পিকচার পোস্টকার্ড





ছোট্ট বন্ধুরা কেমন আছো? মন কি খুব পুজো পুজো করছে? পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেল হওয়ার প্রস্তুতি দেখে স্কুলে বা বাড়িতে মন টিকছে না নিশ্চয়ই? পুজোর কেনাকাটাও নিশ্চয়ই অনেকটা হয়ে গেছে? ভাবছো এবার কবে আসবে পঞ্চমী-ষষ্ঠী আর টুক করে মা-বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়বে ঠাকুর দেখতে বা শহরের কোলাহল, গ্রামের চেনা গন্ডির বাইরে বেরিয়ে পাড়ি দেবে অদূর বা সুদূর কোনো পাহাড়ে বা সমুদ্রে?

জানো, যাঁর অর্চনাকে কেন্দ্র করে এই উৎসব, যাঁর আশীর্বাদে পরিবারের কল্যাণ কামনা করে আমরা শান্তিতে থাকি, যিনি চিরন্তন অশুভশক্তিকে বিনাশ করার প্রতীক, যাঁকে সারা ভারতবর্ষ দেবী হিসাবে বরণ করেন তিনি হয়তো আমাদের কাছে কোনো দেবীর থেকেও বেশি আপন। আমরা বাঙালিরা যেন তাঁকে ঘরের মেয়ে রূপে দেখি। নিজের ঘরের মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে ফিরলে যে আদর আপ্যায়ন বা ভালোবাসার উষ্ণতা ফিরে পায়, আমরা আমাদের মা দুর্গাকে সেই ভালোবাসায় যেন বাঁধতে চাই প্রতি বছর। প্রবাসী মেয়ের বাড়িতে আসার সময় হওয়া হইহুল্লোড়ের মতোই হয়তো।

চিরাচরিত ঠাকুর-ভক্তের সম্পর্ক থেকে যেন অনেক কাছের এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে আমাদের আর মায়ের মধ্যে। ধর্ম সেখানে গৌণ হয়ে যায়, মুখ্য হয়ে ওঠে সমাজের সমস্ত ভেদাভেদ মুছে গিয়ে জেগে থাকা আন্তরিকতা, ভালোবাসা। তাই দুর্গাপুজো কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের নয়, দুর্গাপুজো সকল মানুষের। প্যান্ডেলে গিয়ে তাই ছোট শিশু থেকে বয়স্ক মানুষ হঠাৎই কোনো না কোনো সময় তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের কোনো মূর্ত প্রতীকের দিকে। এই কি সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়ে যাকে ভাগ্যের টানে চলে যেতে হয়েছে আমাদের ছেড়ে? এই কি সেই মা যে জন্ম দিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে আলোর কোলে?

দুর্গা মা তাই আসেন বারবার, প্রতি বছর, আর আসেন সমস্ত অশুভ শক্তিকে নাশ করে শুভ চিন্তা জাগ্রত করতে। দুর্গা মায়ের পায়ের তলে থাকা এক মহিষাসুরই অশুভ শক্তি নয়, আমাদের সমাজে, নিজের অন্তরে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকে এরকম অনেক অশুভ শক্তি। মা চিনিয়ে দিতে আসেন আমাদের মনের ভেতরে থাকা সেই সমস্ত চিন্তাকে যা আমাদের আদর্শের পরিপন্থী, যা অন্যের দুর্দশার কারণ। মা যেন আমাদের মানুষ হয়ে ওঠার বাধাগুলোকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য বারবার ফিরে আসেন। আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য অন্তরের সেই দুর্দশা, পীড়ন, অহংকাররূপী অশুভ শক্তিগুলোকে নাশ করে এগিয়ে চলা জীবনের পথে।

তাই পুজোর সময়ে আমরা অনেক আনন্দ করবো, আর খেয়াল রাখবো আমাদের আনন্দ অন্য কারোর কষ্ট না হয়ে দাঁড়ায়। আমরা অনেক ভালোমন্দ খাবো আর লক্ষ্য রাখবো আমার আশেপাশে থাকা মানুষগুলো, প্যান্ডেলে আসা মুখগুলো যেন পেট ভরে খেতে পারে, তাদের মুখে যেন হাসি ফুটে থাকে। আমরা নতুন নতুন বেশ কিছু জামাকাপড় পরবো আর সুযোগ করে দেব এমন অনেক মানুষকে যেন তাঁরাও সেই নতুনত্বের স্বাদ পান এই পুজোতে। মা দুর্গা, এই পুজো, এই উৎসব সবার। আমাদের মজা, উচ্ছলতা যেন ছড়িয়ে পড়ে মা দুর্গার সমস্ত সন্তানের মধ্যে। খারাপ করতে চাওয়া অসুরদের আটকে দিয়ে ভালোটুকু করাই আমাদের কাজ। মা হয়তো এটুকু সম্মানই চান।

তাই ছোট বন্ধুরা এবং তাদের হাত ধরে থাকা বড়রা, আমরা, সবাই যেন অনেক আনন্দ করি, ভালো থাকি, ভালো ভালো গল্প পড়ি, মজা করি, অন্যদের সাহায্য করি, ভালো থাকি, অনেক সহজ থাকি।



প্রচ্ছদশিল্পী : স্বর্ণদ্বীপ চৌধুরী

গল্পের ঝুলি : কাঠঠোকরা : অনন্যা দাশ





“ওটা কাঠঠোকরা!!” 

বলে ফেলেই হকচকিয়ে গেল দর্শিতা। ক্লাসের সবাই ওর দিকে তাকিয়ে দেখছে! পরক্ষণেই সবাই হো হো হি হি করে হাসতে শুরু করে দিল। লজ্জায় লাল হয়ে গেল দর্শিতার ফর্সা গাল দুটো। মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে সে, বাংলায় কথা বলে ফেলেছে ক্লাসে!

দু’সপ্তাহ হল দর্শিতা মায়ের সঙ্গে আমেরিকার হ্যারিসবার্গ শহরে এসেছে। বাবার কাজের সূত্রেই ওদের এখানে আসা। বাবা আগেই এসেছিলেন, তারপর বাড়িঘর সব ঠিক হতে ওরা এসেছে। দর্শিতা এখানকার স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সে ইংরাজিটা বুঝতে পারে কিন্তু এখানকার ঢঙে কথা বলতে তার বেশ অসুবিধা হচ্ছে। সেইজন্যেই সে বেশির ভাগ সময় ক্লাসে চুপ করেই থাকছে, অথবা হ্যাঁ না বলে কম কথায় মাথা নেড়ে ইশারায় কাজ চালাচ্ছে। মুশকিলটা হল ক্লাসের জানালার বাইরে একটা সুন্দর কাঠঠোকরা পাখি এসে বসার পর। সে তার লম্বা ঠোঁট দিয়ে এদিক ওদিক ঠুকঠাক করে ঠুকে দেখছিল! মাথা লাল, গা-টা সাদা কালো মেশানো, ভারি সুন্দর দেখতে পাখিটাকে! দর্শিতা পাখিটাকে চেনে তাই উৎসাহে আনন্দে ওর মুখ থেকে বাংলা কথাটাই বেরিয়ে গেল! ব্যস আর যাবে কোথায়! ক্লাসের সবাই ওকে ‘কাঠঠোকরা কাঠঠোকরা’ বলে খেপাতে লাগল।

ইসাবেল বলে একটা মেয়ে তো চেয়ারের উপর উঠে তারস্বরে ‘কাঠঠোকরা কাঠঠোকরা’ বলে নেচে নেচে চেঁচাচ্ছিল আর অন্যরা সবাই হাততালি দিচ্ছিল, এমন সময় টিচার এসে ক্লাসে ঢুকলেন।


“ইসাবেল? এ সব কী হচ্ছে? কী করছ তুমি? কী বলছ?”


টিচারকে দেখে অবশ্য ইসাবেল চুপ! তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে নেমে পড়ল। আর তার মুখ থেকে কোনও কথা বেরলো না। টিচার তখন অ্যালিস, নর্মা আর পিটারকে জিজ্ঞেস করলেন। ওরা তিনজনে মিলে টিচারকে বলে দিল ঘটনাটা সত্যি কী হয়েছিল।


সব শুনে টিচার বললেন, “তোমাদের ব্যবহারে আমি মর্মাহত হয়েছি। তোমরা সবাই দর্শিতাকে সরি বলবে। আর ইসাবেল তুমি ভয়ানক বাজে কাজ করেছো। ও একটা অন্য দেশ থেকে এসেছে। আমাদের ভাষাটা ঠিক মতন জানে না এখনও, তবে ঠিক শিখে নেবে। ভেবে দেখো যদি উল্টোটা হত, যদি তোমাকে ওর দেশে গিয়ে পড়াশোনা করতে হত, তাহলে? আমার ক্লাসে আমি এইরকম আচরণ মোটেই বরদাস্ত করব না। আমি তোমাকে দু’দিন সময় দিচ্ছি। সোমবারের মধ্যে তুমি ও যেখান থেকে এসেছে সেই দেশ সম্পর্কে জেনে, পড়ে একটা প্রোজেক্ট করে আমাকে দেখাবে। না হলে আমি আরও কঠিন শাস্তি দেবো তোমাকে। আমি বলব না ও কোথা থেকে এসেছে আর ক্লাসের অন্য কেউও যেন কিছু না বলে। তুমি ওকেই জিজ্ঞেস করে জানবে।”

ক্লাসের সবাই দর্শিতাকে সরি বলল। দর্শিতা লজ্জা লজ্জা মুখ করে বসে রইল। টিচার তার পড়ানো শেষ করে চলে গেলেন। ইসাবেল দর্শিতার কাছে এসে বলল, “নাও এবার তুমি খুশি তো? আমাকে এখন ফালতু ফালতু একটা বাড়তি প্রোজেক্ট করতে হবে হোমওয়ার্ক ছাড়াও। তাও দু’দিনে! উইকেন্ডটা মাটি হয়ে গেল। নাও এবার দয়া করে বলো তুমি কোথা থেকে এসেছ!”


দর্শিতা মুখ খুলল না। ইতিমধ্যে অন্য টিচার এসে গেলেন আর তার পরেই স্কুল ছুটি হয়ে গেল। ইসাবেল আবার কিছু জিজ্ঞেস করতে পারার আগেই দর্শিতা চটপট বাসে গিয়ে উঠে পড়ল। ইসাবেল ওদের পাড়াতেই থাকে ওদের দুটো বাড়ি পরে, সেটা দর্শিতা জানে। একটু ভুগুক সে তারপর না হয় তাকে বলা যাবে! ভেবে দর্শিতা মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইল।

বিকেলবেলা যেই না দর্শিতা বাড়ির বাইরে বেরিয়েছে অমনি ইসাবেল সেটা দেখতে পেয়ে ওর কাছে এসে হাজির!

বলল, “ঠিক আছে, অনেক ড্রামা করেছ। এবার বলো তুমি কোথা থেকে এসেছ। প্রথমদিন টিচার বলেছিলেন মনে হয় কিন্তু আমি ভুলে গেছি। এখন তো স্কুলের লাইব্রেরিও বন্ধ হয়ে গেছে, আর তো বইও পাব না। কম্পিউটারেই দেখতে হবে। আমার দাদা আবার আমাকে কম্পিউটারটা ছুঁতে দেয় না আমি নাকি বাচ্চাদের খেলা খেলি ওটাতে বলে!”

মা মনে হয় জানালা দিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন ওদের। দর্শিতা কিছু বলার আগেই বেরিয়ে এসে বললেন, “ওমা তোমার বন্ধু এসেছে বুঝি? যাও বন্ধুকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসাও।”

“না ও আসবে না। ও একটা দরকারে এসেছে।”

মা রেগে গেলেন, “এ কীরকম ব্যবহার হচ্ছে? নাও ওকে ডাকো।”

দর্শিতা ভেবেছিল ইসাবেলকে ডাকলে সে আসবে না কিন্তু তাকে বলতে সে দিব্যি ভিতরে চলে এল। সেদিন বাবার জন্মদিন ছিল বলে মা কেক বানিয়েছিলেন। সেই কেক আর সাবুর পাঁপড় ভেজে ইসাবেলকে দিতে সে দিব্যি খেয়ে নিলো। তারপর সে দর্শিতাকে আর না জিজ্ঞেস করে সোজা ওর মাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কোথা থেকে এসেছ?”

“ইন্ডিয়া।”

“ও আচ্ছা, তা ভালো।”

দর্শিতা যখন দেখল ওকে আর আটকানো যাবে না তখন বলল, “এসো, দেখাচ্ছি।”


এই বলে বাবার নতুন কম্পিউটারে ইন্ডিয়া সম্পর্কে অনেক কিছু দেখাল ইসাবেলকে। তাজমহল দেখে ওর তো চোখ ছানাবড়া! পোশাকের ছবিগুলো দেখে বলল, “তোমার কাছে এইরকম ইন্ডিয়ান ড্রেস আছে?”

“হ্যাঁ।” বলে দর্শিতা তার সুন্দর লেহেঙ্গা চোলিটা বার করে এনে ওকে দেখাল। ওটা দর্শিতার মামা ওকে রাজস্থান থেকে এনে দিয়েছিলেন। ওর মামা ইদানীং জয়পুরে থাকেন। মাসখানেক আগে নিজের জন্মদিনে ওটা পরেছিল দর্শিতা। ইসাবেল মনে হয় অত জমকালো জামা কোনওদিন দেখেনি, ওর মুখ হাঁ হয়ে গেল।

বলল, “আমাকে পরতে দেবে একবার?”

দর্শিতা আর কী বলবে, বল, “ঠিক আছে, পরো।”

ইসাবেল বলল, “দাঁড়াও, আমি আমাদের ক্যামেরাটা নিয়ে আসি!”

একটু পরেই সে ক্যামেরা আর নিজের মাকে নিয়ে হাজির হল। ওর মা-ও জামাটা দেখে মোহিত! ইসাবেল জামাটা পরে বেশ কয়েকটা ছবি তুলল। ওদের জামাটা এত ভাল লেগেছে দেখে মা বললেন, “ইসাবেল, ওটা যদি তোমার অত পছন্দ হয়ে থাকে তাহলে তুমি ওটা নাও! আমরা তো আবার আনিয়ে নিতে পারব!”

তাই শুনে ইসাবেল সে কী খুশি! ও আর ওর মা দুজনেই খুব ‘থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাঙ্ক ইউ’ করল।


তারপর শনিবার আর রবিবার দু’দিনই ইসাবেল এল ওদের বাড়িতে। তখন অবশ্য শুধু ইন্ডিয়া নিয়ে পড়াশোনা হলো না অনেক খেলাও হলো। দর্শিতার আর ওর সামনে ইংরাজিতে কথা বলতে লজ্জা করছিল না, ইসাবেলের সঙ্গে দিব্যি কথা বলতে পারছিল সে। ওদের সঙ্গে দুপুরের খাবার পর্যন্ত খেল ইসাবেল। মা ভেবেছিলেন ও খেতে পারবে না কিন্তু সে দিব্যি ভাত, ডাল, চিকেন কারি খেল! খেয়ে বলল, “খুব ভাল খেতে!”

ইসাবেলকে প্রোজেক্টটা অনেকটাই বানাতে সাহায্য করল দর্শিতাই।


সোমবার দিন চার্ট পেপারে তৈরি প্রোজেক্টটা ক্লাসের সবাইকে দেখিয়ে পিছনের নোটিস বোর্ডে টাঙ্গিয়ে দিলেন টিচার। সেখানে ইন্ডিয়া নিয়ে অনেক কিছু লিখেছে ইসাবেল। তার সঙ্গে নিজের একটা লেহেঙ্গা পরা ছবি আটকেছে, একটা কাঠঠোকরা এঁকেছে আর তলায় লিখেছে ‘কাঠঠোকরা ইন বেঙ্গলি’! সব শেষে লিখেছে ‘ইন্ডিয়ার লোকেরা খুব ভাল। আমার একজন ইন্ডিয়ান বন্ধু আছে তার নাম দর্শিতা।’

টিচার সেটা পড়ে মুচকি মুচকি হাসলেন, এইটাই তো তিনি চেয়েছিলেন।


এখন কাঠঠোকরাটা ওদের ক্লাসের জানালায় এসে বসলে দর্শিতাদের ক্লাসের সবাই বলে, “দ্যাট বার্ড ইজ আ উডপেকার, বাট ইউ ক্যান অলসো কল ইট আ কাঠঠোকরা!” অর্থাৎ ওই পাখিটা উডপেকার কিন্তু ওটাকে কাঠঠোকরা বলেও ডাকতে পারো!


(সমাপ্ত)


অলঙ্করণ : আবির

গল্পের ঝুলি : তস্করশিল্পী : দিব্যেন্দু গড়াই





বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে পড়তেই ছ্যাঁক করে উঠল। জ্বর গায়ে আজ কাজে বেরিয়েছে নন্দ। বামুনপাড়ার পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা সোজা পুবের মাঠের দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তা দিয়ে পা টিপে টিপে হাঁটছিল ও। একপশলা বৃষ্টিতে পথময় কাদা। একটু অসাবধান হয়েছ কি, চিৎপটাং। আর এই পঞ্চান্ন বছর বয়সে পা হড়কে পড়লে কোমরের হাড় যে মোটেই আস্ত থাকবে না সেকথা নন্দ বিলক্ষণ জানে। গতবছর পুকুর ঘাটে পা পিছলে সাধনখুড়ো সেই যে শিরদাঁড়া ভেঙে শয্যাশায়ী হল, এখনও একই অবস্থা। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে ও সাধনখুড়োর মত আড়াইমণি নয়। রোগাপাতলা চেহারা। সেজন্য বয়সও অন্যদের চেয়ে কম বলেই মনে হয়। আর বয়স হয়েছে বলে তো আর ঘরে বসে থাকলে চলবে না। ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাঙ তুলে মৌজ করে চুরুট খাওয়ার সাধ মনে হয় না ওর কোনওদিনই পূরণ হবে। এক বিঘত লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে ফুসফুসে জোলো হাওয়া ভরে তাড়াতাড়ি পা চালাল নন্দ। অনেকটা যেতে হবে।


*****


বাপ নাম রেখেছিল পটাশ। তুবড়ি, রঙমশাল, হাউইবাজির কারিগর ছিল পটাশের বাপ বকুল। বাজির আসল মশলা গান-পাউডার তৈরির সময় সঠিক অনুপাতে পটাশ মানে পটাশিয়াম নাইট্রেট, কাঠকয়লা আর গন্ধক মেশানোতে সিদ্ধিলাভ করেছিল বকুল। শেষের দিকে তো চোখ বন্ধ করে ৭৫-১৫-১০ ভাগের অনুপাত মিশিয়ে মশলা তৈরী করে দিত। একচুলও এদিক-ওদিক হত না। তো সেই পটাশপ্রিয় বকুল তার একমাত্র ছেলের নাম পটাশ রাখবে না তো রাখবেটা কী? নাম পটাশ হওয়া সত্ত্বেও পটাশ কিন্তু বাপের মান রাখতে পারল না। পটাশ, কাঠকয়লা আর গন্ধক মেশানোটা শিখতে পারলেও বাহারি রঙ ঠিকমত আনতে পারত না পটাশ। ও দেখত বাপটা কী সুন্দর সাদা, লাল, কমলা, হলুদ, নীল, সবুজ রঙের ফুলকি ছোটাত তুবড়ি-রঙমশাল থেকে। হাউইগুলো আকাশে গিয়ে ফাটার পর রঙবেরঙের ফুল ফোটাত। বিভিন্ন রঙের জন্য বিভিন্ন জিনিস। সাদার জন্য অ্যালুমিনিয়াম, লালের জন্য লোহাচুর, নীলের জন্য তামা... আরও কত কী! ওগুলো ঠিক করে মেশাতে পারত না পটাশ। তাই শেষমেষ বাপের দ্বিতীয় পেশাটাকেই বেছে নিল ও। ....চুরি।


নান্না, নাক কুঁচকানোর মত কিছু নেই। এ জিনিস হেলাফেলার মত মোট্টেও নয়। মামুলি চোরদের মত ফাঁকা ঘর বা দোকান থেকে মাল তুলে সটকে পড়া বা অসতর্ক মানুষজনের কাছ থেকে জিনিস ছিনিয়ে দুদ্দাড় করে দৌড়ে পালানোর মত ছ্যা-ছ্যা কম্ম পটাশ কক্ষনো ভাবতেই পারে না। তার চেয়ে কাকতাড়ুয়া সেজে পাখিদের ভয় দেখানো ঢের সম্মানের। গেরস্তবাড়িতে ঘরভর্তি লোকজনের মধ্যে থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করার মধ্যে যে বাহাদুরি আছে তা ঐসব ছিঁচকে চুরির মধ্যে নেই। শুধু চুরি করাই নয়, চুরি করা সামগ্রী দু’দিন পরে লোকভর্তি হাটের মধ্যে গেরস্তকে ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক উত্তেজনা অনুভব করে পটাশ। জিতে যাওয়ার আনন্দ। অবশ্য চোর বিজয়ীর মত সম্মানও পায়। চুরির বস্তুর মধ্যে থেকে দামী কোন জিনিস উপহার হিসেবে হস্তগত হয় চোরের। এ কি কম আনন্দের? এই গোটা আমোদগঞ্জ ও আশেপাশের একুশটা গ্রামের মধ্যে এমন তস্করশিল্পীর এখন সত্যিই বড় অভাব। একজন মাত্র ওস্তাদই কাজের মধ্যে আছে এ লাইনে।


আজ রাতে সেই গুরুর কাছে হাতে-কলমে পরীক্ষা। কম খাটতে হয়নি এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে। শরীরে একফোঁটা অতিরিক্ত চর্বি থাকলেই বাতিল। বারো ফুট উঁচু পাঁচিল ডিঙানো থেকে শুরু করে নিমেষের মধ্যে জানালার শিক খুলে তার ফাঁক দিয়ে গলে যাওয়া, পনেরোফুট লংজাম্প কিংবা পঞ্চাশ কেজির মাল নিয়ে ঘন্টায় কুড়ি মাইল স্পীডে দৌড়ানো... শরীরচর্চায় তুখোড় হতে হয়েছে পটাশকে। সাথে তাৎক্ষণিক বুদ্ধিরও পরিচয় দিতে হয় বৈকি। গেরস্তের বাড়ি ঢোকার কম সে কম দশ রকম উপায় ভেবে রাখতে হয়। একটা নাহলে আরেকটা। বিফল হওয়ার কোনও রাস্তা নেই। একবারের জন্য ব্যর্থ হয়েছ কি, ডাহা ফেল। তুমি আর ‘তস্করশিল্পী’ তকমা পাবে না। এত হ্যাপা বলেই না এ লাইনে কেউ আর আসতে চায় না!


