পিকচার পোস্টকার্ড



কেমন আছো ছোট্ট বন্ধুরা? লাল নীল সোয়েটার আর মাফলারের ফাঁক গলে শীতের হিমেল হাওয়ার সাথে লুকোচুরি কেমন লাগছে? চুপিচুপি একটা রহস্য ফাঁস করি? ছাদে বা ঝুলবারান্দায় দুপুরের নরম রোদে পিঠ ডুবিয়ে বসে অঙ্ক কষতে ছবি আঁকতে আর গপ্পের বই পড়তে কিন্তু ভারি মজা লাগে।

এবার বলো দেখি শীতের কোন খাবারটা তোমাদের সবচেয়ে প্রিয়? পিঠে পাটিসাপটা নাকি কেক? আমাদের অবিশ্যি সবগুলোই ভালো লাগে। আর সবথেকে বেশি কী ভালো লাগে জানো? চড়ুইভাতির খিচুড়ি, বাঁধাকপির তরকারি আর চাটনি। হি হি হি!

কী বললে? তোমরা এই বছর এখনও চড়ুইভাতি করোনি? সেকী! আর একদম দেরি নয়। শিগগির বাড়ির বড়দের রাজি করিয়ে একটা সুন্দর জায়গায় গিয়ে পিকনিক করে চলে এসো দেখি। আর তা যদি না হয় তবে ক্ষুদে বন্ধুরা মিলেই বাড়ির ছাদে জমিয়ে করে ফেলো চড়ুইভাতি। তবে হ্যাঁ যেখানেই হোক না কেন, পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে ভুলো না যেন। নোংরা ময়লা সব যথাস্থানে ফেলো, কেমন?

সান্টা ক্লজের থেকে অনেক উপহার নিশ্চয়ই পাওয়া হয়ে গেছে? কিছু উপহার তোমরাও তাদের দিও যাদের উপহার কেনা হয়ে ওঠেনি। ভাগ করে নিলে আনন্দ দুইগুণ হয়ে যায়, তাই না ছোট্ট বন্ধুরা? ঠিক সেই কারণেই আমরাও এসেছি আমাদের গল্পের ঝুলি তোমাদের সাথে ভাগ করে নিতে। শীতের হইহুল্লোড়ের সাথে সাথে কিশলয়ের ডালিতে সাজানো গল্প-ছড়া-ধাঁধা-আঁকিবুকি-ক্যুইজের ভাণ্ডারে উঁকি দিতে ভুলো না যেন।

আজ এটুকুই... সক্কলে ভালো থেকো, ভালো রেখো.


প্রচ্ছদশিল্পী : স্বর্ণদ্বীপ চৌধুরী

গল্পের ঝুলি : শীতের দেশের গল্প : অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়




শীত বড় আরামের, বড় আদরের। এই সময়ে মন ভাল করে দেওয়া কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব দেখা যায় আকাশে বাতাসে। শীত এসে গেল তো - চলো চলি চড়ুইভাতিতে। নিদেনপক্ষে মিঠে রোদে পিঠ মেলে ধরে খাও বাদামভাজা। কিম্বা নেমে পড়ো মাঠে ব্যাট বল নিয়ে।

সারাবছর সবাই অপেক্ষা করে থাকে, শীত পড়লে বেড়াতে যাবে ট্রেনে চড়ে দার্জিলিং, কালিম্পং বা আর একটু দূরে সিমলা বা কুলু-

মানালি। শীত নিয়ে আমাদের এই যে বাড়াবাড়ি, সে কিন্তু আমাদের দেশ গ্রীষ্মপ্রধান বলে। বড় বিচিত্র আমাদের এই দেশ। গ্রীষ্মপ্রধান হলেও ভারতের বেশ কিছু অঞ্চল শীতকালে তুষারাবৃত হয়ে যায়। যেমন কাশ্মীর বা হিমাচল প্রদেশ। সেখানে আছে হিমালয় পাহাড়। আবার সমুদ্রের কাছাকাছি শীতের তীব্রতা অতটা থাকে না। আমরা যারা সমতলে বা সমুদ্রের কাছাকাছি থাকি, তারা বছরের শীতের দুই মাসের আগমনের অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে থাকি।

কিন্তু বিশ্বের সর্বত্র তো আর ভারতের মতো নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া নেই! যেমন পৃথিবীর উত্তর আর দক্ষিণমেরুর কাছাকাছি অঞ্চল বছরের বেশির ভাগ সময় বরফের পুরু চাদরে ঢাকা থাকে। যারা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে বাস করে তাদের পক্ষে মেরু অঞ্চলের শীতের প্রবলতা ধারণায় আনা একটু অসুবিধের। সেখানে শীতকালে আবহাওয়ার তাপমাত্রা শূন্যাঙ্কের অনেক নিচে নেমে যায়। প্রবল তুষারপাতের সাথে পাল্লা দিয়ে চলে হাওয়ার দাপট। মেরু অঞ্চলে বছরের ছ'মাস থাকে শীত আর বাকি ছ'মাস গ্রীষ্ম। গ্রীষ্মকালেও তাপমাত্রা শূন্যের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে। আবার শীতকাল মানেই এখানে সারাদিন থাকে অন্ধকার। তাই মানুষ বাড়ি ছেড়ে বেরোতেও পারে না। উত্তরমেরুর বাসিন্দারা শীতকালের জন্য সিল মাছ, শ্বেত ভল্লুক, সিন্ধুঘোটক শিকার করে তাদের মাংস জমিয়ে রাখে।

আর শীতকালে কাজ না থাকলে মানুষগুলো কী করে? অবশ্যই গল্পগুজব করে সময় কাটায়। তখন তো আর ওদের দেশের বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার বালাই থাকে না। বেচারারা যে চড়ুইভাতি করতে যাবে, তারই বা উপায় কী! চারিদিক বরফের কয়েক মিটার পুরু আস্তরণে ঢাকা পড়ে যায়। সেই প্রচণ্ড শীতকালটা মেরু অঞ্চলের মানুষদের পক্ষে খুব কষ্টের। সিল মাছ আর ভল্লুকের চামড়া দিয়ে জ্যাকেট বানিয়ে তারা ঠাণ্ডা থেকে নিজেদের বাঁচায়।

বরফে ঢাকা পড়ে যাওয়া এইসব এলাকায় মানুষের মুখে মুখে অনেক সুন্দর সুন্দর গল্প ছড়িয়ে আছে। শতকের পর শতক ধরে বরফাবৃত অঞ্চলে দাদু দিদা, বাবা মায়েরা মুখে মুখে তাদের বাচ্চাদের গল্প শুনিয়ে হয়তো বাচ্চাদের ভুলিয়ে রাখে বা ঘুম পাড়ায়। আমেরিকার আলাস্কায় উপজাতিদের মধ্যে প্রচলিত এমনি এক গল্প আজ তোমাদের শোনাব।


***

এই জগতে আপন বলতে জো-এর কেউ ছিল না, সে ছিল এক অনাথ বালক। তার বাবা-মা, ভাই বোন ছিল না বলে তার নিজের কোনও ঘরও ছিল না। পাহাড়ের নিচে এক গ্রামে ছোট্ট জো বেঁচে থাকার জন্য এর ওর বাড়ি চেয়েচিন্তে, খাবার জুটিয়ে, কোনোরকমে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে রাখত। গ্রামের লোকেরা তাকে থাকতে দিয়েছিল ফসলের এক গুদামে।

​খাবারদাবার জোকে কেউ এমনি এমনি দিত না। হাতের কাছে ওকে দেখতে পেলেই খুব একচোট খাটিয়ে নিত। কেউ বলত, ‘নদী থেকে চার বালতি জল তুলে আন দেখি।’ কেউ বলত, ‘এই জো, জঙ্গল থেকে ক’টা কাঠ কেটে নিয়ে আয় না!’ আবার কেউ বলত, ‘যা এই ছাগলগুলো চরিয়ে আন পাহাড়ের নিচে ঘাসের জমিতে। ফিরে এসে সন্ধেবেলা দুটো রুটি আর মাংসের ঝোল নিয়ে যাস।‘

​জো তার খিদের জ্বালা ভুলে, দুটো মাংসের টুকরো সমেত একবাটি ঝোলের লোভে পাহাড়ের নিচে ঘাসের বিস্তীর্ণ সবুজ জমিতে ছাগলের পাল নিয়ে ছুটত। সকালের খাবার পেটের মধ্যে হজম হয়ে যেতে বেশি সময় লাগত না। ছাগলের পাল যখন ঘাস খেতে ব্যস্ত থাকত, তখন জো-এর পেট খিদের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলত - ঠিক যেমন দূরে পাহাড়ের গায়ে জঙ্গলে আগুন লেগে যায় হঠাৎ হঠাৎ।

​পেটের খিদে বড় বালাই! তাই জঙ্গলের বুনো ফল খেয়ে, ঝর্ণার জলে পেট ভরাত জো। ছাগলের পাল ফিরিয়ে গ্রামে নিয়ে এলে মালিক তাকে দুটোর বদলে একটা রুটি ছুঁড়ে দিত। মাংসের টুকরোর জায়গায় হাড় জুটত কপালে। সেই সব নিয়ে অবশ্য জো-এর কোনও অভিযোগ ছিল না, কারণ সে ছিল এক অত্যন্ত সরল মনের মানুষ। আর দুঃখ হলে কাকেই বা সে সেকথা সে জানাতে পারত? তার নিজের লোক কেউ ছিল না যে! যা পেত, তাই খেয়ে পেট ভরিয়ে, ফসলের গুদামঘরে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ত জো।

​এই ভাবেই গ্রামের মানুষের ফাইফরমাশ খেটে দিন গুজরান হচ্ছিল ছোট্ট জো-এর। দুটো খাবার জুটিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাই ছিল তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। একদিন ফসলের গুদামঘরে গ্রামের একদল চাষি ফসল জমা করে বসে বসে গল্প গুজব করছিল। ঠিক সেই সময়ে শুরু হল প্রবল ঝড়। ঝড়ের সাথে বৃষ্টি। বৃষ্টির সাথে সাথে বরফ পড়তে শুরু করল। তীব্র শীতে ঘরের মধ্যে জড়ো হয়ে ওঠা মানুষেরা বাড়ি ফিরতে না পেরে ঘরের মধ্যে খড় জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব চালাতে লাগল। ছোট্ট জো ঘরের এককোণে ভল্লুকের চামড়া দিয়ে তৈরি ছেঁড়া একটা কম্বল জড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল।

​চাষির দলের মধ্যে মুরুব্বি গোছের লোকটা জোকে ডেকে বলল, “যা, বাইরে গিয়ে দেখে আয় বরফ পড়া কমে গেছে কিনা।”

​জবরদস্ত ঠাণ্ডায় বিপর্যস্ত জো বাইরে যাওয়ার জন্য গড়িমসি করছে দেখে একজন লাঠি দিয়ে জোকে খুঁচিয়ে দেয়। তাড়া খাওয়া পশুর মতো দরজা খুলে বাইরে আসে জো। ঘুরে এসে জো বলে, “বৃষ্টি একটু কমে গেছে। তবে হাওয়া বইছে শনশন করে।”

​এইভাবেই আগুনের তাপ নিতে নিতে লোকগুলো নিজেদের মধ্যে চাষবাস আর লাভ-ক্ষতি নিয়ে গল্প করতে থাকে, আর মাঝে মধ্যেই জোকে বাইরে পাঠাতে থাকে আবহাওয়ার খবর নিতে। ক্লান্ত শরীরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিজের ঘুম বিসর্জন দিয়ে জো এক একবার কম্বলের তলায় নিজেকে মারাত্মক ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে, আর এক একবার লোকগুলোর হুকুমে বাইরে গিয়ে দেখতে থাকে বরফ পড়া কমেছে কি না। এইভাবেই রাত গভীর হতে থাকে। ঘুমন্ত জোকে আবার একটা ষণ্ডা লোক খুঁচিয়ে তুলে বাইরে পাঠায়। ফিরে এসে উত্তেজিত গলায় জো বলে, “পাহাড়ের দিকে একটা লাল আগুনের গোলা দেখতে পেলাম। সেটা আবার এদিকেই এগিয়ে আসছে দেখছি।”

​লোকগুলো হো হো করে হেসে ওঠে। দলপতি বলে, “ঠাণ্ডায় তোর বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়েছে। আবার গিয়ে দেখ দেখি, বোধহয় একটা বিশাল তিমিমাছ পাহাড় থেকে ছুটে আসছে তোকে গিলে ফেলবে বলে।”

​লোকটার রসিকতা ছোট্ট জো বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আর আগুনের শিখার সামনে চাষির দল দুলে দুলে হাসতে থাকে। ঠিক তখনি বাইরের দরজার ফাঁক দিয়ে লাল আলো দেখা যায়। গুদামের ছাতের ফুটো দিয়ে সেই আলোর ফুলকি নাচতে নাচতে ঘরের ভিতর ধীরে ধীরে নামতে থাকে। লোকগুলো নিজেদের মধ্যে কথা থামিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে ভয়ে ঘরের এক কোণায় জড়ো হয়ে যায়। আলোর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে মানুষের এক কঙ্কাল। ঘরের দরজা সজোরে খুলে যায়। ঝড়ো হাওয়াও ভয়ে ঘরের চৌকাঠ পেরতে পারে না। কঙ্কালের ইশারায় দুষ্টু লোকগুলো দুর্বার টানে তার পিছু নেয়। কঙ্কাল নাচতে নাচতে চলে পাহাড়ের দিকে। লোকগুলোও সে টেনে নিয়ে যায়। চিৎকার করতে থাকা লোকগুলো একসময়ে পাহাড়ের দিকে হারিয়ে যায়।

​পরদিন সকালে লোকগুলোর মৃতদেহ পাওয়া যায় পাহাড়ের নিচে ঘাসের জমিতে। গ্রামবাসীরা উদ্ধার করে জো-এর বাবার কবর, বহুদিন আগে তাকে মেরে চাষিরা মাটির তলায় সেখানে পুঁতে রেখেছিল।

(সমাপ্ত )

অলঙ্করণ : স্বর্ণদ্বীপ চৌধুরী

গল্পের ঝুলি : ইয়োনাগুনির বন্ধু : দেবদত্তা ব‍্যানার্জী


ভীষণ জোরে বাজ পড়ার শব্দে কেঁপে ওঠে মিশুকা, একবার মনে হয় ওদের ঘরটাই বুঝি ভেঙ্গে পড়ল। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে বাইরে তাকায়, প্রবল ঝড় বৃষ্টিতে চারপাশ লন্ডভন্ড, বাইরের গাছগুলো যেন ভেঙ্গে পড়বে এখনি। আবার আকাশের বুক চিরে এক রুপালি ঝিলিক, কে যেন কেটে দিল আকাশটাকে।
অকামা মাছ ধরার ছোট নৌকাটা নিয়ে দু'দিন আগে সমুদ্রে গেছে। তারপর আজ বিকেল থেকে এমন দুর্যোগ। মিশুকার বড্ড ভয় করে। অকামা ছাড়া ওর যে আর কেউ নেই।


রিইউকি দ্বীপে ছিল ওদের ছোট্ট ছবির মত বাড়ি। বাবা ছিল ডুবুরি, মা একটা রেস্টুরেন্ট চালাত। আর দাদু ওদের নিয়ে মাছ ধরতে বের হত মাঝে মাঝে। একবার প্রবল ভূমিকম্পের পর সুনামিতে ওদের ছবির মত সুন্দর গ্ৰাম ভেসে গেল। বাবা মা কোথায় হারিয়ে গেল। গ্ৰামের যে কয়জন বেঁচে ছিল শহরে চলে গেল। আর দাদুর হাত ধরে ওরা দুই ভাই বোন দ্বীপের এধারে চলে এল। শহরে ওদের কেউ ছিল না যার কাছে যাবে। তারপর দাদু মাছ ধরেই সংসার চালাত। গতবছর দাদুও চলে গেল এক ঝড়ের রাতে। তারপর থেকে ওর দাদা অকামা একাই যায় মাছ ধরতে। মিশুকার প্রথম প্রথম একা একা ভয় করত। দ্বীপের এদিকটা বড্ড ফাঁকা। তেমন লোকজন নেই। অকামা মাছ ধরে পাশের একটা দ্বীপের বাজারে বিক্রি করে প্রয়োজনীয় বাজার করে ফেরে। মিশুকা ওর পথ চেয়ে বসে থাকে। পুরো দ্বীপটায় লোক বসতি বড্ড কম। স্কুল নেই বলে ওরা আর স্কুলে যায় না। মাঝে মাঝে কিছু টুরিস্ট আসে ওদের গ্ৰামে ঘুরতে। ইয়োনাগুনি দ্বীপটা পাশেই। সেখানে যায় টুরিস্টরা। অকামা তখন গাইডের কাজ করে।

মিশুকা অকামার কাছে শুনেছে ইয়োনাগুনি দ্বীপের গল্প। রিইউকি দ্বীপের দক্ষিণে সমুদ্রের নিচে এ এক আজব পাথুরে শহর, দাদা গল্প বলেছিল। সেখানে নাকি পাথুরে পিরামিড, বড় থামওয়ালা বড় দেওয়াল, মানুষের খোদিত মুখ এসব রয়েছে। অনেকেই বলে বহুবছর আগে ঐ অঞ্চল ছিল পৃথিবীর ওপরে। কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে সমুদ্রের নিচে হারিয়ে গেছে ঐ ইয়োনাগুনি। 

পৃথিবীর সেরা সেরা ডুবুরিরা এই জায়গাটিতে যেতে ভয় পান। আপাতশান্ত জলের নিচে প্রচন্ড ক্ষ্যাপাটে স্রোতের কারণে কেউ আসতে চায় না । ওখানে সমুদ্রের তলায় আছে এক পিরামিড আকৃতির বিশালকায় পাথর। যেটি উচ্চতায় প্রায় ৫০০ ফুট এবং ১৩০ ফুট চওড়া। হ্যামার হেড হাঙ্গরেরা অবিরাম ঘোরাফেরা করে রহস্যময় পাথরটিকে ঘিরে। একটা অতিকায় পাথরের ব্লক কেটে কোনও এক সময়ে তৈরি করা হয়েছিল এই সামুদ্রিক পিরামিড। কিন্তু কারা তৈরি করেছিল, কেন এবং কার জন্য তৈরি করেছিল এই অবিশ্বাস্য পিরামিড সেই রহস্যের কিনারা আজও হয়নি। অনেকেই মনে করে ঐ পিরামিডের ভেতর রয়েছে লুকোনো ধনসম্পদ। কিন্তু প্রবল স্রোত ও হাঙরের ভয় উপেক্ষা করে যারা ঐ অঞ্চলে গেছে ফিরে আসেনি। অকামা কয়েকবার গেছে ওদিকে। ওদের বাবা কাওকুরা কয়েকবার নাকি গিয়েছিল ঐ অঞ্চলে। মিশুকা ছোট ছিল, তাই বাবার বলা গল্পগুলো সব মনে নেই। কিন্তু অকামা বলেছে ঐ ইয়োনাগুনিতে বসবাস করে কিছু অদ্ভুত প্রাণী। মারমেডের মত আধা মানুষ আধা মাছ রয়েছে ঐ অঞ্চলে। দাদু বলত ঐ ইয়োনাগুনি অপদেবতাদের জায়গা। তাই ওদিকে ওদের যেতে দিত না। পাহাড়ের মাথায় ওদের ছোট্ট কুঁড়েঘর থেকে দক্ষিণে তাকালে যে ডুবোপাহাড় দেখা যায় তার থেকে কয়েক ক্রোশ গেলেই ইয়োনাগুনি। মিশুকা যদিও যায়নি ওদিকে তবু কী এক অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করে ও ঐ দ্বীপের প্রতি। 

সকালে দুর্যোগ কেটে নতুন সূর্য উঠতেই মিশুকা ছুটে যায় সমুদ্রের তীরে। যতদূর চোখ যায় চেয়ে দেখে, অকামার আশায় বসে থাকে একটা পাথরে। সামুদ্রিক পাখি ও চিলগুলো ডুবোপাহাড়টার উপর ভিড় করেছে। নিশ্চয়ই কোনো জলজ প্রাণীর দেহ রয়েছে ওধারে। মনটা কেমন কু ডাক ডাকে। কিছু মরে আটকে আছে, তাই ওরা গোল হয়ে উড়ছে। পাড় থেকে সাঁতরে ওই জায়গায় বহুবার গেছে মিশুকা। হঠাৎ মনে হয় একবার গিয়ে দেখবে !!

