Showing posts with label বই কথা কও. Show all posts
Showing posts with label বই কথা কও. Show all posts

বই কথা কও : দ্য লোর‍্যাক্স (The Lorax)- লেখক: ডঃ স্যুস : আলোচনা : সুস্মিতা কুণ্ডু



বইয়ের নাম: দ্য লোর‍্যাক্স (The Lorax)

লেখক: ডঃ স্যুস (Dr. Seuss, Pen name of renowned children’s book writer and illustrator Theodor Seuss Geisel)

প্রকাশক: র‍্যান্ডম হাউস।

প্রকাশকাল : ১৯৭১.

******************

বন্ধুরা, এই বইটি নিয়ে আলোচনা করার আগে অল্প দু’টো কথা লেখকের লেখাগুলি সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে বলে নিই, কেমন? ডঃ স্যুস-এর লেখা আর আঁকা বইগুলো এবং তাঁর সৃষ্টি করা চরিত্রগুলো ইংরাজি শিশুসাহিত্যের এক অন্য দিক খুলে দিয়েছে ছোটোদের জন্য। কখনও বিষয়ের অভিনবত্ব, কখন চরিত্রদের ভীষণরকম মজাদার এবং ইউনিক নামকরণ, কখনও বা ছন্দের খেলায় জিতে নিয়েছে ছোটোদের মন। শুধু নতুন নতুন নামকরণই নয়, সেই সাথে ছবিতে সেই চরিত্রগুলোকেও উপস্থিত করেছেন তিনি। এককথায় বলতে গেলে শিশুদের কল্পনার ডানাকে আরও পোক্ত করতে তাঁর লেখা ও আঁকা বইয়ের জুড়ি মেলা ভার।

দ্য ক্যাট ইন দ্য হ্যাট, হর্টন, দ্য গ্রিঞ্চ, স্যাম-আই-অ্যাম, ইত্যাদি প্রায় শতাধিক জনপ্রিয় চরিত্র সৃষ্টি করেছেন তিনি।

বন্ধুরা, আজ ‘দ্য লোর‍্যাক্স’ বইটার গল্প শোনাবো তোমাদের কারণ এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বইটা শুধু ছোটোদেরই নয়, বড়দেরও পড়া উচিত। অ্যামাজনের জঙ্গল আগুনের কবলে, হিমবাহ গলে চলেছে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর চোখ রাঙানি, দূষণে বিপর্যস্ত মানুষ থেকে শুরু করে পশুপাখি সামুদ্রিক জীব সকলে। গাছের পর গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, আকাশ নীল রঙ হারিয়ে ধূসর বর্ণ ধারণ করছে। এই সাংঘাতিক কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে আরেকবার দেখে নেওয়া যাক এই গল্পটা, যেখানে বনভূমির এই অবাধ আগ্রাসনের নির্মম পরিণতিটাকে ডঃ স্যুসের নিজস্ব ঘরানায় পরিবেশিত হয়েছে।

গল্পের শুরুতেই আমরা দেখি যে একটা ছোট্ট ছেলে ‘দ্য স্ট্রিট অফ দ্য লিফ্টেড লোর‍্যাক্স’ ধরে হেঁটে এসে পৌঁছয় শহরের একপ্রান্তে একটা দূষিত এলাকায়, যেখানে পাখি গান গায় না, বাতাসময় দুর্গন্ধ। সেখানে বাস করে 'ওয়ান্সলার(Once-ler)', একটা অন্ধকার ঠাণ্ডা উঁচু ভাঙাচোরা বাড়িতে। একমাত্র ওয়ান্সলারই জানে এই জায়গার এরকম দুর্দশার কারণ। কিন্তু সে সহজে কাউকে দেখা দেয় না, কারোর সাথে কথা বলে না। ছেলেটি পনেরো সেন্ট, একটা নখ, আর তার প্রপ্রপ্রপিতামহর দেওয়া একটা শামুকের খোলসের বিনিময়ে ওয়ান্সলারের কাছে শোনে সেই দুঃখের কাহিনী।

একটা লম্বা পাইপের আগায় চোঙা লাগানো 'হুইস্পার-মা-ফোন(Whisper-ma-phone)' নিচে ঝুলিয়ে দেয় ওয়ান্সলার। তাইতে কান পেতে ছেলেটি শোনে সেই কাহিনী।

অনেক অনেকদিন আগে ট্রাফ্যুলা (Truffula) গাছে ভরা সুন্দর একটা জঙ্গলে এসে উপস্থিত হয়েছিল ওয়ান্সলার। তখন চারিদিকে ছিল অনেক সবুজ ঘাস, পুকুরভর্তি জল, পরিষ্কার মেঘ, সুগন্ধী বাতাস। ট্রাফ্যুলা গাছের তলায় বাস করত বাদামীরঙা 'বার-বা-লুট'রা (Bar-ba-loot)। তারা ট্রাফ্যুলা গাছের ফল খেয়ে পেট ভরাতো। পুকুরে গুনগুন করে গান ধরত গাইয়ে মাছেরা(Humming-Fish)। আকাশে উড়ত সোয়ামি-সোয়ানের (Swomee-Swan) দল।

অনেকদিন ধরে এরকম গাছই খুঁজছিল ওয়ান্সলার সুতো বানানোর জন্য। অমনি একটা সুন্দর ট্রাফ্যুলা গাছ সঙ্গে সঙ্গে কেটে ফেলল সে। তাই থেকে রেশমের মত এক ধরনের মোলায়েম সুতো তৈরি করল ওয়ান্সলার, যার নাম দিল থ্নিড(Thneed)। সেই থ্নিড তৈরি করা মাত্র কাটা ট্রাফ্যুলা গাছের গোড়া থেকে বেরিয়ে এল অদ্ভুতদর্শন একটা প্রাণী। সে কড়া গলায় ওয়ান্সলারকে বলল,

“I am the Lorax, I speak for the trees’

I speak for the trees, for the trees have no tongues.”

