Showing posts with label ধারাবাহিক গল্প. Show all posts
Showing posts with label ধারাবাহিক গল্প. Show all posts

ধারাবাহিক গল্প : বনস্থলীর নব্য পুরাণ (অন্তিম পর্ব) : টিম কিশলয়



।।৫।।

বিশুপাগলকে এমনিতে বনস্থলীর লোকজন বিশেষ মান্যিগন্যি করেনাকো, তবে তাই নিয়ে বিশুর তেমন কোনও আক্ষেপ নেই। ও এই পশুপাখিদের দলে মিশেই দিব্যি আছে। তার ওপর  দানিসায়েবের বাংলোতে রাজ্যের আজবগজব যন্ত্রপাতি নেড়ে ঘেঁটে দেখতে দেখতেই বিশুর বেলা বয়ে যায়, পাড়া বেড়ানোর আর সময় কোথায়?

দানিসাহেবের এই অদ্ভুত ল্যাবরেটরির সন্ধানও বেশ অদ্ভুতভাবে পেয়েছিল বিশু। বনস্থলীর সব বুড়ো লোকেরা বলত দানিসায়েব নাকি মানুষ ছিলেন না। এমন এমন সব কলকব্জা বানাতেন, এমন এমন সব কাণ্ড ঘটাতেন যা নাকি কোনও মনিষ্যির পক্ষে সম্ভব নয়। এক পারে ভূতে নয়তো বা ভগবানে।
এই সব কথাও যথারীতি কেউ পাত্তা দিত না। দানিয়েল রজার আসলে ছিলেন এই বনস্থলী টিম্বার প্রসেসিং ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা। এখানের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতিই ওঁর তত্ত্বাবধানে বানানো যা প্রায় এক’শ বছর পরও দিব্যি ঘটরঘট করে চলছে। বিশুর তাই মনে মনে সন্দেহ হয় দানিসাহেব ভূত বা ভগবান কোনওটাই ছিলেন না। উনি ছিলেন এলিয়েন, মানে ভিনগ্রহের প্রাণী। ভূত বা ভগবান যন্ত্র বানিয়েছে এমন অশৈলী কথা কেউ শুনেছে কখনও? এলিয়েনরাই বরং কত উন্নত সব যন্ত্র বানিয়ে চাকতির মত মহাকাশযানে চেপে পৃথিবীতে আসে।

বিশুর বরাবরের শখ অন্য একটা গ্রহে যাওয়ার, সেখানের শুঁড়ওয়ালা চারটে চোখওয়ালা সবুজ রঙের এলিয়েনদের সাথে ভাবসাব করার। দানিসাহেবের পরিত্যক্ত বাংলোয় তাই প্রায়শই এসে ঢুঁ মারত বিশু যদি স্পেসশিপটার দেখা মেলে। স্পেসশিপের দর্শন না হলেও বিশুর হাতে এল দানিসায়েবের ডায়রি। খোলা বাংলোর এ ঘর সে ঘর ঘুরতে ঘুরতে অদ্ভুতভাবেই একটা ভাঙাচোরা খালি দেরাজের এক কোণে পেল ডায়রিটা। ভূতের ভয়ে বেশি লোক বাংলোর ধারেপাশে আসে না, তাই অনেক জিনিসই অক্ষত থেকে গেছে এই বাড়ির।

সেই শতবর্ষ পুরনো ডায়রির পাতা কোন কেরামতিতে এখনও অক্ষত। একটু হলুদ হয়ে গেছে বটে কিন্তু তার থেকে বেশি ক্ষতি কিছু হয়নি। ডায়রিটা ইংরেজিতে লেখা। তাতে কোনও অসুবিধে নেই কারণ বিশুক্ষ্যাপা গড়গড়িয়ে ইংরেজি পড়তে পারে! কে শিখিয়েছিল, কবে শিখিয়েছিল এসব কিছুই বিশুর মনে নেই, যেমন ওর মনে নেই ওর ভালো নাম কী, পদবী কী, বাবার মায়ের নাম কী, আসল বাড়ি কোথায়। এসব রাজ্যের প্রশ্ন বিশুর মাথার অলিগলিতে পথ হারানো বেড়ালছানার মত ঘুরেই বেড়ায় শুধু, জবাব আর মেলে না। ওইজন্যই তো বিশু আরও মোলাকাত করতে চায় এলিয়েনদের সাথে। যদি ওদের সব যন্ত্রপাতি দিয়ে বিশুর মাথার কলকব্জাগুলো ঠিক করে দিতে পারে।

যাই হোক! দানিসাহেবের ডাযরি পড়ে বিশু বুঝল সাহেবের এই বাংলোতেই আছে একটা বিশ্বকর্মার ল্যাবরেটরি। হরের কিসিমের যন্ত্রপাতি বোঝাই সেখানে। আর বিশুকে পায় কে! এলিয়েন বা স্পেসশিপের সন্ধান না পেলেও যন্তরমন্তরের হদিশ পেয়েছে। এবার আর কে আটকায় বিশুকে। ডায়রিতে দেওয়া নির্দেশ অনুসারে বাংলোর দক্ষিণপ্রান্তে গিয়ে দেখল কোনও ঘরটর নেই কেবল একটা দেওয়াল। দেওয়ালের গায়ে খোদাই করা একটা কিম্ভুতকিমাকার মূর্তির গায়ে চাপ দিতেই দেওয়ালটা সরে গিয়ে একটা বিশাল বড় ঘর দেখা গেল। ঘরটা যন্ত্রপাতিতে ভরা।

*****

আজ বিকেলে যখন বোমকাইয়ের পোষা ছাগল পুঁটিলাল আর কাবলি বেড়াল ফেলিসিয়া এসে হাজির হ’ল বিশুর কাছে তখনই বিশু বুঝেছিল এই সমস্যার সমাধান একমাত্র দানিসাহেবের যন্তরমন্তর ঘরেই আছে। দানিসাহেবের ডায়রি পড়ে পড়ে অনেকগুলো যন্ত্রপাতিরই ব্যবহার সুবিধে অসুবিধে এখন বিশুর নখদর্পণে।

 যাকগে আপাতত এই ছানা হাতিটাকে তার মা বাবার কাছে পৌঁছনোর উপায় আছে এই যন্ত্রের মধ্যেই। জায়ান্ট হুইলটায় চাপিয়ে মিশকুনকে জঙ্গলে ওর মা বাবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু এখন সমস্যা একটা নয় দু’টো। আতিফ ইশান আর অ্যালেক্সের পরিবারগুলোও নিজেদের মধ্যে ঝগড়ায় ব্যস্ত। সেটারও সমাধান করতে হবে। বাচ্চাগুলো ভরসা করে আছে বিশুর ওপর। বিশুর আবার একদম ঝগড়াঝাটি ভালো লাগে না। সবাই মিলেমিশে কেমন সুন্দর থাকবে, তবেই তো জীবনটা সুন্দরভাবে কাটবে। এই যে সেবার বোমকাই ওর জন্মদিনে সব্বাইকে ডাকল, বিশুও গেল, কত আনন্দ হ’ল, কেক কাটা হ’ল। বোমকাইয়ের মা লুচি পায়েস আরও কত্ত কী করে খাওয়ালেন সকলকে। শুধু কী জন্মদিন! এই বনস্থলীতে আতিফদের ঈদের পরব, ঈশানদের দুর্গাপুজো, অ্যালেক্সদের ক্রিসমাস, সবকিছুই সারা পাড়ার লোক মিলে করে। এইগুলো ভাবতে ভাবতে বিশুর মাথায় বিদ্যুৎচমকের মত একটা বুদ্ধি খেলে গেল। কিন্তু এটার জন্য দরকার বোমকাইকে।

বিশু পুঁটিলালের দিকে ফিরে বলল,
“হ্যাঁ রে পুঁটি, বোমকাইকে একবার এখানে নিয়ে আসতে পারবি?”
পুঁটি ঘাড় হেলিয়ে বলল,
“কেন পারব না? এতক্ষণে ওর পড়া হয়ে গেছে। এখন মাও বসে সিরিয়াল দেখে আর বোমকাই ছবি আঁকে। আমি টুক করে ওকে পেছনের দরজা দিয়ে নিয়ে এসে হাজির হ’ব। আমি এই গেলুম আর এই এলুম।”

(সুস্মিতা)