ডুবোপাহাড়ের যে অংশটা জেগে রয়েছে তাতে অসংখ‍্য ছোট বড় গুহা, আর আগাছা, আর লতাপাতা ভর্তি। জোয়ারের জল ঢুকে রয়েছে গুহার ভেতরে। অনেক সময় হাঙর এসে আটকে থাকে। একটানা অনেকটা সাঁতরে এসে মিশুকা একটা বড় পাথরে বসে বড় করে শ্বাস নেয়। একটা শুকনো গাছের ডাল খুঁজে নিয়ে ও পাথরের খাঁঁজে পা রেখে ওধারে যায়। যা ভেবেছিল তাই। একটা কিছু আটকে রয়েছে পাথরের খাঁজে। কিন্তু সামনে গিয়ে অবাক
 হয়ে তাকিয়ে থাকে মিশুকা। মানুষ বা মারমেড নয়, এ এক আজব প্রাণী! মুখটা মানুষের বাচ্চার মত হলেও সারা গায়ে আঁশের মত কী যেন, আর হাত পা গুলো কেমন অদ্ভুত! আর কপালের মাঝখানে একটা নীলচে আলো জ্বলছে দপদপ করে। তবে কি এটা কোনো রোবট? আগে যখন মিশুকা স্কুলে যেত ওর বিজ্ঞান বইতে রোবটের ছবি ছিল। কিন্তু এ তো তেমন নয়! আর শ্বাস নিচ্ছে প্রাণীটা। পাখি গুলো ওর উপরেই উড়ছে কিন্তু নেমে  আসছে না। 

মিশুকা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। প্রাণীটাকে বাঁচাতে হবে। ওর বয়স মনে হয় কম, মুখটা শিশুসুলভ। ওকে টেনে পাশের একটা গুহায় নিয়ে আসে মিশুকা। দাদু ওদের বিভিন্ন লতাপাতা চিনিয়ে দিয়েছিল। পাথরের খাঁজে এক ধরনের ছোট পাত রস কেটে গেলে লাগালে খুব উপকারী, রক্ত বন্ধ হয়। আবার খাওয়ালে দ্রুত জ্ঞান ফেরে। ডুবোপাহাড়ের উত্তরে এমন কিছু লতা গাছ আছে মিশুকা জানে। দ্রুত সেগুলো খুঁজে আনে সে। বেশ কিছুটা পাতার রস বার করে খাইয়ে দেয় প্রাণীটাকে। তারপর একটু দূরে বসে লক্ষ‍্য রাখে। সারাদিন খাওয়াদাওয়া নেই, অকামার কথাও ভুলে গিয়ে এই আজব প্রাণীর সেবায় ব‍্যস্ত থাকে মিশুকা। দুপুরের পর তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসে। বিকেলে ও যখন বাড়ি ফিরে আসবে কিনা ভাবছিল বহু দূরে কালো বিন্দুটা নজরে পড়ে। একটা বড় পাথরে উঠে দাঁড়িয়ে মিশুকা বোঝার চেষ্টা করে ওটা কী। একটু কাছে আসতেই তিন রঙের পালটা দেখে অকামার নৌকাটা ও চিনতে পারে। আনন্দে গলার স্কার্ফটা খুলে ও নাড়তে থাকে। একটু পরেই অকামার নৌকাটা দেখা যায়। একটা পাথরে নৌকা বেঁধে লাফিয়ে নামে অকামা। বলে, ''এখানে কী করছিস তুই? বলেছি না এদিকে একা আসবি না। তোর কিছু হয়ে গেলে ...''
''আমি ঠিক আছি। আয় তোকে একটা জিনিস দেখাই।'' 
অকামার কথার মাঝেই ওর হাত ধরে টেনে ওকে গুহার কাছে নিয়ে যায় মিশুকা।
প্রাণীটা দেখে অবাক হয় অকামা। বলে, ''একে কোথায় পেলি?''
''এই পাথরের খাঁজে আটকে ছিল। এটা কী রে?''
''ঠিক জানি না, তবে এদের আমি দু একবার দেখেছি ওদিকে। অন্ধকার নামার আগে ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। জোয়ার আসলে এই গুহা ডুবে যাবে। জোয়ারের জল আসছে। তুই একটু ধর ওদিকটা।''

দুই ভাই বোন মিলে ওকে বাড়ি নিয়ে আসে তাড়াতাড়ি। প্রাণীটা নড়াচড়া করলেও চোখ মেলেনি। রাতে অকামা মিশুকাকে বলে -''ওকে ছেড়ে এলে হাঙর বা তিমির পেটে যেত। কিন্তু নিয়ে এসেও কিছুই বুঝতে পারছি না। বাঁচবে তো?''

চুপ করে মিশুকা অতিথিকে ওষুধ খাওয়ায়। সারা রাত দু'জন পালা করে জেগে থাকে।
ভোররাতে চোখ খোলে ওদের অতিথি। ঘষটে ঘষটে উঠে বসে। তারপর অদ্ভুতভাবে ওদের দিকে তাকায়। কী যেন বলে যা ওরা বোঝেই না। অকামা বলে -''ভয় পেও না। আমরা বন্ধু, তোমার ক্ষতি হবে না। ''

প্রাণীটা সমুদ্র দেখিয়ে আবার কিছু বলে। 

''ও সমুদ্রে ফিরতে চাইছে। চল , ওকে দিয়ে আসি।''
মিশুকার কথায় প্রাণীটা মাথা নাড়ে। ওরা উঠে দাঁড়ায় আর লক্ষ‍্য করে পা থাকলেও হাঁটতে জানে না ঐ প্রাণী। মিশুকা ওর নাম দিয়েছে মারিও। বলে -''মারিও হাঁঁটতে পারে না। ও জলে থাকে। ওকে তুলে নিয়ে যেতে হবে।"

দুই ভাই বোন ওকে নিয়ে নেমে আসে সমুদ্রের ধারে। ভোরের জোয়ারের জল কমতে শুরু করেছে, ওরা মারিওকে জলের ধারে নিয়ে যেতেই ও লাফিয়ে জলে নেমে যায়। তারপর সাঁতার কেটে এগিয়ে যায় ইয়োনাগুনির দিকে। একটু পরেই ওদিকে ভেসে ওঠে মারিও। ওদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ে। তারপর ডুব দেয় জলের গভীরে। 

কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে ফিরে আসছিল ওরা। হঠাৎ কেউ বলে -''ইয়ামেরু, ইয়ামেরু" (দয়া করে দাঁড়াও)

দু জনেই থেমে পিছন ঘোরে। মারিওর সাথে দু'জন ভেসে উঠেছে জলের উপর। এদেরও কপালের মাঝে একটা নীলচে আলো দপদপ করছে। অকামা আর মিশুকা অবাক হয় ভীষণ। এরা পুরুষ, গলার স্বর তাই বলছে। জাপানী ভাষাও জানে। প্রবল কৌতুহল নিয়ে দু ভাই বোন পারে নেমে আসে।
''আমাদের সন্তানকে রক্ষা করার জন‍্য ধন‍্যবাদ। তোমাদের বন্ধু মনে করি। '' শুদ্ধ জাপানী ভাষায় প্রথম জন বলে।
''ওস .... কিন্তু .... আপনারা...'' কী বলবে কথা হারিয়ে ফেলে অকামা।
''আমরা তোমাদের মতোই এই পৃথিবীর জীব। বহু পুরানো আমাদের সভ‍্যতা। তবে এ মুহূর্তে খুব অল্প সংখ‍্য‍ক টিকে রয়েছি পৃথিবীর বুকে।"

মিশুকা আর অকামা অবাক হতেও ভুলে গিয়েছিল। মিশুকা বলে -''মারমেড...!!''
''না ঠিক মারমেড নয়। পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের জন্ম জলেই। পরে জল থেকে কিছু প্রাণী স্থলে উঠে গেছিল। বিবর্তনের ফলে এসেছিল নানারকম বদল। আর জলের নিচেই থেকে গেছিলাম আমরা। যদিও আমরা বাতাসেও নিশ্বাস নিতে পারি। আমাদের সভ‍্যতা বিস্তার লাভ করে জলের নিচেই। হাজার হাজার বছর ধরে আমরা রয়েছি সমুদ্রের গভীরে। তবে ইদানিং মানুষদের জন‍্য আমরা ধ্বংস হচ্ছি দলে দলে। সমুদ্র দূষণ, সমুদ্রে বাহনের অত‍্যাচার, মানুষের অতিরিক্ত কৌতূহল আমাদের হয়তো আর টিকতে দেবে না। এই অঞ্চলে আমরা আর সাত জন রয়েছি। সারা পৃথিবীতে একশো জন মত। তার মধ‍্যে এগারোটা শিশু। তাই আমাদের সন্তানকে বাঁচিয়ে তোমরা আমাদের রক্ষা করেছো। "

''ইয়োনাগুনি মনুমেন্ট কি তোমাদের সৃষ্টি ? ওখানেই থাকো তোমরা ?'' অকামা জিজ্ঞেস করে।
''দশ হাজার বছর আগে ইয়োনাগুনি ছিল আমাদের রাজধানী শহর। তখন পৃথিবীর উপর এত ঘন জনবসতি ছিল না। মানুষ এত উন্নত ছিল না। অথচ আমরা সে সময় অনেক উন্নত ছিলাম। কিন্তু লোভ লালসা আমাদের ভেতরেও ছিল। তাতেই সভ‍্যতা ধ্বংস হয়েছিল ধীরে ধীরে। আমরা যখন তা বুঝেছিলাম ততক্ষণে বহু দেরি হয়ে গেছে। আমাদের মধ‍্যেও কিছু গোষ্ট্ঠী স্থলে চলে গেছিল একসময়। বিবর্তনের নিয়ম মেনে তারাও সভ‍্য হয়েছে একসময়। আর অল্প কিছু এখন রয়েছি গভীর সমুদ্রে। আমাদের পাহারা দেয় হাঙর তিমি ও অন‍্যান‍্য জলজ প্রাণীরা। তবে তোমাদের ভাষাটা আমরাও জানি।''


মিশুকার মনে হয় ও স্বপ্ন দেখছে। একটা জলের জীব ওদের ভাষায় কথা বলছে। 


''আমাদের বিজ্ঞান প্রযুক্তি কিছু কম উন্নত ছিল না, তবুও আমরা আস্তে আস্তে ধ্বংস হচ্ছি। মানুষ যদি সাবধান না হয় এই সভ‍্যতাও শেষ হয়ে যাবে।
তবে তোমরা ভালো এবং সৎ। তাই তোমাদের উপহার দিতে চাই কিছু।'' 


দ্বিতীয় জন একটা বড় ঝিনুক ওদের দিকে বাড়িয়ে দেয়। অকামা হাতে নিয়ে ঝিনুকটা খোলে, বড় বড় মুক্তার দানা রয়েছে ভেতরে, কোনটা সবজে, কোনটা গোলাপি আবার কোনটা আকাশী। নানা রঙের মুক্তা।
অকামা একবার হাত বুলিয়ে মিষ্টি হেসে ঝিনুকটা ফেরত দেয় ওদের। বলে -''আমি এটা নিতে পারবো না। এ যদি আমি শহরে বিক্রি করি হাজার হাজার লোক এই সমুদ্রে ছুটে আসবে এমন রঙিন মুক্তার সন্ধানে। তোমরা বিপন্ন হবে। এর চেয়ে তোমাদের বন্ধুত্ব আমার কাছে দামি। " 


মিশুকাও দাদাকে সমর্থন করে। 


অকামা বলে -''আমি আর আমার বোন ঐ টিলার উপর থাকি। অল্প মাছ ধরেই দিন কাটে। চাহিদা বেশি না আমাদের। ''
প্রাণী দুজন খুশি হয়। প্রথম জন বলে -''সমুদ্রে বিপদে পড়লে আমাদের ডেকো। আমরাও সাহায‍্য করবো। আমরা ট‍েলিপ্যাথি জানি। যখন আমাদের কথা ভাববে আমরা টের পাবো।''


ঝুপ করে জলে ডুব দেয় অচেনা বন্ধুরা। বেশ কিছুটা দূরে একবার ভেসে উঠে ওদের হাত নাড়ে। 


দুই ভাই বোন খুশি মনে বাড়ি ফেরে। ওরা এই দ্বীপে আর একা নয়। ভালো বন্ধু পেয়ে ওরা খুব খুশি।


(সমাপ্ত) 

অলঙ্করণ : আবির

গল্পের ঝুলি : কুঁজোচুড়ো পাহাড়ের পিকনিক : প্রদীপ কুমার বিশ্বাস




ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে, আমাদের পরিবার-পরিজনেরা চলে আসতেন লোহাপাহাড়ে, আমাদের খনিজ-অনুসন্ধানী বেসক্যাম্পে। প্রতি বছরই এঁদের আসার পর আমাদের ক্যাম্পের বাৎসরিক পিকনিক হয়। সাধারণতঃ এইসব জায়গাগুলো হয় বেস ক্যাম্পের কাছাকাছি জায়গায় কোনও সুস্বাদু জলের ঝোরার পাশে বা পাহাড়ি নদীর কোনো অজানা হাঁসুলিবাঁকে। কিন্তু একবার আমাদের পিকনিক হল সবদিক দিয়ে অন্যরকমের যা পরিস্থিতির কারণে একদিনের জায়গায় তিনদিন ধরে হয়েছিল। সেই পিকনিকে একদিকে যেমন প্রচুর আনন্দ আর রকমারি খাওয়া হয়েছিল, সেই সঙ্গে হঠাৎ আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে পড়ে এমন সব অভিজ্ঞতা হয়েছিল যা মনে পড়লে আজও গায়ে বেশ কাঁটা দেয়। তবে আমার দুই আরণ্যক বন্ধু শিবা আর নন্দিনীর সহায়তায় আমরা বেস ক্যাম্পে ফিরে আসতে পারি।

সে বছর নভেম্বরের শুরুতেই কলকাতা হেড-অফিস থেকে নায়ার স্যার ওয়্যারলেস মেসেজে বললেন, “এইবারের শীতের পিকনিক কিন্তু কুঁজোচুড়ো পাহাড় চুড়োর কাছে ছায়াঘেরা সেই মাঠটায় হবে অ্যান্ড নো আর্গুমেন্টস প্লিজ। তবে ভেন্যুটা ওই ঝরনার কাছের মাঠে নাকি এই পশ্চিম ঢালের সেই জায়গাটায় যেখান থেকে পাহাড়ি নদীর তিনটে বাঁক দেখা যায়, সেটা তোমাদের ওপর ছেড়ে দিলাম।”

মাইলের পর মাইল জুড়ে আছে লৌহখনিজের এই লোহাপাহাড়। এর পশ্চিম সীমানা দিয়ে বয়ে যায় পাহাড়ি নদী। পাহাড়ি নদীর উজানে ছটা বাঁক মানে একই নদীকে ছয়বার পার করে তবে আসে কুঁজোচুড়ো পাহাড়। এইখানে আমরা চারজন ভূতত্ত্ববিদ আছি টাংস্টেন খনিজের সম্ভাবনাকে খতিয়ে দেখতে। এইখানে এসেই আমাদের চোখে পড়ে যায় ঘন জঙ্গলের আড়ালে কুঁজোচুড়ো পাহাড়ের এককোণ থেকে শুরু করে পড়ে সাতটি ধারায় নেমে আসছে এক নয়ন মনোহর জলপ্রপাত যার নামকরণ আমরা করলাম সাতধারা।



সাতধারার বেশ কিছুটা নিচে একটা লম্বা-চওড়া সমতল মাঠ। দিনের বেশিরভাগ সময়েই এখানে চারপাশের লম্বা চওড়া গাছগুলোর ছায়া পড়ে। কুঁজোচুড়ো পাহাড়ের পশ্চিমদিকের ঢাল যেমন কম, ঠিক তার উল্টোটাই উত্তর-পূর্ব দিকে। পাহাড়ের গা, খাড়াই পাথর ধরে সোজা নেমেছে পাহাড়তলির ঘন ঘাসজঙ্গলে ভরা উপত্যকায়। একবার এখান থেকে কাজ শেষে একটা অনাহারে থাকা বনবিড়ালির বাচ্চাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে আনি। বাচ্চাটা আমাদের ক্যাম্পে থেকে, দুধ খেয়ে বেশ সজীব চঞ্চল হয়ে উঠলো। আমি ওর নাম রাখলাম নন্দিনী। পরব উপলক্ষে এক হপ্তা কাজে আসেনি আমাদের স্থানীয় পথ প্রদর্শকেরা। কাজে ফিরে এসেই, তাদের নেতা মংলু বিড়াল ছানাটাকে দেখে শিউরে উঠে আমায় বলে, “সাহেব, এটা বাচ্চা বাঘিনী। আমি এটাকে এখুনি পূর্ণাপানির ধারে ছেড়ে আসছি”। নন্দিনীকে আমরা কিন্তু ভুলিনি। সে যাতে অনাহারে না থাকে আমরা তার ব্যবস্থা করলাম।উত্তর ঢালে খনিজের নমুনা নেবার জন্য কিছু ভারি যন্ত্র নামাবার জন্য একটা গাছে যে কপিকল লাগানো ছিল তাতে দড়ি বাঁধাই ছিল। প্রতি বিকেলে সেই কপিকল দিয়ে একটা বড়ো দুধের বোতল দড়ি দিয়ে নামিয়ে, “নন্দিনী” বলে চিৎকার করে ডাকলে, ঘাসবন থেকে জন্টি রোডসের মতো লাফ দিয়ে বোতলটা ধরে নিত নন্দিনী। কিছুদিন পরে আর এসবের দরকার হয়নি। এখন ও নিজেই হরিণ ধরে খায় তবুও আমরা নন্দিনী বলে ডাকলেই ও ঘাসবন থেকে গর্জন করে সাড়া দেবে। এই সময় এক ঝড়ের পরদিন আমরা শিবাকে পাই মুমূর্ষু অবস্থায়। আমরা সবাই মিলে বাজপাখিটিকে সুস্থ করে তুলি। সেই থেকে ও আমাদের কাছে আছে। আমাদের ইঙ্গিত ইশারা ও বোঝে, ওর কিছুটা আমরা বুঝি। আমাদের কাছে থাকবার কিছুদিন পরেই শুরু হয়ে গেল ওর এক নতুন খেলা। আমরা “নন্দিনী” বলে ডাকলেই ও সোজা ঘাস বনের দিকে উড়ে গিয়ে নন্দিনীর কাছে পৌঁছে যেত। দু’জনের মধ্যে দারুণ ভাব। আমাদের ইশারায় ও কয়েকবার উড়ে গিয়ে আমাদের পাঠানো কাঁচা মাংস নন্দিনীর কাছে পৌঁছে এসেছে। আমরা পরে এই জিনিসটাই কাজে লাগাই এখান থেকে লোহাপাহাড় বেস ক্যাম্পে যোগাযোগের জন্য।

নায়ার স্যারের মেসেজ আসবার এক সপ্তাহের মধ্যে, টাংস্টেনের খোঁজে এই মাঠের চারপাশের ঘন জঙ্গল ভেদ করে একটু দূরে যেতেই আমাদের নজরে আসে ঘন জঙ্গলের মাঝে একটা কী যেন বাড়ির মতো দেখা যাচ্ছে। পরদিন অনেক লোকজন সাথে নিয়ে এইখানে আমরা খুঁজে পাই এখানের প্রাক্তন মহারাজার দোতলা শিকার বাড়ি আর তার চারপাশ ঘিরে পরিচারকদের থাকবার ঘর, বিশাল রান্নাঘর এবং ভাঁড়ার। পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে থাকলেও এতো মজবুত করে তৈরি যে এখনও পুরো শিকার বাড়ির সবকটা ঘর আর তার দরজা জানালা অটুট আছে। দোতলার চারটি ঘরের একটি ঘরেই মাত্র দরজা আছে। সেটি অনেকটা ব্যাঙ্কের ভল্টের মতো। তাতে গোল চাকা লাগানো আছে। এছাড়া বাকি সব ঘরে শুধু শিকল লাগানো ছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল সেগুলো কে যেন একটু আগে পরিষ্কার করে গেছে। কোনও ঘরের মেঝেতে ঝুল বা মাকড়সার জাল বা মেঝেতে পুরু ধুলোর স্তর দেখলাম না।

সাতধারার মাঠে আমাদের চারজনের থাকার জন্য চারটে তাঁবু আর গাছের মাথায় হ্যামক টাঙ্গানো থাকলেও আমরা এখানে থাকতে তেমন ভরসা পেতাম না। দিনের দিন কাজ শেষ করে, ঘোড়ার পিঠে চড়ে ফিরে যেতাম লোহাপাহাড় বেস ক্যাম্পে। এই বাড়িটা দেখতে পেয়ে আমরা ঠিক করলাম এবার থেকে এখানেই থাকা হবে আর সেইজন্য ভাঁড়ার ঘরে পুরো মাসের রেশন, জ্বালানি কাঠ, রাত্রে পেট্রম্যাক্স জ্বালাবার কেরোসিন মজুত করে রাখা শুরু হল।



পিকনিকের এক মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে গেল তার তোড়জোড়। নায়ার স্যার ছাড়াও কোম্পানির আরো কয়েকজন উচ্চপদস্থরাও টাংস্টেনের কাজ দেখা আর পিকনিক দুটোই করতে আসবেন। এইপ্রথম লোহাপাহাড়ে কোম্পানির এত উঁচু পদের লোকেরা আসছেন। তাঁদের যাতে কিছুতে অসুবিধে না হয় সেজন্য লোহাপাহাড় বেসক্যাম্প ইন চার্জ কর্নেল প্রতাপ সিং একদিন নিজে এলেন কুঁজোচুড়ো পাহাড়ে। আমরা ঠিক করলাম যে পিকনিকের রান্নাবান্না আর খাওয়া দুটোই হবে সাতধারার কাছের বিশাল মাঠে। ঝর্নার পাশে অনেক পাথর আছে সেইগুলো বসবার জন্য হবে। ঝর্নার কাছে এক কোণে, রান্নার চুল্লিগুলো বানানো হবে। অভ্যাগতদের মধ্যে এবং আমাদের পরিবারের লোকেরা যারা চাইবেন, তাঁরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছ’বার নদী পার হবার রোমাঞ্চের স্বাদ নেবেন। লোহাপাহাড় ক্যাম্পে তিনটে রবারের স্পিড বোট আছে। সেগুলো একদম তৈরি করে রাখা হবে বাকি অভ্যাগতদের আনবার জন্য। রান্নার সব জিনিস এমনকি ঝাঁকা ভর্তি মুরগীদের ও কিনে রাখা হবে শিকার বাড়ির খাঁচায় । পিকনিকের আগের রাত্রেই, পাহাড়ি নদীতে দু-তিন জায়গায় বড়ো বড়ো পাঙ্গাস মাছ ধরবার জন্য জাল ফেলে রাখা হবে। এছাড়া জংগলের মধ্যে ছোটো প্রাকৃতিক লেক থেকেও মাছ ধরা হবে। মেনুটা কর্নেল স্যার তাঁর মনে মনেই রাখলেন কিন্তু আয়োজন দেখে আমরা বেশ বুঝতে পারলাম যে কী আছে তাঁর মনে। কর্নেল প্রতাপ আর নায়ার স্যার তাঁদের পরিবারের লোকদের নিয়ে এলেন লোহাপাহাড় ক্যাম্প থেকে সবার শেষে। আমি ওঁদের অভ্যর্থনা করে ফিসফিসিয়ে কিছু বলতেই নায়ার স্যার তাঁর মিসেসকে ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে বলে ইশারা করে কিছু বলতেই নায়ার বৌদি ভয় পেয়ে বলে ঊঠলেন “ ওরে বাবা, সত্যিই বাঘ নয়তো?” কোনোমতে তাকে ম্যানেজ করে স্যার আর কর্নেলদের নিয়ে এলাম ঝর্নার ধারের মাঠের উত্তরের খাড়া ঢালের দিকে, যার উপত্যকায় আছে ঘাসবন যেখানে শুধু বিকেলের দিকে নন্দিনীকে দেখা যায়। কিন্তু এইসময়টায় নন্দিনী বেরোয় না, অনেক দূরের একটা গুহাতে ঘুমায়। ততক্ষণে সার্ভে টিম তাদের থিওডোলাইটের শক্তিশালী টেলিস্কোপ আর অনেকগুলো উচ্চশক্তির বাইনোকুলার বার করেছে। সবাই আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম যে ঘাসবনে যেন একটা লম্বা ঝড় ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করতে করতে লম্বা গাছগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা কয়েকজন শঙ্কিত হয়ে পড়লেও, সার্ভে টিমের আর আমাদের ক্যাম্পের পুরানো লোকেদের সবারই মুখে চাপা হাসি যা একটু পরেই উল্লাসে পরিণত হল। ঘাসবন থেকে এবার যাদের পরিস্কার দেখা গেল সেটা একপাল বাঁদর। সার্ভে টিম যেন তৈরিই ছিল ওদের আপ্যায়ন করতে। ওরা প্রত্যেকে নিজের নিজের হ্যাভারস্যাক খুলে জঙ্গলের কলা, লেবু, বাতাবি,নাসপাতি হনুমান বাহিনীর দিকে ছুড়ে মারতেই, কপিবাহিনী জন্টি রোডসকে লজ্জা দিয়ে সেগুলো অনায়াসে ক্যাচ ধরে ফেলছিল। এরপর সাম্বা আর সালসা মিশিয়ে একটা জম্পেস সমবেত নাচ দেখালো। কিন্তু পূব দিক থেকে ধুলোর ঝড় তুলে কারা যেন আসছে? এক লহমার মধ্যে পুরো কপিবাহিনী গাছে চড়ে গেল। কারা আসছে ধুলোর ঝড় তুলে? চিতার একটা দল কি আসছে তাদের চিরশত্রুদের আসার খবর টের পেয়ে?