দীর্ঘদিন চেষ্টা-চরিত্র করে ‘তস্করশিল্পী সংস্থা’র কাছে আবেদন-নিবেদন করে তবে সুযোগ পেয়েছে পটাশ। সংস্থা থেকে বেছে দিয়েছে মহালয়ার আগের রাত। এই রাত পোহালেই মহালয়া। পিতৃপক্ষের অন্তিম দিন। এদিন শেষ হলেই দেবীপক্ষের শুরু। পূর্বপুরুষদের আত্মার সমাবেশ ঘটে এই দিনে। ভোর হতে না হতেই একবুক জলে দাঁড়িয়ে তর্পণ, প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অঞ্জলি শুরু হয়ে যায়। রাতটা অনেকেই না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। কারণ ভোরের আলো ফোটার আগেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠস্বর জেগে উঠবে রেডিওতে। 


“আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর; ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা...”


পটাশকে ছোটবেলায় ওর বাবা ঘুম থেকে তুলে দিত মহালয়া শোনার জন্য। রেডিও ছিল না ওদের, তাতে কী? পাশের বাড়ির রেডিওতে মহালয়া শুনতে শুনতে পটাশ বাবার কোলেই ঘুমিয়ে পড়ত আবার। আজ মহালয়ার আগের রাতে সেইসব পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসছিল। থম মেরে মিত্তিরদের দুর্গাদালানের বাইরে শিরীষ গাছের নীচে অন্ধকারে অপেক্ষা করছিল পটাশ। হঠাৎ কাঁধে টোকা পেয়ে ঘুরে দেখে গুরুদেব হাজির। অন্ধকারে চোখ সয়ে যাওয়ার পরও গুরুকে আসতে দেখেনি ও। একেই বলে জাতশিল্পী। সেলাম জানাল মনে মনে। আগে থাকতে সব প্ল্যান করা ছিল। তাই কেউ কোনও কথা না বলে নিঃশব্দে ঘোষবাড়ির দিকে হাঁটা লাগাল। দুর্গাদালানের ডানপাশ দিয়ে সোজা সিকিমাইল গেলেই চিন্তাহরি ঘোষের বাড়ি। সুদের কারবারী চিন্তাহরি ঘোষ লোক খারাপ নয়। তবে কিপ্টেমিতে ওর ধারেকাছে কেউ আসবে না। সারাদিনে দশটাকার বেশী খরচ হয়ে গেলে প্রচন্ড মুষড়ে পড়ে। বংশে সন্তান হওয়ার সুখবর কাউকে বলেনি, পাছে কেউ মিষ্টিমুখ করাতে বলে। তো সেই সুদখোরের বাড়ি চুরি করে তস্করবৃত্তি পরীক্ষায় পাশ করতে হবে পটাশকে। সুবিধে একটাই, মাইনে দিতে হবে বলে পাহারাদার বা চাকরবাকর তেমন নেই ঘোষবাড়িতে। সিন্দুকের ঘরেই রাতে শোয় চিন্তাহরি ঘোষ, পাহারা দেবে বলে।


*****


এক ডজন দুধেল গাইয়ের জন্য গোয়ালঘরটা বেশ শক্তপোক্ত ভাবেই তৈরি করিয়েছে চিন্তাহরি ঘোষ। সেই গোয়ালঘরের ছাদের একটিমাত্র টালি সরিয়ে তার ফাঁক দিয়ে সুড়ুৎ করে গলে নিচে পড়ল পটাশ। গরুদের জাবনার গামলায় রাখা খড়-বিচালির গাদায় পড়াতে অওয়াজ হয়নি এতটুকু। কেবল পাশের লালগাইটা বসে বসেই লেজটা বাঁদিক থেকে ডানদিকে করল। বাড়িতে ঢুকে পড়া গেছে। মানুষ কেন, পশুতেও টের পায়নি। মানে, প্রথম পরীক্ষা পাশ। দ্রুতপায়ে লোহার তারজালি দিয়ে ঢাকা লম্বা উঠোন পেরিয়ে সিন্দুকের ঘরের সামনে পৌঁছায় পটাশ।


মধুমেহ রোগের কারণে প্রতি রাত্রে দু’বার ঘুম ভাঙে চিন্তাহরি বাবুর। একদম সঠিক সময়ে পৌঁছেছে পটাশ। ও জানালার বাইরে অন্ধকারের মধ্যে মিশে দাঁড়িয়েছিল। খুট করে ছিটকিনি খোলার আওয়াজ পেয়ে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে দিল। তারপর অপেক্ষা। চিন্তাহরি বাবু লম্বা বারান্দার অন্যপ্রান্তে বাথরুমের দিকে যেতেই সিন্দুকঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল পটাশ। পেছন পেছন ওর গুরুদেব। ঠিক তিন মিনিট কুড়ি সেকেন্ড সময়। মাসখানেক আগেও বাথরুম করে ঘরে ফিরতে চিন্তাহরির ২মিনিটের বেশি লাগত না। ইদানীং প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের সমস্যা বাড়ার জন্য পটাশের কপালে আরও দেড় মিনিট অতিরিক্ত সময় জুটেছে। নিপুণভাবে সিন্দুকের চাবির খাঁজে ছোট্ট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে যখন সিন্দুক খুলে ফেলল তখন মোটে দেড়মিনিট পেরিয়েছে। স্তূপীকৃত জমির কাগজ, টাকার বান্ডিল, স্বর্ণালঙ্কার সরিয়ে পেছনদিকে রাখা একটি বার্মাকাঠের বাক্স হাতে তুলে নেয় পটাশ। এক মুহূর্তের জন্য পেছন ফিরে দেখে নেয় গুরুদেবের সম্মতিসূচক মাথা নাড়া। ঘরে ঢোকার পর ঠিক তিন মিনিটের মাথায় ঘরের দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে পড়ে দুজন। একজনের কোমরের সাথে গামছা দিয়ে কাঠের, বাক্সটি বাঁধা। তারপরে আর দু'মিনিট সময় লাগে ওদের, ঘোষবাড়ি থেকে বের হতে।


*****


আমোদগঞ্জে মহালয়ার দিন সন্ধেবেলা মিত্তিরদের দুর্গাদালানে প্রতিবছর ভালোই জনসমাগম হয়। আজও লোকজনের ভিড় উপচে পড়েছে। পুজোর নির্ঘন্ট ঘোষণা করা হয় এদিন। মিত্তির বাড়ির বয়জ্যেষ্ঠ হরেন্দ্রনাথ মিত্র, পুরোহিত নিতাই চক্কোত্তি, থানার বড়বাবু বামাচরণ শর্মা, হেলথ সেন্টারের ডাক্তারবাবু অন্বয় সাঁতরা, বিশিষ্ট পন্ডিত দুর্গাগতি সান্যাল... কে নেই সেখানে?

হরেন্দ্রনাথ মিত্র উঠে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করলেন।

"প্রায় দেড়শ বছর হতে চলল এই মিত্তিরবাড়ির পুজো। রাজা সুরথ বসন্ত ঋতুর শুক্লপক্ষে সর্বপ্রথম দেবীদুর্গার পুজো শুরু করেন। এই পুজোও তাই বসন্তকালেই হত। তখন ঘোটকমুখী সিংহের ওপর আসীন অষ্টধাতুর তৈরী দেবীমূর্তি পূজিত হতেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা দেবীকে রক্ষা করতে পারিনি। দশ বছর আগে সেই মূর্তি খোয়া যায়। তারপর থেকেই অামরা শরৎকালেই মা দুর্গার পুজোর আয়োজন করে থাকি।

মা দুর্গার নামের অর্থ হল দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। কারণ, দ অক্ষরটি দৈত্য বিনাশ করে, উ-কার বিঘ্ন নাশ করে, রেফ রোগ নাশ করে, গ অক্ষরটি পাপ নাশ করে এবং অ-কার শত্রু নাশ করে। দেবী নিজেই সমস্ত অমঙ্গলের বিনাশ ঘটিয়ে আজ এই পুণ্যতিথিতে আমাদের সাক্ষাৎ দিয়েছেন।


আজ্ঞে হ্যাঁ। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে সেই অষ্টধাতুর মূর্তি উদ্ধার হয়েছে। আর যে ব্যক্তি উদ্ধার করেছে তাঁকে সকলের তরফ থেকে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ। পটাশ, তুমি এখানে এসো। নিজের হাতে উদ্ধার হওয়া মূর্তি তুলে ধরো। সবাই দেখুক।’


আনন্দে, বিস্ময়ে হতবাক জনগণের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে পটাশ। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরা বার্মাকাঠের বাক্সটি। সকলের উল্লাসধ্বনি আর করতালির মধ্যে বাক্সের ডালা খুলে বের করে আনল দেবীমূর্তিটি। এখানে দেবী দুর্গা দশহাতে অস্ত্রসজ্জিতা হয়ে ঘোটকমুখী সিংহের ওপর দন্ডায়মান। লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ, এমনকি মহিষাসুরও অনুপস্থিত এই মূর্তিতে। অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তিটি ভারি সুন্দর। অন্যান্য অষ্টধাতুর মূর্তির মত ধাতব রঙের নয় এটি। বরং বেশ রঙীন। শাড়ি-গয়না-অস্ত্র-সিংহ সব আলাদা আলাদা রঙের। নীল-লাল-কমলা-হলুদ পড়ে যায় পটাশের। তন্ময় হয়ে দেখতে থাকে দুহাতের মধ্যে থাকা দেবীমূর্তিকে। আস্তে আস্তে মাথার উপর তুলে ধরে মূর্তি। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপরেই উল্লাসধ্বনিতে ফেটে পড়ে জনতা। দেবী দুর্গার সাথে নিজের নামে জয়োল্লাস শুনে আনন্দে কেঁদে ফেলে পটাশ।


ভিড়ের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল দুজন। একজন বেশ বিমর্ষ মুখে। চিন্তাহরি ঘোষ। শোরগোলের মধ্যে ধীরে ধীরে সরে পড়ে সে। আরেকজন তখন মুখে চুরুট নিয়ে পটাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এই ছেলেটাই আমার যোগ্য উত্তরসূরি হবে। তস্করশিল্পী নন্দকুমারের পর তস্করশিল্পী পটাশ।

(সমাপ্ত)


অলঙ্করণ : দিতিপ্রিয়া গড়াই


গল্পের ঝুলি : সবুজ অভিযান : দেবদত্তা ব‍্যানার্জী



ঈশানের মনে ভারি দুঃখ। কারণ ওদের স্কুল থেকে প্রতিবার অরণ‍্য সপ্তাহে প্রত্যেককে দুটো করে গাছ দেয় লাগানোর জন‍্য। ওদের যে গাছ লাগানোর জায়গা নেই কোথাও। ঈশান তো ফ্ল্যাটে থাকে, পাঁচটা বড় টাওয়ার নিয়ে ওদের ক‍্যাম্পাস। ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটা নীল সুইমিং পুল। তার চারপাশে কয়েকটা পাম-ট্রি রয়েছে। কংক্রিটের ফাঁকে ফাঁকে চৌকো খোপে মাটির মধ‍্যে কয়েকটা পাতাবাহার আর ফুলের গাছ থাকলেও বড় গাছ নেই। মাটিও নেই যে ওরা গাছ লাগাবে। ঈশানের গত দু’বছরের স্কুল থেকে পাওয়া গাছ ব‍্যালকনিতে থেকে থেকেই মরে গিয়েছিল। গতবার বাবা ক‍্যাম্পাসের সেক্রেটারি কল্লোলকাকুকে বলতে গিয়েছিল গেটের ধারে টাইলস তুলে মাটি বার করে যদি গাছ লাগানোর একটা জায়গা করা যেত তবে সব বাচ্চারাই কিছু গাছ লাগাতে পারত।

কিন্তু কল্লোলকাকু শুনেই আঁতকে উঠেছিল। বলেছিল বড় গাছ লাগালে তার শিকড় চলে যায় বহু গভীরে। আর বড় বড় বিল্ডিংয়ের ভিত নাড়িয়ে দেবে ঐ শিকড়। চারপাশে সব বহুতল। ফাটল ধরবে বাড়িগুলোয়। তাই তো বড় গাছ লাগানো হয় না ওখানে। অরণ্য সপ্তাহে কয়েকটা ছোটো ফুলের গাছ লাগানো হয় প্রতিবার।

ঈশান ভাবে বড়রা কি বোঝে না গাছ আমাদের বন্ধু! এই যে মিস বলে গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, ছায়া দেয়, বৃষ্টিকে ডেকে আনে এসব তো সবাই জানে। তাও সবাই গাছ কেটে ফেলে কেন? ছোটোবেলায় যখন ওরা বাঙুরে ভাড়া থাকত, ঐ বড় রাস্তাটার ওপর কত বড় বড় গাছ ছিল। খালের ধার দিয়ে বাবা যখন ওকে নিয়ে বিগবাজারে যেত ছোট্ট ঈশান অবাক হয়ে বড় বড় গাছগুলোকে দেখত। পুরো রাস্তাটা ছিল ছায়ায় ঢাকা। ওর মনে হত ঐ গভীর অরণ‍্যেই বোধহয় আছে লিটল রেড রাইডিং হুড। অথবা ঐ অরণ‍্যের ভেতর রয়েছে স্নো হোয়াইট। ও যখন ক্লাস টু-তে পড়ে, তখন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখত একটা একটা করে সব গাছ কাটা হচ্ছে। বাবা বলেছিল গাড়ির সংখ‍্যা এত বেড়ে গেছে তাই রাস্তা চওড়া হবে বলে ওরা গাছ কাটছে। রোদে খুব কষ্ট হ’ত তখন গাড়িতে বসে থাকতে। এখন ঈশান ক্লাস সেভেনে পড়ে, কিন্তু ঐ ভি. আই. পি. রোড চওড়া হলেও আর গাছ লাগায়নি কেউ। বাহারি কিছু ছোট গাছ লাগিয়ে পার্ক বানানো হয়েছে অবশ‍্য।

ঈশানদের স্কুল থেকে এবার প্রসেশন হবে শহরের রাস্তায়। সবাইকে দু’টো করে চারাগাছ দেবে ওরা। কিছু লোক নিশ্চয়ই লাগাবে সেই গাছ।

কিন্তু ঈশান ভাবে ক’টা লোক লাগাবে? ওর বন্ধু অর্ক, কুনাল, নীলাভ এরা বাড়িতে থাকে বলে গাছ লাগিয়েছিল। বাকিদের গাছ লাগানোর জায়গা ছিল না। সবার গাছ মরে গিয়েছিল।

ঈশানের ছোট মামা থাকে কেষ্টপুরে। মামার ছাদ জুড়ে বনসাইয়ের বাগান। বড় বড় গাছকে ইঞ্জেকশন আর ওষুধ দিয়ে মামা ছোটো ছোটো টবে ধরে রেখেছে। ছোট্ট বট গাছের ঝুরি নেমেছে কোথাও, কোনও গাছ ঐ টবেই ফল দিচ্ছে।



 কিন্তু ঐ গাছগুলো দেখলে ঈশানের খুব মন খারাপ করে। ওদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে এভাবে আটকে ফেললে ওদের বুঝি কষ্ট হয় না!! ঈশান জানে গাছদের প্রাণ আছে। ওরা কথা বলতে পারে না বলে মামা ওদের উপর এমন অত‍্যাচার চালাতে পারে! মামাবাড়ি গেলেও ঈশান এখন আর ছাদে ওঠে না। ওর মনে হয় গাছগুলো কাঁদছে। শুধু ও-ই শুনতে পায় গাছগুলোর কান্না।

ঠাম্মার বাড়ি মেদিনীপুর যেতে ঈশান ভালোবাসে। ঠাম্মার বাড়ি গ্ৰামে। চারদিকে কত গাছ। সবুজ, সবুজ আর সবুজ চারপাশ। পুকুরের জলটাও সবুজ। প্রাণ ভরে শ্বাস নেয় ঈশান ওখানে গেলে। কত রকমের ফল হয় ঠাম্মার বাড়িতে। বাঁশঝাড়ের মধ‍্যে দিয়ে যখন হাওয়া যায় শনশন আওয়াজ হয়। সন্ধেবেলায় ঠাম্মার ঘরে বসে ঐ অন্ধকার বাঁশঝাড়ের গান শুনতে শুনতে ও নারকেলকোরা দিয়ে গরম মুড়ি খায় আর ঠাম্মার মুখে গল্প শোনে। আগে ঠাম্মা ওকে রূপকথার গল্প বলত। এখন বলে স্বাধীনতা সংগ্ৰামীদের গল্প। ক্ষুদিরাম বসু থেকে মাতঙ্গিনী হাজরা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর সবাই জন্মেছিলেন ঐ মেদিনীপুরের মাটিতে। ওঁদের গল্প ঠাম্মার মুখে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে ঈশানের।


সেদিন স্কুলে গিয়ে ঈশান দেখল প্রচুর চারাগাছ এসেছে নার্সারি থেকে। দু’দিন পর শনিবার ওদের প্রসেশন বার হ’বে অরণ‍্য সপ্তাহ উপলক্ষ্যে। আরও গাছ আসবে মিস বলেছিলেন। ঈশানের মনটা আবার খারাপ হয়ে যায়। এই কয়েক হাজার গাছের ভেতর কয়েক’শ গাছও যদি বাঁচানো যেত!! স্কুলেও আর গাছ লাগানোর জায়গা নেই। রাস্তার লোকেদের কিছু গাছ দেওয়া হবে মিস বলেছেন। মামাবাড়ির বনসাই গাছগুলোর মত এই চারা গাছগুলোর কান্নাও শুনতে পাচ্ছিল ঈশান। ওরা যে বাঁচতে চাইছিল। একরাশ মন খারাপ নিয়ে ও বাড়ি ফেরে।


কিন্তু বাড়ি ঢুকেই দেখে ঠাম্মা এসেছে গ্ৰাম থেকে। আনন্দ হলেও ওর মুখ দেখে ঠাম্মা বলে, -''দাদানের মুখ এত কালো কেন? স্কুলে কিছু হয়েছে?''

ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে ঈশান। খুলে বলে ওর দুঃখের কথা। ওর যে গাছ লাগানোর উপায় নেই।

হাত পা ধুয়ে খেয়ে নিয়ে ও বারান্দায় এসে বসে ঠাম্মার কাছে গল্পের আশায়।

ঠাম্মা বলে, -''আজ তোমায় একটা সত‍্যি গল্প বলব দাদান। তুমি যে গাছ ভালোবাসো তেমনি গাছ ভালোবাসত অনেকেই। আমাদের গ্ৰামের এক মাস্টারমশাই ছিলেন। ফাঁকা জায়গা দেখলেই গাছ লাগাতেন। লোকে ওঁকে গাছ-পাগল বলত। সরকার থেকে উনি পুরস্কার পেয়েছিলেন সবুজ অভিযানের জন‍্য। তবে শহরে সত‍্যিই জায়গার অভাব।

কর্নাটকের একটা রুক্ষ প্রান্তিক গ্ৰামে এক চাষি থাকত বৌ নিয়ে। ওদের কোনো সন্তান ছিল না। এই নিয়ে গ্ৰামের সবাই ওদের হেয় করত। ঐ গ্ৰাম থেকে শহরে যাওয়ার পথটা ছিল রুক্ষ, বড় গাছ ছিল না তেমন। গরমের সময় ঐ পথ দিয়ে শহরে যেতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে যেত। চাষির বৌ কী করেছিল, বেশ কিছু চারা গাছ নিয়ে ঐ পথের ধারে ধারে লাগিয়ে দিয়েছিল। রোজ বহুদূর থেকে জল বয়ে এনে গাছেদের পরিচর্যা করত ঐ বৌটি। লোকে ওদের পাগল বলতে শুরু করল। তবুও ওরা গাছের পেছনে পড়ে থাকল। বেশ কিছুদিনের চেষ্টায় কিছু গাছ বেঁচে গেল। বড় হয়ে উঠল তরতরিয়ে। ওরা আরও গাছ লাগালো। সব কাজ ছেড়ে ওরা এক সবুজের নেশায় মেতে উঠেছিল। কয়েক বছরের ভেতর পুরো পথটা ওরা গাছে ভরিয়ে দিল। সেই সব গাছ বড় হয়ে ছায়া দিল। পাখিরা এল বাসা বাঁধতে। যে সব লোক আগে ওদের নিয়ে হাসত তারাই এবার ধন‍্য ধন‍্য করে উঠল। ঐ চাষি পরিবার সন্তানস্নেহে গাছগুলোকে বড় করেছিল। পরে ওদের নামেই ঐ সড়কের নাম হয়েছিল।''

ঠাম্মা থামতেই লাফিয়ে ওঠে ঈশান, চোখ বড় বড় করে বলে, -''এটা তো থিমক্কার গল্প। আমি পড়েছি ক্লাস থ্রি তে। এটা কি সত‍্যি হয়েছিল ?''


-''হ‍্যাঁ দাদান, এটা সত‍্যি ঘটনা। গাছ লাগানোর জায়গা তোমায় খুঁজে নিতে হবে। একটা বড় গাছ যদি বাঁচে কত উপকার বলো তো?''


পরদিন স্কুল যাওয়ার পথেই ঈশান খুঁজে নিয়েছিল গাছ লাগানোর জায়গা। অ্যাসেম্বলির পর ও নিজেই প্রিন্সিপালের কাছে যায়, খুলে বলে ওর পরিকল্পনা। থিমক্কার কথাও বলে। প্রিন্সিপাল অবাক হয়ে দেখছিলেন বারো বছরের ছেলেটাকে। ওকে ক্লাসে যেতে বলে কয়েকটা দরকারী ফোন করেন উনি।


পরের দিন অরণ‍্য সপ্তাহের প্রোগ্ৰাম। সবাই সবুজ পোশাক পরে স্কুলে এসেছে। ওদের এবারের স্লোগান, "গো গ্ৰিন’'।

প্রসেশনের শুরুতে দাঁড়িয়ে প্রিন্সিপাল বললেন, - ''আমাদের আজকের অনুষ্ঠানে ছোট্ট একটা বদল এসেছে। আমরা শহরের রাস্তার বদলে নিউটাউনের ফাঁকা রাস্তায় যাবো এখন। গাছ বিলি করার বদলে রাস্তার ধারে ধারে নিজেরাই গাছ লাগাবো। আমাদের স্কুলের বাইরে রাস্তার ধারে গাছ লাগিয়ে শুরু হবে আমাদের এই সবুজ অভিযান। আর শুরু হবে ক্লাস সেভেনের ঈশান চক্রবর্তীর হাত দিয়ে। কারণ এই সুন্দর প্রস্তাবটা এনেছে ও। আমি সব সরকারি পারমিশন নিয়েছি। এ বছর কাউকে গাছ দেবো না স্কুল থেকে। সব গাছ নিজেরাই লাগাবো আজ। আর মাঝে মাঝে একেকটা ক্লাসের দায়িত্ব থাকবে এইসব গাছের পরিচর্যা করা। সোসাল ওয়ার্কের ভেতর থাকবে সেটা। গাছ শুধু লাগানো নয়, বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের।''


তুমুল হাততালির ভেতর ঈশানকে নিয়ে প্রসেশন এগিয়ে গেল বাইরের বড় রাস্তায়। নিউটাউনের ধু ধু প্রান্তরে ওদের স্কুল। রাস্তার দু’ধারে নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে স্কুলের সব বাচ্চারা তখন ব‍্যস্ত গাছ লাগাতে। একঝাঁক সবুজ পোশাক পরা নানা বয়সী বাচ্চারা মনের সুখে পৃথিবীকে সাজিয়ে তুলছে সবুজ রঙে।


পরের দিনের কাগজে প্রথম পাতায় ছিল এই সবুজ অভিযানের ছবি। আর ছিল বড় বড় করে ঈশানের নাম, এমন একটা সুন্দর উদ‍্যোগের জন‍্য।


(সমাপ্ত)



অলঙ্করণ : আবির

গল্পের ঝুলি : পাপাইয়ের দাদু : দেবপ্রিয়া দাস


॥১॥

তোমরা দাদুকে দেখেছ গো, আমার দাদু, ক'দিন হল বাড়িতে ফেরেনি। তোমরা জানো দাদু কোথায়? বলো না, দাদুকে ছেড়ে আমি যে একদম থাকতে পারি না। সেই কোন ছোটবেলা থেকে দাদুর সাথে আছি। সেই দাদু কোথায় চলে গেল আমায় ফেলে?

দাদু জানো, বিষ্টুদা আমায় কাল ডেটলের ভয় দেখাচ্ছিল। সেই যেবার রাস্তার ধারে পড়ে থাকা টিনটায় আমার গায়ে কতখানি কেটে গেল, তুমি ডেটল দিয়ে পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতে, সেই থেকেই আমার ডেটলে কি ভয়! বড্ড জ্বালা করত যে।

তোমার মতো যত্ন করে তো কেউ রাখে না আমায়। গত সপ্তাহে বিষ্টুদা আবার আমায় লাথি মেরে সিঁড়ি থেকে নীচে ফেলে দিয়েছিল । তুমি নেই বলেই ও আমায় এত শাস্তি দিচ্ছে। তুমি ফিরে এসো দাদু, তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।

রাতে তোমার কম্বলের মধ্যে তোমার পায়ের কাছে এই সেদিনও শুয়েছি, কী যে আরাম হত! কিন্তু এই শীতের রাতে ওরা তো আমায় একটা চটের বস্তা অব্দি দেয় না। বাইরের গেটে একটা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে সারাদিন। যদি চলেই গেলে আমায় কেন তোমার সাথে নিয়ে গেলে না দাদু?

কতখানি খিদে আমার পেটে জমা থাকতে পারে তুমি থাকতে জানতেই পারিনি। রোজ চারবেলা মাছটা, মাংসটা ভাতে মেখে নিজের হাতে ডেকে খাওয়াতে, বাটি ভরে দুধ-জল কোনো অভাব রাখোনি। আজ দেখো আমায় খেতে দেওয়ার কথা কারোর মনেও থাকে না। তোমার ঘরের সুখের বাসা ছেড়ে আমার কোথায় ঠাঁই হয়েছে জানো, দারোয়ানদাদার ঘরের পাশের এই লোহালক্কড়ের গুদোমে। কালকে তোমার ঘর থেকে আমায় টানতে টানতে বের করে এনে এখানে রেখে গেছে হারুদাদা।

আজ শুনছি বাড়ি ভর্তি লোক আসবে, কী নাকি একটা সভা আছে। কাজের মধ্যে হুড়োহুড়িতে বিষ্টুদা ভুলেই গেছে বোধ হয় আমায় বাঁধতে। দাদুর ঘরে একবার এই সুযোগে ঘুরে আসি।



॥২॥


নিখিলেশবাবু লোকটি ছিলেন আদ্যোপান্ত পশুপ্রেমী। অবিবাহিত, অধ্যাপক মানুষটির বাড়ির লোক বলতে বিষ্টু আর হারু। বিষ্টু চব্বিশঘন্টা তাঁর যাবতীয় ফাইফরমাস সামলানো আর হারু বাগানের মালী আর দারোয়ানির কাজটা করে। তাঁর বাড়ির একতলার একটা ঘরে মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন অতিথির আনাগোনা লেগেই থাকত। কখনও রাস্তার পাশে পড়ে থাকা পা ভাঙা বেড়াল, কখনও বা ডানাভাঙা বাজপাখি, কখনও আবার গাছের ডাল থেকে পড়ে আঘাত পাওয়া ছোট্ট ছানা বাঁদর, কাউকে না কাউকে পাওয়াই যেত ওঁর ঐ ঘরখানায়। শুশ্রূষা করে ঠিক সারিয়ে তুলতেন ওদের। ফিরিয়ে দিতেন প্রকৃতির কোলে।

একবার ওঁর পাশের বাড়ির বাগানে আমগাছের মগডালে লাফালাফি করতে গিয়ে একটা বাঁদরছানা পা পিছলে মাটিতে পড়ে। সারাদিন তার মা আর দলবল সেই বাগানে একদম হুলুস্থুল কাণ্ড জুড়েছিল। কেউ সাহস করে সেদিকে পা পর্যন্ত বাড়াতে পারেনি। কলেজ থেকে ফিরে বিষ্টুর মুখে সেই কথা শুনে নিখিলেশবাবু একখানা লাঠি হাতে বাগানে গিয়ে ছানাটাকে তুলে নিজের বাড়ি নিয়ে আসেন। গোটা একটা সপ্তাহ লেগেছিল সেটাকে চাঙ্গা করে তুলতে। মা বাঁদরটা নাকি নিখিলেশবাবুর বাড়ির ছাদে সেই এক সপ্তাহ ঘাঁটি গেড়েছিল। তারপর ছানাকে সুস্থ ফিরে পেয়ে তার কী আনন্দ! নিখিলেশবাবুর পায়ের কাছে চারটে পাকা আমড়া রেখে তখনকার মতো বিদায় নেয় সেই মা আর ছানা। তারপর থেকে মাঝেমধ্যেই দেখা যেত ওদের দুটোকে নিখিলেশবাবুর বাড়ির ছাদে, বাগানে। কী একটা অদৃশ্য বন্ধন যেন ওদের টানত নিখিলেশবাবুর প্রতি। উনিও ওদের দেখলে এটা ওটা দিতেন খাওয়ার জন্য, ছানাটাকে নিয়ে খেলা করতেন।

এহেন মানুষটা পাপাইকে নিয়ে আসার পর অন্য কোনো জীবজন্তুকেই আর বাড়িতে আনেননি। যতক্ষণ থাকতেন পাপাইকে নিয়েই মেতে থাকতেন। তাকে চান করানো, খাওয়ানো, দুবেলা নিয়ে বেড়ানো, তার সঙ্গে খেলা করা, একসাথে শোওয়া সবটুকু করতেন নিজে হাতে।

এক শীতের রাতে হঠাৎ করেই শ্বাসের কষ্ট শুরু হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে, আর সেখানেই সব শেষ। তিনি গত হয়েছেন তেরোদিন হয়ে গেল। আজ তাঁর উদ্দেশে একটি শোকসভার আয়োজন করেছেন তাঁর কলেজের সহকর্মীরা। বিষ্টু আর হারুকে তাঁরাই সমস্ত নির্দেশ দিয়ে বাড়ি গোছগাছ থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন সব দায়িত্বও দিয়ে রেখেছেন।

লোকজন প্রায় এসেই পড়েছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সভা শুরু হবে। বাবুর ঘরে হঠাৎ পাপাইকে দেখে বিষ্টুর মনে পড়ল আজ ওকে বাঁধতে ভুলে গেছে। কখন আবার ঘরদোর নোংরা করে দেয়, ব্যাটা আবার দেওয়াল আলমারির দরজায় আঁচড় কাটছে! কী করে যেন একটা পাল্লা খুলেও ফেলেছে। 'হেই হেই' করে বিষ্টু তাড়া লাগাল পাপাইকে। কী যেন একটা মুখে নিয়ে পাপাই ছুট লাগাল মনে হল না? যাকগে, বিষ্টুর এখন অনেক কাজ। পরে ওসব দেখা যাবে'খন। ব্যাটা আজ ছাড়াই থাক। এত্ত বছর এবাড়িতে আছে, কোনোদিন কাউকে একটা আঁচড় পর্যন্ত কাটেনি। সেদিক দিয়ে ব্যাটাকে ভালই বলতে হবে।



॥৩॥


ছাইরঙা একটা হাতমোজা মুখ থেকে নামিয়ে রাখল পাপাই গোডাউনের মেঝেতে। বেশ কিছুক্ষণ ওটায় নাক লাগিয়ে শুঁকল। এটা ওর দাদুর জিনিস। এখনো এটাতে যেন দাদুর গন্ধ লেগে আছে। ওর চোখের কোণা বেয়ে কি এক-দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল? কে জানে, হবে হয়তো।

বেশ কয়েক বছর আগে শীতের এক সন্ধ্যায়, বাড়ির সামনের সরু গলিটায় দাঁড়ানো একটা বাইকের পিছনে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা দিনকয়েকের ছানাটাকে দেখে সেটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন নিখিলেশ সান্যাল। তারপর থেকে পাপাইয়ের ঠিকানা এই বাড়িটাই। দাদুকে ছেড়ে গোটা একটা দিনও থাকেনি সে। আর আজ, এত্তোগুলো দিন চলে গেল, কই দাদু তো ফিরে এলো না!

এইমাত্র পাপাই দেখে এসেছে, সাদা চাদর মোড়ানো দাদুর বসার চেয়ারে রাখা দাদুর ছবিখানাতে সাদা মালা পরানো। সেই থেকেই ওর মনে যেন কেমন একটা ভয় ভয় কষ্ট হচ্ছে।

গোডাউন থেকে বেরিয়ে গেট দিয়ে সোজা বেরিয়ে এল পাপাই। বাড়ির সামনেই যে ঝাঁকড়া কদমগাছটা, তার তলায় এসে বসল। এইখানেই সেদিন নীল আলো লাগানো সাদা বড় গাড়িটা এসে দাঁড়িয়েছিল। দুজন লোক একটা সরু, লম্বাটে বিছানায় শুইয়ে দাদুকে ঘর থেকে বের করে এনে তাতে তুলে দিতে ভোঁ বাজিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল গাড়িটা।

বাড়ির ভিতরের স্মরণসভায় যখন অতগুলো লোক নিখিলেশবাবুর সারা জীবন করে আসা ভালো কাজগুলোর স্মৃতি মনে করে তাঁর অাত্মার শান্তি কামনা করছে, তখন বাইরে গাছতলায় তাঁর সাদাকালো ছোপছোপ চারপেয়ে পোষ্যটা বসে আছে রাস্তার দিকে তাকিয়ে, তাঁর বাড়ি ফেরার আশায়॥



॥৪॥


তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। নিখিলেশবাবুর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর বাড়িখানা এখন লাইব্রেরী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিষ্টু, হরি সেই লাইব্রেরী দেখাশোনা করে। পাপাইও আছে। ওর প্রতি ওদের দুজনেরও এখন বেশ মায়া পড়ে গেছে। ছোটো থেকেই পাপাই দেখত দুটো বাঁদর এসে ওদের বাড়ির ছাদে বারান্দায় বসে আছে। দাদু ওদেরকে ডেকে ডেকে খেতে দেয়। ছোট বাঁদরটা দাদুর কোলে, পিঠে চড়ে দাদুর সাথে খেলে। পাপাই ভাবত দাদুর সাথে ও ছাড়াও আরও একজন আছে তবে খেলা করার! তারপর একদিন দাদুর সাথে ওই দুই বাঁদর বন্ধুর একটা ছবি পাপাই-এর চোখে পড়ে। ছোট্ট ছানাবাঁদরটি দাদুর কোলে, তার একটা পায়ে সাদা কাপড়ের ব্যান্ডেজ। পাপাই তার নিজের মতো করে বুঝে নিয়েছিল দাদুর সাথে ওদের সম্পর্কটা।

দাদু চলে যাবার পরেও ওরা দুজনে এসেছিল একদিন। দুপুর বেলা ছাদে ঘুরে বিকেলে নেমেছিল বারান্দায় দাদুর দোলনাটার কাছে। এতক্ষণেও একবারও দাদুকে দেখতে না পেয়ে নিজেদের মধ্যে কিচকিচ মিচমিচ করে কী যেন বলাবলি করছিল। পাপাই ওদের দিকে তাকিয়ে যখন বসার ঘরের দিকে হাঁটা দিল, ওর পিছন পিছন গিয়েছিল ওরা দুজনে। দেওয়ালে টাঙানো ফুলের মালা পরানো দাদুর ছবির দিকে কেমন যেন অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়েছিল মা'টা; আর তার ছানাটা ছুট্টে গিয়ে বারান্দায় কেমন যেন ছটফট করতে শুরু করল। লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ডিগবাজি খেয়ে নিজের মাথায় চাপড় মারতে লাগল। পাপাই দেখেছিল ওর চোখ দিয়ে জল পড়ছে।



॥৫॥


পাপাই মাঝেমধ্যে বাগানের ডালপালা মেলা আমগাছটার নিচে গিয়ে বসে, উপরে তাকিয়ে দেখে ওর দুই বাঁদর বন্ধু এসেছে কিনা। আজও এসেছে, ওর মনে হচ্ছে আজ ওর সেই দুই বন্ধু আসবে। তাই পাপাই দাদুর হাতমোজাটা নিয়ে এসেছে, ওটা থেকে তারা একসাথে শুষে নেবে দাদুর গন্ধ, বুকে আগলে রাখবে দাদুর সাথে কাটানো ওদের পুরোনো সময়গুলোকে।

সেই কোন সকাল থেকে অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে । থামার কোনো লক্ষণই নেই। সাথে দুমদাম কড়াক্কড় বাজ আর বিদ্যুতের চোখরাঙানি। পাপাই এরকম বৃষ্টির দিনে ভয়ে খাটের তলায় ঢুকে পড়ত। যেকোনো আওয়াজেই বড্ড ভয় ওর। আর দাদু তখন ওকে খাটের তলা থেকে বের করে নিজের কোলে নিয়ে বসত। হাত বুলিয়ে দিত মাথায়, গায়ে। আজও ও ভয় পাচ্ছে, খুব খুব ভয় পাচ্ছে, তাই বাকি বন্ধুদের চাইছে ওর পাশে। ওর ভিতর থেকে একটা দমবন্ধ করা কষ্টের আওয়াজ বেরিয়ে আসতে চাইছে। দুটো কান ভয়ে মাথার সাথে লেপ্টে গেছে, লেজটা গুটিয়ে পা-দুটোর মধ্যে গিয়ে সেঁধিয়েছে। ওরা কখন আসবে, ওরা আসবে তো? বৃষ্টিটা একটু যেন কমল। ওই তো, কিচমিচ আওয়াজ করে কারা যেন আসছে, ওই তো সেই মা আর ছানা! ওরা তিনজনে একটা গাছের তলায় হাতমোজাখানা ঘিরে বসল। পাপাই ওদের ভাষা বোঝে না, ওরাও বোঝে না পাপাই কী বলতে চায়। শুধু হাতমোজাখানাই যেন ওদের যোগাযোগের সেতু। হঠাৎ খুব জোর কোথাও একটা বাজ পড়ল, সাথে ভীষণ আলোর ঝলকানি।



॥৬॥


দাদু তুমি এসেছ? এই মাত্র আমরা তোমার কথাই বলছিলাম। তোমার হাতে পরার মোজাটা নিয়েছি, আমায় বকবে না তো? তোমায় কী সুন্দর দেখাচ্ছে এই সাদা ধপধপে জামাটা পরে! আর কিন্তু তোমায় আমরা ছাড়ব না। এখন থেকে আমরা আবার একসাথেই থাকব তো দাদু? দেখেছ দাদু, তুমিও এলে, আর বৃষ্টিটাও থেমে গেল। অত জোরে বাজ পড়ছিল, আমাদের খুব ভয় করছিল জানো! এক্ষুনি কত্ত আলো বেরিয়ে চারপাশ কী সুন্দর ঝকমকে হয়ে গেছে! খুব আনন্দ হচ্ছে দাদু, আমাদের খুব ভাল লাগছে। দাদু আমাদের ওই সুন্দর বাগানটায় নিয়ে চলো না, চলো না আমরা ওই রংবেরং সাঁকোটা পেরিয়ে চলে যাই।


বৃষ্টি থেমেছে। বাগানটায় যেন প্রলয় ঘটে গেছে। বিষ্টু আর হরি দেখেছিল খুব জোরে বাজ পড়েছিল একটা গাছের ওপর। ওরা সেখানে গিয়ে দেখল পাপাই সেই গাছের তলায় পড়ে আছে, আর তার পাশে পড়ে আছে মা আর ছানা বাঁদরটা। বাজ পড়ে ওদের তিনটে প্রাণকেই শেষ করে দিয়েছে। আর ওদের মাঝখানে জলকাদায় মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে নিখিলেশবাবুর হাতমোজাখানা॥

(সমাপ্ত)