লোর‍্যাক্সকে রেগে যেতে দেখে তাকে আস্বস্ত করল ওয়ান্সলার যে চিন্তার কিছু নেই। এই থ্নিড মানুষের ভীষণ উপকারে আসবে কারণ তাই দিয়ে জামা, মোজা, টুপি, দস্তানা, বালিশ, পর্দা, কার্পেট সঅঅঅব কিছু বানানো যাবে।

লোর‍্যাক্স সহমত হয় না ওয়ান্সলারের সাথে। তাকে ফের সাবধান করে যে কেউ এই থ্নিড কিনবেনা আর ওয়ান্সলার খামোকা লোভের ফাঁদে পা দিয়ে ট্রাফ্যুলা গাছ কাটছে। ঠিক এমন সময়ই একজন এসে ৩.৯৮ ডলার দিয়ে কিনে নিল ওই থ্নিডটা। আর যায় কোথায়! রমরমিয়ে শুরু হল ব্যবসা। ওয়ান্সলারের ছোট্ট দোকান ধীরে ধীরে বৃহৎ আকার নিতে থাকল। একের পর এক যন্ত্রপাতি এল, গাড়িঘোড়া এল, এল ওয়ান্সলারের পরিবার আত্মীয়স্বজন। সবাই হাত লাগালো থ্নিড বানাতে, ব্যবসা বাড়াতে, আরও আরও পয়সা কামাতে। সুপার-অ্যাক্স-হ্যাকার(Super-Axe-Hacker) যন্ত্রের এক একটা কোপে কাটা পড়তে লাগল অজস্র ট্রাফ্যুলা গাছ।

ফের দেখা দিল লোর‍্যাক্স। ওয়ান্সলারকে জানালো এত এত ট্রাফ্যুলা গাছ কাটার ফলে ট্রাফ্যুলা ফলের অভাব দেখা দিয়েছে। বেচারা বার-বা-লুটরা না খেতে পেয়ে জঙ্গল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ওয়ান্সলারের একটু খারাপ লাগল, কিন্তু তার লোভে তবুও ভাঁটা পড়ল না। থ্নিড কারখানা আয়তনে আরও বড় হতে থাকল।

ফের এল লোর‍্যাক্স। ভীষণ রেগে জানালো যে কারখানা থেকে বেরনো ধোঁয়াশাতে ছেয়ে গেছে সমস্ত আকাশ। বেচারা সোয়ামি-সোয়ান পাখিরা ভালো করে শ্বাস নিতে পারছেনা, গান গাইতে পারছেনা। তারাও চলে যাচ্ছে জঙ্গল ছেড়ে। শুধু তাই নয়, কারখানার যন্ত্রপাতি থেকে রোজ যে নোংরা আবর্জনা বেরোচ্ছে সেগুলো গিয়ে মিশছে পুকুরের জলে। হামিং-ফিশদের কানকো সেই নোংরায় বুজে গিয়ে খাবি খাওয়ার দশা। তারা কোনওমতে পাখনায় ভর দিয়ে হেঁটে পালাচ্ছে এই দূষিত জায়গা ছেড়ে।

ওয়ান্সলার এবার ভীষণ ভীষণ রেগে গেল লোর‍্যাক্সের কথায়। কারণ সে তো তখন লোভে অন্ধ, ব্যবসা আরও বাড়াতে, আরও পয়সা কামাতে পাগল। থ্নিডের ব্যবসা বাড়াতেই থাকল ওয়ান্সলার, “and biggering... and biggering...and biggering...”

আরও ট্রাফ্যুলা গাছ কাটা পড়তে লাগল।

শেষমেষ সেই দিনটা এল, যেদিন শেষ ট্রাফ্যুলা গাছটাও কাটা পড়ল। গাছ নেই তাই আর থ্নিডও নেই, ব্যবসাও নেই। সব আত্মীয়স্বজন, গাড়িঘোড়া নিয়ে বিদায় নিল। ওয়ান্সলার একা পড়ে রইল সেই ফাঁকা দুর্গন্ধময় কারখানাতে আর রইল লোর‍্যাক্স। করুণ চোখে ওয়ান্সলারের দিকে তাকিয়ে, কিচ্ছুটি না বলে সেই ধোঁয়াশা ঘেরা আকাশের মাঝের একটুকরো ফাঁক দিয়ে কোথায় যেন চলে গেল লোর‍্যাক্স। আর ফিরে এলো না কোনওদিনও। শুধু লোর‍্যাক্সের ফেলে যাওয়া ক’টা পাথরের ওপর খোদাই হয়ে পড়ে রইল একটা শব্দ ‘UNLESS’

ওয়ান্সলার তখনও বুঝতে পারল না সেই শব্দের অর্থ কী! বছরের পর বছর পেরিয়ে সব আজকের এই ভগ্নস্তূপে পরিণত হল।

ছোট্ট শ্রোতা ছেলেটিকে পরিশেষে ওয়ান্সলার বলল, এতদিন লোর‍্যাক্সের শেষ শব্দটার মানে না বুঝলেও এবারে বুঝেছে। ছেলেটির উদ্দেশ্যে ওয়ান্সলার বলে উঠল, "Unless someone like you cares a whole awful lot, nothing is going to get better. It's not."

ওয়ান্সলার নিজের কাছে এতদিন জমিয়ে রাখা শেষ ট্রাফ্যুলা গাছের বীজটা ছেলেটার হাতে দিয়ে অনুরোধ করল সে যেন আগের মত ট্রাফ্যুলার জঙ্গল তৈরি করে এখানে, এবং কলকারখানার কুঠারের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে গাছকে। তাহলেই আকাশ পরিষ্কার হবে, বাতাস দূষণমুক্ত হবে, জল স্বচ্ছ হবে। তারপর কোনওদিন হয়ত লোর‍্যাক্স আর তার বন্ধুরা আবার ফিরে আসবে এই জঙ্গলে।

গল্পের শেষ এখানেই।

শিশুদেরকে গাছ এবং সমগ্র প্রকৃতির সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সহজ গল্পের ছলে বোঝানোর জন্য বইটি ছোটোদের কাছে তো বটেই এমনকি সমগ্র পাঠকমহলে ভীষণভাবে সমাদৃত হয়। ২০০৭ সালে একটি অনলাইন পোলের মাধ্যমে ‘ন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন’ ‘দ্য লোর‍্যাক্স’ বইটিকে "Teachers' Top 100 Books for Children" আখ্যা দেয়। ২০১২ সালে ‘স্কুল লাইব্রেরি জার্নাল’-এর একটি সার্ভেতে বইটি ৩৩ নম্বর স্থান পায় "Top 100 Picture Books" এর তালিকাতে।

শুধু তাই নয় ১৯৭২ এবং ১৯৯৪ সালে টিভির পর্দাতে অ্যাডাপ্ট করা হয় বইটি। ২০১২ সালে একটা জনপ্রিয় সিনেমাও তৈরি করে ‘ইল্যুমিনেশন এন্টারটেইনমেন্ট’(ডেসপিকেবল মি/মিনিয়ন সিরিজের সিনেমাখ্যাত)। তাইতে কণ্ঠ দেন নামী অভিনেতা অভিনেত্রীরা। সিনেমাটি রিলিজ করে ‘ইউনিভার্সাল পিকচার্স’। এছাড়াও অডিও বুক এবং ব্রডওয়ে মিউজিকালরূপেও দেখা মিলেছে দ্য লোর‍্যাক্সের।

একটা মজার ঘটনা বলি, যখন প্রথম পাবলিশ হয় তখন দ্য লোর‍্যাক্স বইটিতে ক'টা লাইন ছিল,

"They'll walk on their fins and get woefully weary,

in search of some water that isn't so smeary.