একটু পরেই আমাদের আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে এলো একপাল চিতল হরিণ বা চিতল এক্সপ্রেস। গাছের ওপর কপিবাহিনী দেখতেই থেমে গেল তারা। আমাদের থেকে পাওয়া ফলগুলো থেকে, ওরা কিছু বাঁচিয়ে রেখেছিল চিতল হরিণ বন্ধুদের জন্য। সেগুলো ছুঁড়ে-ছুঁড়ে এগিয়ে দিয়ে আপ্যায়ন করল আর ওরাও সানন্দে লাফিয়ে সেগুলো গ্রহণ করল । আমরাও বেশ কতগুলো পাকা পেয়ারা চিতলদের দিকে ছুঁড়ে দিলাম । কপিবাহিনী সেই দেখে আনন্দে কিচ-কিচ করে উঠলো ।

সবার পরে পৌঁছাল এক জোড়া চিতল দম্পতি । তাদের দিকে পেয়ারা ছুঁড়তেই, ডুয়েট নাচের ভঙ্গিতে দুজনেই অনেকটা উঁচুতে একসাথে লাফিয়ে, সেগুলো কামড়ে ধরল। এই দেখে আমরা সবাই দু'দলের দিকেই, সবার ব্যাগ থেকে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে বাকি ফলগুলোও ছুঁড়ে দিতে থাকলাম। এ’বার শুরু হয়ে গেল, হরির লুটের মত, মাটিতে গড়িয়ে পড়া ফলগুলো কুড়োবার বা সোজা মুখে ফেলে দেবার ফ্রেন্ডলি ম্যাচ। এর মাঝে দু'পক্ষের যৌথ নাচও হচ্ছিল । বাঁদরেরা দু’পায়ে হেলে-দুলে আবার কখনো বা ডিগবাজি খেয়ে আর হরিণেরা, সামনের দু'পা জোড়া দিয়ে, আকাশের দিকে তুলে পেছনের পায়ের খুরে ভর দিয়ে, দু’ধারে হেলে-দুলে তাদের নাচ দেখাল। কিছুপরে, অন্য এক তালে, স্প্রিঙের মত লাফ দিয়ে, শরীরকে হাওয়ায় সামান্য ভাসিয়ে দিয়ে, ডান দিক থেকে বাঁ দিকে হেলে, আর এক ধরনের নাচ দেখালে।

হঠাৎ করে কী হল, রেফারি যেমন খেলা শেষের বাঁশি বাজায়, সেইভাবে হনুমান দলপতি মুখে একটা অদ্ভুত সুরে হিপ-হাপ করল। মুহূর্তের মধ্যে মাঠ ফাঁকা করে দু’দলই বিদায় নিলো । হরিণের দল ঘাস বনের ফাঁকে শুঁড়িরাস্তায় দৌড়াতে-দৌড়াতে আর কপি-বাহিনীও সেইদিকে গেল, তবে আকাশ পথে গাছের শাখায়-শাখায় দোল খেতে-খেতে। তবে হ্যাঁ, যাবার আগে কপি-বাহিনীর পক্ষে বীর হনুমান,আমাদের সবাইকে মাথা নিচু করে তাঁর দু’হাত বাড়িয়ে দিল। কিছুক্ষণ সেই অবস্থায় থেকে তারপর রীতিমতো ট্রাফিক পুলিসের ভঙ্গিতে হাতের ইশারা করে নিজের দলের সদস্যদের তাকে অনুসরণ করতে বললো। এসব কে এদের শেখালো কে জানে? এ জিনিস আমি তো নয়ই, বহুবছর বনে-জঙ্গলে জরিপের কাজে ঘোরা, সার্ভে টিমের কেউ দেখে নি। নায়ার স্যার আর কর্নেলের বিশ্বাসই হচ্ছিল না, খালি বলছিলেন, “ইয়েহ সব নয়ে ছোকরালোগ কা ইনলোগ সে ইয়ারি-দোস্তি সে।” আমাদের সাথে বন্ধুত্বের খাতিরে আজ চিতল হরিণেরা আর কপিবাহিনী এসে যুগলবন্দী নাচ দেখিয়ে গেল এই কথাটা ওঁদের ঠিক না হলেও শুনতে ভালই তো। ততক্ষণে অভ্যাগতদের সবার হাতে হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সালফি গাছের রস। অনেকটা খেজুর রসের মতো যা পান করে সবাই এতোটা পথ আসার ক্লান্তি জুড়িয়ে গেল। এর সাথেই আমরা দিয়েছিলাম পাতাপোড়া, চিকেন সুপ আর এখানের আদিবাসীদের তৈরি মোমোর মতো ভেতরে সবজির পুর দেয়া সিদ্ধ পিঠে । পাতাপোড়া মানে এখানের একরকম গাছের বড়ো বড়ো পাতা যাতে নদীর আঙ্গুল সাইজের এক কাঁটার মাছ সামান্য তেল মসলা মাখিয়ে কাঠকয়লার আগুনে ফেলে পোড়ানো হয়। পাতা পুড়লেও ভেতরের মাছ পোড়ে না, মসলা সমেত পাতার ভেতরে রাখা মাছ সুসেদ্ধ আর মাখনের মতো নরম হয়ে যায়। আমাদের রোজকার কাজের পথপ্রদর্শকদের নেতা মংলু সর্দার এসে নায়ার স্যারকে সবিনয় অনুরোধ জানালে যে পশ্চিম ঢাল বেয়ে নিচে নামলেই তাদের গ্রাম লোহাগাঁও। সেখানের লোক আপনাদের যুদ্ধের নাচ দেখাবার জন্য অপেক্ষা করছে। আকাশে হাল্কা মেঘ আছে, রোদের তেমন তেজ নেই, সাহেবদের তেমন কোনো কষ্ট হবে না। আদিবাসীদের নাচ দেখতে আর কেউই বসে রইলো না। তখন কি জানতাম যে এই হাল্কা হাল্কা সাদা মেঘের পেছনেই লুকিয়ে আছে এক দুর্যোগকারী?

আমরা এবার দুপুরের খাবারের জোগাড়ে লেগে পড়লাম। জঙ্গলের পুকুর থেকে তেলাপিয়া আর পাহাড়ি নদী থেকে এসেছে পাঙ্গাশ মাছ । লম্বা পাঙ্গাশ মাছের পেট পরিষ্কার করে, তেল মশলা মাখিয়ে, তাদের ফাঁপা বাঁশের মধ্যে চালান করে, সেই বাঁশের ওপর আর নিচের খোলা মুখে কাঠের লম্বা টুকরো দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফুট-খানেক গভীর আর প্রায় সেইরকমই চওড়া, এইরকম অনেকগুলো ভাঁটি আছে সাঞ্ঝাচুলার বাইরে। এক একটা ভাঁটিতে এইরকম তিন-চারটে, পাঙ্গাশ মাছ ভরতি ফাঁপা বাঁশের নল ভাঁটিতে ঢুকিয়ে, পুরো ভাঁটি কাঠ-কয়লা দিয়ে ভরে ওপরে ও নিচে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কাঠকয়লার ধিকি-ধিকি আগুনে, পাঙ্গাশ মাছের নিজের তেল আর মাখানো মসালার মাখামাখির খেলার শেষে, বাঁশগুলো বের করে আনা হয়। বাঁশ পুড়ে গেলেও, মাছ পোড়ে না। পরম উপাদেয় এই খাদ্যটি, ঠিক পরিবেশনের আগে বাঁশ থেকে বার করা হয়। তেলাপিয়া মাছকে কাঠকয়লার হাল্কা আগুনে গ্রিল করা হবে। এর পরেই ওই ভাঁটিতেই হবে মুরগি কিন্তু সেটা হবে মাটির সরায়। মাটির সরাতে তেল মাখিয়ে, মসলা মাখানো মুরগির টুকরো তাতে রেখে, ঠিক ওইরকম আর একটা মাটির সরা উল্টো করে, সেটা ঢেকে দেওয়া হবে। দুটো সরার মাঝের জোড়ের ফাঁক, মাটি দিয়ে লেপে বন্ধ করে সোজা চালান করে দেওয়া হবে ভাঁটিতে। ভাঁটির নিচ থেকে ওপর অবধি কাঠকয়লা দিয়ে ঢেকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে। বেশি পরিমাণ দরকার হলে এক সেট সরার ওপর আর এক সেট দেওয়া হয় । বেস ক্যাম্পে ড্রিলিং এঞ্জিনিয়ার নাইডু এবং তার দলবল ভোর রাতে কাঁচা পেঁপেবাটা মাখিয়ে রাখা মাংসে বিরিয়ানির সব মসলা দিয়ে তাকে এবার হান্ডায় রেখে বড়ো উনুনে বসাবে। সুগন্ধি বাসমতী চাল আধসেদ্ধ হয়ে তৈরি হয়ে মাংসের সাথে দেশী ঘিয়ের সাথে মাখোমাখো হয়ে বিরিয়ানি নাম নিয়ে পুনর্জন্মের পথে পা বাড়াবে।

আমাদের রান্না প্রায় শেষ, পশ্চিম ঢালের পাহাড়ে কলরব শোনা যাচ্ছে। লোহাগাও থেকে সবাই এবার ফিরলো বলে। এমন সময় দেখি আমাদের মাসা আসছে ছুটতে ছুটতে। “সাহেব, একদঙ্গল কালোমেঘ পাহাড়ি নদীর পশ্চিম পাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। এটা ভালো না। খুব শীঘ্রই জোর জল-ঝড় নামবে।” কর্নেল প্রতাপের সাথে আমরা এক দ্রুত মিটিং সেরে নিলাম। সেই অনুযায়ী পুরো রান্না করা খাবারের সাথে সবাই আশ্রয় নেবে শিকার বাড়িতে। নিচের বড়ো হল ঘরে খাবার ব্যবস্থা করা হবে। ঝড়-জল মিটলে তার পর লোহাপাহাড়ে ফিরে যাবার কথা হবে। আমরা সবাই ঝড় আর বৃষ্টি আছড়ে পড়লো। কিন্তু মজবুত গঠনের এই শিকার বাড়ি এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে স্বভাবসিদ্ধ রাজোচিত আচরনে উপেক্ষা করল।

সার্ভে টিমের আটজন নতুন নিযুক্তদের আর ক’দিন পরেই একসাথে কাজে যোগদানের পর তাদের থাকা-খাবার ব্যবস্থা এই বাড়িতেই। সেই অনুযায়ী আগে থেকেই এখানে চাদর, বিছানা, লেপ, কম্বল আর রেশন তোলাই ছিল। নিচের চারটে ঘর সেভাবে তৈরিই আছে। দুটো ঘরে মেয়েরা শোবেন আর তার পাশের ঘর দুটোতে পুরুষরা। তবে আমারা দুইবন্ধু ঠিক করলাম যে আমরা ওপরের একটা ঘরে থাকবো। সারাদিন বড়ো খাটনি গেছে, এখন একটু হাত পা ছড়িয়ে তোফা ঘুমের দরকার। তার ওপর, সন্ধের একটা অংশ কেটেছে সবার থাকা-খাওয়া আর শোবার জোগাড়যন্ত্র করতে। ওপরের ব্যাঙ্কের ভল্টের মত দরজা দেওয়া ঘরটির পাশের ঘরটি বেশ বড়ো। একমাত্র এতেই সেই যুগপ্রাচীন মেহগনি কাঠের সিংহাসন সদৃশ বিশাল পালঙ্ক আছে। যখনই এই ঘরটি খুলেছি লক্ষ্য করে দেখেছি কে যেন এই ঘরটি সদাই পরিষ্কার করে রাখে আর এখান থেকে সবসময়একটা বিদেশী পারফিউমের মতো গন্ধ ছাড়ে।

আমার সাথে কথা বলতে বলতেই আমার সঙ্গী শচিন ঘুমে কাদা। আমারও দু চোখ জুড়ে ঘুম ছেয়ে আসছিল। এই ঘর থেকে দুরের পাহাড়ি নদীর আওয়াজ শোনা যায় যা এখন গর্জনে পরিণত হয়েছে যা শুনতে শুনতে একটা কথা মনে হতেই আমি একদম লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। নদীর পাড়েই বোটগুলো বেঁধে রাখা হয়েছিল। এই গোলমালে সেগুলোর খবর নেওয়া এই দুর্যোগে আর হয়েও ঠেনি। আমি জানি বোটগুলো বেশ শক্ত করে ম্যানিলা রোপ আর লোহার দড়ি দিয়ে পাড়ে হুক করে বাঁধা আছে। কিন্তু প্রবল হাওয়া আর প্রচন্ড স্রোতের টানে সেগুলো ভেসে যায়নি তো? যা অবস্থা এখন কাল সকালে সব কিছু স্বাভাবিক হলেও নদীর জল অত তাড়াতাড়ি নামবে না। আরও একটা কথা সারাদিনে শিবার সাথে মাত্র একবার দেখা হয়েছিল। একটা আস্ত বড়সড় মুরগী ওকে ধরিয়ে দিয়েএকটু দূরে গিয়ে খেতে বলেছিলাম। ও যেখানেই যাক সন্ধের পর আমি যেখানেই থাকি খুঁজে খুঁজে ঠিক চলে আসে আমার কাছে। আজ ও গেল কোথায়? এই ঝড়ে পড়ে হয়তো আছে কোথাও, কাল সকালে ফিরে আসবে নিশ্চয়।এইসব ভাবতে ভাবতে একটু তন্দ্রার মতো আসি আসিকরছে, এমন সময় মনে হল পাশের সেই ভল্ট দেয়া ঘরটায়কি যেন ফিসফাস স্বরে কথা শুনলাম। কে যেন আমাকে স্থানীয় ভাষায় বলছে “দেয়ালের কাছে এসে কান পাতো, আমি কিছু বলবো”। ধড়মড় করে উঠে ওই ঘরের লাগোয়া দেওয়ালে কান পাতলাম কিন্তু কোনো আওয়াজ নেই। বিছানায় আবার ফিরে যাচ্ছি, এইসময় মনে হল, আমার ঘরের লাগোয়া ওয়াসরুমে কেউ যেন আছে । প্রথমবার কানে যেতে বিশ্বাস হয়নি। ক্ষণেক পরে আবার শুনি সেই আওয়াজ। এবার আর ভুল হল না। এটা নূপুরের আওয়াজ। ঠিক এইসময় আমার রুমের দরজার কাছে স্পষ্ট নূপুরের আওয়াজ শুনলাম। শচিনের দিকে তাকালাম। ও যেভাবে ঘুমাচ্ছে ওকে আর জাগালাম না। ঘরের কোণে একটা বড় লাঠি ছিল, সেটা নিয়ে ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসতেই রাস্তার কালো পিচের চাইতে বেশি গাঢ় অন্ধকার আমাকে যেন ঘিরে ধরলো। নদীর তীব্র গর্জন খান‍্খান্ করে দিচ্ছে রাত্রের নিস্তব্ধতাকে। এমন সময় বেশ স্পষ্ট শুনলাম কাঁচের গ্লাস ভাঙ্গার আওয়াজ আর অনেক লোকের চাপা গলায় কথা বলার আওয়াজ। হঠাৎ শুনলাম একটা অট্টহাসির আওয়াজ আর সেই সাথে চাপা কান্না আর ঘুঙ্গুরের আওয়াজ। এত গাঢ় অন্ধকার যে নিজের গায়ের লোমই ঠাহর হচ্ছে না । এইসব আওয়াজ আসছে সেই ব্যাঙ্কের ভল্টের মতো দরজার কাছ থেকে। একটা নারী কণ্ঠের কান্নার আওয়াজ খুব জোরে হয়ে ধীরে ধীরে থেমে যেতে যেতে আর্তনাদ করে উঠলো। মনে হচ্ছে যেন কেউ তার গলা চেপে ধরেছে, আর একবার কাঁচ ভাঙ্গার আওয়াজ শুনতে পেলাম। এর আগে অনেকক্ষণ ধরে টুই টুই করে কয়েকটা রাতজাগা পাখি ডাকছিল । ভয় পেয়ে তারা এবার চুপ করে গেল। একটা কিছু যে নিষ্ঠুর কাণ্ড হতে চলেছে তা এরাও টের পেয়েছে। নাহ্ কপালে যা থাকে আমার হবে। দেখি কী একটা হেস্তনেস্ত করতে পারি। আমার বালিশের তলায় একটা ব্লিঙ্কার দেওয়া বড়ো টর্চ আছে। আলোটা জ্বাললে বোঝা যাবে যে কী হচ্ছে। টর্চ আর লাঠি হাতে নিয়ে, ধীর পদক্ষেপে রুম থেকে বাইরে এলাম। সর্বনাশ! দেখি টর্চ আর জ্বলছে না। বারান্দায় কেউ আছে বলে মনে হল না। কী মনে করে, আমি টর্চের অ্যালার্মের বোতামটা টিপলাম ।

বিকট আওয়াজ করে সাইরেন বাজবার সাথে-সাথে, ব্লিঙ্কারের বেশ জোর আলো জ্বলা-নেভা করতে থাকল। আমার রুমের দরজায় কাউকে দেখতে পেলাম না। কিন্তু টর্চ সিঁড়ির দিকে ঘোরাতেই, গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। কাঠের সিঁড়ির দিক থেকে নূপুরের আওয়াজ শোনা গেল। মনে হচ্ছে, কেউ যেন দ্রুত গতিতে কিন্তু ছন্দের সাথে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। আমি আলোটা সেইদিকে এগিয়ে নিয়ে যেতেই, মনে হল, সার্চ লাইটের মত একজোড়া তীব্র নীল আলো আমার দিকে একবার দেখল। এরপরই আমার টর্চের ব্লিঙ্কার আর সাইরেনের আওয়াজ ক্ষীণ হতে লাগলো। এবার মনে হচ্ছে যেন কেউ ঘুরে দাঁড়ালো। ওই নীল আলো যেন আসলে তারই চোখ আর সেই চোখ এগিয়ে আসছে ক্রমশই আমার দিকে আমি এবার খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম, "বাঁচাও, বাঁচাও"। কিন্তু চিৎকার শেষ করার আগেই দেখি নীল চোখজোড়া এবার আমার থেকে হাতখানেক দূরত্বে। আমার হাতের মুঠিতে জোর করে চেপে ধরা লাঠিটা আর অন্য হাতে ধরা টর্চটা, কেউ যেন কেড়ে নিল। চোখের নিমেষে, সেগুলো সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে লাগলো।

এইটুকু বুঝতে পারলাম যে আমি এবার লুটিয়ে পড়ছি বারান্দার মেঝেতে আর সিঁড়িতে এবার অনেকগুলো ভারি পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সেই আওয়াজে নীল চোখ জোড়া যেন সরে যাচ্ছে ।

ভোরের আলো আর দোয়েলের শিষ, ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিল। চোখ খুলে দেখি, আমি, আমার রুমের বিছানায় নেই। ধড়মড় করে উঠে, চোখ খুলে দেখি আছি গেস্ট-হাউসেই। তবে নিচে হলঘরে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কফির ট্রে নিয়ে ঢুকলেন নায়ার বৌদি আর তার সাথে নায়ার স্যার আর কর্নেল প্রতাপ। নায়ার স্যার আমায় বললেন, “আগে কফি শেষ করি আমরা সবাই আর তার পর শুনবো তোমার মুখে কাল রাতের ব্যাপার।”

কফির পর আমার মুখে সব শুনে কর্নেল আমাকে একগুচ্ছ সজারুর পালক দেখিয়ে বললেন, “তোমার গল্পের আসল নায়িকা হল সজারু তবে একটি নয় বেশ অনেকগুলি। নিশুতি রাতে তারা এসে আড্ডা জমায়,কাল তুমি যে ঘরটায় শুয়েছিলে তার ঠিক তলায়। নিশাচর এই প্রাণীগুলি চোখ রাতে দেখলে মনে হবে কোথাও যেন একজোড়া নীল আলো জ্বলছে”। কিন্তু শুধু কি নীল আলো? আরও অনেক কিছু কাল রাতে শুনেছি। সেই সব নিয়ে কর্নেল কিন্তু কোনো ব্যাখা দিতে পারলেন না। এ’নিয়ে তর্কে আমার উৎসাহ নেই এখন। আমি শচিন কে বললাম, “তুই আমার সাথে আয় বাইনো নিয়ে। বোটগুলো খুঁজে দেখি।”