অলঙ্করণ : রঞ্জন দাস

গল্পের ঝুলি : জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী : পল্লব বসু


।।১।।

হাসপাতালের বিছানায় অসহায়ভাবে শুয়ে আছে সিঙ্গুর মহামায়া স্কুলের গর্ব বিজন। পাশে বসে তার বিধবা মা ছায়া দেবী চোখের জল ফেলতে ফেলতে তার বুকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কী থেকে যে কী হয়ে গেলো! তাঁর সুস্থ সবল ছেলে এই সেদিন উচ্চমাধ্যমিকে জেলার মধ্যে প্রথম হল। সাথে ইঞ্জিনিয়ারিং জয়েন্টে র‍্যাঙ্ক করে মুর্শিদাবাদের এক বেসরকারি কলেজে পড়তে গিয়েছিল সে। আনন্দের চোখের জলে ভেসে আশীর্বাদের রক্ষাকবচ পরিয়ে তাকে কলেজ হস্টেলে রেখে এসেছিলেন ছায়া দেবী। বুকে পাথর চেপে জীবনে এই প্রথমবারের মতো তাকে চোখের আড়াল করেছিলেন তিনি। ছ’বছর বয়স থেকে বিজনকে একা মানুষ করে চলেছেন ছায়া দেবী। বাবার অভাব কোনোদিনও একটিবারের জন্যও তাকে অনুভব করতে দেননি। তিনিই তার একাধারে মা এবং বাবা। রেলের হকার শঙ্করবাবু কিছুমাত্র সঞ্চয় রেখে যেতে পারেননি। স্বামীর মৃত্যুর পর সরকারি অনুদানে একটা সেলাই মেশিন কিনে বাড়িতেই জামাকাপড় সেলাই করে, লটারির টিকিট আর ধূপকাঠি বিক্রি করে ছেলের পড়াশোনার আর কোচিং ক্লাসের খরচা চালিয়েছেন। বাবা নেই বলে কখনো ভালো রেফারেন্স-বইটার অভাব হয়নি বিজনের, পুজোর সময়ে প্রতিবছর ঠিক নতুন জামাকাপড়ও সে পেয়ে গিয়েছে। আর সে যখন মাকে মলিন ছেঁড়া শাড়িটা সেলাই করে পরতে দেখে প্রশ্ন করেছে, ছায়া দেবী উত্তর দিয়েছেন, “আমি কি বেশি রাস্তাঘাটে বেরোই, যে ভালো শাড়ী পরে বসে থাকবো? তোকে এসব নিয়ে একদম মাথা ঘামাতে হবে না বাবা, তুই মন দিয়ে পড়াশোনাটা কর, তাতেই আমার শান্তি।” 


বিজন জানতেও পারেনি, কতোদিন হাঁড়ির সবটুকু ভাত তাকে দিয়ে খিদের জ্বালায় বিনিদ্র রাত কেটে গিয়েছে তার মায়ের। নিজে আধপেটা খেয়ে, গভীর রাত অবধি সেলাইয়ের কাজ করে তিল তিল করে বিজনের উচ্চশিক্ষার জন্য অর্থ সঞ্চয় করেছেন। অথচ অভাবের এতোটুকু গরম আঁচও তার গায়ে লাগতে দেননি ছায়া দেবী। রাজমিস্ত্রি যেভাবে একটি একটি করে ইট গেঁথে ইমারৎ গড়ে তোলেন, তেমনিভাবে সু-সংস্কার, ভালোবাসা, সময় সময় কিছু তিরস্কার, আর শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলেছেন বিজনকে। প্রতিদানে বিজনও জেলার সেরা ছাত্র হয়ে মায়ের মুখ উজ্জ্বল করেছে। 
কতো স্বপ্ন আর আশা নিয়ে ছেলেকে দূরে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। আর আজ নির্লজ্জ র‍্যাগিং-এর শিকার হয়ে তাঁর ‘অন্ধের যষ্ঠি’ মেধাবী ছেলে মারণরোগে শয্যাশায়ী। বিজনের উপর হস্টেলের সিনিয়র দাদারা ‘ইলেকট্রিক হিটার’ নিয়ে এমন এক জঘন্য উপহাস করেছিল, যার পরিণতিতে আজ তার দুটো কিডনিই সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। তার কিডনির ‘গ্রুপ’ আর ‘এইচএলএ’ টাইপ দিয়ে কাগজে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ যোগাযোগ করেননি। ‘ডায়ালিসিস’-এর মাধ্যমে কোনোক্রমে ছায়া দেবীর নয়নের মণিকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন ডাক্তাররা। 

অন্ধকার ঘরে ছায়া দেবী মাথা খুঁড়ে মরেন, - বিধাতা এতো কেন নিষ্ঠুর যে তাঁর নিজের কিডনিটা তাঁর ছেলের কোন কাজে এলো না, গ্রুপ, টাইপ কিছুই ছেলের সাথে মিললো না! কী অপরাধে প্রথমে ভগবান তাঁর স্বামীকে কেড়ে নিলেন, আর আজ একমাত্র ছেলে মৃত্যুশয্যায়?
।।২।।

ডাক্তার সেনের চেম্বারে আসেন ছায়া দেবী। ডাঃ সেন তাঁকে হাউস-স্টাফ মারফৎ দেখা করার কথা বলে পাঠিয়েছিলেন। চেয়ারে বসে ছায়া দেবী ওঁর মুখের দিকে বহু প্রশ্ন নিয়ে চেয়ে থাকেন।

“বিজনকে বেশিদিন ডায়ালিসিসের উপরে কিন্তু রাখা যাবে না। খুব দ্রুত অন্তত একটা উপযুক্ত কিডনি আমার চাই।”

“কিন্তু আমি যে আজ অবধি কোনও উপযুক্ত ডোনার পেলাম না ডাক্তারবাবু! আপনি দয়া করে একটা উপায় করুন, আপনার দুটো পায়ে পড়ি।” ছায়া দেবীর সংযমের সব বাঁধ ভেঙ্গে পড়ে, তিনি অঝোরে কেঁদে ওঠেন।

“রক্ত হলে আমি একটা ব্যবস্থা করে ফেলতাম ঠিকই, কিন্তু কিডনি পাওয়া যে এতো সহজ কথা নয়। তার উপরে ওর গ্রুপ আবার ‘এবি’ নেগেটিভ। অথচ, সময় হু হু করে বয়ে যাচ্ছে।”

একরকম গভীর অবসাদ আর হতাশা নিয়ে হাসপাতাল চত্বর থেকে রাজপথে পা রাখেন ছায়া দেবী। মন উদ্ভ্রান্ত, চোখ জলে ঝাপসা, গায়ে জ্বর। অটোস্ট্যান্ডের দিকে যেতে যেতে পথের ধারে জটলা চোখে পড়ে। ভিড় ঠেলে এগোতেই চোখে পড়ে একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা সংজ্ঞাহীন হয়ে রাস্তার উপরে পড়ে আছেন। কিছু পথচারী তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে নানারকম মন্তব্য করছেন, কিন্তু কেউ এগিয়ে এসে তাঁর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছেন না। ছায়া দেবী নির্দ্বিধায় রাস্তার উপরে বসে পড়ে তাঁর মাথাটা কোলের উপরে নিয়ে ব্যাগের জলের বোতল বার করে তাঁর মুখে-চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে তাঁর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করতে থাকেন।

রাস্তার পাশের পার্কের গাছের ছায়ায় বেদীর উপরে বসে ছায়া দেবী শুনলেন আর এক দুঃখিনী মায়ের কষ্টের কাহিনী। নীলিমা দেবীর স্বামী ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। সীমান্তের যুদ্ধে তিনি দেশের হয়ে বীরের মৃত্যু বরণ করেছিলেন। তারপর থেকে নীলিমা দেবী তাঁর মেয়ে নিবেদিতাকে পিতার আদর্শে বড় করে তুলছিলেন। নিবেদিতা স্কাউট, এনসিসি ট্রেনিং-এ ভর্তি হয়েছিল। কোথাও বন্যা হয়েছে, কয়েকজন সম-মানসিকতার বন্ধুকে নিয়ে ত্রাণসামগ্রী ওষুধপত্র নিয়ে নিবেদিতা ছুটে যেতো সেখানে। ক্যাম্পে তাঁদের শুশ্রূষা করা, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া, গাড়ির ব্যবস্থা করে বেশি অসুস্থদের হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা, চাল, ডাল, পরিশুদ্ধ জল নিয়ে গিয়ে অসহায় মানুষগুলোকে রেঁধে খাওয়ানো, সব করতো ওরা সকলে। এসব করতে গিয়েই কদিন আগে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলের একটা ক্যাম্পে ওকে সাপে কাটে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হলেও ওর প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। ওর বন্ধুরা ওকে কলকাতার এই হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করে দেয়, এখানেই মেল ওয়ার্ডে বিজন ভর্তি আছে। ডায়ালিসিস চলছিল, কিন্তু, এখন ডায়ালিসিসও আর নিবেদিতা নিতে পারছে না। এখুনি একটি কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। কিন্তু নীলিমা দেবীর কিডনি ম্যাচ করেনি। নিবেদিতার বন্ধুবান্ধবদের কারোর কিডনি ম্যাচ করেনি, আর এখনো অবধি কোনও উপযুক্ত ডোনারও নীলিমা দেবী পাননি। চোখের সামনে তিনি আর তিলে তিলে মেয়েকে মরে যেতে দেখতে পারছেন না। মাথার ঠিক নেই, ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া নেই, মেয়েকে দেখে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তাই হঠাৎই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন রাস্তায়।

ছায়া দেবী জানান, তাঁর জীবনের গল্পটাও অনেকটা কাছাকাছি। এরপর নীলিমা দেবীর হাতের কাগজপত্রের উপরে তাঁর চোখ পড়ে। সবার উপরেই রয়েছে নিবেদিতার কিডনির গ্রুপ আর টাইপের রিপোর্টটা। ছায়া দেবী ওঁর হাত থেকে কেড়ে নেন কাগজগুলো। নিবেদিতার রিপোর্টের ঠিক নীচের কাগজটিই নীলিমা দেবীর কিডনির গ্রুপ-টাইপের রিপোর্ট। বারংবার তিনি অবাক বিস্ময়ে দেখতে থাকেন দুটো রিপোর্টের কাগজকেই। কাগজগুলো ওঁর হাত থেকে খসে পড়ে ছড়িয়ে যায় মাঠের ঘাসে। জলে ঝাপসা হয়ে আসে তাঁর চোখদুটো। জড়িয়ে ধরেন তিনি নীলিমা দেবীকে, আর হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকেন। ওঁর এই আকস্মিক ব্যবহারে বিহ্বল হয়ে যান নীলিমা দেবী।

যিনি বিপদ দেন, তিনি এমনি করেই বুঝি তার থেকে মুক্তির রাস্তাও তৈরি করে রাখেন। শুধু সেই পথটা ঠিকমতো খুঁজে পেলেই মানুষের সব কষ্টের অবসান হয়। নাহলে এমন কাকতালীয় সমাপতনও বুঝি ঘটে? আর, দুই অসহায়া বিপর্যস্ত মমতাময়ী মায়ের এমনি করে দেখা হয়ে যায়! আবার এমনি করে কিডনির রিপোর্ট দুটোও চোখে পড়ে যায়! আসলে, ছায়া দেবীর কিডনির গ্রুপ ও টাইপ নিবেদিতার সাথে মিলে গেছে, আর নীলিমা দেবীরটা বিজনের সাথে।

আজ দুই মমতাময়ী পরম কল্যাণময়ী মা তাঁদের পরস্পরের পুত্র ও কন্যাকে তাঁদের নিজেদের একটি করে কিডনি দান করে জীবনদান করেছেন। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে বিজন আর নিবেদিতা। আসলে, মায়েদের আশীর্বাদের লক্ষ্মণরেখা যাদের সর্বদা ঘিরে রেখেছে মৃত্যুরূপী রাবণের সাধ্য কি তাদের স্পর্শ করে! মা আর দেশ-মায়ের চেয়ে বড় আর আপন বুঝি আর কিছু নেই! 

'জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী...'!

(সমাপ্ত)


অলংকরণ : সুকান্ত মণ্ডল

গল্পের ঝুলি : মানুষের বন্ধু : প্রতীক কুমার মুখার্জী



দিনকুড়ি জমিয়ে দস্যিপনা করার পর ইলেভেন বুলেটস কাঁদোকাঁদো মুখে নিজের নিজের বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয় প্রতিবার। 'ইলেভেন বুলেটস' ব্যাপারটা বোঝা গেলো না তো? দেশের বাড়িতে জমায়েত হই সকলে - দাদু, ঠাকুমা, জ্যাঠা, কাকা আর পিসিরা - ফি বছর দু'বার করে, গরমের ছুটিতে আর পুজোর ছুটিতে। সাথে আমরা, একেবারে গুনে গেঁথে এগারোজন 'তুতো' ভাইবোন!

পুজোয় আমাদের পোয়াবারো, কারণ ছোট করে হলেও একচালা দুর্গাপ্রতিমায় সেজে ওঠে চল্টা উঠে যাওয়া লাল মেঝের আমাদের আদি বাড়ির নাটমন্দির। বড়োরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন পুজোর জোগাড়ে, আর মায়েরাও রাশে আলগা দেন। ফলে গাছে উঠে নাচানাচি করা থেকে সবলুর দিদার আচার চুরি, নিশাদাদুর পেয়ারাবাগানে ডাকাতি, বুধনকাকুদের ছিপের ফাতনায় ঢিল ফেলে মাছধরার দফারফা করা, আরো অনেক নাশকতামূলক কাজকর্ম চলে, যার সবটা বলে দিলে সবাই আমায় একঘরে করবে।

প্রতিবেশীরা নালিশ করতে এলে, বাবা জ্যাঠারা চোখ পাকিয়ে নড়েচড়ে বসেন চোয়াল শক্ত করে। ছোটকা ফুট কাটে, "আহা, গরুগুলো কতদিন পরে ছাড়া পেয়েছে, মেরো না, বরং ওদের খোঁয়াড়ে দিয়ে আসা হোক!" আমরা ছোটকার উপর বিশেষভাবে খাপ্পা। আজই যেমন টুম্পি আচার চুরি করতে গিয়ে, জলভরা কলসির উপর পড়ে বানভাসি জল আর ভাঙা কলসির টুকরোর মধ্যে থেবড়ে বসা অবস্থায় ধরা পড়ে যারপরনাই অপদস্থ। তারপরেও ছোটকা যখন "আচ্ছা, সরকারিভাবে এদেরকে 'রোগ' হিসেবে ঘোষণা করা যায় না?" বলেছে, খণ্ডযুদ্ধ বাধার উপক্রম!

একটা খামচাখামচি কান্ড ঘটেই যেত, যদি না টুকটুকে ফরসা একটা হাত এসে ছোটকার কানে একটা মোলায়েম মোচড় দিতো, "অতু, বুড়ো হতে চললি নিজে, এখনো বাচ্চাদের পিছনে লাগা!" বড়দাদাদু এসে গেছে!! অশান্তির অবসান। দু'মিনিটের ভিতরে চারদিক ভোঁ ভা, শুধু ছোটকা আহত কানে হাত বুলোতে বুলোতে, "পাইড পাইপার এসে গেছে, ছুঁচোর কেত্তন এবার বন্ধ", বলেই স্যুট করে স্টাডিতে ঢুকে পড়লো। আর আমরা দাদুকে গার্ড অফ অনার দিয়ে, ব্যাগ ব্যাগেজ কোলেপিঠে করে নিয়ে টং-এর ঘরে। বড়দাদাদু এলেই রোজ একখানা করে দুর্দান্ত গল্প আমাদের বরাদ্দ - তাই 'ছুঁচো' অপবাদটা গায়ে মাখলাম না।

দাদুকে ধাতস্থ হবার সময় দিতে আমরা গাড়ি বারান্দার ডান কোণে নীচের ধাপে জমা হলাম। সেখানে তখন ঘুমন্ত ফুলির সারা গায়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে তার আট বাচ্চা। আমাদের দেখে মুখ তুলে হাল্কা করে একবার "ভুক" করেই পাশ ফিরে শুতেই চারটে ছানা টপাটপ ডিগবাজি খেয়ে গেল। ও, ফুলির সাথে আলাপ হয়নি বুঝি? আরে, আমাদের ফুলির দুধসাদা গায়ে বাদামীর ছোপ, কানদুটো ঝোলা, আর চোখদুটো কথা বলে। ওর মুখটা এতো মায়াময় যে পল্টনদাদা ওকে এখানেই আশ্রয় দিয়েছে।

আমরা তুলোর বলের মত বাচ্চাগুলোকে চটকাচ্ছিলাম, এমন সময় ধোপদুরস্ত পোষাকে বড়দাদাদু স্নান সেরে হাজির। বাগানের দিকে যেতে যেতে বলে গেলো, "মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু, দ্যাখ কী নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে তোদের হাতে ছানাগুলোকে ছেড়ে দিয়ে! কিন্তু জানিস - কীভাবে কুকুর মানুষের কাছে এসেছিল?"

আমরা ঘুড়ির মাঞ্জার মশলা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। দাদুর কথাগুলো কানে ঢুকতে আমরা স্ট্যাচু! তারপরে পঙ্গপালের মত ধেয়ে গেলাম দাদুর পিছনে। বড়দাদাদু যেন এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল, সাথে সাথেই বলল, "হবে, হবে বিকেলে হবে। এখন বাড়িটা ঘুরে দেখতে দে।" গাছে পুরুষ্টু ডাব দেখে পল্টনদাকে নিয়ে লেগে পড়ল। কাজেই, আবার আমরা ফুলির কাছে ফিরতে, সে আমাদের দেখে আরেকপ্রস্থ পাশ ফিরলো।

দুপুরে জমিয়ে খাওয়াদাওয়ার পর দেখা গেলো আকাশ ধীরে ধীরে কালো হতে শুরু করেছে। ক্রমে অন্ধকার হয়ে এলো, প্রবল ঝড়জল শুরু হলো। আমরা সবাই দুদ্দাড় করে নীচে এসে বাচ্চাগুলোকে কোলে তুলে ফেলতেই ফুলি একটা রাগী ডাক ছাড়লো। বড়দাদাদু বলল, "ছানাগুলোকে আমার ঘরে নিয়ে আয়, ওদের মা সাথে সাথেই চলে আসবে।" এসবের পর ঠিক সাড়ে তিনটের সময়, শুরু হলো বড়দাদাদুর গল্প। ঘরের মাঝখানে গুটিসুটি মেরে ঘুমোতে লাগল ফুলির 'ফুল ফ্যামিলি'!!

স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই দাদু শুরু করল, 

"ভেবে দ্যাখ, এখনি গল্পটা শুনে ফেলবি নাকি সন্ধেবেলায়? এখন তো ভূতের গল্প ভালো?" 

আমরা প্রবল আপত্তি জানাতে গল্প শুরু করল বড়দাদাদু,
"মস্কোর স্মোলেন্সকে থাকতাম, তখন আমাদের বাটলার দিমিত্রি বুড়োর মুখে শোনা 'নেন্টুক' প্রদেশের এই উপকথা। তবে একটা কথা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার, আগেরবারের হিসেবে আমি দুটো হামি কম পেয়েছিলাম। তাই এবার পারিশ্রমিক আগাম চাই।"

মুখ চাওয়াচাওয়ি করেই চটজলদি বড়দাদাদুর 'পারিশ্রমিক' দাদুর আপেলের মত টুকটুকে গালে আছড়ে পড়তে লাগলো, পাছে অস্বীকার করলে গল্পের কোয়ালিটি পড়ে যায়! ফুলিও উঠে বসে লেজ নাড়াতে শুরু করলো আহ্লাদে।

''বহুকাল আগে কুকুর থাকতো জঙ্গলে, সে কখনো লোকালয়ে আসেনি, মানুষের সাথে থাকা তো দূরের ভাবনা, সে মানুষ দেখেইনি। মানুষের অনেক গল্পগাছা তার বাপ ঠাকুরদাদের কাছ থেকে শুনে মানুষকে সে অন্য গ্রহের প্রাণী ভাবা শুরু করেছিল। কিন্তু একা আর কতদিন থাকা যায়? সব মিলিয়ে সে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছিল।

একটা কেউ নেই যার সাথে দু'দণ্ড সুখদুঃখের কথা বলে সময় কাটায় সে। সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ায় বেচারা, যা পায় তাই খেয়েই পেট ভরায়, যেদিন খাওয়া জোটে খায়, আর যেদিন পায় না, সেদিন জল খেয়েই রাত কাবার করে। তার যদি একটা বন্ধুও থাকত, তাহলে জীবনটা কতো সুন্দরভাবে কেটে যেতো!

