিতে। ফেরার পরে পিকলু খেতে বসে মাকে জিজ্ঞাসা করলো,

"আরো দু'দিন থেকে যাবে মা?"

কেউ কিছু বলার আগেই, দরজায় সবে এসে দাঁড়ানো পিকলুর মামা সহাস্যে বলে উঠলেন, “নিশ্চয়, প্রাইভেট ডিটেক্টিভ আবদার করেছে বলে কথা!”

পিকলুর মামার কথায় ঘরে একপ্রস্থ হাসির রোল উঠলো।

বাকি দুইদিন সবাই মিলে ভালোই কেটে গেল, আসার সময় প্রতিবারের মতো মন খারাপ হলেও কিছু তো করার নেই, এবার ফিরে পড়াশোনা শুরু করতেই হবে, অনেকদিন বন্ধ রয়েছে।

ফিরে আসার কিছুদিনের মধ্যেই রেজাল্ট বেরোনোর পরের দিন সকালে টেবিলের ওপর একটা উপহারের বাক্স পেয়ে খুব খুশি হলো পিকলু, কিন্তু তার থেকেও খুব অবাক হলো ভিতরে থাকা জিনিসগুলো পেয়ে। অন্যবারের মত ক্যালকুলেটর বা পড়াশোনার জিনিস বা পড়ার বই নয়, মোড়কের মধ্যে রয়েছে দুই খণ্ডের ফেলুদা সমগ্র। মা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়াল করেনি পিকলু,

"পছন্দ হয়েছে?" বললেন সঞ্চিতা।

“হ্যাঁ মা খুউউব।”

“বেশ, পড়িস, সবসময় কি আর পড়ার বই নিয়ে বসে থাকতে ভালো লাগে কারুর!”

পিকলুর চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠলো, নতুন করে মাকে বন্ধু হিসেবে পাওয়ার আনন্দে।



(সমাপ্ত)


অলঙ্করণ : স্বর্ণদ্বীপ চৌধুরী

3 comments:

  1. দারুণ রে। পুরো টানটান গল্প 😊

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু ������

      Delete
  2. দারুণ রে। পুরো টানটান গল্প 😊

    ReplyDelete