ঘরের বাইরে যাবার জন্য নামতেই সবাই হাঁ হাঁ করে উঠলেন। আমি কোনওমতে বাইরে এসে সোজা গেলাম পশ্চিমের ঢালে। সবকটা বাঁক এখান থেকে পরিস্কার দেখা যায়। আমাদের এই ক্যাম্পের কাছেই পাহাড়ি নদীর বিপদ সীমানার মার্কা লাগানো পিলার আছে। নদী এখন তার ওপর দিয়ে বইছে। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে যে হঠাৎ বরসার এই বাড়-বাড়ন্ত দুপুরের পরই কমতে শুরু করবে। তখন স্পিড বোট চলতে পারে কিন্তু ঘোড়াতে নদী পার হবার ঝুঁকি নেয়া উচিত নয়। কিন্তু সেই বোট এখন আছে কোথায়? বোট ভেসে গেলে হয় সেটি আমাদের লোহাপাহাড় বেস ক্যম্পের কাছে কোনো বাঁকে বা বেস ক্যাম্পের পর যে ড্যাম আছে তার দেওয়ালে আটকে আছে। কিন্তু সেই খোঁজে বেরোবার প্রায় সব কটা লোক এইখানে। বাকিরা যারা আছে তারা নেহাত নতুন, বুঝিয়ে না বললে পারবে না বোট খুঁজতে। ওয়্যারলেস সেট কাজ করছে না, পুরু মেঘের জন্য স্যাটেলাইট ও নেই। এইসময়ে বোট খোঁজার খবর পাঠানো জন্য যাকে দরকার সেই শিবা কাল সকাল থেকে গায়েব। শিবা গেল কোথায়? কাল তাকে একটা গোটা মুরগী দিয়ে যে দিকে পাঠানো হয়েছিল সেই পূবের খাড়া ঢালে গিয়ে বেশ কয়েকবার শিবা কে ডাকলেও লাভ কিছু হল না। বিরক্ত হয়ে এবার আমি শিবাকে ডাকতে গিয়ে চিৎকার করে উঠলাম,”নন্দিনী, নন্দিনী” আমার আওয়াজ প্রতিধ্বনি হয়ে আসবার আওয়াজ চাপা পড়ে গেল নন্দিনীর গর্জনে। দেখি নন্দিনী আসছে আর তার পিঠে চড়ে আসছে শিবা। শিবা উড়ে আসতেই আমার পিছনে থাকা শচিনের উদ্দেশ্যে বললাম, “তোর পকেটে পেন আর মেসেজের ট্যাগ আছে বার কর।” পেন আর ট্যাগে নিয়ে যে হাত এগিয়ে এল সেটা দেখে আমি একবার পেছন ফিরতেই চমকে উঠলাম। বোধকরি আমাদের চিৎকার-চেঁচামিচিতে নায়ার স্যার চলে এসেছেন এখানে আর উনি সব দেখেওছেন। ট্যাগে লোহাপাহাড় বেস ক্যাম্পকে বোটগুলো উদ্ধার করবার সাঙ্কেতিক জাইগুল লিখছিলাম আর শুনছিলাম, “ ওয়েল ডান বয়েজ। নিজের চোখে না দেখলে আনবিলিভেবেল। আমি মুভিতে এইরকম দেখেছি।” ততক্ষণে কর্নেল চলে এসেছেন, “স্যার আমার ডি এস এল আর ক্যামেরায় নন্দিনী আর শিবা কয়েদ হয়ে আছে। ওয়েট স্যার, চলল আমাদের শিবা। আর কয়েক মিনিটেই বেসক্যাম্পে খবর পৌঁছে যাবে।”

বিকেলের সামান্য আগেই চারটে স্পিড বোটে সবাই রওয়ানা হয়ে গেলেন বেস ক্যাম্পের দিকে। পরের মাসে কোম্পানির ইন হাউস ম্যাগাজিনের কভার পেজ জুড়ে ছিল নন্দিনী আর তার পিঠে চড়া শিবা।


(সমাপ্ত)


ছবি : লেখক

গল্পের ঝুলি : সুড়ঙ্গ : মধুমিতা সেনগুপ্ত




বাবার কথা শুনে খাওয়া শেষ না করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে যায় ঋষি । প্রীতম ছেলের সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাওয়া দেখে নিজের মা প্রীতির দিকে তাকান ।
ঋষির মা রোমিলা বলেন –“খেয়ে উঠে বলতে পারতে কথাটা । প্রতিবার বেড়াতে যাওয়ার সময় তোমার কোনো না কোনো ইম্পরট্যান্ট মিটিং পড়ে । ব্যাগ পর্যন্ত গুছিয়ে রেডি আমরা ..ধুর ভাল্লাগে না । মা আপনি সামলান আপনার নাতিকে । "


রাতে ঠাম্মা আর ঋষি একঘরে ঘুমায় । ছোটবেলার অভ্যাস । সবাই বারণ করলেও জেগে থাকেন ঠাম্মা যতক্ষণ না ঋষির পড়া শেষ হয় । বাবার চাকরি আর মায়ের বুটিক । দুজনের সব সময় ব্যস্ততা। ঠাম্মাই সবদিক সামলে নেন ঋষির ।


ঠাম্মা একহাতে থালায় দুজনের ভাগের রুটি আর বাটিতে মিক্স ভেজ নিয়ে ঋষির পাশে এসে বসেন।


“ আমার ক্ষিদে নেই । ” মোবাইলে খেলতে খেলতে জানিয়ে দেয় ঋষি ।

“ খাওয়ার উপর রাগ করতে নেই সোনা । বহুবার বলেছি । তুই না খেলে তোর মা খাবে না । আমিও খাবো না । আমার আবার সময়ে না খেলে শরীর অস্থির করে । সুগারটা মাপাতে হবে । হয়ত একদিন না খেয়ে সুগার ফল করে মরে যাবো ..।” বলতে থাকেন ঠাম্মা ।

নিশানা নির্ভুল ।

"দাও দাও খাচ্ছি । সবসময় তুমি এসব বলবে না তো । তোমার জন্য আমি ঠিকঠাক রাগটাও করতে পারি না । দাও খাইয়ে দাও।" ঋষি হাঁ করে।

ঠাম্মা পড়ার টেবিলের একপাশে প্লেটটা রেখে বাঁ হাতে ফোনটা নিয়ে রোমিলাকে টেক্সট করে খেয়ে নিতে বলেন । ফোনটা ঋষির হাতে ফেরৎ দিয়ে রুটি ছিঁড়ে বেশি করে তরকারি দিয়ে নাতির মুখে পুরে দেন ।

“ তুমি জানো আমি সবাইকে বলেছি এবার উইন্টারে আমরা মালয়েশিয়া হংকং যাচ্ছি । হেন করবো তেন করবো সব প্ল্যান বলেছি । এবার আমি মুখ দেখাবো কী করে? ঋতমরা কেরালা যাচ্ছে শ্রীরা রাজস্থান । শুধু আমি ঘরে বসে ছুটি কাটাবো ।” ঋষির চোখে জল আসবো আসবো করে ।

“কোথাও তো আমরা যাবোই । সেটা বিদেশ না হতে পারে ভিনরাজ্য না হতে পারে কিন্তু আমরা দুজনে বেড়াতে যাবো । বন্ধুদের বলবি ফরেন ট্রিপ ক্যান্সেল হয়ে আমরা প্রকৃতি পাঠ করতে যাবো । নেচার স্টাডি।" বলেন ঠাম্মা ।

ঋষির মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে । সে জানে তার ঠাম্মা মিথ্যা আশ্বাস দেন না । সারাজীবনই খুব ডাকাবুকো সাহসী মহিলা হিসেবে তিনি পরিচিত মহলে প্রসিদ্ধ। ঠাম্মার সাথে বেড়ানো মানে মনের প্রচুর খোরাক জুটে যাবে । বাবা বলেন ছোটবেলায় মাকে তিনি যমের মত ভয় পেতেন । এটা শুনে ঋষি খুব হেসেছিল কারণ ঠাম্মাকে দেখে ভয় সে জীবনে পায়নি । এত মিষ্টি করে আদর করে সবটা বুঝিয়ে দেন ঠাম্মা । সব বন্ধুরা বলে কাশ তাদের এরকম একজন গ্র্যানি থাকতো।


“ কোথায় যাবো বলো বলো প্লিজ। আমার আর তর সইছে না।" আদুরে গলায় প্রশ্ন করে ঋষি ।

“ আগে যাও ব্রাশ করে বাবা মাকে গুড নাইট করে এসো । আমাদের প্ল্যান কিন্তু এখনই কিছু বলিস না । যা । " বলেন ঠাম্মা ।


আনন্দে প্রায় লাফাতে লাফাতে নীচে চলে যায় ঋষি । প্রীতি হেসে নিজের খাওয়া শেষ করেন ।

.....


ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে ঋষি মুখ নিচু করে টোস্টে কামড় বসায় । ঠাম্মা ডিমের খোসা ছাড়িয়ে জলে ধুয়ে সবার প্লেটে দিচ্ছেন । সবিতামাসি রান্না ঘরে ব্যস্ত । মা চা ঢেলে সবাইকে দিচ্ছেন । প্রীতম আড়চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকান । মা যে কীসের লোভ দেখিয়ে ঋষিকে শান্ত করলেন বোঝা গেল না ।


“ পুতু শোন তোর সাথে একটা জরুরি কথা আছে । " বলেন প্রীতি ।


অনেক দিন বাদে মায়ের মুখে আদরের ডাক শুনে মন ভরে যায় প্রীতমের । বেশিরভাগ সময় মা নাতিকে দিয়ে ডেকে পাঠান । নাহলে ডাকনাম বাপি বলে ডাকেন । আর রেগে গেলে বলেন প্রীতম ।


“ হ্যাঁ মা বলো । " সাগ্রহে তাকিয়ে থাকেন প্রীতম।

“বসিরহাটের বাগানবাড়ি তে তো অনেক বছর যাই নি । ভাবছি দিন সাতেক আমি আর ঋষি ওখানে গিয়ে থেকে আসবো । " চোখের ইশারায় ঋষির দিকে ইঙ্গিত করেন প্রীতি ।

“ ওখানে যাবে ? আমিও তো যেতে পারিনি বহু বছর । অনিল কাকা বাবার খুবই বিশ্বস্ত লোক বলে এতদিন যত্ন করে রেখেছেন সবকিছু । তাও দোতলার সবকিছু কেমন আছে সেটা খোঁজ নিয়ে দেখি । অনিল কাকারও বয়স হয়েছে । "
বলেন প্রীতম ।

“ খুবই ভালো অনিল আর সুষমা । শুধু মাসে মাসে টাকা আর থাকার বিনিময়ে ওরা যা করে সেটা সত্যি ভাবা যায় না ।ওদের জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে তাও ওদের প্রভুভক্তিতে কোনো ছেদ পড়েনি । যাক গে ... দোতলা খুলে পরিষ্কার করাতে বলে দে । বাথরুম দুটো যেন ভালো করে সাফ করে । ঋষি তো সেই কোন ছোটবেলায় গেছিল ..ওর ভালোই লাগবে । তুই আজকেই ফোন করে দে । সামনের রবিবার যাবো ভাবছি।" বলেন প্রীতি ।


“ঠিক আছে । রবিবার সকালে তাড়াতাড়ি রওয়ানা হয়ে যাবো । ওখানে দুপুরে দেশি মুরগি আর ভাত খাবো । তোমরা থেকে যেও । আমরা ফিরে আসবো সন্ধ্যা নাগাদ । ঠিক আছে?” প্রীতম বলেন । সবার মুখে বেড়ানোর খবরে আনন্দের আলো জ্বলে ওঠে ।


....


“অনিল দাদুর জীবনে কি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঠাম্মি ? ওঁরা ঐ বাড়িতে থাকেন কেন ?” রাতের বেলা শোওয়ার আগে ঠাম্মির সাথে কিছুক্ষন প্রাণের কথা বলা ঋষির অভ্যাস ।

“আমার শ্বশুর মশাইয়ের বাবা বাংলাদেশ থেকে এদেশে চলে আসেন । ওদেশে প্রচুর জমিজমা ছিল ওঁর। বলতে পারিস জমিদার মানুষ। অনিলেরা বংশপরম্পরায় এই বংশের লাঠিয়াল রক্ষক ছিল । নিজেদের লোক হয়ে গেছে বলা যায়। ওরাই তো এত বছর সব দেখে শুনে রেখেছে ।
সবই ঠিক চলছিল কিন্তু ওর একমাত্র সন্তান অম্বর নিখোঁজ আর তার স্ত্রী রুক্মিণীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় । ওদের মেয়ে বুল্টি তোর থেকে বছর দুয়েকের ছোট । কিন্তু মেয়েটি বোবা হয়ে গেছে । থাক ঋষি এই প্রসঙ্গে আমার আর কথা বলতে ইচ্ছা করছে না । ঘুমিয়ে পড়।” ঠাম্মি চুপ করে যান । 

অনেক সংগত প্রশ্ন মাথায় ঘোরাফেরা করে ঋষির কিন্তু ঠাম্মি যখন চুপ করে গেছেন তখন এর বেশি কিছু তিনি কিছুতেই বলবেন না । দু'চোখ বন্ধ করে মাথা থেকে সবকিছু বার করার চেষ্টা করতে থাকে ঋষি ।


....


পরের রবিবার গোটা চারেক ব্যাগ, ট্রলি বোঝাই করে জিনিসপত্র নিয়ে সবাই মিলে রওয়ানা দিলেন বসিরহাটের দিকে । ঋষি অনেক ছোটবেলায় একবার গিয়েছিল । অনেক গাছ আর একটা খেলার জায়গা তার মনে পড়ে আবছা আবছা । ঠাম্মা এক মুহূর্ত তাকে চোখের বাইরে যেতে দেননি । দুপুরে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল সারাদিন ছুটোছুটি করে । ফেরার সময় গাড়িতে যখন ঘুম ভাঙে তখন সে তার মায়ের কোলে । সে এবার মনে মনে খুবই উত্তেজনা অনুভব করছে ।


যশোহর রোড ধরে এগিয়ে চলছে
প্রীতমের সাধের স্করপিও । ডাকবাংলো থেকে ডান দিকে ঘুরে এগিয়ে চলে গাড়ি ।
এরপর কলকাতা বসিরহাট রোড ধরে কদম্বগাছি গোলাবাড়ি দেগঙ্গা বেড়াচাঁপা পেরিয়ে বসিরহাট সাব ডিভিশনের বাদুরিয়া পৌঁছাতে বেলা বারোটা বেজে গেল । মাঝে একবার কচুরি মিষ্টি আর চা ব্রেক হয়েছিল ।
“সামনেই ইছামতী নদীর উপর কাঁটাখালি ব্রিজ আছে । সকালে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে নদীর পাড় ধরে ঘুরে আসিস ঋষি । ভালো লাগবে । " বলেন প্রীতম ।

“ভালো করে সোয়েটার টুপি ঠুপি পরে যাবি ঋষি। ভীষণ ঠান্ডা হওয়া দেয় নদীর পাড়ে । " বলেন রোমিলা ।


একটু বাদেই কালো রঙের বিরাট উঁচু একটা লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় তাদের গাড়ি। একমানুষ সমান উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা অনেক গাছগাছালির জায়গা পার হয়ে শেষে বহু পুরোনো আমলের একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে।গেটের ডানদিকে দুটি ঘর। সেখান থেকে একজন দারোয়ান গোছের লোক বার হয়ে এসে দরজা খুলে দৌড়ে আসে। লোকটি কাছে আসলে ঋষি চিনতে পারে হরিহর দাদু । যথেষ্ট বয়স হয়েছে কিন্তু টানটান ব্যায়াম করা পোক্ত চেহারা । গতবার ঋষিকে নিয়ে কাঁধে করে ঘুরেছিলেন উনি। ঋষির ঠাকুরদার বাবার সেরা লাঠিয়াল ছিলেন হরিহর দাদুর বাবা । মানুষটি তাদের দেখে যথেষ্ট আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন । বারবার অনুযোগ করলেন ঠাম্মার কাছে কেন তাঁরা বছরে অন্তত একবার করে আসেন না ।

মালপত্র নামানো চলছে । ঠাম্মার হাতব্যাগ থেকে নিজের বাইনোকুলারটা গলায় ঝুলিয়ে গেটের ভিতরে ঢুকে পড়ে ঋষি । বাঁ দিয়ে ছোট ছোট চারাগাছ পোঁতা হয়েছে । গাঁদা চন্দ্রমল্লিকা ডালিয়া আর কিছু অচেনা ফুলের গাছ সযত্নে বেড়ে উঠছে । কিছুটা দূরে অযত্ন মাখা একটা জঙ্গল মতো । একটু হেঁটে এগোতেই ঋষি বুঝতে পারে জঙ্গলের পরেই খুবই বড় মজা পুকুর আছে যা আগাছায় আর বড় বড় জংলা গাছে ভর্তি । আরো সামনে এগিয়ে যায় ঋষি । পুরো জায়গাটা রেলিং দিয়ে ঘেরা ।
“ঋষি ! ওদিকে কেউ যায় না, আগাছায় ভর্তি । সাপখোপ থাকতে পারে। চলে আয় এক্ষুনি । " রোমিলা মাথার উপর সানগ্লাসটা তুলে চিৎকার দেন ছেলের উদ্দেশ্যে ।

ঋষি সবে ভাবছিল বাইনোকুলার চোখে দিয়ে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখবে কিন্তু উপায় নেই । এমনিতেই মায়ের ধারণা কুকুর বেড়াল থেকে কাঠবিড়ালি , মশা মাছি থেকে শুরু করে যাবতীয় কীট পতঙ্গ ওঁৎ পেতে দাঁত বা হুলে শান দিচ্ছে ঋষিকে কামড়ানোর জন্য। ক্লাসে সে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করে দেখেছে সবার মা একই রকম ।


বাইরে মা ছাড়া কেউ দাঁড়িয়ে নেই । শুকনো পাতার উপর দিয়ে আওয়াজ করে হাঁটতে ভালোই লাগছে ঋষির । এখানে সত্যি খুব ভালো ভাবে নেচার স্টাডি করতে পারবে সে । মা আবার তাড়া লাগানোয় অল্প দৌড়ে বাড়ির ভিতরে ঢোকে ঋষি ।


....


পুরোনো আমলের উঁচু খাটের উপর ধবধবে সাদা চাদর বিছানো । দুটো তাকিয়া কোলে নিয়ে ঠাম্মা আর ঋষি বসে গল্প শুরু করে । ঠাম্মা বলেন


“কাকে দেখে তোর কী কী মনে হলো বল দেখি।"


“অনিল দাদু ,খুব ভালো মানুষ । বাড়ি এবং আমাদের বংশকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন । শ্রদ্ধাও করেন । কথায় কথায় জয় গোবিন্দ বলা অভ্যাস ।
সুষমা দিদা খুব চুপচাপ । গভীর চাপা দুঃখ ওঁর দুচোখে । মাঝেমাঝেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আর বলেন ..সবই কপাল ।
হরিহর দাদু লাঠি হাতে এখনো দশজনকে শুইয়ে দিতে পারেন । তবে সম্ভবত রাতকানা। উনি কী করে রাতে বাড়ি পাহারা দেন কে জানে । ভালো করে তালা লাগাতে পারেন না ।
বুল্টি , অনিল দাদুর নাতনি । বছর দশেক বয়স । কথা বলতে পারে না না চায় না বুঝলাম না । শুনতে পায় সবকিছু । লেখাপড়া করে । খুবই বিষণ্ণ মনমরা মেয়ে ।
আপাতত এইটুকুই ..।” লম্বা বক্তৃতা করে থামে ঋষি ।

“ ভালোই পর্যবেক্ষণ করেছিস দেখছি । " ঠাম্মা হাসেন । 
“ অনিল আর সুষমা দুজনেই বড় হাসিখুশি মানুষ ছিল । আচমকা একমাত্র সন্তান হারিয়ে যাওয়ায় ওরা এরকম হয়ে গেছে । নেহাৎ নাতনি রক্ষা পেয়েছে তাকে নিয়েই ..।”

“ রক্ষা পেয়েছে মানে ! কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছিল নাকি ? ” কৌতূহল চাপতে পারে না ঋষি ।


“ বছর পাঁচেক আগে বাংলাদেশ থেকে চাকরি ছেড়ে এখানে চলে আসে অম্বর মানে তোর অনিল দাদুর ছেলে । সে ওখানে মামাবাড়িতে মানুষ হয়েছে । তোর বাবার সাথে ফোনে কথা হয় । নিচের দুখানা ঘর মেরামত করে নিতে মাসখানেক একা এখানে থেকে যায় । তারপর আবার ওদেশে যায় নিজের শ্বশুরবাড়ি থেকে রুক্মিণীকে মানে ওর স্ত্রীকে আর মেয়েকে আনতে । দিন পনের বাদে ফিরে এসে এখানে গুছিয়ে সংসার শুরু করে । অনিলরা খুশি আমরাও খুশি । এর কিছুদিন বাদেই বাড়িতে মাঝরাতে ডাকাত পড়ে । বাড়িতে কিছুই তেমন ছিল না । ডাকাত আসার উদ্যেশ্য কী তাও বোঝা যায়নি । ডাকাতরা বাঙাল ভাষায় কথা বলছিল । ওরা টানতে টানতে অম্বরকে বাইরে নিয়ে যায় । তাকে বাঁচাতে রুক্মিণীও বাইরে যায় । সবার পিছনে ছিল বুল্টি । তারপর মশালের আলো দিয়ে বাইরের খড়ের গাদায় আর মজা পুকুরের আগাছার জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে দেয় ডাকাতরা। গুলি চালাতে চালাতে তারা চলে যায়। এর ঘন্টাখানেক পর পুলিশ আসে । আশেপাশের লোকেরা ততক্ষনে আগুন নিভিয়ে ফেলেছে । মজা পুকুরের ধারে গুলিতে প্রায় মৃত রুক্মিণীকে পাওয়া যায় । একটু দূরেই একটা গর্তের মধ্যে পড়েছিল অজ্ঞান বুল্টি । দুজনকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে রুক্মিণী একবার চোখ খুলে কোনোমতে একটা শব্দ উচ্চারণ করে ..সেটা তরঙ্গ বা তোরঙ্গ না সুড়ঙ্গ সেটা পুলিশের লোক বা হরিহর কেউই সঠিক বলতে পারেনি । কথাটা বলেই রুক্মিণী মারা যায় । বুল্টি কিছুদিন ভর্তি থাকে হাসপাতালে । শরীরে কোনো আঘাত না থাকলেও তার মনের আঘাত ছিল সাংঘাতিক । আগে সে বাঙাল ভাষাতে কথা বলত । কিন্তু এই ঘটনার পর আর সে কথা বলেনি । এবার ভাবছি ওকে কলকাতা নিয়ে গিয়ে সঠিক চিকিৎসা করাবো । ”

“ খুব ভালো হবে । আমাদের স্কুলে ভর্তি করে দিও । ওকে আমি বনু ডাকবো ঠাম্মা । ঠিক আছে? ”

“বলিস । ”

“কিন্তু ঠাম্মা পুলিশ কী বললো ? আর অম্বর আঙ্কেলের কী হলো ? ”

“পুলিশ বলেছিল অম্বর কোনো খারাপ দলে মিশতো । তাদের হাত থেকে বাঁচতে সে এদেশে চলে আসে । কোনো পুরোনো শত্রুতার জেরে হয়ত এই আক্রমণ । কিন্তু আজ অবধি অম্বরের কোনো হদিশ পায়নি কেউ । ”



...