ঘুরতে ঘুরতে সে দেখা পেলো ছোট্ট ছোট্ট, সাদা তুলতুলে লালচোখ খরগোশের। কুকুর আর একবিন্দু সময় নষ্ট না করে খরগোশের কাছে কথাটা পেড়ে ফেললো, "খরগোশ ভাই, চলো না এখন থেকে আমরা দুজন মিলে একসাথে থাকি! খুব মজা হবে, এক বাড়িতে থাকবো, খাবো, গল্প করবো, আর একসাথে সারা জীবনটা কাটিয়ে দেবো!"

খরগোশ সানন্দে রাজি হয়ে গেলো। না হবার কিছু ছিলো না, কারণ বন্ধু কে না চায়! আর কুকুর তার সাথে থাকলে, তারও খুবই সুবিধে হবে। সে বলল, "বেশ তো ভাই, চলো আজ থেকে আমরা বন্ধু হলাম, চলো আমার বাড়িতে।"

"এভাবে সারাদিন ওরা দুজনে গল্পসল্প করে কাটালো," 
এই বলে বড়দাদাদু কোলবালিশ জড়িয়ে শুয়ে পড়লো! বাইরে তখন ঝড়বৃষ্টিতে কিছু দেখা যাচ্ছে না! আমরা সদলবলে দাদুর উপর চড়াও হলাম, "কী ব্যাপার দাদু? এটা কি তুমি ঠিক করলে? আগাম 'পারিশ্রমিক' নেওয়া হয়ে গেছে বলে তুমি মীরজাফর হয়ে যাবে?"

দাদু পাশ ফেরা অবস্থাতেই রাগী গলায় বলল, "বটে? বুড়ো হয়েছি, বাইরে ঝড়জল, কোথায় বলবে, দাদু চা খাবে না কফি, কোথায় বাক্স থেকে হাভানার সিগার বার করে হাতে ধরিয়ে দেবে, তা না! তোরা নাতি নাতনি না ভূতপেত্নী! মিথ্যা আমায় দোষ দিচ্ছিস, ওরাও তো গল্প করছে, ততক্ষণে না হয় আমিও একটু জিরিয়ে নিলাম!"

ঠোঁট টিপে হেসে নিয়ে আমরা ব্যস্ত হলাম বড়দাদাদুর পরিচর্যায়। একবার যদি দাদু হাতছাড়া হয়ে যায়, দেশবিদেশের গল্প শোনার সেখানেই ইতি। সমস্ত ব্যবস্থা করে আবার দাদুকে গল্পে ফেরানো গেলো। অবশ্য তার আগে উনি দলাই মলাই, চুলে বিলি কাটা আর পা টেপানোর ডিউটিগুলো আমাদের দিয়ে করিয়ে ফেললেন! গরম কফি আর সিগার শেষ করে আবার গল্প শুরু হলো।

''সারাদিন কাটিয়ে ওরা দুজনে ঘুমোতে গেলো, কিন্তু মাঝরাতে কোনো একটা শব্দ শুনে কুকুর তারস্বরে ঘেউঘেউ করে ডাকতে শুরু করলো। সেই প্রচন্ড শব্দে বেচারা খরগোশের ঘুমের দফারফা! সে ভয়ে ভয়ে কুকুরকে বলল, "আরে বন্ধু, কী হয়েছে তোমার? রাতের বেলা এভাবে ডাকাডাকি করলে মস্ত বিপদ! নেকড়েবাঘ এসে আমাদের দুজনকেই খেয়ে ফেলবে তো!"

এই কথা শুনে কুকুর হতবাক! সে ভাবলো, আমি তো ভুল লোকের সাথে বন্ধুত্ব করেছি। খরগোশ তো ভীতু, এর সাথে থাকলে আমার জীবনে কিচ্ছু শেখাই হবে না। আমার মনে হচ্ছে নেকড়েবাঘ হলো সবচেয়ে সাহসী। সে তখনই কাঁদোকাঁদো অবস্থায় খরগোশকে একা ফেলে নেকড়ের খোজে বেরিয়ে পড়ল।

পথ চলতে চলতে কুকুর অনেক দূরের রাস্তা পেরিয়ে এলো। রাস্তায় অনেককে জিগ্যেস করতে করতে ঘুরে ঘুরে সে উপস্থিত হলো নেকড়েবাঘের ডেরায়। প্রথমেই তো নেকড়েবাঘের চেহারা, তার গায়ের বোটকা গন্ধ আর রাগী মুখ দেখে সে ভয় পেয়ে গেল। নেকড়েবাঘ তাকে দেখে আরো রেগে উঠলো, তার মুখ দিয়ে লালা ঝরতে আরম্ভ করলো।

ভয় পেলেও কুকুর ভাবলো, "এই একটা বুক বাজিয়ে বলার মতো বন্ধু পেয়েছি। এ আমার বন্ধু হলে, সবার তাক লেগে যাবে।" হাতটাত কচলে নেকড়েবাঘের সামনে বন্ধুত্বের কথাটা পেড়েই ফেলল। নেকড়েবাঘ তেজীয়ান লোক। চিন্তাভাবনা করে সেও মত দিলো। কুকুরের মজা দেখে কে!

সারাদিন ধরে নেকড়েবাঘ তার বীরত্ব আর শিকারের প্রচুর গল্প বলে কুকুরকে অবাক করে দিয়েছিলো। কুকুর ভাবলো দুনিয়ার সবচেয়ে সাহসী জানোয়ার তার সহায়। যথারীতি দুই বন্ধু কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোতে গেলো। কিন্তু আবার গোলমাল বাধলো রাত হতেই।

মাঝরাতে আবার কুকুরের প্রাণপণ ঘেউঘেউ শুরু হলো। নেকড়েবাঘের ঘুম সাংঘাতিক, প্রবল নাকডাকা থামিয়ে ঘুম ভেঙে চমকে উঠে বসলো, "আরে আরে, করছো কী? এই শব্দ শুনলে এক্ষুনি কী হবে জানো? ভাল্লুক ঠিক শুনতে পাবে আর আমাদের দুজনকেই নখ দিয়ে ফালাফালা করে চিরে ফেলবে! একদম চুপ, আর একটা আওয়াজ যেন না শুনি!"

কুকুর ভাবলো, এ কী ফ্যাসাদে পড়লাম রে বাবা! সবাই বলে নেকড়ে নাকি বাঘ, এ তো দেখছি একেবারে রামভীতু। এর সাথে সে যদি থাকি দিন দিন আমিও সাহস হারিয়ে ফেলবো! এ যখন ভাল্লুককে এতো ভয় পাচ্ছে, তখন সে না জানি কী সাংঘাতিক জানোয়ার! গেলে তার কাছেই যাবো, পাতালে তার সাথেই বন্ধুত্ব পাতাবো।

সে কায়দা করে নেকড়েবাঘকে বলল, "বন্ধু, আমার বাড়ির চাবি ফেলে এসেছি, এক্ষুনি যেতে হবে, নইলে আমার সব জিনিস চুরি হয়ে যাবে!" এই না বলে পগারপার!! কুকুর সোজা ভাল্লুকের খোঁজে বেরিয়ে পড়লো। দরকার নেই তার নেকড়েকে সত্যি বলার। বলা যায় না, রেগেমেগে যদি তার মাথাটা কুড়মুড় করে চিবিয়ে দেয় একবার!"

ঝড়বৃষ্টি ধরে এসেছে, বিকেল হয়েছে। দাদু এই অব্দি বলে বিশাল একটা হাই তুলে সশব্দে আড়মোড়া ভাঙতেই রিকু বুদ্ধি করে পরেশদাকে হাঁক পাড়লো, 
"পরেশদাআআ, দাদুর পান আনো, আর একটু পরে নারকোল কোরা, ঘি আর চিনি দিয়ে মুড়ি মেখে এনো।"

বড়দাদাদু ভ্রূ নাচিয়ে বলল, "পাক্কা গিন্নিবান্নি হয়েছিস দেখি রিকু, বুড়োকে একটু বিশ্রাম নিতেও দিবি না? তবে আর কিন্তু বেশী বাকি নেই গল্পের, পানটাই দিতে বল। মুড়ি খাবো সন্ধেবেলায়, তার অনেক আগে গল্পের পাখি ফুড়ুৎ হয়ে যাবে।" রিকু লজ্জায় লাল হয়ে দাদুর গলা ধরে ঝুলে পড়লো।

পান মুখে নিয়ে রাঙা ঠোঁটে আবার গল্প শুরু হলো। 

"আবার তো বেরিয়ে পড়লো কুকুর বাবাজী। একেবারে ভাল্লুকমশাইএর খোঁজে! যাকে জিগ্যেস করে ভাল্লকের বাড়ি, কেউ কিছু বলে না, ভয়ে সরে পড়ে। মহা মুশকিল! শেষে বুদ্ধি করে মৌমাছিদের বলতে তারা একটা পাহাড় দেখিয়ে বলল, "ওই পাহাড়ের গুহায় শয়তানের বাস। আমরা কষ্ট করে মধু বানাই, আর মাঝে মাঝেই এসে আমাদের চাক ভেঙে, মধু খেয়ে চলে যায়।"

কুকুর পাহাড় চড়তে শুরু করলো। পেয়ে গেছে, সবচেয়ে সাহসী লোক সে পেয়ে গেছে। ভাবতে ভাবতেই কুকুর সামনে একটা কালো পাহাড়কে এগিয়ে আসতে দেখলো। ভাল্লুক!!! সে ফলমূল খুঁজছিলো একমনে, হঠাৎ দেখে কালো বাদামী মেশানো একটা প্রাণী তার সামনে ডিঙি পেড়ে শুয়ে পড়ে কেঁউকেঁউ করছে!

শান্ত হতে সে বলল, "ভাল্লুকদাদা, আমার কেউ নেই, দয়া করে তোমার সাথে আমায় থাকতে দেবে?" ভাল্লুকের চেহারা, নখ, দাত আর ভুসো কালির মতো রঙ দেখে কুকুর 'বন্ধু' হবার কথা বলতে সাহস পায়নি!'

ভাল্লুক ঠোঁট উলটে বলল, "এই কথা, তা থাকো না গুহার এককোণে। তবে বাপু, গুহা রোজ ঝাঁটপাট দিয়ে পরিষ্কার করে রাখার কাজ তোমার।" কুকুর উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার-টমস্কার করে অস্থির। যথারীতি রাত হতেই সেই এক ব্যাপার, কুকুরের প্রাণপণ ঘেউঘেউ।

ভাল্লুকটা একগাদা ফলটল খেয়ে ঝিমোচ্ছিলো, কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসলো, "করো কী, করো কী? মানুষ শুনতে পেলে, তোমায় তো মারবেই, সাথে আমায় মেরে, চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে।" কুকুরের এই অবস্থতেও হাসি পেলো, অতোবড় জানোয়ারটা মানুষের ভয়ে থরহরি কম্প!!

হতাশ হয়ে ভাল্লুককে একটা চাদর চাপা দিয়ে সে বেরিয়ে পড়লো মানুষের খোঁজে। এতোবড় ভাল্লুকের চামড়া যে ছাড়িয়ে নিতে পারে, সে-ই সবচেয়ে বড়ো। মানুষই হবে তার বন্ধু। বেশিদূর যেতে হলো না তাকে। এক মানুষ এসেছিল জঙ্গলে কাঠ কাটতে।

মানুষের চেহারা দেখে কুকুর দমে গেলো। এই মানুষ! একে সব্বাই ভয় পায়? একে তো এক কামড়ে সে-ই মেরে ফেলতে পারে! সে মানুষকে তাচ্ছিল্যভরেই বলল, "কিগো, আমায় তোমার সাথে থাকতে দেবে?"

মানুষ তাকে এক ঝলক দেখে বলল, "বেশ তো, চলো আমার বাড়িতে, সাথে থাকবে! তা তুমি কী খাও বাছা?" কুকুর চমকে উঠলো। তাকে তো কখনো কেউ খাবার কথা জিগ্যেস করেনি! সে বলল, "চিন্তা নেই, আমি আমার খাবার জোগাড় করে নিই।" মানুষ বলল, "ওটি হবে না। আমার সাথে থাকতে হলে আমিই তোমার খাবার জোগাড় করে দেবো, তুমি শুধু বন্ধুর মতো বাড়িতে থাকবে।"

কুকুরের চোখে জল এলো খুশিতে।

যথারীতি রাতে মানুষের বাড়িতে সবাই শুয়ে পড়েছে, কুকুর বাবাজী আবার তার কান ফাটানো ঘেউঘেউ শুরু করলো। মানুষের ঘুম ভেঙে গেলো। সে বাড়ির চারপাশ দেখে এলো মশালের আলোতে, বলল, "কিচ্ছু ভয় নেই, ঘুমিয়ে পড়ো, আমি আছি তো!" এই বলে সে পাশ ফিরে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। কী সাহস মানুষের! কুকুর সেইদিন থেকে কোথাও নড়েনি মানুষকে ছেড়ে!"

গল্প শেষ, বড়দাদাদু উঠে বসল, আর আমরাও হাঁ হওয়া মুখগুলো বন্ধ করতে করতে বাস্তবে ফিরে এলাম। ফুলিও গল্প শুনছিল বোধহয়, সে-ও আবার দিব্যি পাশ ফিরে শুয়ে পড়তেই দাদু বলল, 
"দেখেছিস, এত বছর মানুষের বন্ধু হবার ফলে কী নিখুঁতভাবে পাশ ফিরে শোওয়া রপ্ত করেছে?" বলেই একটা অট্টহাসি!!

দাদুকে অবাক করে দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে হামি দিতে থাকলাম আমরা। ফুলিও তড়াক করে উঠে পড়লো, আর তার বাচ্চারা আমাদের কোলে চেপে, পুরো দলটা সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকলাম। ঝড়জল থেমে গেছে, কোথায় যেন ঢাকে কাঠি পড়েছে!

ছোটকা পায়ে পায়ে স্টাডি থেকে বেরোচ্ছিল, আমাদের নামতে দেখে আবার মুখ চুন করে বেচারা ঘরে ঢুকে পড়লো। উল্লাসে চিৎকার করলাম, "পাইড পাইপার জিন্দাবাদ, লং লিভ ছুঁচোর কেত্তন!" আমাদের সাথে গলা মেলালো নানান সুরে, কারা আবার? ফুলি এন্ড সন্স!!!


(সমাপ্ত)

অলঙ্করণ : স্বর্ণদ্বীপ চৌধুরী

গল্পের ঝুলি : গড়বাড়ির দুর্গাপূজা : প্রদীপ কুমার বিশ্বাস



"দুর্গের অন্ধকার বন্দীঘরে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে রঘুনাথ পরপর দু’বার শুনলেন হুতোম প্যাঁচার ডাক। তিনি নবাব আলিবর্দির সফল সেনানায়ক ছিলেন। এই আওয়াজটা যে জংলি প্যাঁচার ডাক নয়, মানুষের গলা থেকে আসা সাংকেতিক ডাক, সেটা এক লহমায় বুঝে নিলেন। সঙ্কেতটার অর্থ হল, “তৈরি থাকো, খুব শীঘ্রই আমরা তোমাদের উদ্ধার করতে আসছি।"

চাপা কিন্তু দ্রুত পদক্ষেপে রঘুনাথ কারাকক্ষের ঘুলঘুলির কাছে এসে থামলেন। গঙ্গার ঠাণ্ডা বাতাসের আশায় এইখানেই মেঝেতে শুয়ে আছে ভাই চন্দ্রনাথ। এক হাল্কা চাপড়ে তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেবার সময় এবার দুই ভাই একসাথ শুনলেন, হুতোম প্যাঁচার হাড় হিম করা ডাক।

রঘুনাথ কাছে থাকায় ভাইকে সামলে নিলেন, বললেন, “মনে হচ্ছে এই গুমঘর থেকে আমাদেরকে মুক্ত করতে আমার ঝটিকা বাহিনীর সামু আর দামু দুজনে আসছে।"

গঙ্গা থেকে সামান্য দূরে একটা উঁচু টিলার ওপর পরিখা আর উঁচু দেওয়ালে ঘেরা বাংলার নবাব আলীবর্দির এই দুর্গের গুমঘরে থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত বোঝবার একমাত্র উপায় দামামা, বড় শিঙ্গা, পেটাঘড়ির ঘণ্টার মিলিত আওয়াজ আর প্রহরীদের কুচকাওয়াজের পদধ্বনির শব্দ।

দুর্গের একটি গোপন কক্ষের ভেতরে আছে ঘোরানো সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা লম্বা সুড়ঙ্গ পার হয়ে এক বারান্দা আর তাতে সার দিয়ে দুর্গের কারাগার বা গুমঘরগুলো।

বারান্দায় একটাই বড় ঘুলঘুলি আছে। সেটা দিয়ে সারা দিনে একটু আলো কিছুক্ষণের জন্য আসে। দূর থেকে নদীর ঠান্ডা হাওয়া এই ঘুলঘুলি দিয়ে সবসময় আসে। গুমঘর থেকে কোনো বন্দি পালাতে চাইলে তাকে এই বারান্দা আর সুড়ঙ্গে মোতায়েন প্রহরীদের আর দুর্গের জায়গায়-জায়গায় লুকিয়ে থাকা প্রহরীদের ফাঁকি দিতে হবে, যা একদম অসম্ভব। তা সত্ত্বেও, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী হবার অপেক্ষায় থাকা রঘুনাথ আর চন্দ্রনাথকে নবাবের এই দুর্গ থেকে মুক্ত করার জন্য এক দারুণ ছক কষেছিল তাদের বাহিনীর লোকেরা।


রঘুনাথ আর চন্দ্রনাথ এই দুই ভাই ছিলেন নবাবের উচ্চপদের রাজকর্মচারী । রঘুনাথ ছিলেন এক বিশাল সেনাদলের সফল সেনাপতি আর চন্দ্রনাথ ছিলেন নবাবের অর্থ ভাণ্ডারের মুখ্য খাজাঞ্চি। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া তাঁদের বিশাল জমিদারী সম্পত্তির দেখভাল করতেন ছোটভাই রুদ্রনাথ, তাঁদের চাঁপাডাঙ্গার প্রাসাদ থেকে।

রুদ্রনাথ একবার তান্ত্রিক সাধনা শেখবার জন্যে কিছুদিন তিব্বতে গিয়েছিলেন। একবছর পরে তিনি ফিরে এলেন, সঙ্গে তাঁর তিব্বতি গুরু। সেই গুরু তন্ত্রবিদ্যার সাথে-সাথে হাতাহাতি সামরিক যুদ্ধের কৌশল, সোরা, গন্ধক, ধাতুচূর্ণ দিয়ে আগুনে গোলা (বর্তমানের বোমা, হাউই) বানাবার গোপন বিদ্যাও জানতেন।

একবার এই গুরুর হাতাহাতি যুদ্ধের মহড়া, বোমা-পটকার বিকট আওয়াজ আর সেই সাথে হাউইবাজির খেলা দেখে রঘুনাথ বুঝে নিলেন এর শত্রুসেনাকে বিভ্রান্ত করবার আর পিছে হটিয়ে দেবার ক্ষমতা। আর দেরি না করে রঘুনাথ এই তিব্বতি গুরুকে কুলগুরু করে বরণ করে নিলেন। তাঁর ঝটিকা বাহিনীর সেনাদের ছোটো ছোটো দল কুলগুরুর কাছে পাঠালেন এই বিদ্যেগুলো শিখে নেবার জন্য।

রঘুনাথ আর চন্দ্রনাথ তাঁদের কর্মগুণে নবাব আলীবর্দির অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। মীরজাফর আর তার অনুগতেরা রঘুনাথের নবাবের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠাকে খুব হিংসে করতেন। যুদ্ধে পাওয়া ধনভাণ্ডারের সবটা রঘুনাথ তার ভাইয়ের সাথে যোগসাজশে নবাবের কোষাগারে জমা করেন না বলে তাঁরা আলিবর্দির কান ভারী করতে লাগলেন।

একবার রঘুনাথ মারাঠা বর্গিদের সাথে উড়িষ্যা আর বিহারের রণাঙ্গনে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সময় মীরজাফরের চরেরা নবাবী কোষাগার থেকে বেশ কিছু রত্ন আর মোহরের থলি রঘুনাথের প্রাসাদের ভেতর এক শিবমন্দিরে গোপনে পুঁতে রেখে কোতোয়ালের লোকজনদের খবর দিয়ে দেয়।

মারাঠা বর্গিদের সাথে সেই যুদ্ধে তাদের রাজ্যের সীমানার বাইরে তাড়িয়ে ফিরে আসতে রঘুনাথের বেশ দেরি হয়ে যায়। এই দেখে মীরজাফর রটিয়ে দেয় যে রঘুনাথ যুদ্ধে হেরে পালিয়ে গেছেন এবং শিবমন্দিরে লুকিয়ে রাখা এই ধন-ভাণ্ডার আসলে মারাঠাদের কাছে যুদ্ধে হারবার জন্য রঘুনাথের নেওয়া ঘুষ ।

এই রটনা অসুস্থ বৃদ্ধ নবাব আলিবর্দির কানে আসামাত্র তিনি ক্রোধে অন্ধ হয়ে নির্দোষ রঘুনাথ এবং চন্দ্রনাথ দু’জনকেই কেল্লার জেলে বন্দি করে কাজীর বিচারের আদেশ দিলেন।