।।৬।।

ওদিকে হয়েছে কি, পুঁটিলাল আর ফেলিসিয়া চুপিচুপি বোমকাইদের বাড়ির বার হয়ে যাওয়ার একটু পরেই বোমকাইয়ের একটু জলতেষ্টা পেয়েছিল, মানে ঠিক জল নয়, পুঁটিকে দেখার তেষ্টা। এই সন্ধেবেলাটায় পুঁটির মনে বড্ড 'কী করি কী করি' ভাব জাগে, বোমের মতো পড়তে বসতে পারে না বেচারা, বরং খাতাকাগজ দেখলেই কচমচিয়ে চিবোনোর সাধ জাগে মনে। তাই বোমকাইয়ের মায়ের কড়া নিয়ম, নামতাময় সন্ধেবেলায় পড়ার ঘরে পুঁটির ঢোকা চলবে না। পড়া হয়ে যাক, তারপর যত খুশি দুভাইয়ে ঢুঁসোঢুঁসি করো, চরকিপাক নাচো, মা কিচ্ছুটি বলবেন না। কিন্তু পড়ার সময় সেঘরে পুঁটির শিঙের দেখা পেলেই মা বলে দিয়েছেন পাখাপেটা করবেন তাকে। তাই রোজ সন্ধেয় বোমকাই যতক্ষণ পড়ে, পুঁটিলাল ততক্ষণ ঠায় কাঁঠালগাছের গোড়ায় বসে ঝিমোয় আর মাঝেমাঝে তুড়ুক তুড়ুক ল্যাজ নেড়ে মশা তাড়ায়। পড়ার ফাঁকে একদুবার বোমের পুঁটিতেষ্টা পায়, বাগানে উঁঁকি মেরে গাছের গোড়ায় জমে থাকা অন্ধকার, থুড়ি পুঁটিকে দেখে আবার গিয়ে পড়তে বসে। আজও তেমনই উঁকি মেরে বাগানে দেখতে গিয়ে থমকে গিয়েছিল বোমকাই, কই, কাঁঠালগাছের নিচে পুঁটি বসে নেই তো! চাপা গলায় দুবার তাকে ডেকেওছিল। বেশি ডাকতে ভয় করল, মায়ের কানে গেলেই হয়েছে! পুঁটি বোম দুজনের কপালেই কানমলা জুটবে তাহলে। পুঁটির সাড়াশব্দ না পেয়ে বাধ্য হয়ে ঘরে গিয়ে আবার অঙ্কখাতা নিয়ে বসেছিল ও। তবে মাথায় দুশ্চিন্তা ঘুরলে কি আর অঙ্ক হয়? এরও তাই হলো, সাত বারোং কত হয় লিখতে গিয়ে "সাত দুগুণে চোদ্দর চার হাতে রইলো ..." বিড়বিড় করে মায়ের কাছে চোখরাঙানি জুটলো। পড়ার পাট চুকতেই তড়িঘড়ি বাগানে দৌড়ল পুঁটিকে খুঁজতে। নাহ, কোত্থাও নেই। মা ওদিকে টিভি চালিয়ে বসেছে, সিরিয়ালের গান আর বিজ্ঞাপনের গান মিলেমিশে যাচ্ছে, এদিকে বেচারা বোমকাই ঘর বারান্দায় পায়চারি করছে টেনশনে, বাবা একটু আগে ডিউটি থেকে ফিরে চা খেয়েই আবার বেরিয়েছে, প্ল্যান্টে নাকি আজ হেব্বি মারপিট হয়েছে, জোসেফকাকু রতনকাকা ইরফানকাকারা এ ওকে মেরে মাথা ফাটিয়েছে, নাক ভেঙেছে, সেই নিয়েই জটলা চলছে কলোনির মাঠে, বাবাও গেছে সেখানেই। বাবার কাছে শুনতে শুনতে বোমকাইয়ের মনে পড়ছিল গতবারের জন্মদিনের কথা। আতিফ, ঈশান, অ্যালেক্স, সাবিত্রী, তুলিদিদি সবাই কেমন এসেছিল সেবার ওদের বাড়িতে, মায় বিশুদা অব্দি! জোসেফকাকু যে অত ভালো গান গায় আর ইরফানকাকা অত ভালো একতারা বাজায় ওর জন্মদিনে না এলে বোঝাই যেতো না! কাটোয়ার দাদু ওকে যে একতারাটা দিয়েছিলেন জন্মদিনে, সেটা নিয়ে জমিয়ে বসেছিল সবাই। বিশুদা হাঁড়ি বাজাচ্ছিল, আর ওরা দুজন গান আর একতারা, বোমকাইদের বাড়িটা কেমন আলো আলো হয়ে গিয়েছিল সেদিন।
ভাবনাটা ছিঁড়ে গেল, জামায় টান পড়েছে, নিশ্চয়ই পুঁটি।
"অ্যাই বাঁদর, কোথায় ছিলি এতক্ষণ?"

উত্তরে পুঁটি কিচ্ছু বলল না, জামা ধরে গেটের দিকে টানতে লাগল কেবল। কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে? দেখা যাক, মা তো এখন সিরিয়াল দেখছে, ও যাবে আর আসবে, ভেবে পুঁটিলালের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল বোমকাই।

"এই রে, অ্যাই পুঁটি, খোয়াবঝোরার রাস্তায় যাচ্ছিস কেন?" বোমকাইয়ের ভয় করল। ওদিকে তো সন্ধের পর কেউ যায় না। দানিসায়েবের বাংলো নিয়ে কীসব গল্প শোনা যায়। এগোবে কি এগোবে না ভাবছে ও, শুনতে পেলো, "ঈশান! ঈশান!" "আতিফ! আতিফ!" "অ্যালেক্স! অ্যালেক্স!" হাঁকাহাঁকি করছে কাকারা, কী হয়েছে?

"বোমকাই, তুই এখানে? একা একা কী করতে এসেছিস? যা বাড়ি যা!" চমকে তাকিয়ে বোমকাই দেখল ওর বাবাও আছেন রতনকাকাদের সঙ্গে।
"ঈশানরা কোথায় বাবা? ওদের নাম ধরে ডাকাডাকি করছ কেন?"
"জানি না রে, বুঝতে পারছি না ওরা কোথায়। তিনজনকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।"
"জোসেফদা, বিশুপাগলা কোত্থাও নেই। ওর ঝুপড়ি ফাঁকা, ঝড়তিপড়তি বেড়ালকুকুরগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে বাইরেটায়।" কোত্থেকে যেন হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল রাণাদা।
"সে কী! ওদিকে বিশু, এদিকে এরা তিনজন! গেল কোথায়?"
"চল তো বাংলোর দিকে। ওদিকটা দেখা বাকি এখনও।" বোমকাইয়ের বাবা এগোলেন। বাকিরাও তাঁর সাহস দেখে এগোলো পিছুপিছু। রতন, জোসেফ আর ইরফান একে অন্যকে দেখে ফুঁসছে তখন, কী জানি, ভাবছে হয়তো বড়দের মন্দির মসজিদ চার্চ নিয়ে অনর্থক ঝগড়া চারিয়ে গেছে ছেলেগুলোর মধ্যেও!
বাংলোয় যাওয়া হচ্ছে বুঝতে পেরে পুঁটিলালের লাফঝাঁপ যেন বেড়ে গেল মনে হল। বোমকাইয়ের জামা টেনে প্রায় ছিঁড়ে ফেলে আর কি! তার সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে প্রায় দৌড়ে যেতে হলো বোমকাইকে।

দানিসায়েবের বাংলোয় ঢোকার পর গোটা দলটাকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে গেল পুঁটিলালই, এরা সব ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে হাঁটছে তখন, দেখে বোঝার উপায় নেই যে বিকেলেই ভয়ানক মারদাঙ্গা হয়েছে। ঘুটঘুটে আঁধার চারপাশে, কেবল একদিক থেকে ক্ষীণ আলো আসছে, পুঁটিও ছুটে সেদিকেই চলল। বাকিরাও এগোলো পিছুপিছু।

মশাল জ্বলছিল ঘরটার দোরগোড়ায়, তাই ভেতরে দেখতে অসুবিধা হলো না কিছু।

"ওই তো অ্যালেক্স!"ছুটে গেল জোসেফকাকু,
তার পিছনেই ছুটল রতনকাকা, "ঈশান, কী করছিস এদের সঙ্গে?" বলতে বলতে।
"আতিফ, বেরিয়ে চ এখান থেকে" এবার এগোলো ইরফানকাকা, "মিশতে বারণ করেছি না ওদের সঙ্গে!"

হাত তুলে থামাতে যাচ্ছিল বিশুদা, চোখ পড়ল বোমকাইয়ের দিকে।
"বোম, কুইক, এদিকে আয়।"

বিশুদার হাতে একটা হেলমেট, তার থেকে আবার বেরিয়ে আরও দুটো বিদ্ঘুটে যন্ত্রের মধ্যে ঢুকেছে গাছের গুঁড়ির মতো মোটা মোটা পাইপ। বোমকাই হাঁ হয়ে এগিয়ে গেল, এগিয়ে যেতেই বিশুপাগল ঝপ করে হেলমেটটা ওর মাথায় পরিয়ে খট করে কোথায় কী একটা বোতাম লাগিয়ে দিলো, আর ওদিক থেকে ঈশান, আতিফ আর অ্যালেক্স এসে খপ করে বোমের দুটো হাত চেপে ধরে রইলো। ওদের হাত ধরে টানাটানি করতে লাগলো ওদের বাবারা, যে যার নিজের ছেলেকে টেনে বাড়ি নিয়ে যাবে ব'লে। বড়দের কথা না শুনে ঈশান আতিফ অ্যালেক্স মেশামেশি করেছে, মন্দির মসজিদ গির্জা থাকলে কী, না থাকলেই বা কী, সেসব নিয়ে না ভেবে বড়দের মধ্যে আগের মতো ভাব করিয়ে দেওয়া যায় কী করে, সে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে, ওদের কখনও একসঙ্গে থাকতে দেওয়া চলে? কিন্তু রতনকাকা ইরফানকাকারা কি পারল ওদের আলাদা করতে? নাকি নিজেরাই বেশিক্ষণ আলাদাভাবে ভাবতে পারল আর? বোমকাই সেই যে হেলমেট পরলো, তারপর?

বোমকাই হেলমেট মাথায় দিয়ে কেমন যেন ভেবলে গেল, মনে হচ্ছে যেন ও মাথাটাকে হাঁড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছে, আর কে যেন অনেক দূর থেকে কিছু বলে পাঠাচ্ছে।

"বোমকাই, জন্মদিন... জ-ন্-ম-দি-ন... আগের বছরের জন্মদিন... ভাব সেদিনের কথা...হাঁড়ি, একতারা, গান... হইচই..." বিশুদার গলা না? বোমকাই তো সত্যিই আসার আগে জন্মদিনের কথা ভাবছিল। বিশুদার কথায় মনে পড়ে গেল আবার সেদিনের সব কথা। জোসেফকাকুর দরাজ গলায় "সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে..", আহা! মনে পড়ে ওর এখনও একপাক নেচে নিতে ইচ্ছে করছে। এরা বড়রা যা শুরু করেছে, আর কি জমে উঠবে ওরকম একখানা আসর? গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করে উঠল বোমকাইয়ের। মনে পড়ে গেল আরেকদিনের কথা।