সকালে উঠে ঋষি দেখে রান্নাঘরের সামনে একটা বড় জামবাটিতে প্রচুর নারকেল কোরানো হয়েছে। কাঠের জ্বালের উনুনের উপর কড়াইতে খেজুরগুড় জ্বাল দিচ্ছেন ঠাম্মা । বড় একটা শিলে ভিজিয়ে রাখা চাল নোড়া দিয়ে পিষছেন সুষমা দিদা । একটা স্টীলের থালায় বেশ কিছুটা কাজু আর কিশমিশ রাখা আছে । এদিক ওদিক তাকিয়ে একমুঠো কাজু কিশমিশ তুলে নেয় ঋষি। পকেটে চালান করে বলে
“ঠাম্মা একটু বাইরে যাচ্ছি।" 

বাড়ির পিছনে কিছু গাছপালা আর একটা ছোট ডোবা মতো আছে । সেদিকে হাঁটতে গিয়ে চোখে পড়ে তার কাজু চুরি দেখে মুখে হাত চাপা দিয়ে বুল্টি নিঃশব্দে হাসছে । সে বুল্টিকে কাছে ডেকে তাকে চুরির ভাগ দেয় । বাইরে আসতে আসতে শুনতে পায় সুষমা দিদা বলছেন ...“ সবই কপাল। "


ডোবার পিছল ঘাটে সাবধানে দাঁড়িয়ে কাজু কিশমিশ সাবাড় করে দুজনে । বুল্টি ইশারায় ঋষির বাইনোকুলারটা চায় ।
“নে । গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে এইভাবে চোখে দে ।" 

ঋষি দেখে ডোবার অপর দিকে ঘন জঙ্গল । মোটা মোটা লতা গাছ বড় বড় গাছগুলোর গুঁড়িগুলো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে জায়গাটা দিনের বেলাতেও অন্ধকার করে রেখেছে । তার ওপারে বড় পাঁচিলটা প্রায় দেখাই যাচ্ছে না । বুল্টি দূরের জিনিস স্পষ্ট করে সামনে দেখতে পেয়ে খুবই উত্তেজিত হয়ে ডানদিকে ঘুরতে গিয়ে ঋষিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে । ঋষির পা বেশ কিছুটা পিছলে যায় । কোনমতে ডোবায় পড়া সামলে নিয়ে ঋষি বলে,
“ধাক্কা দিস না রে বনু । সাঁতার জানি না ডুবে যাবো । "


দুচোখে কৌতুক নিয়ে পুরোটাই রসিকতা ভেবে হাসতে হাসতে ঋষিকে ধাক্কা মেরে বসে বুল্টি । টাল সামলাতে না পেরে জলে পড়ে যায় ঋষি । আপ্রাণ হাত পা ছোঁড়ে । বুল্টি বিস্ময়ে চোখ বড় করে ফেলে । এই বয়সী একটি ছেলে সত্যি সাঁতার জানে না এবং সে ডুবে যাচ্ছে দেখে হতবাক হয়ে যায় । পরক্ষণেই বাইনোকুলার ডোবার পাড়ের কচুপাতার ঝোপে ছুঁড়ে দিয়ে চিৎকার করে ওঠে ―“ দাদাভাই ..." তারপর জলে ঝাঁপ দেয় ।


জলের মধ্যে ডুবতে ডুবতে মা ঠাম্মার মুখ মনে পড়ে। অসহ্য কষ্টের মধ্যেই ঋষি টের পায় একটা হাত এসে তার চুল খামচে ধরলো । তারপরেই একবুক বাতাস টানতে পারে সে। তাকে প্রাণপণে পাড়ের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তার ছোট্ট বনু ।


একটু বাদে ঘাসের উপর শুয়ে পড়ে ধাতস্থ হতে সময় নেয় ঋষি । হঠাৎ তার খেয়াল হয় পাশে বসে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলেছে বনু । সবচেয়ে বড় বিস্ময় বনু কথা বলছে ! কিন্তু এগুলো কী বলছে বনু !

“ তুমি এত্তো বড় পোলা হইয়া জলে ডরাও তুমি সত্যই সাঁতার জানোনা আমি হেইডা জানুম ক্যামনে কও .." বলে আবার কাঁদতে যায় বুল্টি ।

“আরে দাঁড়া দাঁড়া । কী বলছিস ! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না । তুই কথা বলছিস বনু এটা তো দারুণ খবর । চল সবাইকে বলি । ” বলে ঋষি ।

“আরে খাড়াও । এই রকম জল চুপচুপে দুজনকে দেখলে হোগগলে আমাগো পিডাইবো ..অ তুমি তো আবার এই ভাষা বুঝবে না । আমাদের এরকম জলে ভেজা দেখলে সবাই পেটাবে । ”

বুল্টির নির্দেশে সকলের চোখ এড়াতে বাগানের একদম শেষ কোণায় চলে যায় ঋষি । জঙ্গলের ভিতরে বড়বড় গাছের আড়ালে একটা জং ধরা লোহার ঘোরানো সিঁড়ি । সিঁড়ির গায়েও কিছু জংলি বেগুনি লতা ইচ্ছামত পেঁচিয়ে আছে । তার মধ্যে দিয়েই সাবধানে পা ফেলে উঠতে থাকে ঋষি। দোতলায় একটা কাঠের দরজা। তাতে একটা মাকড়শার জাল ঢাকা ছোট্ট তালা ঝুলছে।

“ এ বাবা !এতো তালা দেওয়া রে বনু । ”

“ খাড়াও । মানে দাঁড়াও ।চাবি আমার গলায় । " ঋষিকে অবাক করে দিয়ে নিজের গলার লম্বা রুপোর চেন একটা লম্বাটে রুপোর কবচের মত লকেট সমেত বাইরে বের করে আনে বুল্টি । কবচের উপর মা কালীর মূর্তি । তার উপর বিশেষ কায়দায় চাপ দিতেই কবচটি খুলে যায় । ভিতরে একটা চাবি দুটো ছোট ছোট আংটা দিয়ে শক্ত করে আটকানো । চাবিটা একটু শক্তি প্রয়োগ করে বার করে নেয় ঋষি । তারপর তালা খুলে ভিতরে ঢুকে দেখে একটা ধুলো পড়া বিশাল বারান্দা । বহুদিন বাড়ির এই জীর্ণ অংশে কেউ আসেনি । দুজনে প্রায় দৌড়ে পরপর দুটি ইংরেজি এল অক্ষরের মতো লাগোয়া দুটি বারান্দা পেরিয়ে একটা গ্রিলের গেট খুলে ঢুকে পড়ে চেনা জায়গায় । এরপর স্বাভাবিক ভাবে নিজের ঘরে ঢুকে যায় ঋষি । বনু নিচে নেমে যায়। দুপুরে খেয়েদেয়ে ছাদে গিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দেবে বলে কথা দেয় সে ।


নিচে বেশ খুশির উল্লাসধ্বনি শোনা গেল । সবাই খুশি আচমকা বুল্টিকে কথা বলতে শুনে । ঘরের লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ঋষি । আজ আর একটু হলেই তার প্রাণ চলে যেত ভেবে শরীর জুড়ে কাঁপুনি অনুভব করে ঋষি ।মায়ের বারণ শুনলে এভাবে দুর্ঘটনায় পড়তে হতো না । ঠাম্মা শুনলে বিকেলেই বাড়ি রওয়ানা দেবেন ।ভাগ্যিস সকালে মোবাইল চার্জে বসানো ছিল ।পকেটে থাকলে নষ্ট হয়ে যেত । এখন অনেক প্রশ্ন তার মাথায় কিলবিল করছে । কিছু একটা রহস্য তো আছেই এবাড়িতে । সেটা ভেদ না করা পর্যন্ত কাউকে এ ঘটনা জানানো যাবে না । ঠাম্মা তার বেস্ট ফ্রেন্ড , তাকেও জানানো যাবে না ।


...


শীতের দুপুরে ছাদের উপর বড় বড় গাছেদের মাঝখানের ফাঁকফোঁকর চুঁইয়ে আসা হাল্কা রোদে পিঠ দিয়ে মাদুরে বসে কদবেল মাখা খেতে এত ভালো লাগে ঋষির জানা ছিল না । তারপর গাছের ডাঁসা পেয়ারা ছুরি দিয়ে কেটে কেটে বাড়িতে তৈরি ঝালনুন মাখিয়ে খায় দুজনে ।


“ এবার বল । "
“ হ কইতাসি ..না না বলছি । এখানকার ভাষায় বলছি । তখন আমি ভীষণ ছোটো ।মা বাবাকে অনেক বোঝাতো বাবা যেন খারাপ লোকেদের সঙ্গে না মেশেন । কিন্তু বাবা কথা শুনতেন না । তারপর এই বাড়িতে আসি আমরা । বাবা রাত্রে একটা টর্চ নিয়ে বের হয়ে যেতেন। আমায় গলার এই তাবিজ বানিয়ে দিয়েছিলেন। এক বর্ষার রাতে বাবা মাকে ডেকে তুললেন। বললেন অনেক কিছু পেয়েছেন । এবার আমরা বিরাট বড়লোক হয়ে যাবো । মা প্রশ্ন করাতে বাবা আমাকে কোলে নিয়ে মাকে নিয়ে দোতলায় উঠে কত অন্ধকার পেরিয়ে একটা দরজা খুলে ওই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেন । একদম সীমানা ঘেঁষে ডোবার ঐধার ঘেঁষে হেঁটে চললেন মজা পুকুরের দিকে । তারপর রেলিং এর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
 “এখানেই সব আছে । অনেক ধনরত্ন খাজনা এখান থেকে নদী পথে আসতো সবার চোখের আড়ালে । ডাকাতি ঠেকানোর জন্য । ঠাকুরদার লেখায় এরকম ইঙ্গিত পেয়েছি আমি । "

সেদিন মা ভয় পেয়ে আমায় কোলে নিয়ে বাড়ির দিকে চলে আসেন । বাবা বলছিলেন এখনো কিছুই পাননি খুঁজে ।কিন্তু কিছু বাজে লোককে কিছু গোপনীয় কথা বলে ফেলেছেন । তারা একদিন ঠিক আসবে । 

এর বেশ কিছুদিন বাদেই রাতের বেলা অনেক লোকের চিৎকার । চারিদিকে মশালের আলো । বাবাকে দুজন লোক এসে বললো কোথায় আছে সব সোনা দানা না দেখিয়ে দিলে বাবাকে মেরে ফেলবে । লোকগুলো বাবাকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল মা চিৎকার করে পিছনে ছুটলেন আমিও মায়ের পিছনে ছুটলাম । মজা পুকুরের জঙ্গলের ভিতরে বাবা দৌড়ে নেমে গেলেন । ওরা জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে দিল । দুমদাম আওয়াজ হচ্ছিল । বোধহয় ওরা গুলি করছিল মা আমাকে একটা ময়লা ফেলার গর্তের ভিতর ফেলে দিলেন । তারপর আমার আর কিছুই মনে নেই । " চোখ ভরা জল নিয়ে চুপ করে যায় বুল্টি ।

“ আমাকে এখুনি একবার জায়গাটা দেখাতে পারবি বনু ? সবাই লেপ চাপা দিয়ে ঘুমাচ্ছে এই ফাঁকে আমরা দেখে আসি । চল । ছুরিটা নে সঙ্গে।" বলে ঋষি ।

“ চল । ” 

ছাদের জলের ট্যাঙ্কের গায়ে লাগানো কল খুলে হাত মুখ ধুয়ে নেয় দুজনে । তারপর চুপিচুপি নেমে আসে দোতলায় বারান্দার শেষ প্রান্তে সেই গ্রিলের গেট খুলে আবার নিঃশব্দে সেটা লাগিয়ে দেয় বুল্টি । এরপর আবার সেই এল আকৃতির দুটি বারান্দা পেরিয়ে পৌঁছে যায় সেই দরজার সামনে । বাইরে বেরিয়ে সাবধানে পা ফেলে নেমে আসে নীচে । সিঁড়ি দিয়ে নেমে বুল্টি মাটিতে ইশারা করে কিছু দেখায় । ভালোভাবে লক্ষ্য করে ঋষি বুঝতে পারে একটি হালকা পায়ে হাঁটা পথ প্রায় পাঁচিলের গা ঘেঁষে জঙ্গলে ঢুকে গেছে । দুজনে দুজনের দিকে একবার তাকিয়ে নেয় । তারপর বুল্টি আগে হাঁটতে শুরু করে । মাঝে মাঝেই থেমে দুজনে ওই হাঁটা পথে পাতা সরায় পা দিয়ে । ঋষি একটু খুঁজেই বেশ বড় একটা শুকনো ডাল খুঁজে পেয়ে যায় । এবার সে ওই ডাল দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে করতে চলে । মোটামুটি সীমানার পাঁচিলের থেকে দু'ফুট দূর দিয়েই তারা সোজা হাঁটছে । একটু বাদেই বাঁ দিকের ঘন গাছের আড়ালে ডোবাটা দেখতে পায় ঋষি । সকালের দমবন্ধ অবস্থার কথা মনে পড়ে ।
বেশ কয়েক মিটার দূরত্বে এসে তারা মজা পুকুরটি দেখতে পায় । পাঁচিলের গা ঘেঁষে জমিটা বেশ খানিকটা ঢালু হয়ে গেছে । সামনে গাছের প্রহরা থাকায় বোঝা যায় না পাঁচিল এত নিচ থেকে গেঁথে তোলা হয়েছে । ঋষি বুঝতে পারে বাড়ির দিক থেকে কেউ এদিকে তাকালেও তাদের পরিষ্কার দেখতে পাবে না ।


রেলিং ঘেরা জায়গার সামনে এসে তারা দেখে রেলিংটি অনেকটা ভাঙা । সেখান দিয়ে দুজনে ভিতরে ঢোকে । হঠাৎ সরসর করে কী একটা প্রাণী ঋষির পাশ দিয়ে মজা পুকুরের ভিতরে দৌড়ে একপাঁজা ইঁটের পিছনে পালায় । ঋষি বেজায় চমকে ওঠে । বুল্টি মুখে চাপা দিয়ে হাসি সামলায় । তারপর ফিসফিস করে বলে,

“শহুরে পোলা নেউল দেইখ্যা ডরায় ..ওটা বেজি দাদাভাই । বেজি আছে মানে এখানে সাপ নেই । ওটা ওর ঘর ।”

“বেশি পাকামি করবি না । আমাদের অনেকটা নীচে নামতে হবে । কিছু তো আছেই নিচে । পায়ে হাঁটা পথটা প্রায় বোঝাই যাচ্ছে না , তবু চেষ্টা তো করতেই হবে । সব রহস্যের জট খুলবে এখানে ।” ধীরে ধীরে বলে ঋষি ।


অল্প ঢালু হয়ে আগাছা আর জঞ্জালে ভর্তি মজা পুকুরের গা বেয়ে তারা নিচের দিকে সাবধানে থেমে থেমে নামতে থাকে । 

একটু বাদে একজায়গায় তারা থামতে বাধ্য হয় । পথটা দু'ভাগে ভাগ হয়ে গিয়ে একভাগ বাঁ দিকে বেঁকে মজা পুকুরের কেন্দ্রের দিকে চলে গেছে অন্য ভাগ অল্প ডানদিকে বেঁকে নিচের দিকে চলে গেছে । বুল্টি একটু ভাবে চোখ বন্ধ করে তারপর বলে ,
“ দাদাভাই , অস্পষ্ট ভাবে মনে আছে বাবা ডানদিকে কোনাকুনি ভাবে দৌড়ে নেমে গিয়েছিলেন । চলো । "


দুজনে এবার একটু জোর পায়ে নেমে চলে । অনেকটা নামার পর বড় বড় ইঁট পাথরের একটা প্রায় গোলাকার স্তূপের কাছে এসে পৌঁছায় । কী আশ্চর্য ব্যাপার এটা উপর থেকে দেখাই যায় না । কারণ আগুনে পুড়ে পুরো জায়গাটা কালো হয়ে গেছে তারপর জঙ্গল জন্মেছে । সামনে এলে বোঝা যায় এগুলো পাথর আর ইঁট । কিন্তু পুকুরের এক ধার ঘেঁষে এসব কে ফেলে রেখেছে। আর কেন ?


স্তূপাকৃত ইঁট পাথরের পিছন দিকে যায় দুজনে । বেশ বোঝা যায় একটা গর্তের মুখ । সামনে সাপের মত বুনো লতা ঝুলছে । বুল্টির হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে লতা গাছ গুলো কাটতে শুরু করে ঋষি ।

“ বুঝতে পারছিস ? এটা একটা সুড়ঙ্গ । আন্টি মানে তোর মা মারা যাওয়ার আগে এর কথাই বলেছিলেন মনে হচ্ছে রে বনু । দাঁড়া আমি ভিতরে ঢুকি । তারপর তোকে ডাকবো । যদি মিনিট দশেকের মধ্যে না বার হয়ে আসি তাহলে বাড়িতে খবর দিবি ।" বলে ঋষি ।

"কি কইতাস তুমি ! আমাকে বাচ্ছা ঠাউরেছ নাকি ! আমি তোমার সঙ্গে যাবো দাদাভাই । চলো। "


পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে ঋষি । এখন সাড়ে চারটে । বড় বড় গাছের ছায়ায় তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামে । এখন বনুর সাথে তর্ক করতে গেলে বিপদে পড়তে হবে । কথা না বাড়িয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকে যায় সে । পিছনে তার বনু । সুড়ঙ্গ ডান দিকে বেঁকে গিয়েছে । উপর থেকে যাতে না দেখা যায় তাই সুড়ঙ্গের মুখ দাদুর ছাতার বাঁটের মত ঘুরিয়ে করা হয়েছে বলে মনে হয় ঋষির । ডানদিকে ঘুরে সে দেখে তার ধারণাই ঠিক লম্বা সরু একটা পথ ক্রমশ অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে । মোবাইলের টর্চ জ্বেলে নেয় ঋষি । দুজনে সামনে হাঁটে ।


“ এখান থেকে নদী কত দূরে রে বনু ? "

“ খুব দূরে নয় । "


“আরে ওটা কী! " চমকে উঠে বলে ঋষি । 

একটু দূরেই শ্যাওলা ধরা দেওয়ালের বেশ কিছুটা অংশ ভেঙে পড়েছে । তার সামনে গিয়ে দুজনে দেখে একটা শাবল পড়ে । মাটির চাঙ্গরের ভিতর একটা বাক্স মতো কিছু আর একটা কঙ্কালের হাত দেখা যাচ্ছে । 


“ বাবা ! হাতে পলা বাঁধানো আংটি! " 

ডুকরে কেঁদে ওঠে বুল্টি । তারপর দুহাতে ছোট ছোট চাঙ্গরগুলো সরাতে থাকে । ঋষি পটাপট কয়েকটা ফোটো তুলে নেয় । তারপর সেও চাঙ্গর সরাতে থাকে । একটা ধুলো মাখা কঙ্কাল দুহাতে একটা পুরোনো কাঠের বাক্স আঁকড়ে ধরে আছে । জোরে কেঁদে ওঠে বুল্টি । ঋষি ওকে ধরে পেছনে টেনে আনে । তারপর বলে 

“ এটা পুলিশ কেস রে বনু ।ধরিস না । পাশের দেওয়ালে দেখ .."


দেওয়ালের কিছু অংশ ধসে পড়েছিল আগেই । বাকি অংশ খেয়াল করে দেখলে বোঝা যায় ওটা দেওয়াল আলমারি গোছের কিছু । ফাটাফাটা অংশের মধ্যে দিয়ে আরো একটা বাক্সের কোনা দেখা যাচ্ছে ।


“ গুপ্তধন । আমার ঠাকুরদার বাবার বাংলাদেশের এক জায়গায় জমিদারি ছিল । মনে হয় নদীপথে সেগুলো এনে এখানে লুকিয়ে রাখা হতো । চল একটা বাক্স খুলে দেখি কী আছে ।” হাতে শাবলটা উঠিয়ে নিয়ে যে বাক্সটার মাথার দিকটা ভাঙা ছিল তার গায়ে সজোরে আঘাত করে ঋষি ।

ঝন ঝন করে তিন চারখানা সোনালী চাকতি মাটিতে ঝরে পড়ে । তার পিছনেই চোখের পলকে সরসর করে নেমে আসে প্রকান্ড ফণাওয়ালা এক বিষাক্ত ক্রুদ্ধ কেউটে ।

“দাদাভাই ! পালাও ।" 
বলে ঋষির হাতে টান দিয়ে দৌড়ায় বুল্টি । হতভম্ব ঋষি একই দিনে দুবার সাক্ষাৎ যমের মুখোমুখি হয়ে মনোবল হারিয়ে দৌড়াতে থাকে মরিয়া হয়ে ।


আধঘন্টা বাদে হরিহর দাদু আর অনিল দাদু দুটো মোটা লাঠি আর মশাল হাতে সুড়ঙ্গ থেকে দেওয়ালের ভিতরে থাকা বাক্সটা বার করে এনে পুলিশে খবর দেয় । সুড়ঙ্গ থেকে বার করে অম্বরের কঙ্কাল আর তার আঁকড়ে ধরে থাকা বাক্স নিয়ে যায় পুলিশ । দশটার মধ্যে প্রীতমরা পৌঁছে যান । বাড়িতে পুলিশ পোস্টিং হয় রাতে ।
....