I hear things are just as bad up in Lake Erie."

এই লেখার কারণ ছিল সত্যিই সেই সময় লেক ইরি ভীষণভাবে দূষিত ছিল, মাছেরা দলে দলে মারা পড়ছিল। আশির দশকে নানারকম দূষণবিরোধী পদক্ষেপের পর লেকটির পরিস্থিতির সমূহ উন্নতি হয়। ওহায়ো সি গ্রান্টের দুজন গবেষক ডঃ স্যুসকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন বই থেকে ওই তৃতীয় লাইনটি সরিয়ে দিতে। পাবলিশ হওয়ার প্রায় ১৪বছর পর ওই “I hear things are just as bad up in Lake Erie.” লাইনটি সরানো হয় বই থেকে।

১৯৭১ সালে প্রকাশিত এই বই নিয়ে কম আলোচনা তোলপাড় হয়নি। বেশিরভাগ বইপ্রেমীই বইটিকে সাদরে গ্রহণ করলেও কিছু কিছু সমালোচকের মনে হয়েছে কলকারখানাগুলোকে একটু বেশিই খারাপ ভাবে দেখানো হয়েছে গল্পে। বিশেষত আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ছোটো স্কুল ডিস্ট্রিক্টে ১৯৮৮ সালে বইটি ব্যানও করা হয়। কারণ ওই অঞ্চলের মানুষের মূল জীবিকাই নির্বাহিত হত লগিং ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে। তদের দাবী ছিল কাঠ কাটার এই কারখানাগুলো যত না গাছ কাটে তার থেকে অনেক বেশি গাছ লাগায়। শিশুমনে এই বইটি তাই বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে শিল্প সম্পর্কে। এমনকি টেরি বার্কেট নামে এক লেখিকা এই শিল্পের অন্য দিকটি তুলে ধরার জন্য ‘দ্য ট্রুয়াক্স’ নামের একটি বইও লেখেন, দ্য লোরাক্স এর প্রতিবাদে।

শেষ করি আর একটা ঘটনা বলে। যদিও লোর‍্যাক্স এবং গল্পটার অন্য সব চরিত্র কাল্পনিক তবু মনে করা হয় যে, বিশেষ একটি গাছকে দেখেই নাকি ডঃ স্যুস এই গল্পটা লিখেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডঃ স্যুস ক্যালিফোর্নিয়ার লা হোয়া (La Jolla, California)-তে বাস করাকালীন একটা মন্টরে সাইপ্রেস (Monterey Cypress) গাছ দেখতে পেতেন অবজার্ভেশন টাওয়ার থেকে। সেই একাকী দাঁড়িয়ে থাকা গাছটিকে দেখেই দেখে ট্রাফ্যুলা গাছের কথা লিখেছিলেন বলে স্থানীয় এলাকায় প্রচলিত। গাছটি পর্যটকদের কাছে লোরাক্স ট্রি নামেই বেশি পরিচিত। দুর্ভাগ্যবশতঃ এই বছর জুন মাসেই(June 16, 2019) সেই গাছটি উপড়ে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে যদিও এই গল্পের মধ্যে দিয়ে গাছটা চিরতরেই থেকে যাবে।



ছবি ও তথ্যসূত্র:


•প্রথম ছবি: পিওয়াকি, উইসকনসিক লাইব্রেরি থেকে প্রাপ্ত ‘দ্য লোর‍্যাক্স’ বইটি।

•দ্বিতীয় ছবি: আন্তর্জাল

• https://en.m.wikipedia.org/wiki/The_Lorax

•https://www.smithsonianmag.com/travel/visit-seussical-san-diego-180959997/

•https://www.google.com/amp/s/qz.com/quartzy/1353379/the-us-logging-industry-once-released-a-parody-response-to-the-lorax-called-truax/amp/