সেদিন বিকেলে ঝড় হয়েছে খুব, বাবা সদরে ফ্যাক্টরির হেড অফিসে গিয়ে ফিরতে পারেননি, এদিকে সন্ধেবেলা বাথরুমে পড়ে গিয়ে বোমকাইয়ের মায়ের মাথা ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড! কী করবে কিচ্ছু বুঝতে না পেরে ও পাশের বাড়ির সাবিত্রীর মাকে ডেকে এনেছিল। লোকের মুখে খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে এসেছিল ইরফানকাকু জোসেফকাকু রতনকাকারা। তারপর মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, রক্ত জোগাড় করা, এমনকি মাঝরাতে বাইক নিয়ে সদরে গিয়ে বড় ওষুধের দোকান থেকে ইঞ্জেকশন কিনে গেস্ট হাউস থেকে বাবাকে নিয়ে ফেরা, সব করেছিল ওরা সবাই মিলে। শেলীকাকিমা অ্যালেক্সকে নিয়ে বোমকাইদের বাড়িতে এসে ছিলেন সেরাতে, অ্যালেক্সদের ঘর পাহারা দিয়েছিলেন ঈশান আর আতিফের মায়েরা।
তখনও তো মন্দির মসজিদ চার্চ সবই ছিল, আলাদা আলাদা, তবে কেন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে সেদিন বোম দেখেছিল ওদের ঠাকুরঘরে চোখ বুজে বসে আছেন শেলীকাকিমা? কেন পরদিন ভোরবেলায় ঘুম ভাঙতেই ওর কপালে ছুঁইয়ে দিয়েছিলেন নিজের গলায় ঝুলতে থাকা ক্রসের লকেটটা? আবার আজ, সেই মন্দির মসজিদ চার্চ নিয়ে কথা উঠতেই গডচাচাকে মার খেতে হলো, মাথা ফাটলো হাত ভাঙলো বাকিদের, কেন? কীসে যে সবাই এক, আর কীসে যে আলাদা, কিচ্ছু বুঝতে পারে না বোমকাই। ওর শুধু কান্না পায়, হেলমেটটা পরার জন্য কিনা বোঝে না, ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা মা জোসেফকাকু আর শেলীকাকিমার কাঁধে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে বাড়ি ঢুকছেন, দুপুরে ঈশান আতিফ অ্যালেক্স আর বোমকাই খেতে বসেছে, ভাত এনেছেন আতিফের মা, ডাল আর বেগুনভাজা এনেছেন ঈশানের মা, এসব দেখতে দেখতে বোমকাই টের পায় ওর গাল বেয়ে ঠোঁটের ওপর গড়িয়ে নামছে নোনতা গরম জল। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে গিয়ে খেয়াল হয় ওকে ছুঁয়ে আছে আতিফ ঈশান অ্যালেক্স আর বিশুদা, চটকা ভাঙে, ঘুরে তাকায় ও।

বোমকাই ঘুরে তাকাতেই ঘোর কাটল বাকিদেরও। জোসেফ বুঝতে পারলেন হেলমেট পরা বোমকাইয়ের দেখানো ছবি দেখতে দেখতে কখন যেন তিনি গলা ছেড়ে গেয়ে উঠেছিলেন, "লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এ নজরে...", অবাক হয়ে দেখলেন রতনের হাত রয়েছে ওঁর কাঁধে, ওদিকে ইরফানের হাত রয়েছে বোমকাইয়ের বাবার পিঠে, তিনি হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছছেন। ওপাশে বিশুর চোখও শুকনো নেই। বড়রা সবাই আস্তে আস্তে গিয়ে দাঁড়াল বিশুর পাশে।
"বিশু, তুমি অসাধ্য সাধন করলে যে! পুলিশ ডেকে লাঠির বাড়ি মেরে যে গোলমাল মেটেনি তা তুমি এক নিমেষে মিটিয়ে দিলে?" বোমকাইয়ের বাবার অবাক প্রশ্ন।

"আমরা সব ভুলে গেছিলাম গো ঘোষালদা, সব হইহই আনন্দ কষ্ট ভাগ করে নেওয়া, সব বিপদে একে অন্যের সঙ্গে থাকা, সব যে একসঙ্গে করেছি, ভুলেই মেরে দিয়েছিলাম। ভাগ্যিস বিশুদা আর ছেলেগুলো ছিল!" রতনকাকার স্বীকারোক্তি শুনে মাথা হেঁট হয়ে গেল বাকিদেরও।

"আমরা নিজেরা তো পচে যাচ্ছিলামই, নতুন তাজা মানুষগুলোকেও পচিয়ে দিচ্ছিলাম, বল রতনা? ছি ছি, কত বড় অন্যায়!" ইরফানকাকু মাথা নাড়লেন আফসোসে।

"কাল হাসপাতালে যাব রে ইরফান, গডচাচার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছি আমরা।" জোসেফকাকুর কথায় সায় দিল সক্কলে, ভুল শোধরাতে হবে যে।

বিশুর এখন গলা খুলে গান গাইতে ইচ্ছে করছে, "আজকে মোদের আরাম বড় শেষ হয়েছে মোদের কাজ...", সত্যিই তো, কলোনির সবাই আবার মিলেমিশে গেল, বড় আরাম, বড় আরাম! বিড়বিড় করতে করতে বিশু এগোচ্ছিল দরজার দিকে, নজর গেল মিশকুন পুঁটি আর ফেলিসিয়ার দিকে।

"আ খেলে যা! আরাম কোথা? হাতিটা যে এখনও বাপমায়ের কাছে যেতে পারল না।"

বিড়বিড় করতে করতে যন্ত্রগুলোর কাছে ফিরে এল বিশু, হাঁক দিল আতিফদের,

"বাচ্চা হাতিটাকে নিয়ে আয়, দোলায় বসা, আমি স্টার্ট দিই।"
"আমরাও যাব বিশুদা, পিলিজ!"
"হ্যাঁ হ্যাঁ মানা কোরো না, আমরা কক্ষনও জঙ্গলে যাইনি, এইবেলা ঘুরে আসা হবে!"
বিশু তো হাঁ হাঁ করে উঠল শুনে,
"আরে পাগলা জঙ্গল কি ঘুরতে যাওয়ার জায়গা? বাচ্চা ছেলেরা জঙ্গলে যায় না।"
"আমরা কিচ্ছু করব না দাদা, চুপ করে থাকব, একটু নিয়ে চলো না আমাদের!"
ছেলের দলের নাছোড় বায়নায় বিশু আর কী করে, "আচ্ছা ঠিইক আছে, ওঠ সবাই।"
বলে কলকব্জা নাড়তে লাগল।

ততক্ষণে মিশকুনকে নিয়ে হুইলের বাকেটগুলোয় বসে পড়েছে একে একে চারটে ছেলে, পুঁটিলাল আর ফেলিসিয়া।

সবাই উঠে বসলে জায়ান্ট হুইলটার ধুলোটুলো ঝেড়েটেড়ে কলকব্জা নেড়েচেড়ে স্টার্ট দিল বিশু, ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার ধাক্কায় আশপাশ থেকে একরাশ ধুলো উড়ে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। বহুবছরের জমা ধুলো, পরিমাণ কম নয়, ঘরময় ধুলোর মেঘে ছেয়ে গেল যেন, ছোট বড় সক্কলে চোখে হাত, থাবা, খুর ইত্যাদি সব চাপা দিতে বাধ্য হলো, মিশকুনের শুঁড়ে সুড়সুড়ি, "হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁচ্চোওও"...... তারপর?

(ধূপছায়া)


।।৭।।

জায়েন্ট হুইলটা ঘুরল কিনা সেটা বোঝা গেল না, কিন্তু চাকা ঘোরার মত ঘ্যাড় ঘ্যাড় করে শব্দ হল একখানা। আর সে কী শব্দ, মিশকুনের পাখার মত বিশাল বিশাল কানদু’টোতে তালা লেগে গেল একেবারে। আর সঙ্গে চোখ ধাঁধানো আলোর ছটা। চমকানি ঝলকানি হুড়ুদ্দুমে পুরোপুরি ভেবলে যাওয়া মিশকুন আবার যখন জ্ঞানবুদ্ধি ফিরে পেল, তখন দানিসাহেবের ল্যাবরেটরি থেকে সে আর তার নতুন বন্ধুবান্ধবরা এসে পৌঁছে গেছে তার জঙ্গলে। ওই তো, ওই তো হেলে পড়া সেই নাম-না-জানা গাছটা! ওর পাশের গাছটায় গা ঘষতে মিশকুনের মা ভারি ভালোবাসে। শুঁড় বাতাসে তুলে মায়ের গায়ের গন্ধ খোঁজে মিশকুন। এই তো, এই তো! আছে মা, কাছাকাছিই আছে! উত্তেজনায় কান নাড়িয়ে, শুঁড় দুলিয়ে সবাইকে ডাকে হাতির ছানা। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জঙ্গলের আরো গভীরে কোথাও থেকে ভেসে আসে হাতির ডাক। মায়ের গলা, মায়ের গলা! লাফিয়েঝাঁপিয়ে ফিরতি হাঁকাড় পাড়ে মিশকুনও। তার বন্ধুরাও সব লাফিয়ে ওঠে আনন্দে।

আর তখনই, বিশুর পায়ের মাঝখান দিয়ে সুট করে বেরিয়ে আসে ফেলিসিয়া। মাটিতে থেবড়ে বসে পড়ে একখানা থাবা চাটতে চাটতে টেরিয়ে দেখে সবাইকে। বলে, “আরেদ্দাঁড়াও! লাফালে হবে? খুব তো যাচ্ছ গোলটুটাকে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দিতে, এটা ভেবে দেখেছ যে মানুষের ছোঁয়া লাগলে হাতির মা ছানাকে নাও ফিরিয়ে নিতে পারে?”

এক ধাক্কায় সক্কলের মুখ শুকিয়ে যায়। সত্যিই তো, পেপারে তো পড়াই যায় এরকম! মানুষের গন্ধ গায়ে পেলে নাকি হাতির দল ফিরিয়ে নেয় না ছানাকে! এইটা তো মাথায় আসেনি এতক্ষণ! ভয়ে একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে সকলে। শুকনো গলায় বোমকাই বলে, “কী হবে গো বিশুকা?”
বিশু নিজেও বুঝি জানে না কী হবে। মাথা চুলকে বলে, “কী জানি রে কী হবে। সব কিছু ভালোয় ভালোয় মিটে গিয়েও শেষরক্ষা কি হবে না?”

এদিকে অন্ধকার জঙ্গল দাপিয়ে ছুটে আসছে আরো অন্ধকার এক বিশাল চেহারা। মিশকুনের মা আসছে ছানার আওয়াজ পেয়ে। মিশকুন আনন্দে ভয়ে মাখামাখি মুখখানা বাড়িয়ে মায়ের আসার রাস্তা দেখে। কী হবে? মা কি নেবে না ওকে? পুশকুনকেও তো মানুষরাই বাঁচিয়েছিল, পুশকুনকে তো ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সবাই কত আনন্দ করে!

এটা ভেবে মনে একটু জোর পায় মিশকুন। কিন্তু মুখে সে কথা বলতেই চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ায় ফেলিসিয়া। বলে, “মানুষের বাচ্চা ছিল তো ওরা। বাচ্চাদের গায়ে কি ঝগড়াঝাঁটি মারামারি কাটাকাটির গন্ধ থাকে নাকি?”

বিশু বলে, “তা’ এরাও তো বাচ্চা। আর আমাকে তো আমি নিজেই মানুষের মধ্যে ধরি না। অসুবিধে হবে না বল?”