কাগজের রিপোর্টার টিভি চ্যানেলের সাক্ষাৎকার পুলিশের জেরা সব সেরে রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বসার ঘরে সবাই জড়ো হন । একটা ঝড় বয়ে গেছে পুরো পরিবারের উপর দিয়ে । দুটো ক্ষুদে সদস্য একজন ক্লাস সিক্স একজন ফোর ..তাদের উপস্থিত বুদ্ধি এবং গোয়েন্দাগিরির ফলে পরিবারের এতবড় ইতিহাস উন্মোচিত হলো । সুড়ঙ্গ থেকে আনা বাক্সটি এনে সেটার ঢাকনা সাবধানে ভাঙা হয়েছে ছাদে নিয়ে গিয়ে । যদি আরো সাপখোপ থাকে এই আশঙ্কায় । সেটা নামিয়ে এনে বসার ঘরে রাখেন হরিহর । সাবধানে ভিতরের সোনার টাকা বার করতে থাকেন অনিল ।
ভিতর থেকে একটা ছোট রূপার বাক্স বার করে এনে প্রীতমের হাতে দেন অনিল । বাক্স খুলে প্রীতম বার করে আনেন একটি ভাঁজ করা কাগজ । সেটা একটি অতি পুরোনো চিঠি । প্রীতম জোরে জোরে পড়েন


“ এই বাক্সে গচ্ছিত সোনা ডানা সবই
প্রজাদের উপর জোর জুলুম করে আদায় করা খাজনার টাকা থেকে কেনা । আমার যে উত্তরপুরুষ এর সন্ধান পাবে তার উপর আমার আদেশ রইলো সে যেন এর থেকে যৎসামান্য নিজের কাছে রেখে বাকিটা কোনো হাসপাতাল তৈরির কাজে ব্যবহার করে । অনেক অভিশাপ আর অনেক কান্না লেগে আছে এর গায়ে । এগুলো লুকিয়ে রেখে গেলাম । কিছুতেই হাতে ধরে ধ্বংস করতে পারলাম না । তোমাদের সবার মঙ্গল হোক "
আশীর্বাদক
শ্রী বিল্বমঙ্গল গঙ্গোপাধ্যায়


সবাই চুপ করে থাকে । ঠাম্মা বলেন 

“সেই ভালো পুতু । ওর থেকে পাঁচ খানা মোহর অনিলকে পাঁচখানা হরিহরকে আর পাঁচখানা আমাদের জন্য রাখ । বাকি সব বিক্রি করে ওই মজা পুকুরের উপরেই হাসপাতাল তৈরি করে দে। বিল্বমঙ্গল সেবাসদন । বিনামূল্যে চিকিৎসা করিস বাবা । সবাই তোকে আশীর্বাদ করবেন । "

“ তাই হবে মা । তাই হবে । মা আমরা কাল সকালে বের হবো । বুল্টিকে সঙ্গে নিয়ে যাবো । ও আমাদের কাছেই থাকবে । পড়াশোনা করবে । ঠিক আছে ? যা বুল্টি জামাকাপড় গুছিয়ে নে । "

প্রীতমের কথা শুনে বুল্টি হাসিমুখে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ায় । পিছনে তার প্রিয় দাদাভাই।।


অলঙ্করণ : আবির

গল্পের ঝুলি : দেঙ্গা অচাই : রাজীবকুমার সাহা






বিধবার একমাত্র ছেলে। ভারি কুঁড়ে সে। কাজে মন নেই, কম্মে মন নেই - শুধু খায়দায়, আর পড়ে পড়ে ঘুমোয়। সঙ্গীসাথী জুটিয়ে মাঠঘাট দাপিয়ে বেড়াবে, সে ইচ্ছেটুকুও তার নেই।

বিধবা পড়ল মহা ফাঁপরে। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। তার না ছিল নিজস্ব জমিজিরেত, না ছিল একমুঠো অর্থ সঞ্চয়। পরের জমিতে মজুর খেটেই দিন কাটে তার।

একদিন সে এক ফন্দি আঁটলে। গাঁয়ের চৌধুরীর (মোড়ল) হাতেপায়ে ধরে একটুকরো জুমের জমি চেয়ে নিলে আধাআধি ফসলের শর্তে। ঘরে ফিরে ছেলেকে ডেকে বললে, “বাবা, একটু জুমের ব্যবস্থা হয়েছে চৌধুরীর কাছ থেকে। এখন তো জমি তৈরির সময়, চারদিকে দ্যাখ জুম পোড়াচ্ছে সবাই। তুইও বাবা কাল সকালে জুম কাটতে যাস। আমি গোদক-পান্তা মেখে রেখে যাব, খেয়ে যাস।”

বিধবা বিলক্ষণ জানত যে, অলস মানুষের গড়ার চেয়ে ধ্বংসের দিকে আকর্ষণ থাকে প্রবল। তাই ছেলে কথার সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলেও সে আশ্চর্য হল না বিন্দুমাত্র।

পরদিন বিধবা কাজে বেরিয়ে গেলে ছেলেও টাক্কল (দা বিশেষ) হাতে বেরিয়ে পড়ল বর্গা-ক্ষেতের উদ্দেশ্যে। মনটা বেশ ফুরফুর করছে তার আজ।

বিধবা সন্ধের মুখে ঘরে ফিরে দেখে ছেলে মাচার বিছানায় মহা আয়েশে গড়াচ্ছে। বিধবা জানতে চাইলে, “কী রে, জুম কেটেছিস তো? ফিরলি কখন?”

ছেলে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ হ্যাঁ মা, সব আগাছা কেটে শুকোতে দিয়ে এসেছি। দু'দিন যাক, আগুন দেব। তুমি কিচ্ছু ভেবো না।”

শুনে বিধবা একটা মোরগ কেটে ফেললে তক্ষুনি। রাতে জমিয়ে রান্না হবে। কিন্তু আলসে ছেলে যে জুমে গিয়ে শুধুমাত্র একটা ঘিলা লতার গোড়া কেটেই ফিরে এসেছে সে আর বিধবা জানতে পারলে না।

তারপর জুমে আগুন দেওয়ার সময় এলে বিধবা ছেলেকে সে-কাজের সমস্ত জোগাড়যন্ত্র করে দিলে। শুকনো জুমের আগাছায় গিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলেই হয় না, সে-কাজ করতে হয় বিশেষ নিয়মরীতি মেনে। নইলে অনর্থ অবধারিত। মা ছেলেকে সাত জুমের মাটি, সাত পুকুরের জল আর সাতটা মশাল হাতে দিয়ে পই পই করে বলে দিলে সে যেন সমস্ত দেবদেবীর বন্দনা করে, আচার-বিচার মেনে তবে জুমে আগুন দেয়। কোনও প্রাণী যেন বিন্দুমাত্র আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, সেদিকে যেন বিশেষ খেয়াল রাখে। জুমে পৌঁছেই যেন সে তাদের বন্দনা করে জুম ত্যাগ করার অনুরোধ জানাতে ভুল না করে।

ছেলে তো জুমে পা দিয়েই শুকনো ঘিলা লতায় আগুন ঠেকিয়ে দিয়েছে। অত হাঙ্গাম আর কে করবে! সারা জুমে ছাড়া ছাড়া আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।

ওদিকে বিধবা রীতি অনুযায়ী বাড়িতে এক কলসি জল চালুনি দিয়ে ঢেকে ওপরে একটা হাতপাখা রেখে দিয়েছে। জুম পুড়ে ছেলে ফিরলে এ দিয়ে কর্ম আছে।

এদিকে জুমে ঘটে গেছে এক অঘটন। ঘিলা লতাটার নিচেই ছিল নাগরাজের গর্ত। ছেলেপিলেরা তার সব পুড়ে মরেছে। নাগরাজা তখন বেরিয়েছে আহারের সন্ধানে। ফিরে এসে সে গর্তের ধারেই ঘেঁষতে পারলে না দাউ দাউ আগুনের তাপে। প্রচণ্ড ক্রোধে সে বিধবার বাড়ি উপস্থিত হয়ে সাতপাকে বিধবার ঘর জড়িয়ে ফুঁসতে লাগল আক্রোশে। বিধবা আতঙ্কে কাঁটা হয়ে ঘরবন্দি হয়ে রইল। গাঁয়ের মানুষেরা কাছেও ঘেঁষতে পারলে না সেই বিশালদেহী নাগের। বিধবা বিলক্ষণ টের পেয়ে গেল যে জুমে নিশ্চয়ই কোনও অঘটন ঘটিয়েছে ছেলে। তার বলে দেওয়া নিয়মরীতি মান্য করেনি সে।

জুমে সাত পুকুরের জল ছিটিয়ে ছেলে ফিরে এল খানিক বাদেই। উঠোনে পা দিতেই নাগরাজার অভ্রভেদী গর্জনে সাত পা পিছিয়ে গেল তক্ষুনি। চোখেমুখে মরণাতঙ্ক। কোনওমতে উঁচু গলায় মায়ের কাছে উপস্থিত কর্তব্য জানতে চাইলে বিধবা উপায় বাতলায়। বলে, “শিগগির একটা কালো মোরগ, অল্প খই, এক বোতল চুয়াক (মদ্য বিশেষ), এক টুকরো কাঁচা হলুদ, টাক্কল আর কলাপাতার আগা একটা নিয়ে দৌড়ে বনে যা। গিয়ে তোর মামাকে ডাকবি। তিনিই বাকি কাজ দেখিয়ে দেবেন। যা বাবা, দেরি করিসনি একটুকুও।”

মায়ের কথামতো ছেলে ব্যস্ত হাতে সব জোগাড়যন্ত্র করে বনের গভীরে গিয়ে ‘মামা, মামা’ বলে চেঁচিয়ে ডাকতেই পাশের লুঙ্গা (দুই টিলার মধ্যবর্তী উপত্যকা) থেকে সাড়া দিল দীর্ঘদেহী এক বৃদ্ধ। পরনে তার লেংটি, মিশমিশে কালো তার গায়ের রং। লম্বা লম্বা পা ফেলে সামনে এসে দাঁড়াতেই ছেলে শুধোয়, “তুমিই কি আমার মামা?”

বৃদ্ধ সম্মতি জানাতেই ছেলেটা সব বৃত্তান্ত খুলে বলে এই বিপদ থেকে পরিত্রাণের উপায় জানতে চায়।

বৃদ্ধ আদেশ করে, “কয়েকটা মুলি বাঁশের আগা কেটে এনে একটা জায়গা বেড় দিয়ে পুঁতে দিয়ে ওই নাগকে খিলি দে আগে। আমি মন্ত্র পড়ে দিচ্ছি।”

ছেলে তাই করল। বৃদ্ধ মন্ত্র পড়া শেষ করে ওই বাঁশের বেড়ের মধ্যের জায়গায় কলাপাতার আগাটা বিছিয়ে দিয়ে ওপরে টাক্কলটা রাখতে বলেই আবার মন্ত্র পড়া শুরু করল। স্থির দেহ, নিমীলিত চোখ, ঠোঁটদুটো কাঁপছে শুধু। পাশে বসে এই অচেনা বৃদ্ধের মুখের পানে ভয়ার্ত চোখে অপলক তাকিয়ে রইল ছেলে।

মন্ত্র পড়া শেষ করে বৃদ্ধ আচমকা চোখ খুলতেই আঁতকে উঠল ছেলে। অমন রক্তজবার মতো লাল চোখ সে ইহজীবনে দেখেনি। বৃদ্ধর গম্ভীর গলা গমগম করে উঠল, “এবার টাক্কলটা দিয়ে কলাপাতাটা সাত টুকরো করে ফেল।”

ছেলেটা সাত পোঁচে কলাপাতা কেটে ফেলল।

পুজো শেষে বৃদ্ধ ছেলেকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলে, “যা, এবারে বাড়ি যা। আর ভয় নেই। তবে মনে রাখিস, আজকের পর হাজার ডাকাডাকি করলেও আমার দেখা পাবি না আর। যখন যা প্রয়োজন তোর মা-ই বলে দিতে পারবে। আমি তাকে সে-শক্তি দিলাম।”

দ্বিধাগ্রস্ত মনে বাড়ি ফিরে এল ছেলে। দেখে নাগের শরীর সাত টুকরো হয়ে পড়ে রয়েছে অদৃশ্য কোন অস্ত্রের আঘাতে। গ্রামবাসী আনন্দে চিৎকার চেচাঁমেচি জুড়েছে। হাসিমুখে উঠোনে নেমে দাঁড়িয়েছে তার মা। সবকথা খুলে বলে সে। চারদিকে জয়ধ্বনি ওঠে বুড়াদেবতা বুড়াসার।

সেদিন থেকে কেউ কোনও বিপদ-আপদে বা অসুখ-বিসুখে পড়লে পুজো দেয় বুড়াসার। অচাই (পুরোহিত) হয় ছেলেটা। যারা এই পুজোর পুরুতগিরি করে তাদের বলে দেঙ্গা অচাই (কুঁড়ে পুরোহিত)।

-----

(ত্রিপুরদেশের লোককাহিনি)


অলঙ্করণ : স্বর্ণদ্বীপ চৌধুরী

গল্পের ঝুলি : সাহেব বাড়ির জঙ্গলে : সায়ন্তনী পলমল ঘোষ




“ এবারও ওই ঘন্টাওয়ালার ছেলে ফাস্ট হয়ে গেল আর তুই শ্রীধর পালুইয়ের ছেলে হয়ে প্রথম পাঁচজনের বাইরে! দ্যাখো দ্যাখো তোমার ছেলের কীর্তি। আবার পয়লা জানুয়ারি বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিক করবে বলে টাকা চাওয়া হচ্ছিল!”

“ হ্যাঁর, পল্টু, তোর পেছনে তোর বাবা যে এতগুলা মাস্টার দিয়েছে তাতে লাভটা কি হলো শুনি?”

বাবা-মায়ের উপর্যুপরি আক্রমণে ঘাড় গোঁজ করে চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে রইল পল্টু। মনের ভেতরে তার দাবানলের আগুন। ওই ঘন্টাওয়ালার ছেলে কৃষ্ণকে সে দেখে নেবে। সুন্দরগড় গ্রামের রানুবালা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্লাস নাইনের ছাত্র পল্টু। তার বাবা শ্রীধর পালুই মস্ত আড়ৎদার। গ্রামের অন্যতম ধনী ব্যক্তি, সেই কারণে তাঁদের পুরো পরিবারেরই অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। ছেলের পড়াশোনার জন্য হয়ত প্রয়োজনের অতিরিক্তই তিনি খরচ করেন। তাঁর ছেলেকে কেউ টপকে যাবে এটা মানতে তাঁর ভীষণ কষ্ট। পল্টুও সহজে মেনে নিতে পারে না কিন্তু মুশকিল হলো সে কোনও দিনই একেবারে প্রথম দিকে থাকতে পারে না। কৃষ্ণ, অর্ক, মোহন, জিৎ এরা সবাই তার চেয়ে এগিয়ে থাকে। এদের কাউকেই পল্টু সহ্য করতে পারে না তবে তার সবচেয়ে বেশী রাগ ফার্স্ট বয় কৃষ্ণর ওপর। কৃষ্ণ ক্লাসে প্রথম হয় বলে যতটা না কৃষ্ণ স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীর ছেলে হয়ে 
ফার্স্ট হয় সেইজন্য বোধহয় রাগটা আরও বেশি। বাকিদের সবার আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো। কৃষ্ণকে নিয়ে অবশ্য পল্টু ছাড়া আর কারুর কোনও সমস্যা নেই বরং স্কুলের শিক্ষকরা থেকে শুরু করে ছাত্ররা সবাই তার মধুর ব্যবহারের জন্য তাকে খুব ভালোবাসে। কৃষ্ণর বাবা স্কুলে ঘন্টা বাজায়। সেই ঘন্টাওয়ালার ছেলে হয়ে কৃষ্ণ ক্লাসে ফার্স্ট হবে, সবার নয়নের মণি হয়ে থাকবে এটা ভাবলেই পল্টুর মাথায় আগুন জ্বলে যায়।

প্রীতম স্যারের বাড়ি থেকে ফিরছিল কৃষ্ণ। স্যারেরা তাকে খুব সাহায্য করেন। বিনা পয়সায় পড়া বুঝিয়ে দেন। কৃষ্ণও তাঁদের এই ভালোবাসা, বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার চেষ্টা করে। শীতের বিকেল বলে দিনের আলো থাকলেও এখনই বেশ ঠান্ডা লাগছে। হাঁটতে হাঁটতে কৃষ্ণ যখন ফুটবল মাঠের কাছে এসেছে তখনই শুনতে পেল, “ কৃষ্ণ একটু এদিকে শুনবি ভাই।” কৃষ্ণ অবাক হয়ে গেল বিনোদকে দেখে। বিনোদ পল্টুর খুব ভালো বন্ধু। ওদের একটা দলও আছে। ওরা যে কেউ কৃষ্ণকে খুব একটা পছন্দ করে না সেটাও কৃষ্ণর খুব ভালো করেই জানা আছে। আজ হঠাৎ বিনোদ ওকে ডাকছে কেন! “ ভাই, তুই কি আমার ওপর রাগ করেছিস?” নরম গলায় বলল বিনোদ।

“ না, না তা কেন? কী বলছিস বল না?”

“ ভাই, এই অংকগুলো আমাকে একটু বুঝিয়ে দিবি? বুঝতেই তো পারছিস পল্টু জানলে আমাকে...।” মাথা নিচু করে বলে বিনোদ।

“ আচ্ছা ঠিক আছে। আমি বুঝিয়ে দেব।” স্মিত হেসে বলে কৃষ্ণ।

“ তাহলে ওই গাছটার তলায় বসে চট করে বুঝিয়ে দে। এখানে কেউ আমাদের দেখতে পাবে না। এখনও দিনের আলো যায়নি। সব ক'টা অঙ্কই হয়ে যাবে।”

“ আচ্ছা, চল।”



আস্তে আস্তে চোখ মিলে তাকালো কৃষ্ণ। মাথার ওপর তারায় ভরা রাতের আকাশ। প্রথমে খানিকক্ষণ মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল তারপর আস্তে আস্তে সব মনে পড়লো তার। বিনোদ তাকে বটগাছটার কাছে নিয়ে গেল তারপর তার মাথায় কেউ আঘাত করল। তারপর আর কিছু মনে নেই তার। ঠান্ডায় হাত-পা জমে যাওয়ার উপক্রম তাও উঠে বসার চেষ্টা করল কৃষ্ণ। সব বুঝতে পারছে সে। পল্টুরা একটা ফাঁদ পেতেছিল তার জন্য আর বোকার মত সেই ফাঁদে সে পা দিয়ে ফেলেছিল। রেজাল্ট বেরোনোর পরই জিৎ তাকে বলেছিল যে পল্টু রাগে ফুঁসছে তার ওপর কিন্তু ওরা এত মারাত্মক একটা কাজ করবে কৃষ্ণ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। কিন্তু এটা কোন জায়গা বুঝতে পারছে না সে। তার চেনা কোনও জায়গা নয়। উঠে বসে বোঝার চেষ্টা করলো কৃষ্ণ। সে একটা ফাঁকা জমিতে বসে আছে কিন্তু চারপাশে বড়, বড় গাছের জঙ্গল, ঝোপঝাড়। খানিক পরে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো কৃষ্ণর। এটা সাহেব বাড়ির জঙ্গল নয় তো? সুন্দরগড়ের উত্তর প্রান্তে এই সাহেব বাড়ির জঙ্গল। জ্ঞান হওয়া ইস্তক এই জঙ্গলের দুর্নাম শুনে আসছে কৃষ্ণ। তাদের গ্রামের কেউ এই জঙ্গলে ঢোকে না, বিশেষ করে সূর্য ডোবার পর তো নয়ই। দাদুর মুখে কৃষ্ণ শুনেছে সূর্যাস্তের পরে যারাই এই জঙ্গলে ঢুকেছে আর কোনও দিন বেরিয়ে আসেনি জঙ্গল থেকে। তারও কি এই অবস্থা হবে নাকি! কনকনে ঠান্ডা হওয়ায় হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ক্রমশ একটা অজানা ভয় জাঁকিয়ে বসছে তার মনে। নিজের বুকের ধুকপুক আওয়াজ নিজেই শুনতে পাচ্ছে কৃষ্ণ। “ বিপদে সব সময় মাথা ঠান্ডা রাখবে। দেখবে ঠিক পথের দিশা খুঁজে পাবে তুমি।” বাংলা স্যারের বলা কথাগুলো হঠাৎ করেই কৃষ্ণর মনে মধ্যে উঁকি দিল। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো সে। দুধসাদা জ্যোৎস্নায় চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। আন্দাজে ভর করে সে একদিকে হাঁটা শুরু করল। খানিকক্ষণ হাঁটার পর সে বুঝতে পারলো জঙ্গলের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে সে। এখানে চাঁদের আলোও ভালো ঢুকছে না। আবার দিক পরিবর্তন করে হাঁটা শুরু করল কৃষ্ণ। খিদেয় পেট কামড়াচ্ছে, ভীষণ শীত করছে কিন্তু সে নিরুপায়। কিছুটা হাঁটার পর অবাক হয়ে গেল কৃষ্ণ তার সামনে একটু উঁচু জমির ওপর একটি পুরানো আমলের বাংলো বাড়ি। কয়েক মুহূর্ত ভেবে সাহসে ভর করে এগিয়ে গেল সে। মনে মনে সে বুঝেই গেছে এই জঙ্গল থেকে বেঁচে ফেরা প্রায় অসম্ভব। তাহলে আর ভয় কী তার? শুধু বাড়ির সকলের জন্য মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তারা তো জানবেও না কৃষ্ণ কোথায়।



----- হু ? হু ইজ দেয়ার? 