বই কথা কওঃ চার্লস ডিকেন্সের 'আ ক্রিসমাস ক্যারল' : দেবলীনা দাস



এখন আমি বুড়ি থুত্থুড়ি, শনের নুড়ি চুল। কিন্তু চার্লস ডিকেন্সের ‘'আ ক্রিসমাস ক্যারল’ বইটির সঙ্গে যখন আমার পরিচয় ঘটে, তখন আমার বয়স কিন্তু তোমাদের থেকে খুব বেশি ছিল না। ক্লাস নাইন না টেন মনে পড়ে না ঠিক, তবে সিবিএসই র ইংলিশ রিডারে 'আ ক্রিসমাস ক্যারল’ এর একটি সংক্ষিপ্ত নাট্যরূপ ছিল। বড়দিন আসি-আসি করছে, এমন সময়ে কিশলয়ের শীত সংখ্যায় বইবকবক লিখতে বসে তারই কথা মনে পড়ল।
ডিকেন্স শুনেই ভয় পেয়ে যেও না। ভিক্টোরিয়ান এই সাহিত্যিকের বাকি উপন্যাসগুলোর মত বিশাল কলেবর নয় ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’ এর। এই মুহূর্তে আমার নাগালের মধ্যে আছে প্রজেক্ট গুটেনবার্গের ইবুকটি, আর তাতে ৭৮টি মাত্র পৃষ্ঠা। উপন্যাসিকা বা নভেলা বলা হয় একে। বিষয়বস্তুও সহজসরল, এমন কি চাইলে ভূতের গল্প মনে করেও পড়া যেতে পারে।
বইয়ের শুরুতেই আমাদের আলাপ হয়ে যাবে মুখ্য চরিত্র স্ক্রুজের সাথে। নামটা চেনা লাগছে তো? লাগবেই। কারণ ডিজনির ‘ডাকটেলস’ খ্যাত ধনকুবের এবং কৃপণ শিরোমণি আঙ্কল স্ক্রুজের নামটি এখান থেকেই তো নেওয়া হয়েছে। ডিকেন্সের স্ক্রুজও কিনা ঝানু ব্যবসাদার, প্রচুর পয়সার মালিক, এবং কৃপণ। হুঁকোমুখো স্ক্রুজ কাউকে ভালোবাসে না, তার জীবনে কোথাও এক কণাও আনন্দ নেই, কোনো শখ নেই। দেদার পয়সা রোজগার করা এবং সে ধনকে দু'হাতে আগলানো - এছাড়া তার কোনো লক্ষ্য নেই জীবনে। আমাদের দুর্গাপূজার মত ক্রিশ্চানদের সম্বৎসরের সব চেয়ে বড় উৎসব, প্রাণের উৎসব যে ক্রিসমাস - সেই উৎসবকে নিয়ে মাতামাতি করাকে স্ক্রুজ মনে করে মূর্খামি, সময় নষ্ট করা। কিন্তু এরকমই এক ক্রিসমাসে তিন ভূত দেখা দেয় স্ক্রুজকে, তার গোটা জীবনটাই আমূল বদলে যায়।
এই ভূতদের ঠিক ভূত বলা যায় না। স্ক্রুজের পরলোকগত পার্টনার মার্লির মত মৃত মানুষের আত্মা নয় এরা। ঘোস্ট অফ ক্রিসমাস পাস্ট, ঘোস্ট অফ ক্রিসমাস প্রেজেন্ট আর ঘোস্ট অফ ক্রিসমাস ইয়েট টু কাম স্ক্রুজের হাত ধরে তাকে দেখিয়ে আনে তার গোটা জীবনখানা। দেখায় ধনার্জনের নেশায় মত্ত স্ক্রুজ কিভাবে আত্মীয়পরিজন, বন্ধুবান্ধবদের থেকে আলাদা হতে হতে একলা হয়ে গেল। দেখায় স্ক্রুজের কেরানি মিস্টার ক্র‍্যাচিটের বাড়ির ক্রিসমাস সেলিব্রেশন - কেমন করে দারিদ্র‍্যের মধ্যেও মানুষ পরিবারের ভালোবাসায় ভালো থাকে। অভাব যেন শীতের মত - রুক্ষ, রিক্ত - জীবনের টুকরো খুশিগুলো তাকে জড়িয়ে রাখে তালিমারা কাঁথার ওমে।
সব শেষে স্ক্রুজ দেখে নিজের ভবিষ্যতের ছবি। তার মৃত্যুতে দুঃখ পায় না কেউ, বরং সুদে নেওয়া টাকা ফেরত দিতে হবে না বলে আনন্দ পায় এক গরিব দম্পতি। তার শেষকৃত্যে কোনো আত্মীয় বন্ধু আসে না, বিনি পয়সার মধ্যাহ্নভোজনের লোভে আসে কেবল সুবিধেবাদী ব্যবসাদাররা।
কবরের ওপরের ফলকে নিজের নাম পড়ে আঁতকে ওঠে স্ক্রুজ। ঘোস্টের কাছে কাকুতিমিনতি করে, একটা সুযোগের জন্য। ইংরেজিতে যাকে আমরা বলি ‘আ সেকেন্ড চান্স’ - নিজের ভুলভ্রান্তি শুধরে নিয়ে জীবনকে নতুন ভাবে বাঁচার আরেকটা সুযোগ। স্ক্রুজ কি সেকেন্ড চান্স পায়? পেয়ে কাজে লাগাতে পারে সেই চান্সকে? ভবিতব্যকে পালটে ফেলতে পারে? জানতে চাইলে পড়ে ফেলো ‘'আ ক্রিসমাস ক্যারল’’।
‘ক্রিসমাস ক্যারল’ কেবল ক্রিসমাসের গল্প নয়। সব ধর্মের, সব দেশের আনন্দ উৎসবের গল্প। কারণ উৎসব মানেই তো মানুষে মানুষে মেলবন্ধন। ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ড ছিল যেন এক দেশের মধ্যে দু'খানা আলাদা দেশ - ধনীদের ইংল্যান্ডে গরিবদের কোনো অধিকারই ছিল না, তাদের অন্ধকারকে ছুঁতে পারত না আনন্দের রোশনাই। ডিকেন্স এই দুই ইংল্যান্ডকেই মেলানোর চেষ্টা করেছিলেন স্ক্রুজের গল্পের মধ্যে দিয়ে। বোঝাতে চেয়েছিলেন, আনন্দ কেবল স্বার্থপরের মত কুক্ষিগত করে রাখার জিনিস নয়, সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জিনিস। অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই রয়েছে ‘দ্য স্পিরিট অফ ক্রিসমাস’।
বইটির দাম বেশি নয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাবলিশিং এর এডিশনটির দাম একশো টাকা, ওয়ার্ডসওয়ার্থ চিল্ড্রেনস ক্লাসিকসের বইটির দাম আর পঁচিশ টাকা বেশি। ইলাস্ট্রেটেড বইও পাওয়া যায়।
তাহলে দেরি না করে এই শীতেই পড়ে ফেলো ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’। কেমন লাগল সে কথা কিশলয়কে চিঠি লিখে জানাতে ভুলো না যেন।

বই কথা কও : উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর 'গল্পের রাজা' আলোচনা : জয়িতা সাহা



'তোমরা গান গাইতে পার? আমি একজন লোকের কথা বলব সে একটা গান গাইতে পারত। তার নাম ছিল গুপি কাইন।.... গুপি কিনা একটা গান গাইতে পারত, আর সে গ্রামের আর কেউ কিছু গাইতে পারত না, তাই তারা তাকে খাতির করে বলতো গুপি 'গাইন'।...... গুপিদের গ্রামের কাছেই আরেকটা গ্রামে একজন লোক থাকতো, তার নাম ছিল পাঁচু পাইন। পাঁচুর ছেলেটির বড্ড ঢোলক বাজাবার শখ ছিল। বাজাতে বাজাতে সে বিষম ঢুলতে থাকতো, চোখ পাকাতো, ..... গ্রামের লোক তা দেখে হাঁ করে থাকত আর বলত, 'আহা!...' শেষে যখন 'হাঃ হাঃ! হা-হা!' বলে বাঘের মতো খেঁকিয়ে উঠতো, তখন সকলে পালাবার ফাঁক না পেয়ে চিৎপাত হয়ে পড়ে যেত। তাই থেকে সকলে তাকে বলতো 'বাঘা বাইন'।' 




চেনা চেনা লাগছে নিশ্চয়ই? একদম ঠিক ধরেছো! এই সেই আমলকি গ্রামের গুপি আর হরতুকীতলার বাঘা, যাদের গান বাজনায় তিতিবিরক্ত হয়ে গ্রামের লোক তাড়িয়ে দিয়েছিলো গ্রাম থেকে আর দুজনে তখন গভীর জঙ্গলে দেখা পেয়েছিলো ভূতের রাজার! সত‍্যজিৎ রায়ের এই কালজয়ী সিনেমা 'গুপি গাইন বাঘা বাইন' তো সবাই তোমরা দেখেছো, কিন্ত জানো কি এই গল্প কে লিখেছিলেন? উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, যিনি ছিলেন সত‍্যজিতের ঠাকুরদা। 



আমি যখন ক্লাস ফোর, জন্মদিনে উপেন্দ্রকিশোরের একগোছা গল্প দিয়ে সাজানো বই 'গল্পের রাজা' উপহার দিয়েছিলো আমার দাদাভাই। আর সেই বইতেই আমি প্রথম গুপি বাঘার গল্প পড়ি। বইটিতে ছোটো বড় মিলিয়ে মোট তিরিশখানা গল্প ছিলো। গুপি বাঘার পরেই যে গল্পটি আমার সবথেকে প্রিয় তার নাম 'ঝানু চোর চানু'। গ্রামের এক গরীব ছেলে তার চালাকি আর বুদ্ধির জোরে কীভাবে ডাকাত দলকে শায়েস্তা করবে আর জমিদারকে নাস্তানাবুদ করবে সেই কাহিনী সবার পছন্দ হবেই। আমি তো এখনো অবধি যদি কেউ চালাকি বা ফাঁকিবাজি করে কোনো কাজ করে তাকে বলি "ঝানু চোর চানু হয়েছো?" 