ফেলি তাও মাথা নাড়ায়। বলে, “দ্যাখো বাপু, এরা বাচ্চা বটে, কিন্তু এদের বাবারা মারামারি লাঠালাঠি করে যা একখান কান্ড করল ক’দিন! লড়াই ঝগড়ার গন্ধ বড় আঁশটে জানো, রক্তের মত টক টক। ছোঁয়াচ যদি লেগে গিয়ে থাকে ওদের গায়েও?”

আর কিছু ভাবার সময় পায় না কেউ। কারণ ততক্ষণে তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে পাহাড়ের মত এক মা-হাতি। অল্প অল্প হাঁপাচ্ছে বুঝি, দৌড়ে এসেছে তো কত দূর থেকে! মা কে দেখে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে মিশকুন। তার ইচ্ছে করছে ছুট্টে গিয়ে মাকে শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে ধরে, সেঁধিয়ে যায় গুটিসুটি মেরে তার পেটের তলায়। কিন্তু, কিন্তু মা যদি আর ভালো না বাসে তাকে? কোথায় যাবে সে, কী করবে?

আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে মিশকুনের মা। বিশুর ইশারায় ওরা সবাই পেছনে সরে আসে পা পা করে। ভয়ে নয়। মা ছানার মধ্যে থাকতে চায় না বলে সরে আসে। দম বন্ধ করে দেখে সবাই, মিশকুনের গায়ে শুঁড় বুলিয়ে বুলিয়ে দেখছে মা, শুঁকছে বুঝি। সময়ের গতি কমে যায় যেন। এক একটা মিনিটকে যেন কে লম্বা করে দেয় টেনে। তারপর এক সময়ে শুঁড়ে জড়িয়ে মিশকুনকে কাছে টেনে নেয় তার মা। মা-ছানা দু’জনেই শুঁড় উঁচিয়ে ডেকে ওঠে আনন্দের ডাক।

নেচে ওঠে বিশু, নেচে ওঠে আতিফ ঈশান অ্যালেক্স বোমকাই।
“পায়নি, পায়নি, মা হাতি ছানার গায়ে ঝগড়াকুটে মানুষের গন্ধ পায়নি!”
ফেলিসিয়ার মুখেও যেন হাসি ফোটে। মোটকা ল্যাজখানা দুলিয়ে নিয়ে সে বলে,
“যাক বাবা, সব ভালো যার শেষ ভালো!”

মা আর মিশকুন ফিরে যাচ্ছে জঙ্গলের দিকে৷ সবার গলার কাছটা কেমন ব্যথা ব্যথা করছে। মিশকুনেরও করছে। জঙ্গলের মধ্যে কেমন স্যাঁতস্যাঁতে ঠান্ডা ঠান্ডা কিনা, তাই বোধ হয়। যেতে যেতে ফিরে তাকায় মিশকুন, ফিরে তাকায় তার মা। শুঁড়খানা কপালে ঠেকিয়ে ডাক ছেড়ে কী যেন বলে মা হাতি। হাতির ভাষা না বুঝলেও হাত নাড়িয়ে টা টা বাই বাই করে সবাই। আতিফ ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে বিশুকে, “কী বলল গো বিশুকা?”
আলতো হাসে বিশু, বলে, “তেমন কিছু না। বলল, তোমরা খুব ভালো। মানুষ ভালো। থ্যাঙ্ক ইউ।”

মানুষ ভালো। জাতপাত মন্দির মসজিদ সব কিছুর শেষ কথা এই - মানুষ ভালো। এই জানাটুকু বুকে নিয়ে বনস্থলীর দিকে ফিরে চলে ওরা - ক’জন মানুষ আর দু’জন না-মানুষ৷ সন্ধের অন্ধকারেও যেন একখানা নরম আলো ছুঁয়ে থাকে ওদের দুনিয়াটাকে।

(দেবলীনা)

(সমাপ্ত)

অলঙ্করণ : সুস্মিতা কুণ্ডু


আগের পর্বগুলি পড়তে ক্লিক করো নিচের লিঙ্কগুলিতে :
ধারাবাহিক গল্প : বনস্থলীর নব্য পুরাণ (প্রথম পর্ব)
ধারাবাহিক গল্প : বনস্থলীর নব্য পুরাণ (দ্বিতীয় পর্ব)

ধারাবাহিক গল্প : বনস্থলীর নব্য পুরাণ (দ্বিতীয় পর্ব) : টিম কিশলয়



।।৩।।

চৌকির ওপর বসে রাস্তার দিকের জানলাটার দিকে উদাস মুখে তাকিয়ে রয়েছে ঈশান, সামনে খুলে রাখা অঙ্ক বই, এক্স প্লাস ওয়াই ইজ ইক্যুয়াল টু জেড, এ প্লাস বি হোল স্কোয়ারের ফর্মুলা ইত্যাদি। অন্যদিন হলে ঝটাঝট দু'তিনটে প্রশ্নমালা শেষ করে বইখাতা গুছিয়ে রেখে উঠে পড়ত, মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে খানিক আগড়ম বাগড়ম বকে উঠোনে বেরিয়ে আতিফের নাম ধরে হাঁক পাড়তো। সে হাঁক শুনে আতিফের সঙ্গে সঙ্গে অ্যালেক্সও বেরিয়ে আসতো, তারপর উঠোনের একধারে কৃষ্ণচূড়া গাছটার গোড়ায় বসে গ্রুপ ক্যাপ্টেন অ্যালেক্স বিশ্বাস, স্কোয়াড্রন লিডার ঈশান সাহা আর উইং কমাণ্ডার আতিফ আহমেদের জোরদার মিটিং চলতো। ওই কালো আকাশটার বুক চিরে সাঁ করে উড়ে যাওয়া এরোপ্লেনগুলো, নীল আকাশে সাদা মেঘ ছড়িয়ে উড়ে যাওয়া গম্ভীর জেটগুলো, আর ছাব্বিশে জানুয়ারি টিভিতে দেখা গেরুয়া সাদা সবুজ রং ছড়িয়ে উল্টেপাল্টে খেলা করা ফাইটার প্লেনগুলোকে দেখেটেখে ওরা ঠিক করে নিয়েছে যদি কোথাও যেতেই হয় এয়ারফোর্সেই যাওয়া ভালো। ওদের এই বনস্থলী টিম্বার প্রসেসিং ইউনিটের ছোট্ট কলোনির ছেলেপুলে হয়ে এয়ারফোর্সে যাওয়ার ইচ্ছেটিচ্ছেকে আজগুবিই বলা যায়, বিশেষ করে যখন ওদের তিনকুলে কেউ কোনওদিন এয়ারফোর্সে ছিলো না, কী করে ওসব জায়গায় পৌঁছাতে হয়, সে নিয়েও কোনও ধারণা নেই এদের, তবে রাতের আবছায়াতে কৃষ্ণচূড়ার ডালপালায় আটকে যাওয়া চাঁদের আলোয় তিনমূর্তিতে মিলে এসব গোপন কথা আলোচনা করতে বেশ ভালো লাগে। মায়েদের কাছ থেকে রাতের খাওয়ার হাঁকড়ানি আসার আগে পর্যন্ত কথাবার্তা চলতে থাকে, মানে কাল অব্দি তাইই হয়েছে। 

আজ দুপুরের পর যে কী হল, কেমন জানি সব ঘেঁটেঘুঁটে গেল। বিশুপাগলা বলে না, 'ঘেঁটে ঘ হয়ে যাচ্ছে সব' সেই ঘেঁটে ঘ হয়ে গেল ব্যাপারস্যাপার! ভাবতে ভাবতে ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে ঈশানের বুক খালি করে। খাট থেকে নেমে গুটিগুটি পায়ে এসে দাঁড়ায় সদর দরজার সামনে। মা এখন সাত ভাই চম্পা দেখছে, শুনতে পাবে না, ও আস্তে আস্তে ছিটকিনি খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। রাস্তার আলো এসে পড়েছে উঠোনে, আতিফ আর অ্যালেক্সের বারান্দার আলো নেভানো, স্পষ্ট করে কিছু দেখা যাচ্ছে না, তবুও ঈশান জানে, আরও দুটো শরীর ওর মতোই অন্ধকারে মিশে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে যার বাড়ির সদর দরজায়। মিনিটকয়েক ভেবে উঠোনে নামলো ঈশান, ওর দেখাদেখি বাকি দুটো ছায়াও এগিয়ে এলো আলোর দিকে, আতিফ, অ্যালেক্স আর ঈশান তিনমূর্তিতে গিয়ে বসল কৃষ্ণচূড়ার গোড়ায়।

"গডচাচা কেমন আছে রে? আর ইরফানকাকু?" ফিসফিস করে শুধোলো ঈশান।

"বাবার মাথায় স্টিচ পড়েছে দুটো, শুয়ে আছে ঘরে। গডচাচাকে শুনলাম দু'দিন হাসপাতালে রাখবে।"

"রতনকাকারা হেব্বি ক্ষেপে গেছে। লোকজন নিয়ে বড়সায়েবের কাছে মিটিং করতে গেছে। সত্যি, গডচাচার গায়ে কেন হাত তুলল বল তো বাবারা?" অ্যালেক্স ডানপায়ের বুড়ো আঙুলটা মাটিতে ঘষতে ঘষতে বলে উঠলো।

"কী নাকি মন্দির মসজিদ চার্চ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে বলেছিল গডচাচা, 'ইয়ে সব ঝুট হ্যায়' বলে চিৎকার করছিল ফ্যাক্টরি ক্যান্টিনের বাইরে দাঁড়িয়ে, তাইতেই নাকি জোসেফকাকু আর রাণাদা গডচাচাকে ধাক্কা মেরেছিল, তারপরেই গোলমাল বাধে।"

গডচাচা, মানে বনস্থলী টিম্বার প্রসেসিং ইউনিটের আদিযুগের মিস্তিরি মাথার ব্যামোর রুগি ভগবান দাসের দুটো এলোমেলো কথায় সে নাকি এমন গোলমাল বেধে গিয়েছিল, যাতে সবাই একেবারে হাত খুলে সবাইকে মারধর করতে শুরু করে দিয়েছিল, রতন সাহা, ইরফান আহমেদ, জোসেফ বিশ্বাস, যারা সেদিন সকালেও একই টিপকল থেকে জল তুলে বালতিতে জল বয়ে নিয়ে গেছে ইস্কুলের ছেলেদের মতো লাইন করে, তারা সব ক্ষ্যাপা মোষের মতো এ ওর ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এইসান লড়াই লড়েছে যে কারও মাথা ফেটেছে, কারও হাত ভেঙেছে, শেষে দারোগা অবনী মল্লিক এসে পড়ায় মারামারি থেমেছে।

"হ্যাঃ, গডচাচা তো ওসব বলেই, মনে নেই, শিল্ড ফাইনালের দিন সারাক্ষণ মাঠের ধারে চেঁচাচ্ছিল, "মার, মার ব্যাটাদের, জাতের নামে বজ্জাতি সব, লাথি মেরে দে ব্যাটাদের বদন বদলে, ওই ওই ফুটবল দিয়েই গুঁড়িয়ে দে মন্দির মসজিদ চার্চ যা আছে সব....", সেই শুনে কি আমরা তেড়ে মারতে গেছি চাচাকে?"