নিখুঁত সাহেবি উচ্চারণ শুনে চমকে উঠল কৃষ্ণ। দোনামনা করে কেটে কেটে বলল,” আয়াম কৃষ্ণপ্রসাদ ঘোষ। আই লিভ ইন সুন্দরগড়।”

বাংলো থেকে কালো কোট প্যান্ট আর ফেল্ট হ্যাট পরা এক সাহেব বেরিয়ে এলেন।

-----ওহ, কাউয়ার্ড,ইললিটারেট বেঙ্গালি বয়।

“ কাওয়ার্ড, ইললিটারেট বেঙ্গালি” শব্দগুলো শুনেই কৃষ্ণর মাথাটা গরম হয়ে গেল।

-----টুমরা বাঙালিরা একডাম ওয়ার্থলেস আছো।

------আপনি এভাবে আমাদের অপমান করছেন কেন? 

ঝাঁঝিয়ে উঠলো কৃষ্ণ।

-----টুমি হামার সাথে এমনি বেহেভ করিতেছ। টুমি জানো হামি কে আছি?

----জানি না কিন্তু আপনি যেই হোন না কেন মোটেই ভালো মানুষ নন।

------ আয়াম জোস থমাস। আ রিয়াল ব্রিটিশ। দাম্ভিক কণ্ঠে বললেন সাহেব।

“ জোস থমাস” নামটা শুনেই চমকে উঠলো কৃষ্ণ। ওদের পাড়ার সুদীপকাকু কলকাতার একটা কলেজে ইতিহাস পড়ায়। সুদীপকাকু নিয়মিত ইতিহাস নিয়ে চর্চা করে। তার কাছেই কৃষ্ণ একবার শুনেছিল যে ইংরেজ আমলে তাদের এই সুন্দরগড়ে সাহেবদের খুব অত্যাচার ছিল। তেমনি এক সাহেব ছিলেন জোস থমাস। অত্যন্ত অহংকারী ছিলেন। প্রচন্ড জাত্যাভিমান ছিল তাঁর মধ্যে। নেটিভদের সংস্পর্শে থাকবেন না বলে গ্রামের বাইরে জঙ্গলের ধারে বাংলো বানিয়েছিলেন। তখন জঙ্গল আকারে এত বড় ছিল না। জোস থমাসের অত্যাচার দিনকে দিন বেড়েই চলছিল। একই সাথে সেইসময় সুন্দরগড় আর তার আশেপাশের গ্রামে গোপনে বিপ্লবী দল গড়ে উঠছিল। শেষে একদিন বিপ্লবীরা থমাসের বাংলো আক্রমণ করে এবং থমাসকে গুলি করে মারে। জনশ্রুতি থমাস মারা গেলেও তার আত্মা এই অঞ্চল ছেড়ে কোথাও যায়নি। থমাসের মৃত্যুর পরও অনেকে বাংলোর কাছাকাছি তাকে দেখতে পেত। থমাসের মৃত্যুর পর দুজন রাখালকে বাংলোর সামনে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। তারপর থেকে গ্রামের মানুষ বাংলো চত্বর এড়িয়ে চলতে শুরু করে। কালের নিয়মে ধীরে ধীরে জঙ্গল বেড়ে আরও এগিয়ে আসে আর সাহেবের বাংলো জঙ্গলের ভেতরে পড়ে যায়। তবে আজও সন্ধ্যের পর কেউ এই জঙ্গলে ঢুকলে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এই জঙ্গলে নাকি বিভিন্ন রকম অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা ঘটে তাই দিনের বেলাও পারতপক্ষে কেউ এদিক পানে আসে না। 



কৃষ্ণ বুঝতে পারলো সাক্ষাৎ মৃত্যু তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর বেঁচে ফেরার কোনও আশা নেই এই কথাটা উপলব্ধি করার সাথে সাথে কৃষ্ণর মনের মধ্যে থেকে সমস্ত ভয়,আশঙ্কা দূর হয়ে গেল। তার মনে হলো বহু বছর আগে যেমন একদল তরুণ বিপ্লবী থমাসকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল তেমনি আজ থমাস তাকে মেরে ফেলার আগে থমাসকে অন্তত দু'চার কথা হলেও শুনিয়ে যাবে সে। সাহেবের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলো সে, 

“বাঙালিরা যদি এতই কাউয়ার্ড তাহলে বাঙালিদের গুলি খেয়ে মারা গেলেন কেন? তাদের সাথে লড়াই করে তাদের হারাতে পারলেন না কেন?” 
সাহেবের ভূত খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। বোধহয় পুঁচকে একটা বাঙালী ছেলের সাহস দেখে একটু অবাক হলো। কয়েক মিনিট পর গলা ঝেড়ে সাহেব বলল, “ ওককে বাট বেঙ্গালীস আর সো ইললিটারেট।”

-----আপনি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শোনেন নি? জগদীশ চন্দ্র বসুর নাম শোনেন নি? আপনি বোধহয় তার আগেই ….। জানেন এখন সবাই কত লেখাপড়া করে। আমাকে দেখুন আমি হলাম রানীবালা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্লাস নাইনের ফার্স্ট বয়। স্যারেরা কত কিছু পড়ান আমাদের জানেন?

------ডু ইউ নো ইংলিশ, হিস্ট্রি, জিওগ্রাফি, ম্যাথস? সন্দিগ্ধ স্বরে বলল সাহেব।

------ইয়াহ। আই গট হান্ড্রেড আউট অফ হান্ড্রেড ইন ম্যাথস।

-----ওহ, রিয়ালি!

------আপনার কি সন্দেহ হচ্ছে নাকি?

------হুম, চল টাহলে টমার ম্যাথস টেস্ট নিই।

-----ঠিক আছে। চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্টেড। তবে একটা শর্ত আছে আমার যদি আমি অঙ্ক কষতে পারি আপনাকে এই জঙ্গল ছেড়ে চলে যেতে হবে।

একটু ভেবে সাহেব উত্তর দিলেন, “ ওকে, ডান।”



পুরো ঘরটা অন্ধকার শুধু মাঝখানে ছোট্ট একটা ডিম্বাকৃতি টেবিলের ওপর মোমদানিতে একটা মোমবাতি জ্বলছে। এখানে শীতটাও আর তেমন অনুভূত হচ্ছে না। টেবিলের দুই দিকে দুটি চেয়ার। এইটা বাংলোর সামনের ঘর। সাহেব এখানেই এনেছে কৃষ্ণকে অঙ্ক কষার জন্য। চেয়ারে বসে সাহেব কৃষ্ণর দিকে টেবিলে রাখা খাতা,পেনটা বাড়িয়ে দিল। সাহেবের মুখে মুচকি হাসি। খাতার পাতাটার দিকে তাকিয়েই কৃষ্ণর মুখটা শুকিয়ে গেল। সাদা পাতায় একটা অঙ্ক দেওয়া আছে কিন্তু এসব অঙ্ক তো কৃষ্ণ জানে না। এই ধরনের অঙ্ক রূপমদাদাকে কষতে দেখেছে কৃষ্ণ। রুপম দাদা কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অঙ্ক নিয়ে পড়ে। কৃষ্ণ সাহেবের চালাকিটা বুঝতে পারলো। তাকে এমন অঙ্ক দিয়েছে যা তার সাধ্যের বাইরে।

----পেনটা হাতে নাও।

কে যেন ফিসফিস করে কৃষ্ণর কানের কাছে বলল। একটু চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে পেনটা হাতে নিয়ে খাতাটা কাছে টেনে নিল কৃষ্ণ। সাহেব বাড়ির জঙ্গলে অনেক কিছুই হতে পারে। খাতায় বসাবার সাথে সাথে পেনটা উইসন বোল্টের গতিতে ছুটতে লাগলো। পাতার পর পাতা অঙ্ক কষে চলেছে কৃষ্ণ থুড়ি পেনটা। কৃষ্ণ শুধু পেনটা ধরে আছে। একসময় খাতার পাতা শেষ হলো। সব কটা অঙ্ক কষে ফেলেছে কৃষ্ণ। পেনটা নামিয়ে সাহেবের দিকে তাকালো সে। সাহেবের চোখদুটো গোল গোল হয়ে গেছে।

-----ইম্পসিবল। ইটস রিয়ালি ইম্পসিবল। ইউ কান্ট ডু দিস।

------কেন থমাস সাহেব? কেন করতে পারি না? বাঙালী বলে? আপনি তো হিন্দী সিরিয়ালের ভাটাকটি আত্মাদের মত এই জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এত বছর ধরে। বাঙালী যে এখন লিলুয়া থেকে লন্ডন, বনগাঁ থেকে বোস্টন সব জায়গায় নিজের ক্যারিশমা দেখিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সে খবর তো রাখেন না। বাঙালী সুভাষ চন্দ্র বসু কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন আপনার ব্রিটিশ সরকারকে। আচ্ছা, ভারত যে এখন স্বাধীন এই খবরটা জানেন নাকি সেটাও জানেন না?

-----কী বলিলে টুমি? ইন্ডিয়া ইজ নাও আ ইন্ডিপেন্ডেন্ট কান্ট্রি! 

চরম বিস্ময় সাহেবের গলায়।

------ইয়েস, স্যার। আপনার জাতভাইরা এদেশ ছেড়ে বহুদিন হল চলে গেছেন। তাই বলছি শর্ত অনুযায়ী আপনিও এবার এই জঙ্গল ছেড়ে চলে যান। এত বছরে অনেক জ্বালিয়েছেন এই অঞ্চলের লোকেদের।

সাহেব তুম্বো মুখ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। বোধহয় কৃষ্ণর কথাগুলো শুনে হজম করতে কষ্ট হচ্ছে।

-----কী হলো সাহেব? ব্রিটিশরা এককথার মানুষ বলে আমি শুনেছিলাম মনে হচ্ছে।

----ওককে, ওককে। আমি আর এই নেটিভদের দেশে থাকিব না। আমি চলিলাম টেমসের হাওয়া খাইটে।

দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল সাহেব।

সাহেব ভুস করে ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে গেল আর কৃষ্ণ অবাক হয়ে দেখল কোথায় সুন্দর সেই বাংলো বাড়ি! সে একটা ভগ্নস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। আস্তে আস্তে সেই ভগ্নস্তূপের বাইরে বেরিয়ে এল কৃষ্ণ। চারিদিক নিঝুম।

-----তুমি তো ভারী সাহসী আর বুদ্ধিমান ছেলে। চমকে উঠে কৃষ্ণ দেখল তার পেছনে ধুতি, ফতুয়া পরা একজন দাঁড়িয়ে আছে। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। বয়স আন্দাজ ওই রূপমদাদার মত কুড়ি-একুশ।

-----আপনি কে? এখানে কী করছেন? অবাক গলায় প্রশ্ন করল কৃষ্ণ।

-----যাব্বাবা। এতগুলো অঙ্ক কষে দিলুম তোমার আর জিগ্যেস করছ আমি কে!

-----আপনি কষে দিলেন!

-----তা নয়ত কি ওই হায়ার ম্যাথমেটিক্স তুমি কষে ফেললে?

কৃষ্ণ রাগী গলায় বলল, “ আমি যে অঙ্কগুলো করিনি আমিও জানি কিন্তু আপনি করেছেন জানব কী করে?

----তা অবশ্য ঠিক। তুমি বুঝবে কী করে? যাই হোক যা বলছিলুম, তুমি খাসা ছেলে। বদমাশ সাহেবটাকে তাড়িয়ে ছাড়লে। আমি যদি তোমার মত সাহসী হতুম তাহলে আর বেঘোরে প্রাণটা যেত না।

----মানে?

------আরে বাবা আমি যে ভূত সেটা কি এখনও বুঝতে পারোনি?

-----তা কেন পারব না? এই জঙ্গলটা যে ভূতদের আড্ডাখানা সেইটা বুঝতে কি আমার বাকি আছে? কিন্তু আপনার হিস্ট্রিটা কী সেটা জানতে চাইছি।

-----ও তাই বলো। শোনো তাহলে। সে অনেক দিন আগের কথা। স্কলারশিপ পাওয়া ছাত্র ছিলুম। অঙ্ক নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তুম। আমার এক দিদির বিয়ে হয়েছিল সুন্দরগড়ে। ছুটিতে দিদির বাড়ি বেড়াতে এসেছিলুম। আমার মধ্যে একটু কবি কবি ভাবও ছিল। একদিন বিকেলে আপন মনে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে এই জঙ্গলে ঢুকে পড়েছি খেয়াল নেই। এদিকে সূর্যও ডুবে গেল। আর এই জঙ্গলের দুর্নাম সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানাও ছিল না। টুকটাক শুনেছিলাম কিন্তু বিশ্বাস করিনি। বিশ্বাস হলো যখন সাহেবের ভূতকে নিজের চোখে দেখলুম। তোমার মত সাহস ছিল না তাই সহজেই সাহেব আমাকে…...।

কৃষ্ণ এই প্রথম ভূতকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখল।

-----জানো, অনেক স্বপ্ন ছিল আমার। অনেক লেখাপড়া করব। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াব কিন্তু বেঘোরে প্রাণটা গিয়ে অতৃপ্ত আত্মা হয়ে এই জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। তবে সাহেব বাংলোর ধারে কাছে পারতপক্ষে আসতাম না। মরেও আমার মধ্যে থেকে ভয় যায়নি কিন্তু আজকে দূর থেকে তোমাকে আর সাহেবকে দেখে কৌতূহলী হয়ে এসে পড়েছিলুম। তোমাদের কথাবার্তা সব শুনলুম। এত বছর ভূত হয়ে থেকে ভূতেদের চোখ এড়ানোর উপায়টা ভালোই রপ্ত করেছি তাই সাহেবের চোখ এড়িয়ে পেনটার মধ্যে সুড়ুত করে ঢুকে গেলুম। পেনটাও তো আবার ভূতের পেন। সাহেবের চালাকিটা তো দেখলে! ক্লাস নাইনের ছেলেকে কেউ নিউমেরিক্যাল অ্যানালিসিস, শক্ত শক্ত ইন্টিগ্রেশন দেয়! নিশ্চিত ছিল তুমি পারবে না কিন্তু দিলুম তো সাহেবের চাল ভণ্ডুল করে।

-----থ্যাঙ্কস। আপনি না থাকলে তো আজ সাহেব আমাকেও….।

-----না না। আমি কিছু করিনি। তোমার সাহস আর বুদ্ধি ছিল বলেই আজ তুমি বেঁচে আছ।

-----আচ্ছা, আপনার নাম কী সেটাই তো এখনও জানা হলো না।

-----প্রাণকৃষ্ণ পাত্র।

কৃষ্ণ ভ্রু কুঁচকে বলল, “ আপনার সেই দিদির নাম কি কুসুম?”

----হ্যাঁ, তুমি জানলে কী করে? উত্তেজিত হয়ে ওঠে প্রাণকৃষ্ণ।

-----তিনি যে আমার বড় ঠাকুমা। বাবার জ্যাঠাইমা। আজও আপনার কথা মনে করে চোখের জল মোছেন তিনি। বড় ঠাকুমার কাছে আপনার কথা তো শুনেছি আমি। আপনি তো খুব ভালো ছিলেন পড়াশোনায়।

----তুমি আমার কুসুম দিদির নাতি হও। কুসুম দিদি আজও আমার কথা মনে করে!

ভূতের চোখে জল আসে না, নইলে প্রাণকৃষ্ণর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসতো। একটু থেমে প্রাণকৃষ্ণ বলল, “ সাহেবের ভূত এই জঙ্গল ছেড়ে চলে যেতেই আমারও মুক্তি হয়ে গেল। কুসুম দিদিকে বোলো আর যেন না কাঁদে।”

কৃষ্ণ অবাক হয়ে দেখল প্রাণকৃষ্ণ একটা উজ্জ্বল আলোর কুন্ডলী হয়ে আকাশের বুকে মিলিয়ে গেল।



“ কৃষ্ণ, কৃষ্ণ।” একসঙ্গে অনেক লোকের ডাকাডাকির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল কৃষ্ণর। প্রাণকৃষ্ণ চলে যাবার পর একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে কুঁকড়ে বসেছিল সে। রাত্রিবেলা জঙ্গল থেকে বেরোতে পারবে না বুঝতেই পেরেছিল। কখন ঘুম ধরে গেছে বুঝতেই পারেনি। গতকাল সন্ধ্যে গড়িয়ে যাবার পরও কৃষ্ণ বাড়ি না ফেরায় খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। কোথাও খোঁজ না পাওয়ায় শেষে থানায় খবর দেওয়া হয়। দারোগবাবু কৃষ্ণর বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁর সন্দেহ হওয়ায় পল্টুকে চেপে ধরেন। পুলিশের ভয়ে পল্টু সমস্ত স্বীকার করে ফেলে যে বিকেল বেলা কৃষ্ণর মাথায় আঘাত করে তাকে অজ্ঞান করে তারা সাহেব বাড়ির জঙ্গলে ফেলে আসে। পকেটে করে ঠাকুরের ছবি নিয়ে তারা জঙ্গলে ঢুকেছিল। কৃষ্ণর ক্ষতি করার জন্যই তারা এমন দুঃসাহসিক কাজ করে ফেলেছে। একথা জানার পরই দিনের আলো ফুটতেই সবাই কৃষ্ণর খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে অবশ্য বেশিরভাগ জনেরই ধারণা কৃষ্ণকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না।

মানুষের গলার আওয়াজ অনুসরণ করে ছুটে গেল কৃষ্ণ।



বাড়ি ফিরে সবার আদর আর সেই সাথে কৃষ্ণর প্রিয় গুড় পিঠে খেতে খেতে কৃষ্ণ ভাবলো লুকিয়ে লুকিয়ে বড় ঠাকুমাকে তার ভাইয়ের খবরটা দিতে হবে। মানুষটা আজও ভাইয়ের কথা মনে করে বড় কষ্ট পায়।



অলঙ্করণ : আবির

গল্পের ঝুলি : পিংলুর দুষ্টুমি : সুকন্যা দত্ত




শীত পড়ছে একটু একটু করে। আর তার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পিংলুর দুষ্টুমি। কিন্তু শীতের সাথে দুষ্টুমির যোগটা কোথায় বুঝলে না তো? আরে বাবা, এই শীতকালটাই তো যত দুষ্টুমির সময়। বড়দিনের ছুটি, নিউ-ইয়ার, কেক খাবার সময়। আর তার সাথে সাথে পিংলুর মামাবাড়ি যাবার সময়। পিংলু তো শীতের ছুটি পড়লেই মামাবাড়ি চলে যায়। দাদু বাড়িতে এসে পিংলুকে নিয়ে যায়। পিংলুর মামাবাড়ি একটা গ্রামে। সবুজে ভরা প্রকৃতি পিংলুর ভারি পছন্দ। পিংলু ছবি আঁকতে খুব ভালবাসে। দাদুর বাড়িতে গেলেই খাতা, রং-পেন্সিল নিয়ে ঘুরে বেড়ায় পিংলু। সঙ্গে থাকে মামা। মামাকে পিংলু মামাই বলে। মামাই পিংলুকে খুব ভালোবাসে। পিংলুকে কত গল্প শোনায়। আর সেই গল্প হল সবুজের গল্প। সেই গল্প শুনতে শুনতেই পিংলু প্রকৃতিকে চিনেছে। আজও পিংলু সারা সকাল ধরে খেলে বেড়ালো এখানে-সেখানে। মামাইয়ের সাথে ঘুরে ঘুরে কত ফুলের নাম জানল। আর দুষ্টুমি? পাশের বাড়ির কালুদাদুর ছাগলটা দড়ি দিয়ে খুঁটিতে বাঁধা ছিল। পিংলু দড়িটা চুপিচুপি খুলে দিয়েছে। ছাগলটা পিংলুর দিকে তাকিয়ে ব্যা-ব্যা করে ডাকতে ডাকতে দিল এক ছুট্‌। তারপর পিংলু লতাদিদার বাড়ির পোষা মুনিয়াগুলোর খাঁচার দরজাটা খুলে দিল। মুনিয়াগুলো দরজা খোলা পেয়ে সোজা ফুড়ুৎ। যতক্ষণ মুনিয়াগুলোকে দেখা গেল, ততক্ষণ পিংলু তাকিয়ে থাকল আকাশের দিকে। এই যে পিংলু নিজের ইচ্ছেমত খেলে বেড়াচ্ছে, লাফাচ্ছে, দৌড়োচ্ছে -সব পশুপাখিরই তো ইচ্ছে হয় এরকম স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে। পিংলু শুধু তাদের সাহায্য করে। কিছুক্ষণ পর পিংলু যখন দাদুর সাথে বসে গল্প করছে বাগানে, হঠাৎ দেখে কালুদাদু আর লতাদিদা কী যেন বলতে বলতে বাড়ীর দিকে এগিয়ে আসছে। বিপদের আঁচ বুঝেই পিংলু দে ছুট্‌।


"কী ব্যাপার কালু? কী ব্যাপার লতাদি? আপনাদের মুখ এত শুকনো কেন?"

দাদু উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে গেল।

"আসলে বিশ্বদা", কালু বলতে একটু দোনামনা করল।

"কী হল কালু, আবার চুপ করে গেলে কেন?"

"বিশ্বদা, আমার ছাগলটাকে খুঁজে পাচ্ছি না।"

"ওহ্‌, এই ব্যাপার, দ্যাখো গিয়ে চারপাশটা। কাছাকাছি কোথাও আছে।"

"না বিশ্বদা, কোথাও নেই। আমি ভালো করে খুঁজলাম। আর লতাদির পাখিগুলোও উড়ে গেছে।
লতাদির নাতি ভুলু বলছিল, 
রোজ সকালে আপনার নাতি সবার বাড়ি ঢুকে ঢুকে সব পাখির খাঁচা খুলে দেয়- মুরগী, হাঁস সবাইকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে বের করে দেয়। গরু-ছাগল সবার খুঁটির দড়ি খুলে দেয়। এভাবে চললে তো আমরা মুশকিলে পড়ে যাব বিশ্বদা।"

"আপনার মুখ চেয়ে পিংলুকে কেউ কিছু বলে না। গাঁয়ের সবাই আপনাকে শ্রদ্ধা করে। কিন্তু আপনার নাতি পিংলুর দুষ্টুমি তো বন্ধ হচ্ছে না।"

"হুমম্‌", দাদুর কপালে ভাঁজ।

"কালু, তুমি এখন বাড়ি যাও। লতাদি আপনিও বাড়ি যান। আমি দেখি কী করতে পারি।"

দাদু বলতে বলতে বাড়ির ভিতরে ঢুকল।



পিংলু ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে সব দেখছিল।

"পিংলু, একবার এদিকে এসো।" দাদু গম্ভীর গলায় পিংলুকে ডাকল।

"আমায় ডাকছ দাদু?" পিংলু দাদুর সামনে।

"তুমি নাকি সবার বাড়িতে গিয়ে গিয়ে পশুপাখিদের বাইরে ছেড়ে দাও, এটা কি সত্যি?"