ঝানু যত চালাক, 'পন্ডিতের কথা' র ঢিপাই পন্ডিত ততটাই বোকা। ঢিপাই মনে মনে ভাবে তার এতো বুদ্ধি সে নাকে কানে ঢিপলি করে তুলো গুঁজে রাখে যাতে বুদ্ধি বের না হয়ে যায়। একগ্রামে একবার এক শূকর এসেছে কিন্তু সেই গ্রামে কেউ কোনোদিন শূকর দেখেনি। কেউ বললো হাতি ছোটো হয়ে গেছে! কেউ বললো ইঁদুর বড় হয়ে গেছে!! ঢিপাই বললো একে জলে ছেড়ে দেওয়া হোক। ডুবে গেলে মাছ, উড়ে গেলে পানকৌড়ি আর সাঁতরে উঠলে কচ্ছপ!!! ঢিপাই পন্ডিতের পান্ডিত‍্যের এই নমুনা পড়ে আমার হাসি সহজে থামেনি।

গল্পের রাজার বেশ অনেকটা অংশ জুড়ে আছে পুরাণের গল্প। মা দুর্গার ছোটো ছেলে গণেশের মাথা হাতির মতন কেন? সূর্যের বউ যদি ছিলেন বিশ্বকর্মার কন‍্যা, সূর্যের ছেলে মেয়ে তবে কারা? পৃথিবীর নামকরণ কীভাবে হলো? গঙ্গানদীকে তো আমরা বলি গঙ্গাদেবী, সেই দেবীকে পৃথিবীতে কে আনলো? এই সব নানাবিধ পুরাণের আখ‍্যান একদম ছোটোদের উপযোগী করে নিজের লেখনীর গুণে গল্পের আকার দিয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। রামায়ণে রাম লক্ষ্মণের গুরু ছিলেন যে ঋষি বশিষ্ঠ, দুই অসুর ভাই ইল্বল-বাতাপি বা প্রচণ্ড শক্তিধারী ঋষি অগস্ত‍্য যিনি বিন্ধ‍্য পর্বত নড়িয়ে দিয়েছিলেন এদের সবার কথাই আছে গল্পের রাজাতে। মাইথোলজি অর্থাৎ পুরাণ আমার খুব পছন্দের বিষয়। পরবর্তীকালে হিন্দু, বিষ্ণু আর নানা দেশ বিদেশের মাইথোলজি পড়েছি, তোমরাও নিশ্চয়ই পড়বে। পুরাণের প্রতি আমার এই ঝোঁক গল্পের রাজা পড়েই প্রথম আসে।

ছোটোদের ভীষণ পছন্দের একটি বিষয় রূপকথা আর সেই সূত্র ধরেই 'গল্পের রাজা'তে বেশ কয়েকটি রূপকথার গল্পও স্থান পেয়েছে। এই রূপকথার গল্পের মধ‍্যে আবার প্রকারভেদ রয়েছে। একপ্রকার হলো রাজা-রানি, দত‍্যি-দানব, রাজপুত্র-রাজকন‍্যেদের নিয়ে। যার মধ‍্যে আমার সবথেকে প্রিয় গল্প ছিলো 'ঘ‍্যাঁঘাসুর'। 


ঘ‍্যাঁঘার বাহারী লেজের পালক আনতে গিয়ে মানিককে বানাতে হবে এমন এক গাড়ি যা চলে ডাঙায়, ভাসে জলে আর ওড়ে আকাশে! তবে গিয়ে সে পাবে রাজত্ব আর রাজকন‍্যা। বানর রাজপুত্রের গল্পও আছে এই বইতে। আরেকপ্রকারের রূপকথা হলো সাধারণ গ্রামের গরীবগুর্বো লোক তাদের জীবনে দারুণ সব আজব আশ্চর্য কান্ডকারখানা। যেমন গুপি-বাঘার গল্পে দুই বেজায় গরীব ছেলে ভূতের রাজার বরে জগৎ জয় করেছিলো বা 'দুঃখীরাম' গল্পে দুখু তার মামার অত‍্যাচার থেকে বাঁচতে কতসব আজগুবি ঘটনা ঘটিয়েছিলো, আবার 'তিনটি বর' গল্পে শয়তানের হাত থেকে পালাতে কামারের কতশত ফন্দিফিকির! কেবলমাত্র রাজা রানি নয়, অতি সাধারণ মানুষদের জীবনও যে রূপকথার মতো হতে পারে এই গভীর ভাবনার বীজ কি অবলীলায় শিশুদের মনে রোপণ করেছেন উপেন্দ্রকিশোর। ওঁর গল্পেই আমরা শিখেছি শয়তানের পায়ে থাকে ছাগলের খুর!

গল্পের রাজার সূচীতে আরো একটি বিশেষ ধরনের গল্প স্থান পেয়েছে, সেটি হলো বিভিন্ন জন্তু জানোয়ারের গল্প। ঈশপের গল্পে যেমন আমরা জানি বিভিন্ন নীতিকথা প্রাণীদের মধ‍্যে দিয়ে বলা হয়, ঠিক সেইভাবেই উপেন্দ্রকিশোরও শিশুমনের উপযোগী করে নানান গল্প বলেছেন, উপদেশের কথা শুনিয়েছেন। 'তিন মাছের কথা' গল্পে আমরা জানতে পারি তিন বন্ধু মাছের কথা। 'অনাগত বিধাতা' যে কোনো বিপদ হওয়ার আগে তার উপায় করে রাখতো, 'প্রত‍্যুৎপন্নমতি' যে বিপদ এলে বুদ্ধি খাটিয়ে তা দূর করতো আর 'দীর্ঘসূত্র' যে আজ নয় কাল করে সময় কাটাতো আর বুদ্ধি তার ছিলো না, তাই বিপদ এলে তার রক্ষা থাকতো না। গল্পের রাজাতে যখন এই গল্প প্রথম পড়ি তখন এইসব কঠিন শব্দের মানে জানতাম না। কিন্ত এই গল্প পড়লে দেখবে কত সহজে তোমরা বেছে নিতে পারবে জীবনে চলতে গেলে কোন মাছের মতো হতে হবে। 