"সত্যি বাবা, এই দামড়া লোকগুলো আর মানুষ হলো না!" 
এক্কেবারে শেলীকাকিমার মতো করে সুর টেনে বলে উঠলো অ্যালেক্স, বাকি দুজন হো হো করে হেসে উঠতে গিয়েও 'শশশ' করে মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করে গেল। বড়রা শুনতে পেলে বেধড়ক ঠ্যাঙাবে, আজ দুপুরের পর থেকে আতিফ ঈশান অ্যালেক্সদের বাড়ির লোকেদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ যে! বিকেলে বল নিয়ে লাথালাথি না করলে যাদের সন্ধেটা তেঁতুল ছাড়া আলুকাবলির মতো পানসে লাগে, তাদের আজ থেকে নাকি একসাথে খেলতে যাওয়াই বারণ হয়ে গেছে! হুঁঃ, মানুষের যত বয়স বাড়ে, বুদ্ধি তত কমে।

"এই এই দ্যাখ দ্যাখ!" 
আতিফ হঠাৎ চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠলো। ওর ডাকে সবাই মুখ তুলে দেখল ঝুপসোল্যাজ কাবলি বেড়াল ফেলিসিয়া, দিনভর নেচে বেড়ানো বোমকাইয়ের পোষা ছাগল পুঁটিলাল (একে ছাগল বললে বোম ক্ষেপে ব্যোম হয়ে যায়) আর বিশুপাগল হন্তদন্ত হয়ে খোয়াবঝোরার দিকে চলেছে, আর, কী কাণ্ড, দেখে তিনমূর্তির মুখের হাঁ-গুলো দশটাকা দামের বোম্বাই রসগোল্লার মতো হয়ে গেল, ফেলিসিয়াদের পিছু পিছু হেলেদুলে চলেছে অন্ধকারের একটা মিশকালো ডেলা, ফটাফট কান নাড়াতে নাড়াতে আর শুঁড় নাচাতে নাচাতে, চাঁদের আলোয় চকচক করছে লম্বা দুটো দাঁত।

"হাআআতিইই!!" হাঁ হয়ে যাওয়া মুখগুলো দিয়ে আওয়াজ বেরলো অবশেষে!

"ই কী কাণ্ড! বিশুপাগল হাতি পুষছে কবে থেকে?"

"পুষছে নাকি?"

"নইলে সন্ধেরাতে হাতি বগলে ঝোরার দিকে হাঁটা লাগিয়েছে কেন? আবার পুঁটি আর কাবলিটাও আছে!"

"যাবি ওদের পিছু পিছু? কোথায় যাচ্ছে কী করছে একটু দেখে আসি!" ঈশানের প্রস্তাবে একরকম নেচেই উঠলো বাকি দুই মক্কেল।

ওই বিশুপাগল অনেকরকম তুকতাক জানে। সেই সেবারে জিতুর পিসি আর কাঞ্চনের কাকিমার ভয়ানক ঝগড়া বেধেছিল, কলোনি ছাড়িয়ে পাশের পাড়াতেও নাকি ওদের গলার আওয়াজ পৌঁছে গিয়েছিল। বিশুপাগল দু'টুকরো পাকা পেঁপে দু'হাতে ধরে কোত্থেকে যেন দৌড়ে এসে টুকরোদুটোয় বিড়বিড় করে কীসব মন্ত্র পড়ে সেদুটো গুঁজে দিয়েছিল দুই ঝগড়ুটের মুখে। ব্যস, সেই যে ঝগড়া থেমেছিল, আজ ন'দশমাস হয়ে গেছে দুই বাড়িতে আর চেঁচামেচি শোনা যায়নি। তাছাড়া বিশুর আস্তানার পাশ দিয়ে যেতে যেতে লোকে যদি একটু খেয়াল করে, দেখবে তার ঘরের সামনে সার বেঁধে বসে আছে কলোনির যত ঘিয়েভাজা কুকুর, কানছেঁড়া বেড়াল, একঠেঙে কাক, হাতভাঙা বাঁদরবাচ্চারা, আর বিশু কখনও ভৌঔ ডেকে, কখনও মিঁয়াও, ফ্যাঁস, কক্কঃ, ইত্যাদি বিচিত্র ভাষায় তাদের সঙ্গে আলাপ করছে। এসব দেখেশুনে বড়রা বিশুকে বলে ভেকধরা পাগল, আসলে সে টেররিস্ট কিংবা স্পাই হলেও কেউ নাকি অবাক হবে না। কিন্তু আতিফ বোমকাইদের মতো বুদ্ধিমান মানুষদের ধারণা, বিশুপাগল নোবেলজয়ী না হলেও ওরই কাছাকাছি লেভেলের কোনও জিনিয়াস বিজ্ঞানীটিজ্ঞানী হবেন, মানবজাতির স্বার্থেই তাঁকে ছদ্মবেশে থাকতে হয়। তাই আজ যখন অ্যালেক্সদের জীবনে এত বড় একটা সমস্যা, আধবুড়ো লোকজন নিজেরা অকারণে মারামারি করছে আর খেলা বন্ধ হচ্ছে ওদের, তখন তিনজনেরই মনে হল, ব্যাপারটা বিশুকে খুলে বললে হয় তো!

"চল তবে!" 
বলে আস্তে আস্তে চটি পায়ে গলিয়ে তিনমূর্তিতে হাঁটা লাগালো খোয়াবঝোরার দিকে। শুকিয়ে আসা ঝোরার ধারেই একটা পোড়ো বাড়ি, এককালের দানিসায়েবের বাংলো, এরা দূর থেকে দেখতে পেলো বিশু আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা সেই বাড়িতেই ঢুকলো।

(ধূপছায়া)


।। ৪ ।।


পৃথিবীটা ঠিক কতটা বড়? বিশু বারবার বোঝার চেষ্টা করে। শ্রীকৃষ্ণ ঠাকুরের এক হাঁ-এর মধ্যে নাকি সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় বস্তু এঁটে যায়! তা বহু চেষ্টা করেও কৃষ্ণ ঠাকুর দেখা দেননি, হয়তো বিশুর বাক্সবোঝাই প্রশ্নের বহর দেখে আর আসেননি, নাহলে বেশ বোঝা যেত। 

অবশ্য গডচাচা বলেন, 
“কেউ নেই, ওসব কেউ নেই। মানুষ, পুজো করতে হলে এই রক্তমাংসের মানুষকে পুজো কর, তার সততা, পরিশ্রমকে পুজো কর। যে অভাবনীয় শক্তি এই প্রকৃতির মধ্যে, জীবজগতের মধ্যে আছে, তাইই ঈশ্বর।” 

তা ভুল কিছু বলেন না গডচাচা, বিশু উপলব্ধি করেছে। বাবুই পাখি কীভাবে ঠোঁট দিয়ে ডালপালা, পাতা এনে বুনে ফেলে ঐ আশ্চর্য বাসা, পিঁপড়ে কীভাবে তার শরীরের থেকে অত ভারী জিনিস বয়ে নিয়ে চলে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়! সেবার যখন আফ্রিকা গেল ও, দেখেছিল এক জায়গায় প্রবল বৃষ্টির ফলে পুরো গ্রাম ভেসে যায়। জলের মধ্যে চলে যায় অনেক কিছু। ঐ জলের তোড়ে ক্ষয়ে যায় মাটি, নষ্ট হয় পিঁপড়েদের বাসা। তবু ওরা ভেসে তলিয়ে যায় না, সবাই একসঙ্গে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে একটা গোল বৃত্তের মতো আকার নিয়ে জলের ওপর ভেসে থাকে, অত গভীর জলে সাঁতার কেটেও বাঁচতে পারবে না, কিন্তু একসঙ্গে এত পিঁপড়ে ঐভাবে থাকাতে ঠিক ভেসে থাকে ওরা জলের ওপরে। 

ও বোঝে জীবজগতেই এক অবিনশ্বর শক্তি আছে, আর তাইই সব। 

বিশু কর গুনে পৃথিবী মাপে, ছুঁয়ে ছুঁয়ে বোঝার চেষ্টা করে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কেউ কিছু বলছে কিনা। এইভাবেই পেয়ে যায় হঠাৎ হঠাৎ কতকিছুর সন্ধান! সেবার রাস্তায় পড়ে থাকা একটা আধুলিকে ছুঁতেই ও পৌঁছে গিয়েছিল কত রাজাগজাদের মধ্যে, তারপর আরেকবার আবিষ্কার করে একটা ভাঙা তানপুরা, হাতে ধরতে না ধরতেই কোন বাদশাহ বলে ওঠে, ‘গান করো তানসেন’, সে মস্ত ফাঁপরে পড়েছিল সেবার। বিশু বোঝে কিছুই ফেলনার নয়, কেউই নয়, সবার কথা মন দিয়ে শুনতে হয়। ও তাই নিজের ঘরের বারান্দায় ঠায় বসে শুনতে থাকে কানছেঁড়া বেড়াল, একঠেঙে কাক, হাতভাঙা বাঁদরবাচ্চাদের মনের কথা, আহা ওদের কত কী বলার থাকে, একটু নয় শরীরটা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ওদের সঙ্গে, তাই বলে ওদের সমাজ থেকে দূরে রাখতে হবে! ও ঠিক করেছে এরকম সব্বাইকে নিজের কাছে এনে রাখবে। আর এদের সবারও এখন বিশু না হলে চলে না। জীবজন্তুরাও এই ভালোবাসার কথা বোঝে, শুধু মানুষগুলোই বোঝে না, উল্টে তারা আবার ওকে পাগল বলে! বিশু ভাবতেই নিজে হেসে ওঠে হঠাৎ জোরে জোরে। 
মিশকুন ঐ হাসি শুনে শুঁড় দিয়ে ফেলিসিয়ার ল্যাজ টানে, ফেলিসিয়া একটা বুঝদারের হাসি হেসে বলে, “ভয় পেয়ো না, ও বিশুদা একটু ওরকম, নিজের মনেই হঠাৎ হঠাৎ হেসে ফেলে। তবে বুদ্ধি কিন্তু অনেক, এখন তোমাকে আর ঈশান, আতিফদের বাঁচাতে পারে শুধু বিশুদাই। ”