কাজীর দল যথারীতি দুই ভাইকে প্রাণদণ্ড দিলেন। নবাব সেইসময়ে খুব অসুস্থ, তাঁর অনুমতি পেতে বেশ দেরি হল। ততদিনে রমজান শুরু হয়ে গেছে। কাজীরা স্থির করলেন ঈদ পরব চুকলেই তার পরদিন সকালেই দুই ভাইয়ের শাস্তি কার্যকরী করা হবে।

তাঁদের ছোটোভাই রুদ্রনাথকে তাঁর তিব্বতি তান্ত্রিক গুরু আদেশ দিলেন যে এই বিচারের প্রহসন তাঁর ওপরও নেমে আসা শুধু সময়ের অপেক্ষা। তাই এখন তাঁর উচিত জঙ্গলে আত্মগোপন করে ঝটিকা বাহিনীর সাহায্যে দুই ভাইকে নবাবের কারাগার থেকে মুক্ত করবার ছক তৈরি করা।

রুদ্রনাথ ঝটিকা বাহিনীর মধ্যে গুপ্তচরের কাজে দক্ষ এমন সেনাদের থেকে বাছা-বাছা দশজনকে সামু আর দামু নামে দুই কুশলী সেনানায়কের নেতৃত্বে পাঠিয়ে দেন কেল্লায়। সেই সময়ের উচ্চশ্রেণীর হিন্দু রাজবন্দীদের প্রাপ্য সুবিধা অনুযায়ী পুরোহিত, নাপিত, রাঁধুনি, বৈদ্য এই সব পরিচয়ে ঝটিকা বাহিনীর লোকেরা সেইখানে সর্বক্ষণ থাকতে পায়। এদের আসল কাজ হল কেল্লার ভেতরে পাহারার আর পালাবার ফাঁকফোকরের সুলুকসন্ধান করা।

ঈদের পরের দিন সকালেই যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে সেই খবর আর দুর্গের এক দেওয়ালে একটা পাথর চাপা দেওয়া ফাঁক ছাড়া প্রহরীদের দুর্বলতার কোনো খবর তারা দিতে পারেনি।

রমজান শেষ হয়ে আসছে, আর রুদ্রনাথের কপালে ভাঁজ বেড়ে চলেছে। রমজানের আগের দিন সূর্য ডুবে আসছে, এমন সময় সামু-দামুর চরেরা একটা দারুণ খবর আনলো। দুর্গের বড় ফটকের ঠিক বাইরে এক সালঙ্কারা অপরূপ সুন্দরী মধ্যবয়স্কা মহিলা বাঁকে করে বেশ কয়েক জালা ঘোল নিয়ে এসে খুব সস্তায় বিক্রি করছেন। ঈদের বাজার সেরে রমজানের উপবাস ক্লান্ত সেপাইয়ের দল সেই ঘোল খেয়ে আরো খাবার জন্য ভিড় করে আছে।

সন্ধের অন্ধকার সবে নেমেছে। কেল্লার ফটকে একটা টিমটিমে লণ্ঠনের আলো কোনোরকমে জ্বলছে। সামুর খেয়াল হলো ফটকের সেপাইদের হাঁকডাক বন্ধ। ওদের একজন মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, বাকিরা গাছতলায় বসে ঢুলছে । এমন সময় কেল্লার ভেতরে, সামু দামুর লোক যারা রঘুনাথদের সেবা করছে, তারা ঘুঘুর আওয়াজে সাঙ্কেতিক ডাকে বলল, “এখানে নিদালী নেমেছে। ভাগ্যিস আমরা গোপিনীর ঘোল খেতে গিয়েও খাইনি।"

নিকষ কালো রাতের অন্ধকারের চাদর আর পুরো কেল্লার সব প্রহরীদের নিদালীর কবলে পড়ার সুযোগ নিয়ে, কেল্লার কারাগার থেকে বেরিয়ে এলেন রঘুনাথ আর চন্দ্রনাথ। তাঁদের আগে- পিছে ঝটিকাবাহিনির বেষ্টনী। দুর্গের পেছনের দিকের দেওয়ালে, এক জায়গায় পাথরচাপা দিয়ে লুকানো মানুষপ্রমাণ গর্তের কথা তাঁর ঝটিকা বাহিনীর নজরে আগে থেকে জানা ছিল। তাঁরা সেই জায়গা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দ্রুত পদক্ষেপে গঙ্গাপারের অরণ্যের দিকে চলে গেলেন।

নদীর এপারে তাঁদের আর একটি প্রাসাদের ঘোড়াশাল থেকে আনা চারটে কালো রঙের শিক্ষিত আরবি ঘোড়া রঘুনাথ চন্দ্রনাথ, সামু আর দামুকে নিয়ে চলল রাঢ় বাংলার দিকে। সকাল হবার আগে রুদ্রনাথ আর তাঁর ছ’জন অশ্বারোহী দেহরক্ষীর বাহিনীও তাঁদের সাথে যোগদান করলেন।

সকাল হতেই তাঁরা গেরুয়া বসনে জটাজুটধারী সাধুর বেশ ধরে এগিয়ে চললেন জঙ্গলের পথ ধরে। কেউ তাঁদের চিনে ফেলতে পারে, এইকারণে তাঁরা গ্রামগুলো এড়িয়ে চললেন।

এইভাবে চারদিন চলবার পর, তাঁরা এক সন্ধেয় খুব ক্লান্ত হয়ে এক গাছতলায় এসে আশ্রয় নিলেন। তাঁদের দেহরক্ষীর বাহিনী জানালো, পথে সব গ্রামেই মারাঠাদের দল খাদ্যশস্য, আনাজ জোর করে লুঠ করে নিয়ে গেছে। তবে জঙ্গলে এক জায়গায় তাঁরা বেশ কিছু বিরাট বড়-বড় মেটে আলু পেয়েছেন।

সামু আর দামু একটু পরে এসে জানালো, তাঁরা আজ যেখানে বিশ্রাম করছেন তার কাছেই আছে একটা খুব বড়ো দীঘি। এইখানে একসময় একটা গ্রাম ছিল বলে মনে হচ্ছে। তারা দু’জনে কিছু পরিত্যক্ত কুটির দেখেছে। কাল সকালের আলোতে ব্যাপারটা আরও খোলসা হবে।

মেটে আলু-পোড়া দিয়ে কোনোরকমে আধপেটা খেয়ে তিন ভাই শুয়ে পড়লেন গাছের তলায়। তাঁর দুই ভাই ঘুমিয়ে পড়লেও রঘুনাথের দু'চোখে ঘুম আসতেই চাইল না। চোখ বন্ধ করলেই তাঁর কানে আসছিল অসহায় গ্রামবাসীদের বুক ফাটা কান্না। তাদের একমাত্র সম্বল দু’মুঠো ধান মারাঠারা লুঠ করে নিয়ে যাচ্ছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কি কিছু করা যায় না?

ভোররাতে একসাথে ঘুম ভেঙ্গে তিন ভাই একের পর এক বলতে শুরু করলেন তাঁদের দেখা স্বপ্নের কথা। কী আশ্চর্য! তিন ভাইই দেখেছেন একই স্বপ্ন। বড় দীঘির দিকে পৌঁছে থমকে দাঁড়ালেন রঘুনাথ আর তাঁর পেছনে আসা দুই ভাই। দীঘির সামনে এসে তিনজনে মিলে যা দেখলেন তাতে তাঁদের গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠলো। স্বপ্নে তিনজনেই যা দেখেছেন, দীঘির পূর্বদিকে কোনাকুনি হয়ে সেটি সত্যি ভাসছে।"



ঠাকুমার কথা শেষ হবার আগেই তাঁর অতবড়ো ঘর খাঁটি ঘি আর বাদাম এলাচের গন্ধে ভরে উঠলো। দু’জন পরিচারিকা দুটি বিশাল বড় পিতলের থালাতে অনেক হলুদ রঙের নাড়ু্ নিয়ে এসেছে।

ঠাকুমা তাঁর মেহগনির পালঙ্কে এবার আধশোয়া থেকে সোজা হয়ে বসে ডাকলেন, 

“নন্দিতা, তোমার বন্ধু রিয়াকে ডাকো আর তোমরা সবাই এসো। নাও রিয়া, এ হল আমাদের বাড়ির দুর্গাপুজোতে বোধনের দিনের নারায়ণশিলা পুজোর প্রসাদের মিষ্টি। এর নাম আনন্দনাড়ু্।"

এইসময় আর এক পরিচারিকা ঠাকুমাকে চাপা স্বরে বললে, "রানিমা, গুরুজি লামা ওয়াংচুকবড়নালার সিং-দরজার কাছাকাছি চলে এসেছেন।”

এই বয়েসেও অশীতিপর ঠাকুমা, তাঁর মেহগনির খাট থেকে দ্রুতপদে নেমে বললেন,

“রিয়া, আমার গল্প শেষ হয়নি, বাকিটা কাল শোনাবো। এই বাড়ির দুর্গাপুজোতে নেপাল থেকে আমাদের কুলগুরু নিজে আসেন তন্ত্রধারী হয়ে। উনি একজন তিব্বতি লামা। আমায় এখন তাঁকে বরণ করতে নাট মন্দিরে যেতে হবে।"

নন্দিতা আর রিয়া কারশিয়াং-এ খুব ছোটো থেকে একটা বোর্ডিং স্কুলে একসাথে পড়ে। নন্দিতার মুখে অনেকবার তাদের বাড়ির দুর্গাপুজোর গল্প শুনেছে। এইবার নন্দিতার বিশেষ অনুরোধে রিয়ার মা-বাবা রাজি হয়েছেন তাকে এখানে আসতে দিতে।

“তিব্বতি লামা সেই নেপাল থেকে আসেন পুজো করতে? নন্দিতা তুই এই কথাটা বলিসনি তো আমায়? আচ্ছা উনি যে গল্পটা বলছিলেন তাতেও তো এক তিব্বতি গুরুর কথা ছিল।”

ছাদে যাবার সিঁড়ির মুখে এসে, নন্দিতা ঘাড় ঘুরিয়ে বলে,

"সেইটাতো আমাদের বংশের ইতিহাস।"

রিয়া বলে, “বাপরে! তুই তাহলে এক ঐতিহাসিক রাজবংশের রাজকন্যে।"

নন্দিতা ঘাড় নাড়ে,

"নাঃ রে! আমরা সবাই এখন সমান। চল ছাদে যাই। কাল রাতে আসার সময়, তুই অনেক কিছু দেখতে পাসনি।"

ছাদ থেকে মেটে-লাল রঙের দুর্গা দালান, নাট মন্দির, সিংহদুয়ার আর তার পাশে রাখা বিশাল কামান সব কিছু যেন রিয়াকে পেছনে টানছিল, সেই ঐতিহাসিক ব্রিটিশ পূর্ব শাসনকালের সময়ের দিকে।

একটা বেশ চওড়া নালা, পুরো রাজবাড়িকে ঘিরে আছে। নালা পার হবার জন্য একটা বড় সেতু আর তার দু'পাশে দুটো চাকা লাগানো আকাশের দিকে মুখ করা কামান। নালার একটু পরে, সিংহ- দুয়ারের সাথে লাগোয়া তিন চার মানুষসমান উঁচু প্রাকার। সেই প্রাকারে মাঝে মাঝে ফাঁক করে দেওয়া আছে।

রিয়া ওই দিকে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে আছে দেখে নন্দিতা বলে, 

 “এই চওড়া নালাটা এই গড়ের পরিখা। ঠাকুমার মুখে শুনেছি এক সময়ে এই পরিখার নালাতে অনেক কুমির ছিল।"

“কুমির থাকতো?”

“শত্রুসেনা যদি দুর্গের প্রাকার বা সিংদরওয়াজা পার করে এই পরিখার সেতু পার হতে চাইত, তারা সেতুর মাঝে এলেই কামানের গোলায় সেতু ভেঙ্গে যেত। যারা বেঁচে যেত তারা কুমিরের শিকার হতো।

গুপ্তধনের লোভে ডাকাত দলের পরপর দু’বারের আক্রমণকে দুর্গের সেনারা এভাবেই শেষ করে দিয়েছিল। ঠাকুমার মুখে এই গল্প আমরা শুনেছি।"

রিয়া বলে, “ইস! তোমাদের বংশের ঐতিহাসিক গল্পটা কী দারুণ বলছিলেন! একদম জমাটি মুহূর্তে আনন্দ নাড়ুর থালাগুলো নিয়ে না এলে গল্পটা শুনে নিতে পারতাম। উনি আজ আবার কখন ডাকবেন?”

নন্দিতা হেসে বলে, 

“তাঁর মুখে শুনতে চাইলে তোকে দশমীর পরদিন অবধি অপেক্ষা করতে হবে। আর যদি আমার মুখে শুনতে চাস তাহলে দুপুরে খাবার পর আমরা বসবো ছাদের কোণে আমার ঘরে।”

রিয়া অবাক হয়ে বলে, 

“ওই সেতুর ওপর এখন মনে হচ্ছে অনেক লোকজন আসছে!”

নন্দিতা সেদিকে চেয়ে বলে, 

“আমাদের গুরুদেব আসছেন শিষ্যদের নিয়ে। ঠিক মাঝখানে, খয়েরী লাল রঙের বিশাল ছাতার নিচে, মাথা কামানো, পরনে খয়েরী রঙের আলখাল্লা, টকটকে ফর্সা রঙ, উনিই হলেন কুলগুরু। ওঁকে ঘিরে আছেন ওঁর শিষ্যেরা। ওঁর পেছনে রয়েছেন গুম্ফাতে যে রকম গুমগুম করে ঢোল মতো বাজে সেই বাজনদারেরা। তিনদিনের পুজোতে তালপত্রে লেখা প্রাচীন পুঁথি থেকে মন্ত্রোচ্চারণ করবেন ওঁরা, নাটমন্দির গমগম করবে সেই সব শব্দে।"

রিয়া বলে, “তাহলে এখানের দুর্গাপুজোতে ঢাক বাজবে না?”

নন্দিতা বলে, 

“নিশ্চয় বাজবে। ঢাকি, সানাই নিয়ে সে প্রায় পঞ্চাশ জনের দল। আজ বোধনের সময় থেকে সেসব বাজবে দশমীর দিন অবধি। কিন্তু সন্ধিপুজোর সময় আর প্রতিদিন সন্ধ্যারতির আগে গুম্ফার ওই ঢোল ধুম-ধুম আওয়াজ করে বাজবে।"

“বেশ জমে উঠবে তাহলে তোদের এই পুজো!"

“হ্যাঁ। এই বাড়ি এখন গমগম করবে। বাবারা ছ’ভাই, চার পিসি। পিসতুতো, খুড়তুতো, মামাতো ভাইবোন মিলে আমরা প্রায় সত্তরজন। নিচের খাবারঘরের দালানে একসাথে সবাই মিলে খাওয়াদাওয়া, হৈ-হৈ, মজা, ফুর্তি চলতেই থাকবে। সপ্তমীর সন্ধেতে যাত্রা, অষ্টমীর বিকেলে পুতুল নাচ, আর নবমীর বিজয় উৎসবের দিনে মারাঠিপাড়ার লোকেদের ছোরা আর তরোয়ালের খেলা আর আমাদের লাঠিয়ালদের লাঠিখেলা এইসবে জমে থাকে। সেদিন দরিদ্রনারায়ণ উৎসব থাকায় আশেপাশের সব গ্রাম থেকে প্রজারা এসে ভিড় করে।"

রিয়া ওকে হাত থামিয়ে দিয়ে বলে, 

 “থাম, থাম একটু। এখানে মারাঠি আবার কোথা থেকে এল? আর বিজয় উৎসবই বা কী? কার বিজয়? কাল শুনছিলাম, এই অঞ্চলের সব গ্রামের লোকেরাই তোদের প্রজা ছিল। তা মারাঠিরা কী করে তোদের প্রজা হল?”

“ সে অনেক কথা। দুপুরে খাবারের পর শুনিস। ঠাকুমার সেই শেষ না করা কাহিনীটা শুনলেই মারাঠাদের কথা বুঝতে পারবি।”

নীচে দোতলার ঘরে বিরাট কলরব শুনে নন্দিতা বলে, 

“পিসিরা সবাই এসে গেছে মনে হয়। এখুনি আমার ডাক পড়বে। আমি যাচ্ছি। তোর জন্য চা পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমার এক সই ছন্দা, সে নিয়ে আসবে।"

ছন্দা এক বিরাট ট্রেতে চা নিয়ে এসে, রিয়াকে ছাদের এককোণে নন্দিতার ঘরের দিকে আসবার কথা বললে। সেদিকে যাবার সময়, রিয়ার চোখে পড়ে এক বিরাট দীঘি। এখান থেকে মনে হচ্ছে কে যেন অনেকগুলো পদ্মফুল আঁকা একটা বিরাট নীল চাদর শুকোতে দিয়েছে।

ছন্দা, রিয়ার দিকে চেয়ে বলে, 

“যে দীঘিটা দেখছো সেটা অনেক যুগ আগের। এই বংশের পূর্বপুরুষ রঘুনাথ ওই দীঘির জল থেকেই মা দুর্গাকে তুলে নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করেন।"

রিয়া বলে, 

“দীঘির পাড় থেকে অনেক দূরে জঙ্গলের মাঝে লাল রঙের একটি মন্দিরের চূড়া দেখা যাচ্ছে। কোন ঠাকুর আছে ওই মন্দিরে?"

ছন্দা বলে, “ওই মন্দির রঘুনাথেরও আগের সময়ের। জল থেকে তুলে আনবার পর ওইখানেই দেবী থাকতে চান। এখানে দুর্গাদালানে যে চতুর্ভুজা দুর্গাদেবী দেখা যাচ্ছে, সেটি ওই দেবীর মৃন্ময়ী রূপ।"

দু’জনের চা শেষ হতে না হতে নিচ থেকে আওয়াজ শুনে ছন্দা ফিরে এসে বলে, 

“রিয়া, তোমাকে সবাই দেখতে আর আলাপ করতে চাইছেন। এস এখন আমার সাথে।"


দুপুরের আহার সেরে ছাদে নন্দিতার ঘরে দুই বন্ধুতে বসেছে। রিয়ার দিকে তাকিয়ে নন্দিতা বলে, 

“ঠাকুমার গল্পে ছিল, তিনভাই রাতে একই স্বপ্ন দেখেছিল আর সকালে তারা সেই কথা বলতে বলতে এক দীঘির পাড়ে এসে থমকে দাঁড়িয়েছিল।"

রিয়া বলে, “ঠাকুমা বলছিলেন যে তাঁরা তিনজনই স্বপ্নে কিছু একটা দেখেছেন যা দীঘির মাঝখানে পূর্বদিকে কোনাকুনি হয়ে সে সত্যি সত্যি ভাসছে।"

নন্দিতা বলে, “গল্পের সেই দীঘি কিন্তু চোখের সামনে যে নীলপদ্মে ভরা দীঘিটা দেখতে পাচ্ছিস সেইটাই। তিনভাই একসাথে স্বপ্নে দেখেছিলেন যে চাঁপাফুলের মত গাত্রবর্ণের এক তেজস্বিনী নারী এক দীঘির জল থেকে আবির্ভূতা হয়ে বলছেন, “মারাঠি দস্যুরা যাতে আমার ক্ষতি না করতে পারে, সেইজন্য আমার মন্দিরের প্রধান পূজারী, আমাকে এই দীঘির জলে ছুড়ে ফেলে দেয়। তোরা আমায় এই দীঘির জল থেকে উঠিয়ে নিয়ে আমার মন্দিরে আমার পুজো কর। আমার আশীর্বাদে বর্গিরা তোদের সাথে যুদ্ধে হেরে পালিয়ে যাবে। দীঘির মাঝখানে একটা বড় নীলপদ্ম দেখতে পাবি। তার পেছনে, পুবদিকে কোনাকুনি হয়ে একটা বড়ো কাঠের তক্তা ভেসে আছে দেখতে পাবি। আমি আছি সেই কাঠের তক্তার ঠিক নিচে।"

সূর্য তখন সবেমাত্র উঠেছে। তাকে প্রণাম জানিয়ে তিনভাই পরের পর ঝাঁপ দিলেন। তার একটু আগেই সামু আর দামু পুরো এলাকাটা ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঘুরে এসে একটা হঠাৎ ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রাম আর পোড়ো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পেয়েছে ।

তাদের তিন সেনাপতিকে জলে ঝাঁপ দিতে দেখে তারাও লাফাতে যাচ্ছিল। রঘুনাথ দীঘির মাঝবরাবরের দিকে সাঁতরে যাবার সময় হাত তুলে নিষেধ করলেন। কাঠের পাটার কাছে এসে তিন ভাই এক-এক করে ডুব দিলেন।