জীবজন্তু বিষয়ক বাঘ আর শিয়াল এবং টুনটুনি আর বিড়ালের কয়েকটি গল্প আছে গল্পের রাজাতে। বাঘ-শিয়াল সিরিজের আর টুনটুনি সিরিজের সমস্ত গল্প পড়তে হলে তোমরা 'বাঘ শিয়ালের মেলা' আর 'টুনটুনির বই' পড়তেই পারো।

গল্পের পাশাপাশি মানানসই অলংকরণে বই পড়ার মজা দ্বিগুণ হয়ে যায়। রঙচঙে প্রচ্ছদ আর প্রতিটি গল্পের সাথে মজাদার ছবি যা ঠিক কার্টুন বা ব‍্যঙ্গচিত্র নয়, অনেকটা হাসির মোড়কে তৈরি ইলাস্ট্রেশন। গল্পের রাজার প্রচ্ছদ এবং অলংকরণ করেছিলেন সঞ্জয় সরকার।

অনেক বছর আগে কেনা বলে বইয়ের প্রচ্ছদ আর অক্ষত নেই, দুঃখের বিষয়। তবু গল্পের সাথে আঁকা কিছু ছবি তুলে দিলাম। বইটি এখনো প্রকাশিত হয় কিনা তাও আমার জানা নেই। তবে আনন্দের কথা, উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র দে'জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত, গল্পের রাজার সব গল্প তোমরা ওতেই পাবে। বইটা জোগাড় করে ফেলতেই পারো, 'গল্পের রাজা'র সঙ্গে আরও অনেক মজাদার গল্পের খোঁজ পেয়ে যাবে একই বইয়ের মধ্যে। 


গল্পের রাজার সাথে সেইবারে গরমের ছুটি আমার কী যে আনন্দে কেটেছিলো তা আর তোমাদের কি বলবো! তখন তো না ছিলো বাড়িতে ল‍্যাপটপ না ছিলো মোবাইল, এমনকী কেবল্ টিভিও না। গরমের ছুটি বা পুজোর ছুটি বা ক্রিসমাসে বই ছিলো আমাদের একমাত্র সঙ্গী। এখনকার ব‍্যস্ত জীবনেও কিন্ত ঠাকুর দেখার ফাঁকে গুপি বাঘা আর ঝানু চোর চানুকে ফিরে দেখতেই পারো। পুুজোর দিনগুলো আনন্দে ভরে থাকবে।


(সমাপ্ত)






বই কথা কও : 'মালশ্রীর পঞ্চতন্ত্র' আলোচনা : চয়ন সমাদ্দার



আমাদের দেশের সভ্যতাটা খুব পুরনো। জানো তো? পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। পেল্লাই সব শহর ছিল, রাজারাজড়া ছিল। খেটে খাওয়া মানুষের দল ছিল। আর ছিল একটা বিশেষ ধরণের গল্প বলার ধরণ। কী রকম জান? ধর, মা তোমাকে টিফিনে ম্যাগি দিয়েছেন। কিন্তু, তোমার বার্গার পেলে ভালো লাগবে। তা, আমি যদি লিখি, তুমি একটা গাছের তলায় গিয়ে চাইলে, অমনি বৃক্ষ দেবতা তোমায় ম্যাকের বার্গার দিয়ে দিলেন, তুমি নির্ঘাত হাসবে। যে জীবনটা আমরা বাঁচি, তাতে অমন হয়? কিন্তু জানো সেইই অনেককাল আগের গল্প শুনতে গেলে তোমায় এরকম একটা দুনিয়া মেনে নিতে হবে। সেই দুনিয়ায় শকুন্তলা শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় বনের গাছ থেকে কাপড়, গয়না আসে। আঁচল টানে হরিণশিশু।

আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে মানুষের মুখে জন্তুর মুখোশ এঁটে একটা বই লেখা হয়। নাম পঞ্চতন্ত্র। জানো তো, দেশ চালাতে নানারকম ফন্দিফিকির করতে হয়। তার কোনওটা অতি বিশ্রীও হতে পারে। এই বিশ্রী চেহারাটাকে একেবারে উদোম করে দেখান এ বইয়ের লেখক বিষ্ণুশর্মা। একটা কথা মনে রেখো, এই নামে সত্যিই কেউ ছিলেন কিনা, জানা যায় না। পাঠক কল্পনা করে নিয়েছে, এক বয়স্ক, রসিক কিন্তু পরম পণ্ডিতকে। তারই নাম দিয়েছঃ - বিষ্ণুশর্মা। তখন, ছোটদের লেখা বলে আলাদা কিছু ছিল না। তবু, বইটার শুরুতে আছে মহিলারোপ্য নগরের রাজা ছিলেন অমরশক্তি। তাঁর তিন ছেলে - বসুশক্তি, উগ্রশক্তি আর অনেকশক্তি। তিন রাজকুমার পণ করেছিলেন কিছুতেই লেখা পড়া শিখবেন না। সব পণ্ডিতমশাই হাল ছেড়ে দিলে আসেন বিষ্ণুশর্মা। তিনি রাজ্যচালনার রীতিনীতিকে গল্পের চেহারা দিয়ে রাজকুমারদে বলতে আরম্ভ করেন। এই চোখ দিয়ে দেখলে, দেড় হাজার বছর আগের বইটা ছোটদের জন্য লেখা, বলা চলতেও পারে। এখন, ঐ গল্পগুলো, প্রথমে তোমাকে যে জগতটা মেনে নিতে বললাম, তার নিয়মে বলা। গল্প থেকে গল্প। মানুষ আছে, জন্তুও আছে। তারা আবার মানুষের মতো ব্যবহার করে। তোমরা, যারা সিক্স, সেভেনে পড়ো, তারা জানবে এই ধরণের গল্পকে ফেবল্ (fable) বলে। মিত্রভেদম, মিত্রপ্রাপ্তিকম, কাকোলূকীয়ম, লব্ধপ্রাণাশম এবং অপরীক্ষিতকারম এই পাঁচটি গল্পে রাজনীতি, কূটনীতি, মানুষের খারাপ দিকগুলো এমন ভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তার জুড়ি পৃথিবীতে বিশেষ নেই। এবার , প্রশ্ন হলো, এ লেখা তো এখন কালজয়ী ক্লাসিক। রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসির মত। একে শিশু জগতে পৌঁছে দেওয়া তো বড়দের কর্তব্য! কি করা যায়, কি করা যায় ভাবতে ভাবতে আমাদের বাংলাদেশেই হলো এর বড়দের জন্য অনুবাদ। করলেন গৌরী ধর্মপাল। আর ছোটদের জন্য লেখা হলো এমন একটা বই যার সমতুল্য কিছু বাংলায় খুব কম আছে। নাম তার 'মালশ্রীর পঞ্চতন্ত্র'। লিখলেন একই মানুষ। যদি বড়দের আর ছোটদের বইদুটো পাশাপাশি রেখে পড়ো, কিছুতেই মানতে পারবে না বইদুটো একই লোকের লেখা!