"হ্যাঁ, দাদু", পিংলু মাথা নিচু করে বলল।

"কেন?" দাদু চিন্তিত।

"বা রে!- মামাই তো বলে- ‘পিংলু, পশুপাখিদের খুব ভালোবাসবি। ওরা যেন কখনো কষ্ট না পায় দেখিস।'
আমি সেদিন লতাদিদার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম- দেখলাম মুনিয়াগুলো কি ছট্‌ফট্‌ করছে। তাই তো খাঁচার দরজাটা খুলে দিলাম।

কালুদাদুর ছাগলটা সারাদিন দড়িতে বাঁধা থাকে। সেদিন দেখলাম- ছাগলটা খুব দড়ি ধরে টানাটানি করছে। নিশ্চয়ই ও দৌড়তে চাইছিল - ঠিক যেমন আমি দৌড়োই, তাই না দাদু? আমার দেখে খুব কষ্ট হল, তাই তো দড়িটা খুলে দিলাম।

শান্তিপিসির বাড়ির হাঁসগুলোকে যেই বের করে দিলাম বাড়ির বাইরে, অমনি সেগুলো পুকুরে লাফ দিল। কী সুন্দর লাগছিল দাদু হাঁস আর হাঁসের বাচ্চাগুলোকে! আমি তো ড্রইংও করলাম, এই দ্যাখো দাদু।"

পিংলু ড্রইং খাতাটা এগিয়ে দিল। দাদু দেখল হাঁস আর তাদের ছানারা পরম নিশ্চিন্তে জলে ভেসে বেড়াচ্ছে-পিংলু খুব সুন্দর এঁকেছে ছবিটা।

দাদু এক এক করে ড্রইংখাতার পাতাগুলো উল্টোতে লাগল। একটা ছবিতে খাঁচার দরজা খোলা - পাখিগুলো এক এক করে উড়ে যাচ্ছে আকাশে। কী সুন্দর এঁকেছে পিংলু! এক এক করে সব ছবিগুলোই দেখল দাদু। পিংলু ছবি আঁকে দাদু সেটা জানত- কিন্তু তার ছবি আঁকার পিছনে এই সুন্দর ভাবনার কথা দাদু জানত না।

দাদু মনে মনে খুব খুশি হল। পিংলুর পশুপাখিদের প্রতি এত মায়া দাদুকে খুব আনন্দ দিল। কিন্তু তার সাথে সাথে দাদু ভাবতে লাগল যে কী করা যায়। পিংলুর যুক্তি দাদু বুঝেছে, আবার এদিকে প্রতিবেশীদের কথাটাও তো ভাবতে হয়। কী করা যায়, এই নিয়ে কথা বলতে দাদু মামাইকে ডাকল। মামাই আসার পর দাদু পিংলুকে বলল-"পিংলু, তুমি বাগানে গিয়ে খেলো, আর কোনো দুষ্টুমি কোরো না।"

পিংলু মাথা নেড়ে সায় দিল আর একটা বল নিয়ে দৌড়ে বাগানে চলে গেল।


"সাম্য, সব শুনলি তো পিংলু কি করেছে।" 
দাদু বলল।

"হ্যাঁ, বাবা।"

সাম্য পিংলুর মামার নাম।

"এবার বল্‌ তো কী করি আমি?" দাদু চিন্তিত।

"বাবা, তুমি এক কাজ করো।" 
এরপর দাদুর সাথে মামাইয়ের অনেকক্ষণ কথা হল।

পিংলু একটু হতভম্ব। দাদু তো তাকে বকল না!



পরের দিন সকালে পিংলু অবাক। আজ রবিবার। গ্রামের অনেক লোক পিংলুর মামাবাড়িতে। তার মধ্যে কালুদাদু, লতাদিদা, শান্তিপিসিকেও দেখতে পেল পিংলু।


শান্তিপিসি দাদুকে বলল-"কী ব্যাপার বিশ্বজেঠু? সবাইকে সকাল সকাল আসতে বললেন?"

দাদু বলল- "একটা কথা বলার আছে আপনাদের সবাইকে।"

সবাই উৎসুক।

এরই মধ্যে পিংলুকে দেখতে পেয়ে দাদু কাছে ডাকল।

পিংলু ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এল। তারপর চুপ করে দাদুর পাশে বসল।

দাদু একটু গলাখাঁকারি দিয়ে বলল- "শোনো সবাই। তোমরা নিশ্চয়ই জানো, পিংলু তোমাদের বাড়িতে গিয়ে সব পশুপাখিকে ছেড়ে দেয়। আসলে কী জানো তো, পিংলু দাদুভাই কিন্তু কোনো দুষ্টুমি করে না। এই যে তুমি আমি যখন ইচ্ছে যেখানে খুশি যেতে পারি, পিংলু দাদুভাই চায় সব পশুপাখিরাও যাতে নিজের ইচ্ছেমত একটু ঘুরে বেড়াতে পারে। এখন আমি পিংলু দাদুভাইকে কী করে বকি বলো? ও তো যা করেছে ওর মায়াবোধ থেকে করেছে। এবার তোমরাই বলো যে কী করা যায়? আচ্ছা আমি একটা কথা বলছি- তোমরা পশুপাখিগুলোকে মাঝে মাঝে যদি একটু ছেড়ে দাও..." এই পর্যন্ত বলে দাদু একটু চুপ করল।

কালুদাদু, লতাদিদা, শান্তিপিসিরা নিজেদের মধ্যে কী আলোচনা করতে লাগল।

তারপর সবাই মিলে দাদুকে বলল-"বিশ্ববাবু, আপনি যখন বলছেন...ঠিক আছে। আমরা আমাদের গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী, পাখি সবগুলোকে সকালবেলা ছেড়ে দেব।"



এরপর কী হল জানো?

সবাই অবাক হয়ে দেখল, ওরা সবাই ছাড়া পেয়ে মনের আনন্দে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সন্ধেবেলা ওরা সবাই ঠিক নিজে নিজে বাড়ি ফিরে আসছে। এমনকী, মুনিয়াগুলোও আকাশে উড়ে বেড়িয়ে সন্ধেবেলা আবার ফিরে এল।


সবাই তো অবাক। আসলে কী জানো তো, কাউকে একটু স্বাধীনতা দিলে সে ভালোবাসার মর্যাদা নিশ্চয়ই রাখে। পশুপাখিগুলো তো জানে, বাড়িতে তাদের ভালোবাসার জন্য সবাই আছে-ঠিক আমাদের মত। আমরা যেমন চারদিকে ঘুরে বেড়িয়ে আবার বাড়িতে ফিরে আসি, ওরাও তেমনি ওদের ঘরে ফিরে আসে। ভালোবাসলে কাউকে বন্দী করতে নেই, তাকে মুক্ত করতে হয়। যদি ফেরার ইচ্ছে হয়, সে এমনিই ফিরে আসে।


আজ গাঁয়ের লোকেরা যা শিখল, সব পিংলুর জন্যই শিখল। পিংলু তো মহাখুশি। সে যতদিন মামাবাড়িতে থাকল, রোজ গিয়ে ওর ছোট্ট বন্ধুদের দেখে আসত। কিন্তু এবার শীতের ছুটি শেষ। ওকেও তো এবার ঘরে ফিরতে হবে। তাই পিংলুও আজ বাড়ি ফিরবে-মুক্ত জীবনের আস্বাদ নিয়ে নিজের ঘরে। কারণ সে জানে, ঘরে বাবা-মা তার জন্য অপেক্ষা করছে। আর বাবা-মা তো তাকে খুব ভালোবাসে।


এবার তোমরা বলো , পিংলু কি আদৌ কোনো দুষ্টুমি করেছে?


অলঙ্করণ : আবির

গল্পের ঝুলি : সার্কাস : সৌমি মল্লিক




ছোট্ট বিলুর খুব মনখারাপ। মিলি, টুবাই, বুমবুম সবারই দু'বার করে সার্কাস দেখা হয়ে গেছে। কিন্তু বিলুকে ওর মা একবারও সার্কাস দেখতে নিয়ে যায়নি। স্কুলে টিফিনের সময় টুবাই কতো গল্প করলো সার্কাসের। একটা নাকি বাচ্চা হাতি এসেছে সার্কাসে! ওকে নাকি চিনেবাদাম ভাজা খেতে দিলে ভারি খুশি হয়ে শুঁড় নাড়ায়! বিলু সত্যিকারের হাতি কখনো দেখেনি, ড্রয়িং বুকে হাতির ছবি দেখেছে। সেদিন তো বিলুর আঁকার দিদিমণি কি বকাটাই না দিলো বিলুকে, হাতির শুঁড়টা ঠিকঠাক না আঁকতে পারার জন্য। তা শুঁড় আঁকতে পারেনি তো কী হয়েছে , বিলু কিন্তু হাতিকে খুব ভালোবাসে! ওর কতদিনের ইচ্ছে ওর একটা হাতি বন্ধু থাকবে, ওর সাথে ফুটবল খেলবে, ওকে পিঠে চাপিয়ে জঙ্গলে ঘুরতে নিয়ে যাবে ! কি মজা ! বিলুর ইচ্ছে করছে এখুনি গিয়ে সার্কাসের বাচ্চা হাতিটার সাথে আলাপ জমায় !

শুধু কি হাতি, বুমবুম বলছিল একটা ছোট্ট মেনি বাঁদরও আছে সার্কাসে ! বাঁদরটা নাকি সকলের দিকে চেয়ে চোখ পিটপিট করে! আগেরবারের গরমের ছুটিতে বিলুদের বাড়ির বাগানের আমগাছটায় দুটো বড়ো বড়ো বাঁদর এসেছিল।  কী সুন্দর বাদামী রঙ কিন্তু মুখটা কালো! দাদাই বিলুকে গল্প বলেছিল , সীতামাকে রাবণের লঙ্কা থেকে আনতে গিয়ে হনুমানের মুখ পুড়ে গিয়েছিল । সেই থেকে ওদের সবার মুখ পোড়া! বিলুর খুব কান্না পায়। আহারে! বেচারি হনুমানের কতই না কষ্ট হয়েছিল! বিলুর তো সেদিন চুপিচুপি দুধের কড়া থেকে সর তুলতে গিয়ে গরম দুধে আঙ্গুল পুড়ে গিয়েছিলো। কী জ্বালা করছিল বিলুর! তার ওপর ঠামার বকা , মায়ের বকা ! ভাগ্যিস দাদাই ঘরে ছিলো সেদিন তাইতো ঠামার ঠাকুরঘর থেকে ঘি নিয়ে বিলুর আঙ্গুলে লাগিয়ে দিয়েছিল।

বিলুদের আমগাছের হনুমান দুটো এক ঝাঁপে বিলুদের উঠোনটায় নেমেছিল। রাঙাপিসি ওদের চারটে করে মিল্কি বিস্কুট দিয়েছিল। ওরা মাটিতে পা ছড়িয়ে হাতে করে বিস্কুট খাচ্ছিল । সার্কাসের বাঁদরটা ওরকম কিনা কে জানে?

মলি তো বলছিল সার্কাসে জিরাফ, ঘোড়া, গলায় ঝুমঝুমি বাঁধা কুকুর, মুখে রঙ মাখা জোকার আরও কত কী আছে! বিলু জিরাফ টিভিতে দেখেছে। ইয়া লম্বা গলা, গায়ে হলুদ চাকা চাকা দাগ। একটা কত লম্বা গাছ থেকে গলা উঁচিয়ে পাতা খাচ্ছে। আর ঘোড়া তো সেবার দিঘা বেড়াতে গিয়ে দেখেছে বিলু। সাগরপাড়ে সাদা, কালো, বাদামি, লালচে কত রঙের ঘোড়া ! বিলু একটা কালো ঘোড়ার পিঠে চেপে ফটো তুলেছিল, ঘোড়াটার কেশরটা ছিল লালচে ।

আর রইলো বাকি কুকুর, তো বিলুদের পাড়ায় কতো কুকুর আছে ! লালু , ভুলু এই সব নাম। বিলু তো ওদের মাঝে মধ্যেই বিস্কুট খেতে দেয়। তবে বিলু মুখে রঙ মাখা জোকার কখনো দেখেনি। নাহ্, এবার বিলুকে সার্কাসে যেতেই হবে। বিলু ভাবে বাড়ি গিয়ে মায়ের কাছে খুব কাঁদবে সার্কাসে যাবার জন্য। এরপরও যদি না নিয়ে যায় তবে বিলু বিকেলে আর দুধ খাবে না।

বিলু বাড়িতে গিয়ে কান্না জোড়ে, ওকে সার্কাসে নিয়ে যেতে হবেই। মা - ঠামা গোলগোল চোখ করে তাকায় বিলুর দিকে। বিলু ভয় পেয়ে চুপ করে যায়।

রাতে বিলু অঙ্কে ভুল করে। মা আচ্ছাসে বিলুর চুলের ঝুঁটি নাড়িয়ে দেয়। বিলুর চোখে জল টলমল করে , তবু বিলু কাঁদে না। দাদাই বলেছিলো কাঁদলে হুতুম পেঁচা এসে পিঠে করে ওদের দেশে নিয়ে চলে যায়, আর কোনোদিন বাড়ি ফেরা যাবে না।

রাতে বিলু বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবে ওকে কেউ ভালোবাসে না, এক দাদাই ছাড়া। দাদাই থাকলে ওকে ঠিক সার্কাস দেখাতে নিয়ে যেতো। কিন্তু দাদাই তো পিপির বাড়ি গেছে! দাদাই যখন ফিরবে তখন তো সার্কাস শেষ।

বিলু ভাবে ও হাতি হয়ে যাবে , সার্কাসে শুঁড় নাড়িয়ে খেলা দেখাবে। নয়তো হনুমান হয়ে গাছ থেকে আম পেড়ে খাবে , ইচ্ছে মতো ঝাঁপাবে। মা একটুও বকতে পারবে না। ওর থেকে তো জিরাফটা কতো খুশি। ছবি আঁকতে হয় না , অঙ্ক করতে হয় না, মনের খুশিতে লম্বা গলা উঁচিয়ে পাতা পেড়ে খায়।

অনেক রাত্রে ঘুম ভাঙে বিলুর। একি, কোথায় এসেছে বিলু! বিলুর পেছন দিকে লাল পাড় জরির ইয়া বড়ো একটা পর্দা , চারপাশে কতো আলো! আরে ওই তো সেই জোকারগুলো মুখে রঙ মেখে বিলুর দিকে তাকিয়ে হাসছে। কতো রকমের ভঙ্গি করে ডিগবাজি খেলো ওরা। বিলু তো হেসেই অস্থির!

আরে ওই লোকটা অতো উঁচু থেকে ঝাঁপ দিচ্ছে কেন? ও পড়ে গেলে কি ওর মা বকবে না নাকি? আরে বেশ তো কায়দা করে ওপর থেকে নিচে খাটানো জালের মধ্যে এসে পড়লো লোকটা! ওই তো হাতিটা শুঁড় দিয়ে একটা ইয়া বড়ো রিংকে ঘোরাচ্ছে। জিরাফটাও কী সুন্দর খেলা দেখাচ্ছে! কুকুরটা কেমন ওই রিংটার ভেতর দিয়ে ঝাঁপ দিয়ে যাচ্ছে। আরে রিংটার চারপাশে তো আগুন জ্বলছে! বিলু তো বলেই ফেললো , "দেখে ঝাঁপাও নয়তো পুড়ে যাবে!"

হাতিটা কী সুন্দর ফুটবল খেলছে কুকুরগুলোর সাথে! বাঁদরটা কতো সুন্দর নেচে দেখালো। উফঃ আরও কতো রকমের খেলা!

খেলা শেষে হাতিটা এগিয়ে এলো বিলুর কাছে। বিলুর দিকে চেয়ে বললো,
"আমার নাম মধু! তোমার নাম তো বিলু? আমি জানি। তুমি খুব মিষ্টি!"

বিলু তো হাতির কথা শুনে অবাক হয়ে গেছে।হাতি কথা বলতে পারে! শুনে তো বিলু অবাক ! এই কথাটাই হাতিকে জিগেস করতে হাতি বললো,

"খুব পারে! আমরা সব হাতিরাই কথা বলতে পারি তবে সব মানুষরা আমাদের কথা বুঝতে পারে না। শুধু যারা আমাদের ভালোবাসে তারাই আমাদের কথা শুনতে পারে, আমাদের ভাষা বুঝতে পারে ! তুমি তো আমাদের খুব ভালোবাসো তাই তুমি আমার কথা শুনতে পারছো! "


বিলু ভারী খুশি হয় । বিলু হাতিকে ওর স্কুলের গল্প বলে , ওর মায়ের তৈরি পায়েসের কথা বলে আরও কতো গল্প করে হাতির সাথে ! সেই সাথে এটাও বলে বিলুকে নাকি ওর বাড়ির কেউ ভালোবাসে না তাই ও সার্কাসে খেলা দেখাতে চলে আসবে!

হাতিও বলে ওর জঙ্গলের কথা , কীভাবে ও ফাঁদে পড়ে এখানে আসে জঙ্গল ছেড়ে , ওর বাবা - মা কে ছেড়ে সেই গল্প ! এখানে নাকি ঠিক করে না খেলা দেখালে ওকে রিং মাষ্টার চাবুক দিয়ে মারে! ও পিছন ঘুরে ওর পিঠের চাবুকের দাগ গুলো দেখালো। আগে নাকি ওর মা ওকে খুব বকতো কিন্তু এখানে আসার পর থেকেই ওর মায়ের জন্য খুব মন কেমন করে।

বিলুর মন খারাপ হয়ে যায় । সত্যি তো বিলুকে ওর মা অঙ্ক না পারলে চুলের ঝুঁটি নাড়িয়ে দেয় ঠিকই কিন্তু সেইবার বিলুর জ্বরের সময় মা বিলুর পছন্দ মতো সুজির পোলাও করে দিয়েছিল। আবার বসন্ত মেলায় বেলুনও কিনে দিয়েছিল।

জিরাফটা এসে বললো ওকে নাকি ওর ছোট্ট ছেলেটাকে ফেলে এখানে আসতে হয়েছে শিকারিদের ফাঁদে পড়ে ! ওর ছেলের জন্য ভীষণ মন কেমন করে। ওর ছেলেটা তো ওর কোলে না ঘেঁষে শুতেই পারে না।

বিলুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। ওর মা তো বিলুকে ছাড়া একটা দিনও থাকতে পারে না। বিলুরও তো রাত্রে মায়ের কোল ঘেঁষে না ঘুমোলে ঘুম আসতেই চায় না।

জোকাররাও বললো ওদেরও বাড়ি যেতে খুব ইচ্ছে করে । যাতে ওদের চোখের জল কেউ না দেখতে পায় তাই ওরা সব সময় মুখে রঙ মেখে থাকে ।

ঘোড়ারাও বললো ওদেরও ভীষণ মন খারাপ করে। পাহাড়ের সরু গিরিপথ দিয়ে ওদের ছুটতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এখানে তো ওদের পায়ে শিকল পরানো থাকে।

বাঁদর এসে বলে ও আর ইচ্ছেমতো ঝাঁপাতে পারে না, গাছেও উঠতে পারে না, আম পেড়েও খেতে পারে না।

সব শুনে বিলুর মন খুুব খারাপ হয়ে যায়। না বাবা সার্কাসে খেলা দেখানোর কোনো ইচ্ছে আর নেই বিলুর। ওর বাড়ি , স্কুল , মা , ঠাম্মাই ভালো।

এমন সময় সেখানে রিং মাস্টার এসে হাজির। বিলুর দিকে চেয়ে বলে,

"এই ছেলে, তুমি না সার্কাসে খেলা দেখাতে চাও! আজ থেকে তুমি এখানে থেকেই খেলা দেখাবে এদের সঙ্গে। তোমায় আর কোনোদিন বাড়ি যেতে হবে না। মায়ের কাছে অঙ্ক করতে বসতে হবে না আর হাতির ছবিও আঁকতে হবে না।"

বিলু ভয়ে কাঁদতে আরম্ভ করেছে ।

"না আমি সার্কাসে খেলা দেখাতে চাই না আর আমি বাড়ি ফিরে যেতে চাই। আমি মাকে অনেকক্ষণ দেখিনি মায়ের কাছে যেতে চাই!" কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে বিলু।


" আরে এই বাবু কী বকছিস ঘুমের ঘোরে? ওঠ দেরি হয়ে যাবে তো স্কুল যেতে।" 

মায়ের ধাক্কায় ঘুমটা ভেঙে যায় বিলুর। দু'হাত দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বিলু !

"উফঃ কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম! ভাগ্যিস ওটা স্বপ্ন ছিলো!" মনে মনে ভাবে বিলু ।

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ,
" মা তুমি খুব ভালো। ঠামাও ভালো। আমি আর তোমাদের ওপর একটুও রাগ করবো না। আর আমি একটাও বায়না করবো না। জানো তো মা আমি বড়ো হয়ে সার্কাসের সব হাতি, ঘোড়া, কুকুর, বাঁদর, জিরাফ, জোকার সবাইকে মুক্ত করে দেবো। ওরা ওদের বাড়ি চলে যাবে। ওদেরও তো বাড়ির জন্যে , মায়ের জন্যে মন কেমন করে, তাই না মা?" 


মা খালি মিষ্টি হেসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নেয়।


~~ সমাপ্ত ~~


অলঙ্করণ : স্বর্ণদ্বীপ চৌধুরী