তিনজনে অতি দক্ষ সাঁতারু কিন্তু পরের পর অনেকক্ষণ ধরে পালা করে ডুব দিয়েও কিছু পেলেন না। বেলা শেষের সময়ও প্রায় হয়ে এল। হতাশ হয়ে তাঁরা পাড়ের দিকে ফিরে যাওয়াই মনস্থ করলেন। রঘুনাথের কেমন জানি মনে হল, তিনি জলের অতল থেকে এক নারীকন্ঠের আহ্বান শুনছেন । কিন্তু এইবার তিনি সেই মাঝদীঘিতে ভাসন্ত কাঠের তক্তা ধরে সেইটা নিয়ে ডুব দেবার জন্য শরীরের সব বলপ্রয়োগ করলেন।

তিনি ডুব দিতেই দেখলেন সেই তক্তা, তাঁর হাত ফস্কে শেওলা মাটির একটা স্তুপে ধাক্কা দিল। সংগে-সংগে এক হলুদ বর্ণের ধাতুর চতুর্ভুজা দেবী প্রতিমা মাটির স্তূপ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলেন। তাঁর একটি হাত বরাভয় মুদ্রায় কিন্তু অন্য হাতগুলির মুষ্টি বন্ধ। এই জলের ভেতর অন্ধকারেও সেই মূর্তি থেকে মাঝেমাঝে হাল্কা নীল রঙের আভা বেরিয়ে আসছে। রঘুনাথ সাঁতরে সেদিকে এগোতেই দেখলেন সেই মূর্তি তাঁর হাতের মুঠোয় এসে ধরা দিয়েছে। এই মূর্তি হুবহু তাঁর কাল রাতের দেখা স্বপ্নের মূর্তি।

জল থেকে বেরিয়ে পাড়ে এসে বড়ো দাদার হাতে সোনারবরণ সেই মূর্তি দেখে, বাকি দু’ভাই চমকে উঠলেন। তাঁরাও কালকে রাতে হুবহু এই মূর্তি স্বপ্নে দেখেছিলেন। সামু আর দামুর মুখে পোড়ো মন্দিরের কথা শুনে তিন ভাই স্থির করলেন যে এই মূর্তিকে আপাততঃ সেখানেই রাখা হোক। তাদের এক অনুচর এসে জানালো যে ঈদের আগের দিন কেল্লার ফটকে যে মধ্যবয়স্কা সুন্দরী গোয়ালিনী ঘোল বিক্রি করছিলেন, তাঁর মুখের সাথে দেই দেবীমূর্তির মুখের হুবহু মিল আছে। কথা শুনে সবাই চমকে উঠলেন।

রাতে তিন ভাই স্বপ্নে আবার দেখেন, সদ্য পাওয়া সেই মূর্তি তাঁদেরকে বলছে, 

“এই আমার আবাসস্থল। আমি এখানেই থাকবো। এইখানেই আছে আমার বাকী আভরণ।"

পরদিন সকালে তিন ভাই আর সামু-দামুর পুরো দলবল অনেক খোঁজার পর জঙ্গলের মধ্যে একজায়গায় এক সুড়ঙ্গ খুঁজে পায় । সুড়ঙ্গের মুখ একটা বড় পাথর দিয়ে বন্ধ করা আছে। দিন গড়িয়ে সূর্য অস্তে গেলেন, কিন্তু সবাইয়ের সম্মিলিত চেষ্টাতেও সেই পাথরকে একচুল সরাতে পারা গেলো না।

বিফল মনোরথ হয়ে তাঁরা মন্দির প্রাঙ্গণে ফিরে আসতেই দেখেন যে তাঁর গুপ্তচরেরা বনপথে আসছে। তাদের পেছনে শিষ্য পরিবৃত স্বয়ং গুরুদেব, তাঁদের কুলপুরোহিত এবং গ্রামবাসীদের একটা দল আসছে।

রঘুনাথদের মুখে দীঘির জল থেকে দেবী উদ্ধারের কথা শুনে গুরুদেব গম্ভীর ও চিন্তিতমুখে বললেন, 

“সন্ধে হয়ে এসেছে। আমার ঝুলিতে পূজারতির সব সামগ্রী বার কর।"

আরতির দীপালোকে দেবীকে দর্শন করে গুরুদেব চমকে উঠলেন। আরতি শেষে, তিনি তিন ভাইকে ডেকে বললেন, 

“চতুর্ভুজা ঘোটকমুখী সিংহবাহিনী এই দেবী হচ্ছেন দেবী ভুবনেশ্বরী। ইনি দুর্গম নামক অসুরকে বধ করে দুর্গা নামে খ্যাত হন। আমার বিশ্বাস এঁর হাতের ধনুর্বাণ এবং অসি(তরোয়াল) ওই সুড়ঙ্গের মধ্যে থাকবার প্রবল সম্ভাবনা। আমি আজ সারারাত দেবী ভুবনেশ্বরীর ধ্যান আরাধনা করবো। উনি পূজার্চনায় সন্তুষ্ট না হলে সুড়ঙ্গের মুখের পাথর সরবে না। রঘুনাথ তুমি আমার পাশে বসে মন্ত্রোচ্চারণ করবে।”

এর আগেই তাঁর চরেরা মুর্শিদাবাদের খবর এনেছে। কেল্লার কারাগার থেকে তাঁদের মুক্ত হবার পরদিনই অসুস্থ আলিবর্দির মৃত্যু হয়। নবাবী সিংহাসন “চেহেল-এ-সুতুন”-এ সিরাজ অভিষিক্ত হলেও, নবাবের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে মীরজাফর এখন খুব ব্যস্ত।

রঘুনাথ বুঝে নিলেন যে মীরজাফরের কাছে এখন তাঁদের তিন ভাইকে সৈন্য পাঠিয়ে ধরে আনা অনর্থক, অন্যদিকে এখনকার এই জায়গাটিও অবস্থানের জন্য মন্দ নয়। এইসাথে এইখানের স্থানীয় অসহায় মানুষদের ওপর মারাঠি বর্গিদের অত্যাচার শুনে তাঁর মনে বারবার আসছিল যে তাঁর সমস্ত যুদ্ধশক্তি নিয়ে এদেরকে তিনি রক্ষা করবেন।

পরদিন সকালে তিন ভাই বা তাঁর অনুচরেরা সুড়ঙ্গের মুখে কোনো পাথর দেখতে পেলেন না। সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে তাঁরা ধনুর্বাণ, তরোয়াল এবং তালপাতায় দেবনাগরীতে লেখা দুটি পুঁথি উদ্ধার করে নিয়ে এলেন।

রঘুনাথদের গুরুদেব আর পুরোহিত পুঁথি পড়ে রঘুনাথকে বললেন যে এই পুঁথিদুটিতে দেবীর পূজার পদ্ধতি এবং সমস্ত মন্ত্র লেখা আছে। ঠিক হল যে মূর্তি শোধন এবং দেবী মন্দিরের সংস্কারের পর চৈত্র মাসেই দেবীর প্রতিষ্ঠা উৎসব করা হবে, ততদিন মন্দিরের পাশে বেলতলায় দেবীর নিত্যপুজা হবে।

রঘুনাথ এখন এইখানেই অবস্থান করতে চান, এই কথা শুনে সুদুর মুর্শিদাবাদ থেকে তাঁর সমস্ত প্রজারা আসতে শুরু করল। কিছুদিনের মধ্যেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত একদা বর্ধিষ্ণু গ্রামটি আবার ছন্দে ফিরে এল।

রঘুনাথদের কথা বিষ্ণুপুরের মল্লরাজের কানে গেল। রঘুনাথের সুনিপুণ সেনাপরিচালনার কথা তিনি জানতেন। রাজসভায় ডেকে তাঁদেরকে রাজমন্ত্রী নিযুক্ত করলেন। তাঁদের তিনি দশটি গ্রাম দান করলেন এবং বর্গি আক্রমণ থেকে তাঁর রাজ্যকে রক্ষার ভার দিলেন।

রঘুনাথের পরামর্শে রাজ্যের সীমানায় তালগাছের চাইতেও উঁচু প্রহরী চৌকি তৈরি হল। চৌকি থেকে দূরে মারাঠাদের অশ্বারোহী দেখা গেলেই প্রহরীরা চারদিকে সঙ্কেত পাঠিয়ে সব গ্রামকে সতর্ক করে দিত। ঝটিকা বাহিনী গ্রামে-গ্রামে গিয়ে যুবকদের তীর-ধনুক, বল্লম, তরোয়াল, লাঠি আর হাতাহাতি সমরের সব কায়দা আর রণপা নিয়ে দ্রুত চলা শিখিয়ে প্রতিরোধ বাহিনী তৈরি করল। প্রতিরোধ বাহিনী আর প্রহরী চৌকির যুগলবন্দিতে রসদ লুঠ করতে গিয়ে মারাঠা বাহিনী অনেক জায়গা থেকেই শূন্য হাতে ফিরে আসতে বাধ্য হল। খাদ্যের অভাবে এবার বর্গিরা দাঁইহাটে(বর্ধমান জেলার) ভাস্কর পণ্ডিতের শিবিরে গিয়ে নালিশ জানাল।

রঘুনাথের গুপ্তচরেরা খবর আনল যে বর্ষার পরে পরেই ভাস্কর পণ্ডিত এক বিশাল বর্গিবাহিনী পাঠাচ্ছে বিষ্ণুপুর মহারাজার কাছে চৌথ আদায় এবং অবাধে লুঠপাট করতে। মাত্র কয়েকমাস আগে রাজমহল পাহাড়ের তেলিয়াগড় গিরিসঙ্কটের কাছে সেই সময়ের নবাব বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি রঘুনাথের কাছে ভাস্কর পণ্ডিত পরাজিত হয়ে কোনোরকমে পালিয়ে বেঁচেছিলেন।

রসদ লুঠ করতে ব্যর্থ বর্গিদের শক্তিশালী বাহিনী যে এইদিকে একবার এসে বেশ জোর একটা আঘাত হানবে তা বিচক্ষণ রঘুনাথ আগেই আন্দাজ করেছিলেন। তাঁর সেনাবাহিনী কীভাবে আক্রমণ প্রতিরোধ করে মোক্ষম আঘাত হানবে, সে নিয়ে তিনি তাঁর তিব্বতি গুরু এবং দুই ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে, সেই অনুযায়ী তৈরি হচ্ছিলেন।

মারাঠি বর্গিরা ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঝড়ের গতিতে আক্রমণ করে আর এইখানেই তাঁর দুর্বলতা। তাঁর সেনারা মূলতঃ পদাতিক। আর্থিক কারণে, মল্লরাজের অশ্বারোহী বা গোলন্দাজ বাহিনী, মারাঠিদের তুলনায় সংখ্যায় অনেকই কম। মারাঠিদের আক্রমণের গতির সাথে কীভাবে মোকাবিলা করা যায় সেই নিয়ে রঘুনাথ এবং রুদ্রনাথ খুবই চিন্তিত ছিলেন। এমন সময় সামু আর দামু এসে জানালো যে মুখ্য কর্মকার একটি যন্ত্র বানিয়ে অস্ত্রাগারে তাঁদের প্রতীক্ষা করছে।

মুখ্য কর্মকার একটি সরু নলের মত যন্ত্র নিয়ে এসেছে। যন্ত্রটি আর তার গোলাগুলো এতটাই হাল্কা যে একজন গোলন্দাজ একাই এই কামান এবং তার গোলাগুলো বয়ে নিয়ে যেতে পারে।

রঘুনাথের কাছে অনুমতি নিয়ে মুখ্য কর্মকার দ্রুত ওই যন্ত্রের পেটে কয়েকটা গোলা ঠেসে দিয়ে নিজের কাঁধে যন্ত্রটি চেপে ধরে তার তলায় একটা কলে চাপ দিতেই প্রচণ্ড শব্দে গোলা গিয়ে লাগলো অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তুতে। কর্মকারের যন্ত্রের কাজ শেষ হতে না হতেই তার সহকারীর যন্ত্রে আবার গোলা বর্ষণ হল।

রঘুনাথ আর রুদ্রনাথ যন্ত্রের কর্মক্ষমতা দেখে শুধু বিস্মিতই হলেন না, কুশলী সমরনায়কের অভিজ্ঞতা থেকে চট করে বুঝে নিলেন এই যুদ্ধে তাঁদের এই যন্ত্র আসলে ছোটো পাল্লার হাল্কা কামান। দুর্গম জায়গাতেও এগুলো সহজেই সেনারা নিজের নিজের কাঁধে করে নিয়ে যেতে পারবে।

রঘুনাথ মুখ্য কর্মকারকে আদেশ দিলেন যত শীঘ্র সম্ভব এগুলো গোলাসমেত অনেক বেশি সংখ্যায় বানিয়ে ফেলতে হবে আর সেই সাথে সামু আর দামুকে বললেন কর্মকারের কামারশালায় দক্ষ সেনাদের লাগাতে যাতে তারা এই নতুন অস্ত্র তৈরির সাথে সাথে চালানোও শিখে ফেলতে পারে।

মাসখানেক পরে সেই রাতটা আশ্বিনের প্রথম অমাবস্যা। রাজ্যের কিছু প্রহরীচৌকি থেকে খবর এল যে তারা রাত্রে মুন্ডেশ্বরী নদীর চরে অনেক কালো রঙের ঘোড়া আর লোকজনের আনাগোনা দেখেছে। গুপ্তচরেরা খবর আনল, প্রায় হাজার অশ্বারোহীর একটি বর্গি সেনার দল মুন্ডেশ্বরী নদী পার করে চরের জঙ্গলে আত্মগোপন করে আছে। সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত নিজে এসেছেন এই দলের সাথে। তাদের সাথে দুটি কামানের গাড়ির চাকা কাদায় আটকে যাওয়ায় তারা সেটাকে তুলে আনতে ব্যস্ত।

রঘুনাথ বুঝে নিলেন যে এইবার ভাস্কর পণ্ডিতের দল রাজধানী বিষ্ণুপুরকে কামান দিয়ে আক্রমণ করে মল্লরাজ্য দখল করতে চাইছে। জয়পুরের জঙ্গল পেরিয়ে গেলেই আড়াবনি আর রঘুপুরের জঙ্গলের লাল মাটির শক্ত জমি। সেখান দিয়ে বিষ্ণুপুরের দিকে কামান নিয়ে যেতে অসুবিধে নেই আর এই জঙ্গলের পরেই কামানের পাল্লার মধ্যে রাজধানী শহর এসে পড়বে। রঘুনাথ তার গুরুদেব আর ভাইদের সাথে পরামর্শ করে আড়াবনির শাল জঙ্গলের কাছেই বর্গিদের সাথে লড়াইয়ের সমরপরিকল্পনা করলেন।

আড়াবনির শাল জঙ্গলে শালগাছের মাঝে অনেক লম্বা তালগাছও আছে। প্রতিটি তালগাছে দু- তিনজন সেনা থাকবে সদ্য আবিষ্কৃত হাল্কা কামান নিয়ে অতর্কিতে গোলাবর্ষণের জন্য। এছাড়াও তাঁদেরকে সহায়তা করবে নিচে অশ্বারোহী সেনারা যারা তীর-ধনুক আর তরোয়াল দুটোতেই সমান দক্ষ। তবে তাদের সাথে থাকবে সাধারণ তীরের সাথে সাথে বেশ কিছু অন্য রকমের তীর। এদের মাথায় তীরের শলাকার সাথে থাকবে তিব্বতি গুরুর তৈরি বিশেষ ধরনের আগুনে বোমা। এছাড়াও শুরুতেই থাকবে এক বিশেষ যুদ্ধকৌশল যার কাছে শুরুতেই ভাস্কর পণ্ডিতের দলবল নাস্তানাবুদ হয়ে গেল।

আশ্বিনের অমাবস্যা কেটে যাবার পর আজ সপ্তমী তিথি। আড়াবনি জঙ্গলের চৌকি থেকে সঙ্কেত এলো, গভীর রাতে চাঁদের অস্পষ্ট আলোতে দেখা গেছে যে কামানের গাড়িসমেত বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী জয়পুরের জঙ্গলের প্রায় শেষ সীমানায়। জংগলের মাঝে গ্রামগুলোতে তারা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আগুনের শিখাতে বর্গিবাহিনীকে আরও স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে।

জয়পুরের পর আড়াবনির জঙ্গলের মধ্যে কাঠুরিয়াদের গরুর গাড়ি আসা যাওয়ার ফলে তৈরি শক্ত লালমাটির রাস্তাতেই যে এরা বিষ্ণুপুরের দিকে এগোবে, সে নিয়ে রঘুনাথ নিশ্চিত ছিলেন। এই জঙ্গলে রঘুনাথের সৈন্যবাহিনীর যার যেখানে থাকবার তারা সেখানে মোতায়েন আগের থেকেই ছিল।

গুরুর এবং দেবী ভুবনেশ্বরীর আশীর্বাদ নিয়ে তিন ভাইই সেনাদের পাশে থেকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য রণাঙ্গনে যাত্রা করলেন। সেদিন আশ্বিন মাসের সপ্তমী তিথি । তাঁদের তিনভাইয়ের অনেক আগে-আগে চলল জ্বালানি কাঠ আর জঙ্গলের কাটা ঘাসে বোঝাই প্রায় একশোর ওপর গরুর গাড়ি।

মুন্ডেশ্বরী নদী পার করে বিষ্ণুপুর রাজ্যে ঢুকে কোথাও রাজার পক্ষ থেকে কোনো বাধা না পেয়ে ভাস্কর 
পণ্ডিতের দল হৈ- হৈ করতে করতে এগিয়ে চলেছে আড়াবনির জঙ্গুলে রাস্তায়। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে তারা দেখে, উল্টোদিক থেকে একসাথে অনেক ছই লাগানো কাঠবোঝাই গরুর গাড়ি তাদের মুখোমুখি হচ্ছে।

বর্গিদের অশ্বারোহীরা তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে, “বর্গিবাহিনী আসছে এই পথে। তোরা ভালো চাস তো এখুনি সবাই রাস্তা থেকে গাড়ীগুলো সরিয়ে নে।"

“ বর্গি? ওরে বাবা! আমরা গরীব কাঠুরিয়ারা,কাঠ নিয়ে হাটে যাচ্ছিলাম। আমাদের দোষ নিও না। আমরা এখনি রাস্তা থেকে গাড়িগুলো সরিয়ে নিচ্ছি, আমাদের প্রাণে মেরো না!” 