দানিসায়েবের বাংলোর দরজা ঝুরঝুরে, কেউ হাত দেওয়ারও সাহস পায় না, দিলেই ভেঙে যাবে, আসলে কেউ এদিকে আসারই সাহস পায় না। বিকেলের পর থেকে এই জায়গা সবাই এড়িয়ে চলে, অনেকরকম প্রেতভূতদের দেখা মেলে নাকি! তা এইরকম জায়গার দিকে পা বাড়ানো ইস্তক পুঁটিলাল একটু কেঁপে কেঁপে উঠছে। শুধু ফেলিদিদি আছে বলে শান্তি। বড্ড ধীরস্থির এই ফেলিদিদি, বটুকদাদা হলে এতক্ষণ তিন-চারবার ভিরমি খেত এই অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে। এতটাই ঘুটঘুটে অন্ধকার, খালি চোখে আশেপাশে ঝোপের অস্তিত্ব শুধু টের পাওয়া যাচ্ছে, দেখা যায় না। 
তো এই একজন মানুষ, একটা বিড়াল, একটা ছাগল আর একটা হাতি ঢুকলো বাংলোর মধ্যে। বাংলো বলেই মিশকুন অনায়াসে পারলো, নাহলে দরজাতেই এঁটে যেত। মিশকুনের গা ছমছম করছে, ইরু, শীলুর সঙ্গে ওর খুব ভাব ভালোবাসা কিন্তু ওদের বাড়িতে ঢোকেনি ও, এই প্রথম কোনো বাড়িতে ঢুকলো, ঢুকে একদম ভালো লাগলো না। ধুস, গাছগাছালি নেই, হাওয়া কম, দৌড়ে বেড়ানো যাবে না, নদী নেই, বদ্ধ কেমন, কেমন যেন বিচ্ছিন্ন, এরকম জায়গায় মানুষগুলো থাকে কীভাবে? 

বিশু বাংলোতে ঢুকে কিছুটা হেঁটে গিয়ে দক্ষিণ দিকের একটা ঘরে ঢুকলো। পিছু পিছু ঢুকলো আরো তিনজন। ওর সঙ্গে একটা হ্যারিকেন ছিল। হ্যারিকেন থেকে আগুন নিয়ে ও দরজার দুইদিকে রাখা মশালগুলো জ্বালিয়ে দিলো। ঘরটা অনেকটা আলোময় হতেই জিনিসপত্রের ওপর রাখা সাদা কাপড়টা তুলে ফেলে দিলো ও। আর বেরিয়ে পড়ল কতকগুলো কিম্ভুতকিমাকার যন্ত্র। বিশু হাততালি দিয়ে উঠলো। 

“অনেকদিন এগুলোর কাছে আসা হয় না। কী যে আনন্দ হয় এগুলোকে দেখে! আজব আজব কাজ করতে পারে কিন্তু এরা।”

বিশুর উৎসাহ দেখে পুঁটিলালের কাঁপুনি একটু কমেছে। এই অদ্ভুত জিনিসগুলো কী? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। শুধু বিশুদা বোমকাইয়ের মতো লাফাচ্ছে। বোমকাই যখন খেলার জন্য বাড়ি থেকে বেরোয় এরকম লাফায়। ও উৎসুক হয়ে এগিয়ে গেল যন্ত্রগুলোর দিকে। 

“এগুলো কী করতে পারে বিশুদা?”

“এটা?” গ্রামোফোনের মাইকের মত একটা যন্ত্রকে দেখিয়ে বলতে থাকলো বিশু,

“ এই মাইকের মুখে হাসির কিছু বললে তাতে আনন্দের দশগুণ মাত্রা বেড়ে গিয়ে পৌঁছে যাবে তার কাছে, যার কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দিতে চাও। আবার দুঃখের, ভয়ের, চিন্তার কিছু বললে সেটাও দশগুণ বেড়ে গিয়ে পৌঁছে যাবে তার কাছে। 

আর এই যে দেখছো হেলমেট, এটা মাথায় পরলেই যেমন ইচ্ছে স্মৃতি তুমি আনতে পারবে নিজের মাথার মধ্যে। কোনো ঘটনা বা তারিখ বললেও সেই ঘটনা বা সেই দিনে হওয়া সমস্ত কিছু দেখতে পাবে। আর শুধু তাই নয়, এমনকী একজন পরলে বাকি সবাই যদি তাকে ছুঁয়েও থাকে তাহলে তারাও ঐ স্মৃতি, ভাবনা সব দেখতে পাবে। 

আর এইটা হচ্ছে জায়ান্ট হুইল, এর ভেতরে চেপে বসলেই যেখানে খুশি যেতে পারবে। 

তবে এই তিনটে যন্ত্রই পরস্পরের সঙ্গে জড়িত, দেখো এই মোটা মোটা গাছের গুঁড়ির মতো পাইপ দিয়ে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে আছে। তাই এগুলো ব্যবহারের কিছু নিয়ম আছে। যন্ত্রগুলো তো খুব পুরানো, তাই একবছরে একবারই এই তিনটে যন্ত্রের মধ্যে যেকোনো দুটো যন্ত্র ব্যবহার করা যায়। তারপর এক বছর ধরে আর করা যায় না, তখন এদের খাওয়াদাওয়া চলে। তখন আর এদের ডিস্টার্ব করা যায় না। ”

“কী খায় এরা?”

সবাই চমকে উঠলো। চারজন ছাড়াও যে ঘরে আরো তিনজন ঢুকে পড়েছে তা তো বোঝেইনি কেউ। তাই হঠাৎ গলা শুনে ঘাবড়ে গেছে সবাই। বিশু বললো, “আয় ঈশান, আতিফ, অ্যালেক্স, আয় তোরা ভেতরে, আমি জানতাম তোরা আসবি।”

“তুমি সত্যিই বিজ্ঞানী, বিশুদাদা, কীরে আতিফ তোকে বলতাম না আমি?”
ঈশান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো। 

বিশু হো হো করে হেসে উঠলো। “না রে পাগল, এসব কি আমার নাকি? এসব বহু প্রাচীন যন্ত্র, অবস্থার হেরফেরে আমার হাতে এসে পড়েছে, খুঁজে পেয়েছি বলতে পারিস।

হ্যাঁ, তোর আগের প্রশ্নের উত্তর, এরা গাছের মতোই জল, হাওয়া, রোদ খায়। আর কিছু না।”


মিশকুনের ভারী পছন্দ হয়েছে সব যন্ত্রগুলো। ঠিক কী কী কাজ কীভাবে করে তা ও বোঝেনি, তবু খুব ভালো লেগেছে। এই প্রথম ওর বিশ্বাস হচ্ছে যে ও আর হারিয়ে গিয়ে থাকবে না, ও নিশ্চয়ই এবার ফিরে যেতে পারবে মায়ের কাছে। শুঁড় তুলে ও বললো, “বিশুদাদা, আমার দুই বন্ধু ইরু, শীলুকে ডেকে দেবে এই যন্ত্রের মাধ্যমে বা আমার বন্ধু পুশকুনকে বা আমার মা বাবাকে?”

“হ্যাঁ, দেবই তো, ঐ জন্য তো তোমাদের আনলাম এখানে। দাঁড়াও।” বিশু এগোতে গেল গ্রামোফোনের মতো দেখতে যন্ত্রটার দিকে। 

“বিশুদাদা, আমাদের বাবাদের মধ্যে সব ঠিক করে দাও না! সবাই যাতে আবার একসঙ্গে থাকি সারাজীবন, কারোর মধ্যে যেন কোনো ঝামেলা না হয় আর! ঠিক করে দাও না সব!” আতিফ কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো।

বিশু থেমে গেল। সত্যিই তো, এই সমস্যাও তো দূর করতে হবে। সবার সমস্যার সমাধান হয় এমন কিছু পথ বের করতে হবে। কারণ একবার দুটো যন্ত্র ব্যবহার হয়ে গেলে আর এক বছর এগুলো ব্যবহার করা যাবে না। 

(অনিন্দ্য)


(পরের পর্ব আগামী সংখ্যায়)


অলঙ্করণ : সুস্মিতা কুণ্ডু


প্রথম পর্ব পড়তে হলে ক্লিক করো নিচের লিঙ্কে 👇 :
ধারাবাহিক গল্প : বনস্থলীর নব্য পুরাণ (প্রথম পর্ব)

ধারাবাহিক গল্প : বনস্থলীর নব্য পুরাণ (প্রথম পর্ব) : টিম কিশলয়




।।১।।

-“জানো মা, বাবুইটা না ভারী বোকা! বলে নাকি মানুষরা একদম ভালো নয়, খুব দুষ্টু। সবসময় ঝগড়া করে। ও তো উড়ে উড়ে জঙ্গলের বাইরে মানুষদের আস্তানায় যায়, তখন নাকি দেখেছে সব মানুষগুলো মোট্টে মিলেমিশে থাকে না। আচ্ছা তুমিই বলো এর থেকে আর হাসির কথা কিছু হয়? সেই যেবার পুশকুন গর্তে পড়ে গেল সেবার ইরু আর শীলু, মানুষদের দু’টো ছানাই তো ওকে বাঁচাল বলো? আমি যেই এই কথা বললুম ওমনি বাবুই বললে, ‘গর্তটাও তো মানুষরাই খুঁড়েছিল’। দুষ্টু মানুষরা নাকি আমাদের ধরে আমাদের এই সাদা সাদা দাঁতগুলো কেটে নেয়! হ্যাঁ মা, এমনটা কি সত্যি হয় গো? ও মা বলো না, চুপ করে রইলে কেন?”