বুঝলে, যে কারণে এ বইটা ইউনিক, সেটা হলো এটা ঠিক পঞ্চতন্ত্রের অনুবাদ নয়। লেখিকা বলেছেন এটি বিষ্ণুশর্মার বইয়ের মেয়ে। এটা একটা নতুন বই মূলের সঙ্গে যার যোগ ভেতরের ভাবের, যাকে স্পিরিট বলে। অসাধারণ কথক বিষ্ণুশর্মা কিন্তু ঐ যে বললুম তাঁর বিশ্ব কখনও কখনও ভয় ধরানো। অনেক সময়ই সেখানে চীটিং, লোকের ক্ষতিকরা, জালিয়াতি - এসব জিতে যায়। । লেখিকার ভাষায় 'বীভৎস রাজনীতি' র ছায়া সেখানে প্রকাণ্ড। কিন্তু, লেখিকা জয় করতে চান তোমাদের জ্যোৎস্না ধোয়া, রূপকথা শোনা মনের রাজ্য। তোমায় মনে রাখতে হবে, এ বই, ১৯৬১ সালে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ লাভ করে সন্দেশ পত্রিকায় যার আদর্শ হলো কোন রকম অমঙ্গল বোধ কাহিনীরাজ্যে রাজসিংহাসন পাবে না। লেখিকার নিজের মতও তাই। তিনি বিশ্বাস করেন বাস্তবে না হোক গল্পজগতে রাক্ষস, ডাইনি, দত্যি দানো সবসময়ই রাজপুত্তুরের কাছে হেরে যায়। শুভ পরাস্ত করে অশুভকে। এটাও আমাদের ঐতিহ্যের একটা অংশ। এই বই শেষ হয় চারবন্ধুর মিলন দৃশ্য দিয়ে। আকাশ, মাটি, জল, জঙ্গলের প্রতীক হয় কাক, ইঁদুর, কচ্ছপ আর হরিণ। একই প্রাণের আলোয় ঢাকা আলোময় বিশ্বের দিকে চেয়ে যেন " কিশোর পাঠক পাঠিকারা এবং প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে যে চিরকিশোর আছে, সে হাঁপ ছেড়ে বলতে পারে, 'যাক, সবাই দমনক নয়।'"। এই দমনককে তুমি পাবে একদম প্রথম গল্পে। একটা শেয়াল। ইভিল স্পিরিট বলতে যা বোঝায় দমনক তাই।

আর এই বইয়ের ভাষা! জাস্ট ওয়াও! লীলা মজুমদার বলেন, "এর ভাষা হ'ল খাঁটি বাংলা।.... বড় অন্তরঙ্গ ভাষা... হৃদয় থেকে বিগলিত ধারায় আপনি এরকম ভাষা বেরিয়ে আসে। অথচ এর তলায় তলায় সংস্কৃত মায়ের মধুর কন্ঠের প্রতিধ্বনিও শোনা যায়"। আমি তো আরো বেশি বলব। এতটুকু খোকাপনা না করে এ ভাষা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অননুকরণীয় ভাষার একমাত্র উত্তরসূরি। আমি আর কারো কাছে এ ভাষা আর শুনিনি। প্রেমেন্দ্র মিত্রও তাই মনে করেন।

একটু উদাহরণ শোন। লেখিকা তাঁর শুরুর কথায় কল্পনা করছেন নব্বই বছরের বিষ্ণুশর্মার কন্যে কিঞ্জল্ককিঙ্কিণীর পোষা ইঁদুর হিরণ্যক পঞ্চতন্ত্রের পুঁথি কেটে টুকরো করেছে। পণ্ডিত মশায়ের মাথায় হাত। তখন " বাবাকে মুষড়ে পড়তে দেখে কিঞ্জল্ককিঙ্কিণী বললে, বাবা আমার কিছু কিছু মনে আছে। ঠিক তোমার মত হবে না, তবে---

বেশ তো, বল না শুনি।

কিঞ্জল্ককিঙ্কিণী বললে। লিখলে। বেশ যত্ন করে গোটা গোটা অক্ষরে। কয়েকটা বানান ভুল হল অবশ্য। তা কী আর করা।

দিন যায়, দিন যায়। আবার একদিন কিঞ্জল্ককিঙ্কিণী এসে বললে, বাবা তোমার ইঁদুরের কাণ্ড দেখে যাও।

বিষ্ণুশর্মা দেখে তো অবাক। কোত্থেকে আটা পেলে কে জানে, সেই ছেঁড়া পুঁথিখানা আবার জুড়েছে। তার সঙ্গে কিছু আজেবাজেও জুড়ে ফেলেছে। ইঁদুর তো!

বিষ্ণুশর্মা হিরণ্যকের মাথা থাবড়ে বললেন, কী রে হঠাৎ সুবুদ্ধির উদয় হল যে?

ইঁদুর বললে, কিচ কিচ কিচ কিচ কিচ কিচ কিচ কিচ

তার মানে, আমার তো কাটাই স্বভাব। কিন্তু দিদির কথায় বড় লজ্জা পেয়েছি। তাই আবার জুড়ে দিলুম।

কালেনৈবাখুনা ছিন্নং কালেনৈব নবীকৃতম।
মহান গুরুর্বিষ্ণুশর্মা কাহং কিঞ্জল্ককিঙ্কিণী।। "


এই নবীকৃত পঞ্চতন্ত্রেরই নাম মালশ্রীর পঞ্চতন্ত্র। জুলাই ১৯৭৬ এ রূপা থেকে এর প্রথম সংস্করণ বার হয়। আর এরপর ৮২-৮৩ তে গৌরী ধর্মপাল মূল পঞ্চতন্ত্র অনুবাদ করেন নবপত্রের সংস্কৃত সাহিত্য সম্ভারের জন্য। এবং এই জন্য জানুয়ারি ১৯৮৫ তে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি কিছু পরির্তন করেন। বর্তমান শিশু সাহিত্য সংসদ এই সংস্করণের পাঠই অনুসরণ করে। ভাবা যায়! আগে ছোটদের জন্য লিখে লেখনীশুদ্ধির পর বড়দের জন্য লেখা! এ কেবল বাংলাতেই সম্ভব। আর বাংলা ভারতের অংশ। সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে!