মা-কে ডাকতে গিয়ে পেছন ফিরে মিশকুন দেখে কেউ নেই আশেপাশে, বড় বড় গাছগুলো ছাড়া। ঝুপ করে আঁধার নেমে এসেছে। অথচ এই মাত্র তো এত্ত আলো ছিল চারদিকে। পাতার ফাঁক গলে নেমে আসা সূর্যের আলোর গোল গোল চাকতিগুলোর সাথে ধরাধরি খেলছিল মিশকুন। গাবদুগুবদু পা দিয়ে যেই না রোদ্দুরের গোল্লাগুলোকে চেপে ধরছে ওমনি দুষ্টু হাওয়াতে গাছের পাতা নড়ে উঠছে আর ওর পায়ের তলা দিয়ে পিছলে রোদ্দুরের গোল্লাটা বেরিয়ে পড়ছে। আবার যেই শুঁড় বাড়িয়ে ধরতে গেছে ঝোপের ওপরে ঘাপটি মেরে থাকা হলুদ গোল্লাটাকে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁচ্চো!’, ব্যস! ঝোপটা প্রবল বেগে নড়ে গিয়ে রোদ্দুর ভ্যানিশ।

এই খেলা খেলতে খেলতে মিশকুন লক্ষ্যই করেনি যে কখন দলছুট হয়ে পড়েছে। মা এইজন্যই সবসময় বলে শুঁড় দিয়ে মায়ের লেজটাকে শক্ত করে পাকিয়ে ধরে থাকতে। কিন্তু সে কথা মিশকুনের মাথায় থাকলে তো! একটা প্রজাপতি কিংবা ফড়িং দেখতে পেলেই হয়েছে! তার পেছন পেছন যে কোন দিকে চলে যাবে মিশকুন তার নেই ঠিক। তবে প্রতিবারই একটু পরে টের পেয়ে মা ওর লম্বা লম্বা কুলোর মত কানদুটো শুঁড়ে করে পেঁচিয়ে ধরে টেনে নিয়ে যায় দলের সবার কাছে, অথবা মিশকুন নিজেই ফিরে চলে আসে। কিন্তু এবার মায়ের কাছছাড়া হয়ে অনেকটা দূরেই চলে এসেছে। একটু গা ছমছম করে ওঠে মিশকুনের। দেখতে মিশকুন অনেক বড়সড় হলে কী হবে, আসলে তো ও কয়েকমাসের বাচ্চা। তাই মা আশেপাশে না থাকলে একটু ভয় পায় বৈকি।

সূয্যিমামা পাটে গেলেই জঙ্গলে বড্ড ঝুপ করে আঁধার ঘনিয়ে আসে। নিমেষের মধ্যে চারিদিক কালো হয়ে যায়। বটগাছ আশুথগাছ শালগাছগুলোকে মনে হয় যেন বিশাল বিশাল দৈত্য কাঁধে গদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস যখন বয়ে যায় পাতার ফাঁক গলে শনশন আওয়াজ ওঠে, গা শিরিশিরিয়ে ওঠে কেমন। আর দূরে সব হায়না ফেউ শেয়াল ডাকলে তো আর কথাই নেই। মিশকুন সোজা গিয়ে মায়ের পেটের তলাটিতে ঠাঁই নেয়। তখন অবশ্য সব ভয় চলে যায়। কিন্তু এই মুহূর্তে মিশকুন কী করবে? মা-কে কোথায় পাবে? ভয়ের চোটে মাথার বুদ্ধিগুলো সব গুবলেট হয়ে যায়। মা কতবার মিশকুনকে বলে রেখেছিল যে যদি কখনও দলছুট হয়ে যায় তাহলে চুপটি করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে, বিশেষ করে রাতের বেলায়। দলের বড়রা ঠিক খুঁজে বার করে নেবে। কিন্তু যদি মিশকুনও এদিকে মাকে খুঁজতে যায় আর মা ওদিকে মিশকুনকে খুঁজতে যায় তাহলে তো কেউই কাউকে খুঁজে পাবেনা।

আর জোরে জোরে ডেকে খোঁজ করাটাও বিপদ, কারণ যদি বনের হিংস্র পশুরা টের পায় একটা বাচ্চা হাতি এক্কেবারে একা রয়েছে তাহলে আর মোটেই নিরাপদ ব্যাপার হবে না। যদিও এই বনে বাঘ সিংহ নেই তবে হায়না, নেকড়ে আছে কতকগুলো। কালো ছোপছোপ হলদে চিতাবাঘও আছে একটা। এমনিতে এরা সব হাতিদের এড়িয়ে চলে, কিন্তু সেটা তখনই যখন হাতিরা দলবেঁধে থাকে। এদিকে মিশকুন আচমকা ভয় পেয়ে এইসব ভুলে ইতিউতি মায়ের খোঁজে দৌড়তে থাকে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে ছুটোছুটি করার পর ক্লান্ত হয়ে মিশকুন একটা বড় গাছের তলায় এসে বসে। কপাল ভালো যে এখনও কোনও হিংস্র পশুর নজরে পড়েনি ও। অন্ধকারে তারাও যে যার জায়গায় ঘুমোতে চলে গেছে মনে হয়।

মিশকুনের এবার খুব কান্না পায়। কী হবে! আর যদি কোনওদিন ফিরতে না পারে মায়ের কাছে। শুঁড় দিয়ে চোখের উপচে আসা জল মোছার চেষ্টা করে। এমন সময় কানে একটা আওয়াজ আসে, ‘পিঁপ পিঁপ পিঁপিপ পিঁইইইইপ’। বড় বড় কানগুলো একবার ঝাপটে নেয় মিশকুন। ভুল শুনল না তো? ফের কান খাড়া করে থাকে। একটু পরে কানে আসে, ‘প্যাঁ পোঁ প্যাঁ পোঁ প্যাঁ পোঁ’!

আওয়াজ লক্ষ্য করে মিশকুন হাঁটা দেয়। একটু এগোতেই জঙ্গলটা পাতলা হয়ে আসে ধীরে ধীরে। তার মানে মিশকুন কি পথ ভুলে ঘুরতে ঘুরতে জঙ্গলের শেষপ্রান্তে মানুষদের বসতির কাছে চলে এসেছে?

এর আগে কক্ষনো মানুষদের এলাকায় আসেনি মিশকুনের মত ছোট্ট হাতিরা। তবে মানুষদের সাথে মোলাকাত হয়েছে বেশ কয়েকবার। গাছ থেকে মৌচাক ভেঙ্গে মধু সংগ্রহ করতে আসে অনেক মানুষ, তাদের দেখেছে। কেউ কাঠ কাটতে আসে, কেউ শালপাতা কুড়োতে আসে। কী করে কে জানে মানুষরা এসব? বাবুই বলছিল ইদানীং তো আবার কিছু বদমাইশ মানুষ নাকি জঙ্গলে আসে পশুদের মারতে। তাদের মেরে তাদের চামড়া হাড় এসব নাকি নিয়ে যায়। মিশকুনের তো শুনেই গা শিউরে উঠেছিল। এমনও হয়? অথচ ঐ দু’টো মানুষের ছানা ইরু আর শীলু, ওরা তো অমন নয়, ওরা কত্ত ভালো।

মা-কে জিজ্ঞেস করলে মা বলে, সব মানুষ তো সমান হয় না। কেউ ভালো কেউ বা মন্দ। হিংস্র পশুরা খিদে পেলে তবেই প্রাণীহত্যা করে, কিন্তু যে মানুষরা খারাপ হয় তারা নাকি লোভের জন্য এমন করে।

এইসব নানা কথা মনের মধ্যে বুজকুড়ি কাটতে থাকে মিশকুনের। যাবে কি যাবে না, এই ভাবতে ভাবতেই দেখে কখন জঙ্গলের ধারের বড় রাস্তাটার পাশে চলে এসেছে। রাস্তা টপকালেই ওপারে মানুষদের বসতি। অনেকটা দূরে একটা বাক্সর মত চাকা লাগানো জিনিস যেটাকে নাকি ‘বাস’ বলে, ভ্যাঁ পোঁ ভ্যাঁ পোঁ জগঝম্প শব্দ করতে করতে চলে যাচ্ছে। এই শব্দই তবে কানে এসেছিলো মিশকুনের। কিন্তু সামনের বড় রাস্তাটা দেখে বুক ঢিপঢিপ করে ওর। মা বলেছিল এইসব রাস্তা দিয়ে মানুষ ‘বাস’ চালিয়ে অনেক দূরে দূরে যায়। আর তখন পশুপাখিরা রাস্তা পেরোতে গেলে তাদের দুম করে চাপা দিয়ে দেয়। মিশকুন ভয়ে ভয়ে ডাইনে বাঁয়ে চায়। নাহ্! কোথাও কেউ নেই, কোনও ‘বাস’ও নেই আর।

কিন্তু রাস্তা টপকে মানুষদের এলাকায় যাওয়া কি ঠিক হবে? জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে গেলে মায়েরা তো আর খুঁজেই পাবে না। এদিকে ভারী কৌতূহলও হচ্ছে কিনা। যদি একবার ইরু আর শীলুর সাথে ফের দেখা হয়। মিশকুনের নাকটা সুড়সুড় করে ‘হ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁচ্চো’ হয় একটা ইয়াব্বড়। মিশকুন দেখেছে অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেলেই ওর লম্বা নাকটা সুড়সুড় করে। আর বেশি ভাবনাচিন্তা না করে চোঁওও করে এক ছুটে রাস্তাটা টপকে যায় মিশকুন।

জঙ্গলের বাইরে এখনও অন্ধকার ঘনায়নি তেমন। সূয্যিমামা আকাশে না থাকলেও, বেশ একটা নরম আলো চারদিকে বিছিয়ে আছে। একটু দূরে সারি সারি বাড়ি। ছোটো, বড়, বেঁটে, লম্বা, রোগা, মোটা, নানা আকারের। একটা ইয়াব্বড় মাঠ। তার চারদিকে জালের মত ঘেরা। ভেতরে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে খেলা করছে। ইরু আর শীলু ওখানে নেই তো? ওদিকপানে গুটিগুটি এগোয় মিশকুন। মাঠটা থেকে একটু দূরের একটা ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করতে থাকে। ইরু আর শীলুকে দেখতে পেলেই শুঁড় দুলিয়ে ডাকবে। ওরা নিশ্চয়ই মিশকুনকে চিনতে পারবে, তারপর ঠিক ওকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।

হঠাৎই মিশকুনের লেজে একটা জোরসে টান পড়ে।

‘ইইইক্কিক্কিইয়াওঁ!!!’ বলে লাফিয়ে ওঠে মিশকুন। পেছন ফিরে দেখে একটা ছোট্টমতন কালোমতন কপালে সাদা বাঁকা চাঁদওয়ালা একটা ছাগলছানার মুখে ওর লেজটা।

-“অ্যাই অ্যাই! তুই কে রে! আমার লেজ চিবোচ্চিস কেন?”