বই কথা কও : ধূপছায়া মজুমদার




বই : স্টপার
রচনা : মতি নন্দী
প্রকাশক : আনন্দ পাবলিশার্স
দাম : ১২৫ টাকা

চারপাশে এখন বেশ ফুটবলের আবহাওয়া। তোমরাও সব নিশ্চয়ই ইস্কুল পড়াশোনার ফাঁকে হিসেব করে রাখছ কবে কখন কোন্ ম্যাচটা দেখবে, রাত জেগে ম্যাচ দেখার স্বপক্ষে যুক্তি সাজাতে গেলে বাবাকে কিভাবে দলে টানতে হবে, এইসব। আমি নিজে ফুটবলটা এক্কেবারে বুঝি না, তবুও বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে তোমাদের সবার এই উদ্দীপনা দেখে আমারও কেমন জানি মনে হচ্ছে ফুটবলজ্বরে গা সেঁকে নিই একটু। কি লেখা যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল শোভাবাজার স্পোর্টিং-এর স্টপার কমল গুহর কথা। বিষয় যখন ফুটবল, আর, লিখতে বসেছি বইয়ের কথা, কমল গুহ আর তাঁর টিমের লড়াইয়ের কথা না বলে থাকা যায়? তাহলে চলো, আজ 'স্টপার'-এর গল্পই হোক।

মতি নন্দী বাংলা কিশোরসাহিত্যের জগতে এক অনন্য ধারার কান্ডারী। খেলার জগতের নানা ওঠাপড়া, আলো-আঁধার, রেষারেষি, সবকিছুকে জয় করে কেমন করে জিতে যায় স্পোর্টসম্যানের স্পিরিট, মাঠের সেই স্পিরিট একজন মানুষকে রোজকার জীবনেও কেমন মাথা উঁচু করে বাঁচতে সাহায্য করে, হারিয়ে যেতে যেতেও কেমন করে সে ফিরে আসে জীবনে, লড়াইয়ের ময়দানে, তাঁর লেখা প্রতিটি গল্পে ছড়িয়েছিটিয়ে থেকেছে তারই কাহিনী।

সেরকমই একটা উপন্যাস 'স্টপার'। কমল গুহ নামে এক বর্ষীয়ান ফুটবলারের গল্প, যে একমাত্র খেলা ছাড়া আর কিচ্ছু পারে না, একসময় যে ছিল কলকাতা ময়দানের অন্যতম সেরা ফুটবলার, কালের নিয়মে সে চলে যেতে থাকে ভুলে যাওয়া লোকেদের দলে। প্রথমে বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন তাকে সংসারে জড়াতে বাধা দিয়েছিল, সংসারের অত্যন্ত দুর্দিনেও সে কাছের মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারেনি, পরে আস্তে আস্তে সংসারের প্রয়োজনেই তাকে খুঁজে নিতে হয়েছে রোজগারের নানা উপায়, ফুটবল সে ছাড়েনি, ফুটবলের হাত ধরেই তার রুটির জোগাড় হয়, কিন্তু প্রয়োজন আর স্বপ্ন, এই দুইয়ের মধ্যে 'ব্যালান্স' রাখতে গিয়ে জেরবার হতে হয়েছে তাকে। জীবনের নানা দিক থেকে আসা একটার পর একটা আক্রমণ সে সামলাতে থাকে ব্যালান্স করে করেই, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে তার মনে হতে থাকে, এই বুঝি শেষ, আর বুঝি আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখা গেল না, হেরে যেতে হবে জীবনযুদ্ধে।

শেষ পর্যন্ত একটা সুযোগ আসে স্টপার কমল গুহর কাছে, শোভাবাজার স্পোর্টিং-এর ছন্নছাড়া একটা টিম, কয়েকজন অনভিজ্ঞ নবীন খেলোয়াড়ের একটা টিমকে গড়ে নিয়ে কমল মাঠে নামে, বহুদিনের চেনা কিছু মানুষের সঙ্গে বোঝাপড়া করবে বলে, একেবারে অচেনা একজন কাছের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবে বলে, তার ভেতরের আগুন যে সবটুকু নিভে যায়নি এখনও, তা নিজের কাছেও প্রমাণ করবে বলে।
কাদের সঙ্গে বোঝাপড়া বাকি কমলের? কে সেই চেনা মানুষ যার সঙ্গে এক বাড়িতে থেকেও পরিচিত হতে হয় মাঠে এসে? কমল কি পেরেছিল নিজেকে প্রমাণ করতে? প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে পড়তে হবে 'স্টপার'।

তোমরা যারা ফুটবল খেলো, খেলাটাকে ভালোবাসো, উপন্যাসটা পড়তে বসলে তাদের মনে হবে, মাঠে পৌঁছে গেছ, বল নিয়ে কমল গুহর টিমের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তোমরাও নেমে পড়েছ খেলাটাকে জেতাবে বলে, এতটাই প্রাঞ্জল বর্ণনা মাঠে কাটতে থাকা প্রতিটি মুহূর্তের। আমি কিচ্ছু বুঝি না, এমনকি মাঠে থাকা খেলোয়াড়দের বিভিন্ন পজিশনগুলোর নাম অব্দি জানি না, তবুও উপন্যাসের প্রতিটি বাক্য আমাকেও কেমন যেন ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায়, যখন কমল গুহ তাঁর চলার রাস্তায় কোথাও এতটুকু আলো দেখতে পাচ্ছেন না, একটা নড়বড়ে টিমকে নিয়ে লড়ছেন আর হেরে চলেছেন একটার পর একটা ম্যাচ, তখন তাঁর সঙ্গেই হতাশায় ডুবতে থাকি আমিও, মনে হয় বুঝি কমল নন, হেরে যাচ্ছি আমিই, আবার যেই কোনও একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখা যায়, অমনি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসে আশায় বুক বাঁধি, ভাবি এইবারে ঠিক গোল হবেই, কমল লক্ষ্যভেদ করবেনই। এই যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস একটা উত্তেজনা, এই জন্যই বারবার পড়তে হয় 'স্টপার', বারবার পড়তে হয় সাহিত্যিক মতি নন্দীর ক্রীড়াকেন্দ্রিক প্রতিটি উপন্যাস, যাদের পাতায় পাতায় মিশে থাকা থ্রিলের পরিমাণ কোনও বেস্টসেলার থ্রিলারের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।

বন্ধুরা, গল্পের বইয়ের 'চাইই চাই' লিস্টে আজকেই তুলে রাখো নামটা।

বই হিসেবে 'স্টপার' এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৪ এর জুলাইয়ে। সেই বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছিলেন সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় (তথ্যসূত্র : দশটি কিশোর উপন্যাস : মতি নন্দী)। আমার সংগ্রহে এই বইটি নেই, তবে আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত 'দশটি কিশোর উপন্যাস' সঙ্কলনে আরও ন'খানা অসামান্য উপন্যাসের সঙ্গে এই 'স্টপার'ও সঙ্কলিত হয়েছে। সঙ্কলনের অন্যান্য উপন্যাসগুলো নিয়েও দু'চার কথা বলার ইচ্ছে রইলো, অন্য কোনওদিন।

বন্ধুরা, সংগ্রহ করতে পারো বইটা, এক অন্য জগতের সন্ধান পাবে, একথা নিশ্চিত করে বলতে পারি।