ছাগলছানাটা এর আগে মনে হয় হাতি দেখেনি। ড্যাবড্যাব করে মিশকুনের দিকে চেয়ে বলে,

-“ম্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা! আমি পুঁটিলাল, বোমকাইয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড! তুমি কে গা? তোমার নাকটা কত লম্বা! তোমার কানদুটো কত বড়! তোমার পা’গুলো কত মোটা মোটা! তোমার গায়ে খুব শক্তি না গো? তোমার নাম কী গো? তুমি কোথায় থাকো!”

মিশকুন খানিকটা হতভম্ব হয়ে বলে,

-“আমি মিশকুন! আমি ওই রাস্তার ওপারে জঙ্গলে থাকি। এখানে আমার বন্ধু ইরা আর শীলু থাকে। আমি ওদের সাথে দেখা করতে এসেছি।”

মিশকুন যে হারিয়ে গেছে সে কথা আর এই পুঁচকে পুঁটিলালের সামনে বলল না, পাছে ওকে ভীতু ভাবে ছাগলছানাটা।

পুঁটিলাল বলে,

-“তুমি যদি ওই বদমাইশ ভুলো কুকুরটাকে একটু দাবড়ে দাও যেন আমায় দেখলে আর ঘেউ ঘেউ না করে, তাহলে আমি বোমকাইকে বলব তোমার বন্ধুদের, ওই কী যেন নাম ইলু আর শীলু, ওদের খুঁজে দিতে। বোমকাই সক্কলকে চেনে, আতিফদাদা, ঈশানদাদা, আলেক্সদাদা! সব্বাই ওর বন্ধু।”

মিশকুন মহানন্দে বলে,

-“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি ভুলোকে দাবড়ে দেব। তুমি আমাকে নিয়ে চলো শিগগির ওর কাছে।”

পুঁটিলাল বিজ্ঞের মত ঘাড় নেড়ে বলে,

-“দাঁড়াও দাঁড়াও! সে তো এখন সন্ধেবেলায় বিশুপাগলের কুঁড়েতে ঢুকে নাক ডাকাচ্ছে। সকালের আগে তাকে পাবো কই!”

-“অ্যাঁ! সকাল! ততক্ষণ আমি কী করব? কোথায় থাকব?”

ডুকরে ওঠে মিশকুন।

পুঁটিলালও চিন্তায় পড়ে,

-“তাই তো! এ তো ভারী মুশকিল। দাঁড়াও আমি বোমকাইকে ডেকে আনি তবে। তুমি চুপ করে এখানে দাঁড়িয়ে থাকো মিশকুনদাদা, কোত্থাও যেও না। আমি আসছি এক্ষুনি!”

মিশকুনকে এই বলে, তিড়িং বিড়িং করে পুঁটিলাল ছুট লাগাল।

(কলমে : সুস্মিতা)


।।২।।

ছুট ছুট ছুট, ছুটে তো গেল পুঁটিলাল। তবে কিনা বোমকাইকে ডেকে আনাটা হল না। সন্ধে হলেই বোমকাইয়ের জীবন কমপ্ল্যান আর নামতাময়। পড়ার ঘরে তখন মা ছাড়া কারোর প্রবেশ নিষেধ। বাবা পর্যন্ত ঘরের বাইরে থেকেই চায়ের চাহিদা জানান দিয়ে পালিয়ে যান। পুঁটিলাল তো তুশ্চু একখানা ছাগল মাত্তর!

ব্যা ব্যা করে বাড়ির আশেপাশে খানিক পায়চারি করে পুঁটি। কাঁঠাল গাছের গায়ে গা মাথা খানিক ঘষে তারপর তার বুদ্ধি খোলে। হ্যাঁ, বটুকদাদাকে গিয়ে বললে হয় তো। ছাগলছানা জানালার গ্রিল গলে ঘরে ঢুকতে পারে না বটে, কিন্তু বেড়াল তো পারে। আনন্দে ‘ব্যা-অ্যা-অ্যা' ডেকে উঠে টিনের ঘরের দিকে দৌড়ে যায় পুঁটিলাল।

কিন্তু এ কি! বটুকদাদার জায়গায় ওটা কে বসে? ও তো বটুক নয়, অন্য বেড়াল। সাদা ঝুমরো লোমশ, কেমন উলোঝুলো ল্যাজ! অচেনা লোক দেখে কথা বলতে আমতা আমতা করে পুঁটিলাল। কেমন উদাস মুখে বসে থাবা চাটছে বেড়ালটা। কেমন একটা রাজাগজা টাইপ ভাব। তাকাচ্ছেই না পুঁটিলালের দিকে! প্রেস্টিজে লাগে না বুঝি পুঁটির! ছাগল বলে হ্যাটা করে লোকে, সে বুঝি বোঝে না!

জোরসে ব্যা করে পুঁটিলাল। বলে, “কে গা তুমি? বটুকদাদার বস্তার ওপর বসেছ কেন?” ঠান্ডা চোখে এদিক তাকিয়ে দেখে বেড়ালটা। তারপর বলে, “তোমার তাতে কি শুনি? বটুক তোমার দাদা বুঝি? তাই বলি, ওর মাথায় ছাগলের মত বুদ্ধি কেন!”

অপমানজনক কথা শুনে রাগে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায় পুঁটির। খেপে গিয়ে বলে, “আমার বাড়িতে ঢুকে আবার আমারই পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করা, অ্যাঁ? রোসো ঘন্টাদুই, বোমকাই বেরোক। একটা হেস্তনেস্ত না করি তো দেখে নিও তখন!”

বোমকাইয়ের নাম শুনে গা ঝেড়েঝুড়ে সোজা হয়ে বসে বেড়ালটা। বলে, “অ, তুমি বোমকাইয়ের বন্ধু হও? তাহলে তোমার সঙ্গে আমার কোনো ঝগড়া নেই। বোমকাই ভালো ছেলে। জীবজন্তুদের প্রতি খুব মায়া ওর প্রাণে। আমি ফেলিসিয়া। তোমার নাম কি?”

ফেলি-সি-য়া!! বেড়ালের আবার এরকম নাম হয় নাকি! মাথা চুলকোতে থাকে পুঁটিলালের৷ মাথাটাকে ঘরের কাঠের খুঁটিতে ঘষতে ঘষতে সে বলে, “আমি পুঁটিলাল। তুমি কি সায়েব বেড়াল?”

ফেলিসিয়া মাথা নাড়ায়। বলে, “না না। আমি কাবলি।”

কি কাবলি? আলুকাবলি? জিজ্ঞেস করতে না করতে ফেলিসিয়া বলে, “বটুক কোথায়? ওর সঙ্গে কিছু আলোচনা করার ছিল যে!”

বেড়ালরা আবার আলোচনা করে নাকি? বোমকাইয়ের বাবা-কাকারা, তাঁদের বন্ধুরা করেন সেটা দেখেছে পুঁটিলাল। বেড়ালদের ঝগড়া আর ম্যাঁওম্যাঁও ছাড়া তো কিছু করতে দেখেনি। সে বুদ্ধি খাটিয়ে বলে, “বটুকদাদা মনে হয় লালু বেড়ালের সঙ্গে ডুয়েল লড়তে গেছে। লালু কিনা সেদিন ভোলা মাছের মাথাখানা বটুকদাদার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে পালিয়ে গেছিল!”

ফেলিসিয়া বিরক্তিভরে ফ্যাঁস করে। বলে, “দূর! এগুলো সব মানুষদের মতো। খালি ঝগড়া আর মারামারি! এদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না সত্যি!”

ব্যা ব্যা করে প্রতিবাদ জানায় পুঁটিলাল। বলে, “না না, মানুষরা সবাই খারাপ হয় নাকি! বললেই হল!”

ফেলিসিয়া উঠে দাঁড়ায়, দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলে, “তবে আর বলছি কি! ওপাড়ার ঈশান, আতিফদের চেনো তো? জানো ওদের বাড়ির বড়রা সব এইসান ঝগড়া করেছে? করে এখন বাড়ির বাচ্চাগুলোর এক সঙ্গে খেলাধুলো বন্ধ করে দিয়েছে? কি করে মিটমাট করানো যায় সেই নিয়েই তো আলোচনা করতে এলুম বটুকের সঙ্গে! সে কিনা নিজেই মারামারি করতে গেছে পাড়া উজিয়ে! দূর! যাই এখন বিশুপাগলার ওখানে, সে যদি কিছু বুদ্ধি দিতে পারে।”

তিড়িংবিড়িং লাফিয়ে ওঠে পুঁটিলাল। বলে, “আমায় সঙ্গে নেবে কাবলিদিদি, স্যরি, ফেলিদিদি? আমিও একটা মুশকিলে পড়েছি গো। একটা হাতির ছানা কেমন করে জঙ্গল থেকে এখানে এসে ঢুকে পড়েছে। মা যাবে, বাড়ি যাবে বলে কাঁদছে। কোন দু’টো বন্ধুকে খুঁজছে, আমি তাদের চিনি না যে! বোমকাই ও পড়তে বসেছে। কার কাছে সাহায্য চাইব বলো তো! আমায় নিয়ে চলো বিশুপাগলের কাছে। আমি ভেতরে যাব না কিন্তু। ভুলো কুকুর শুয়ে থাকে না ওখানে? আমাকে খ্যাঁকায় খালি।”

ফেলিসিয়া ল্যাজ নাড়িয়ে ভরসা দেয় পুঁটিকে, “ভুলোকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভয় পেলেই লোকে আরো বেশি বেশি করে ভয় দেখায়। আমি আছি তো। ভুলোর নাকে যে আঁচড়খানা দিয়েছিলাম না, সেই ইস্তক আমাকে ইস্কুলের দিদিমণির মত সমীহ করে চলে। চলো, যাবে তো চলো। বিশু ঠিক কিছু না কিছু উপায় করতে পারবে।”

(কলমে : দেবলীনা)

(পরের পর্ব আগামী সংখ্যায়)

অলঙ্করণ : সুস্মিতা কুণ্ডু