বর্গির দল আসছে শুনে বাকী গাড়িগুলোর গাড়োয়ানদের মধ্যে হুলুস্থুলু পড়ে গেল। গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে সবাই রাস্তা থেকে গাড়ীগুলো যে যেদিকে পারে সেদিকে সরিয়ে নিল।

এই সব দেখে বর্গিরা হাসাহাসি করতে শুরু করে দিলে। আর সেই হাসাহাসির মধ্যে ওরা কেউ লক্ষ্যই করল না যে গাড়িগুলো জঙ্গলের মধ্যে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল। সবকটা ছই লাগানো গাড়ির মুখ এখন পেছন দিকে ঘোরানো আর প্রতিটা থেকে বেরিয়ে আসছে তিন চারটে ধাতব নল আর সেগুলো তাক করে লাগানো আছে বর্গিদের দিকে।

বর্গিদের হাসাহাসির মধ্যেই, গরুর গাড়িগুলো থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়ে গেল। সেই সাথে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা তীরন্দাজেরা, তাদের তীরের আগায় লাগানো বোমের লম্বা সলতেয় আগুন লাগিয়ে, সেগুলো ধনুক থেকে ছেড়ে দিল। ঘোড়ার দল এই অনভ্যস্ত আওয়াজ আর আলোতে ভয় পেয়ে গেল। তার ওপর গুলিতে কিছু বর্গি সেনা আর তাঁদের ঘোড়া আহত হতেই সব ঘোড়াগুলো একসাথে বিদ্রোহ করল। তারা চিৎকার করে পিছু হটা শুরু করতেই, একে-অন্যের গায়ে পড়ে এক চরম হুটোপাটির অবস্থা শুরু হল। রঘুনাথের তীরন্দাজেরা এবার বর্ষাকালের বৃষ্টির মতো তীর ছোঁড়া শুরু করতেই বর্গি সেনারা অনেকেই ঘায়েল হল।

কিছু একটা হামলা হয়েছে আন্দাজ করে এই দলের পেছনে যে দলটা ছিল তাঁরা দ্রুত এগিয়ে এলো। কিন্তু শাল জঙ্গলের মাঝে- মাঝে থাকা তালগাছের মাথায় রঘুনাথের যে সেনারা ছিল, তারা এবার ছোট কামান থেকে গুলি আর ধনুক থেকে ছোড়া তীরবোমা ছেড়ে দিতেই সেই সেনাদের মধ্যেও হুলুস্থলু বেধে গেল আর সেই সুযোগ কাজে লাগাতে রঘুনাথের তীরন্দাজ আর অশ্বারোহীরা দেরি করল না।

বর্গিদের হতাহতের সংখ্যা বাড়তেই ভাস্কর পণ্ডিতের টনক নড়ে উঠল। রঘুনাথের সেনাবাহিনীর রণকৌশল বুঝে নিয়ে তিনি তার পদাতিকদের বনের রাস্তা ছেড়ে শালজঙ্গলের দিকে চুপি- চুপি এগিয়ে আক্রমণ করতে বললেন আর সেইসাথে গোলন্দাজদের হুকুম দিলেন সব ক'টা তালগাছের মাথায় গোলা ফেলতে। বর্গি সেনাদের অনুপ্রাণিত করতে নিজে তরোয়াল আর বল্লম হাতে এগিয়ে গেলেন সামনে থেকে নেতৃত্ব করতে।

শালজঙ্গলে শুরু হয়ে গেল দুই পক্ষের হাতাহাতি লড়াই। তিব্বতি গুরুর কাছে শেখা বিদ্যেয় রঘুনাথের সেনারা বর্গিদের অনেককে ঘায়েল করলেও নিজেদেরও হতাহতের সংখ্যা কম হল না। রঘুনাথ তীরবেগে তার অশ্বারোহীদের নিয়ে বর্গিদের কামানগুলো দখল করে নিলেন কিন্তু তখন তাঁকে বর্গিরা পুরো ঘিরে ধরেছে। অকুতোভয় রঘুনাথ এবং তার সেনারা “জয় মা ভুবনেশ্বরী” বলে বর্গিদের ওপর হামলা শুরু করে দিলেন। সেই সময় দেখা গেল ঘোড়ার পিঠে চড়ে এক তেজস্বিনী দেবী একহাতে খড়্গ আর অন্যহাতে বল্লম নিয়ে প্রবল বেগে এগিয়ে আসছেন আর সামনে যে বর্গিরা পড়ছে তাদের শিরশ্ছেদ করছেন কিম্বা বল্লম দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছেন। বর্গিরা সেই আক্রমণ দেখে ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেদিকে পারে সেদিকে পালাতে শুরু করলে। ভাস্কর 
পণ্ডিত সেই দেবীকে দেখে, তাঁকে প্রণাম করে দ্রুত রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। 

রঘুনাথ আর তিন ভাই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে দেখলেন যে এই দেবী আর রঘুনাথ দীঘি থেকে যে দেবীমূর্তি এনেছেন তা হুবহু এক। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে অস্ত্রত্যাগ করে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে মাথা তুলে তাঁরা তিনজনেই দেবীকে আর দেখতে পেলেন না।

রণাঙ্গন থেকে ফিরে তাঁরা প্রথমেই গেলেন গুরুর কাছে। তিব্বতি গুরু তাঁদের শরীরে যুদ্ধ ক্ষতের শুশ্রূষা করতে করতে বললেন স্বয়ং দেবী ভুবনেশ্বরী এসে বর্গি নিধন করেছেন এবং যে সময়ে রণাঙ্গনে তাঁর আবির্ভাব হয়েছিল সেটি হল অষ্টমী এবং নবমী তিথির সন্ধিক্ষণ।

বিষ্ণুপুর মহারাজ মল্লদেব তাঁদের এই জয়ে খুশি হয়ে রঘুনাথকে রাজা উপাধি দিয়ে তামার সনদ দিলেন। তাঁদেরকে আরো দশটি গ্রাম দিয়ে গড় বানানোর এবং কামান বসানোর অনুমতি দিলেন। গড় তৈরি শেষ হতে লোকমুখে এই গ্রামের নাম হয়ে গেল গড়বাড়ি আর সেই থেকে হয়ে আসছে এইখানে দুর্গাপুজো। যে মারাঠারা যুদ্ধবন্দী হয়েছিল তারা আর না ফিরে যেতে চাওয়ায় এইখানেই থেকে যায়। তাদের পাড়ার নাম মারাঠাপাড়া বা লোকমুখে মাঠাপাড়া। নবমীর দিন রাজা রঘুনাথ মারাঠা বর্গিদের পরাস্ত করেছিলেন বলে আজও দুর্গানবমীর দিন বিজয়োৎসব পালিত হয়। মারাঠাপাড়ার লোকদের সাথে আজও সেই যুদ্ধ খেলা হয়।"

রিয়া বলে, “আর সেই দীঘি থেকে পাওয়া দেবীমূর্তি? সেই মূর্তি তো ধাতুর। সেই মূর্তি এখন কোথায়?"

“দুর্গাদালানে যে দুর্গামূর্তি দেখতে পাওয়া যাবে তিনি মৃন্ময়ী মা। শুদ্ধ মাটি দিয়ে বানানো এই দুর্গামূর্তি ধাতুর চতুর্ভুজা মূর্তিরই হুবহু অনুরূপ। ধাতুর মূর্তিটি আছে এখান থেকে সামান্য দূরে শালজঙ্গলে ঘেরা পুরানো মন্দিরে। একই সাথে দুই মূর্তিরই পুজো হয় তবে সন্ধিক্ষণে রাজ-রক্ত দিয়ে পুজো হয় জঙ্গল মহালের মন্দিরে”।

রিয়া অবাক হয়ে বলে, “তার মানে? কার রক্ত?”

নন্দিতা হাসতে হাসতে বলে,

“সন্ধিপুজোতে বাবা, কাকা, জ্যাঠা এরা সবাই আঙ্গুল চিরে রক্ত দেন অকাতরে। একসময়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা বর্গি আক্রমণ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে অনেক রক্ত দিয়েছিলেন।"

সূর্য অস্ত যাচ্ছেন দূরের নীল পদ্মদীঘির জলে। অন্যদিকে জঙ্গলমহালে ইতিহাস-প্রাচীন দুর্গামন্দিরে আর গড়বাড়ির নাটমন্দিরে একে একে ঝাড়বাতিগুলো জ্বলে উঠছে। ঢাক, সানাই আর তিব্বতি গোম্ফার ঢোল বেজে উঠতেই নন্দিতা বলে,

"চল রিয়া, বিল্ববরণ শুরু হবে। এরপর রানিমা আমাদের সবাইকে মুর্শিদাবাদ থেকে আসা তাঁতিদের হাতে এখানে বোনা আর তাঁর নিজের হাতে শুকানো শিউলি ফুল দিয়ে রঙ করা সিল্ক শাড়ী আমাদের সবাইকে দেবেন।"

রিয়া অবাক হয়, “রানিমা কে?”

নন্দিতা বলে, “কুচবিহার রাজবংশের প্রাক্তন রাজকুমারী, আমাদের ঠাকুমা এখন রানিমা। পুজোর ক'টা দিন আমরা সবাই তাঁকে রানিমা বলি আর তিনি দেরি একদম বরদাস্ত করেন না।"

হাসতে হাসতে রিয়া বলে, 

“জো আজ্ঞা, ইওর হাইনেস প্রিন্সেস নন্দিতা!"


(এটি একটি গল্প- কাহিনী মাত্র যার সাথে ইতিহাসের কোনো যোগাযোগ নেই। এর কোনো চরিত্রের সাথে, কোনো রাজবংশের লোককথার সাথে সাদৃশ্য থাকলে সেটি কাকতালীয় মাত্র।) 



অলঙ্করণ : সুকান্ত মণ্ডল

গল্পের ঝুলি : হারানো স্বপ্নের রূপকথা : বিভাবসু দে



সে অনেক বছর আগেকার কথা। সাত সমুদ্র, তেরো নদী আর তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে ছিল একটা দেশ, নাম অচিনপুর। ভারী সুন্দর সেই দেশ। মাঠে মাঠে সবুজ ঘাস, গ্রামের ক্ষেতে ক্ষেতে সোনালী ধানের ঢেউ, বহুদূরে চোখ ফেরালে দেখা যেত সোনালী রূপোলি পাহাড় আর কাশবন। শরৎকালে সেই কাশের বনে যেন সাদা মেঘ নেমে আসত আকাশ থেকে। অচিনপুরের গাছগুলোও সারা বছর ভরে থাকত গাঢ় সবুজ পাতায় আর রস-টুসটুসে সব ফলে। ভারী সুন্দর একটা নদীও ছিল সেই দেশে। দেশের ঠিক মধ্যিখান দিয়ে বয়ে গিয়েছিল নদীটা, নাম ইরাবতী। সেই নদীর জল যে কী মিষ্টি আর ঠান্ডা, তা বলে বোঝানো যায় না। ঠিক যেন অমৃত !


অচিনপুরের রাজা তখন অচিন্ত্যনারায়ণ। তাঁর রাজত্বে সবাই ভীষণ সুখী। রাজা ভারী ভালো মানুষ। প্রজাদের নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন। তাঁর সুশাসনে কারও ঘরে কোনও দুঃখ-কষ্ট ছিল না, কোনও অভাব ছিল না। রাজার দরজা ছিল সবার জন্যে খোলা। রোজ সক্কাল সক্কাল দরবারে বসে প্রজাদের সব কথা শুনতেন তিনি; যার যা সমস্যা নিজেই সমাধান করে দিতেন। এমনকি প্রয়োজনে প্রজাদের বাড়ি গিয়েও দেখতেন সবাই ভালো আছে কি-না।


এমন রাজা পেয়ে অচিনপুরে সবাই ধন্য ধন্য করত, দু'হাত তুলে আশীর্বাদ করত তাদের প্রিয় রাজাকে।


দেশের উত্তরদিকে যে সোনালী পাহাড় ছিল, তার ওপর ছিল রাজা অচিন্ত্যনারায়ণের রাজপ্রাসাদ। সেই প্রাসাদের কথা কী আর বলব...দেওয়ালগুলো তার সাতরঙা স্ফটিকে গড়া; সূর্যের আলো পড়লে মনে হত যেন পাহাড়ের ওপর রামধনু উঠেছে। পাহাড়ের নিচ থেকে শ্বেতপাথরের পালিশ করা সিঁড়ি সোজা উঠে গেছে প্রাসাদের সদর দুয়ার অব্দি। সেই দরজা দিনরাত খোলা থাকত, যার যখন দরকার সে তখনই আসত রাজার কাছে। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই ঠিক সামনে ছিল রাজার দরবার আর তার পেছনে দাসদাসীদের থাকবার ঘর। সেগুলো পেরিয়ে গেলে পড়ত অন্দরমহল, রানি পদ্মাবতী থাকতেন সেখানে আর থাকত রাজা-রানির নয়নের মণি, সাত রাজার ধন এক মাণিক, রাজপুত্র অনিন্দ্যকুমার।


অনিন্দ্যকুমার ভারী ভালো ছেলে। রাজা-রানি আর রাজ্যের সবাই যেমন ওকে ভালোবাসে, সে-ও তেমনি মা-বাবাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু একটাই সমস্যা, সে ঠিক আর পাঁচটা রাজকুমারের মতো ছিল না। ছোটবেলা থেকেই সে একটু অন্যরকম। অনিন্দ্যকুমার ভালোবাসত গান গাইতে, ছবি আঁকতে; যুদ্ধবিদ্যা, অস্ত্রচালনা শিখতে মোটেই ভালো লাগত না ওর। সে পাখিদের সঙ্গে খেলা করতে চাইত, চাইত সবুজ ঘাসের বুকে শুয়ে কবিতা লিখতে; রাজনীতির মারপ্যাঁচের পাঠে কিছুতেই মন বসত না তার। আকাশের ওই উড়ে উড়ে আসা মেঘের সঙ্গে কোন নাম-না-জানা কল্পনার রাজ্যে যেন ঘুরে ঘুরে বেড়াত ওর মন; কূটনীতির মোটা মোটা বই পড়তে একটুও ভাল্লাগতো না।


অনিন্দ্যর মন রাজা বুঝতেন, তবু ভাবতেন বাচ্চা ছেলে, হয়তো বড় হলে ঠিক বুঝে যাবে। হাজার হোক সে রাজপুত্র; যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি, তির-ধনুক চালানো না শিখলে চলবে কী করে ? অচিন্ত্যনারায়ণের পর ওকেই তো সামলাতে হবে অচিনপুরের প্রজাদের দায়িত্ব।


অনিন্দ্যও বুঝত বাবার মনের কথা। তিনি তো আর ভুল কিছু চাইছেন না; সে রাজার একমাত্র ছেলে, তার ওপর যে অনেক দায়িত্ব। সে যদি যোগ্য রাজা না হতে পারে তাহলে যে বাবা দুঃখ পাবে। অনিন্দ্য বড় ভালো ছেলে, বাবাকে বড় ভালোবাসত সে। চেষ্টা যে সে করত না তা নয়। বাবাকে খুশি করতে সে মুখ গুঁজে পড়ত সেইসব ইয়া মোটা মোটা কালো কালো অক্ষরে ঠাসা ছবি-ছাড়া বই, রোজ বিকেলে নিয়ম করে যুদ্ধের পাঠিও নিতে যেত, জোর করে মন বসাত রাজনীতির তর্কবিতর্কেও।


কিন্তু হায়, মন কী এত সহজে মানে! সকালবেলা যখন জানালায় ওই রঙিন পাখিগুলো এসে কিচিরমিচির জুড়ে দিত, অনিন্দ্য পড়া ভুলে তাকিয়ে থাকত ওদের দিকে। ওই দূরের মাঠে যখন রাখাল ছেলে বাঁশি বাজিয়ে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরত, অনিন্দ্য ভাবত সে-ও যদি সেই রাখাল ছেলের মতো হত! নীল আকাশে মেঘের ভেলা কখন যে ওর মনকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত সে টেরই পেত না; সামনে খোলা কূটনীতির ওই বিশাল বইটার পাতা আপনা-আপনি উল্টে যেত বাতাসে!


সময় আরও কিছুটা এগিয়ে গেল, অনিন্দ্যকুমারও বড় হয়ে উঠল। ওর স্কুলের পড়া শেষ, এবার রাজশিক্ষার কলেেজে যেতে হবে ওকে। রাজা ভাবলেন ছেলে বড় হয়ে গেছে, এখন আর আগের মতো উড়ু উড়ু মন নেই ওর। কিন্তু অনিন্দ্যর মনে তখন অন্য চিন্তা। সে ভাবছে স্কুলের শিক্ষা তো হয়েই গেল, এবার সে মনের মতো করে নিজের ভালোবাসার জিনিস করে বেড়াতে পারবে। ঠিক সেই আগের মতো সে খেলে বেড়াবে পাখিদের সঙ্গে, গান গাইবে, ছবি আঁকবে রূপোলি পাহাড়ের ঢালে বসে, কবিতা লিখে শোনাবে ওই যাযাবর মেঘেদের। এখন তো সে বড় হয়ে গেছে, আর চিন্তা কী!


তাই অনেক ভেবে বেশ সাহস করে একদিন সে মনের কথাটা বলেই ফেলল তার বাবার কাছে। রাজা কিছু বললেন না, শুধু মুখটা কালো হয়ে গেল ওঁর। অনিন্দ্য বুঝল বাবা কষ্ট পেয়েছেন। বাবাকে সে বড্ড ভালোবাসে। বাবার মনে কিছুতেই কষ্ট দিতে পারবে না সে। বুকের ভেতরটা কান্নায় ভেঙে এল ওর, কিন্তু হাসিমুখে বলল, "বাবা, আমি রাজশিক্ষাই শিখব, কলেজে যাব।"


রাজা খুশি হলেন। বাবার হাসিমুখ দেখে অনিন্দ্যও যেন সব দুঃখ ভুলে গেল। কী একটা যেন রোখ চেপে গেল ওর। মনে হল বাবার ওই হাসিমুখ দেখাবার জন্যে সে সবকিছু করতে রাজি।


তারপর একদিন শুভ দিন দেখে দূরের এক কলেজে ভর্তি হতে চলে গেল সে। সেই কলেজ অচিনপুর থেকে অনেক দূরে। সেখানে দেশ-বিদেশ থেকে রাজপুত্র, রাজকন্যারা আসে রাজবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনো করতে। ভারী সুন্দর সেই কলেজ। কিছুদিনের মধ্যেই কিশোর অনিন্দ্যরও মন বসে গেল সেখানে। খুব মন দিয়ে পড়তে লাগল সে। বাবার চোখে সেই খুশি বারবার দেখার একটা লোভ যেন পেয়ে বসেছিল তাকে। একটু একটু করে সে ভুলেই গেল তার নিজের সেই স্বপ্নগুলোর কথা, তার সেই একলা বিকেল, সেই বেনামী কবিতার খাতা আর রূপোলি পাহাড়ের ঢালে বসে ছবি আঁকার ইচ্ছেগুলো।


প্রথম বছরের পরীক্ষায় প্রথম হল সে। অচিনপুরে খবর পৌঁছতেই যেন আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল সেখানে। রাজা প্রজা সবার বুক গর্বে ভরে উঠল অনিন্দ্যর জন্যে। তারপর এক এক করে বছর পেরোতে লাগল, আর প্রতিটি পরীক্ষাতেই প্রথম হতে লাগল সে। রাজার গর্ব আর ধরে না এমন সোনার টুকরো ছেলেকে নিয়ে। রাজা খুশি, রানি খুশি, অচিনপুরে সবাই খুশি আর তাদের খুশিতে রাজকুমারও খুশি।


বেশ চলছিল সবকিছু। একটু একটু করে অচিনপুরের যোগ্য ভবিষ্যৎ রাজা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলছিল অনিন্দ্য, ঠিক মহারাজ অচিন্ত্যনারায়ণ যেমনটা চাইতেন।


সামনেই পরীক্ষা, বেশ মন দিয়ে রাজনীতির একটা ইয়া গাবদা বই পড়ছিল অনিন্দ্যকুমার। বাইরে তখন বিকেলের শেষ আলো একটু একটু করে ম্লান হয়ে আসছে, দূরের ঝাউবনে নেমে এসেছে সন্ধের অন্ধকারের প্রথম ছোঁয়া। ঠিক এমন সময় হঠাৎ অনিন্দ্য চমকে উঠল একটা গান শুনে। দূরে কে যেন ভারী উদাস-করা সুরে গাইছে গানের প্রথম কলিটা...


"আমি স্বপ্ন দেখি স্বপ্ন হয়ে বাঁচার,

আমি স্বপ্ন দেখি আবার ভালোবাসার..."


বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু-হু করে উঠল অনিন্দ্যর। কী একটা অদ্ভুত পাগল-করা সুর সেই গানের। ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল সে। পুবের ওই বড় বটগাছটার কাছ থেকেই ভেসে আসছে গানটা। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাউকে দেখতে পেল না; এদিক-ওদিক, গাছের চারপাশে খুঁজতে লাগল অনিন্দ্য। কিন্তু কেউ নেই। এমন সময় হঠাৎ ওপর থেকে কে যেন খসখসে গলায় বলে উঠল, "কী গো রাজপুত্তুর, স্বপ্ন খুঁজছ নাকি?"


অনিন্দ্য অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল গাছের ওপর বসে আছে একটা পাখি। এমন পাখি সে কোনওদিন দেখেনি। গায়ে রামধনুর মতো সাতরঙা পালক, মাথায় বাহারি রঙের ঝুটি আর ডানায় ভারী সুন্দর সব নকশা কাটা।


"তুমিই কি গান গাইছিলে ?" অনিন্দ্য জিগ্যেস করল।

পাখি ঘাড় নেড়ে চোখ নাচিয়ে বলল, "নইলে আর কে শুনি ?"

"আমায় গান শেখাবে পাখি ?"


পাখি কেমন যেন চোখ পাকিয়ে বলল, "সে কী কথা রাজপুত্তুর ? তোমার না সামনে পরীক্ষা, তোমায় রাজা হতে হবে। আগে সেটা হও, তারপর সময় পেলে ওসব গানটান করবে'খন।"


কেমন একটা বিদ্রুপের সুর ছিল সেই পাখির গলায়।


বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল অনিন্দ্যর। বহুকাল নিজের যে স্বপ্নগুলো সে ভুলে ছিল আজ সেগুলোই যেন আবার কালবৈশাখীর পাগল হাওয়ার মতো এসে আছড়ে পড়তে লাগল তার চোখের তারায়। সে কাতর গলায় বলে উঠল, "না পাখি, আমি রাজা হতে চাই না, আমি গান গাইতে চাই, আমি ছবি আঁকতে চাই। আমি মেঘেদের সঙ্গে উড়ে বেড়াতে চাই দেশে দেশে। আমি হাঁপিয়ে উঠেছি পাখি, ভালো রাজপুত্র হতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছি।"


পাখির গোলাপি ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল। "সত্যি বলছ রাজপুত্র ?"


"হ্যাঁ গো, তিন সত্যি।" কিন্তু কথাটা বলেই মুখটা হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল অনিন্দ্যর। কী একটা বলতে গিয়েও যেন বলতে পারল না।


"কী হল ? আবার কী ভাবছ অত ?" ওর মনের কথা বুঝেই যেন জিগ্যেস করল সেই সাতরঙা পাখি।


"আমার স্বপ্নগুলো যে হারিয়ে গেছে। এখন যে আর চাইলেও আগের মতো সব ভুলে গান গাইতে পারি না, বিকেলে কচি ঘাসের উপর শুয়ে ভেসে যেতে পারি না কল্পনার দেশে। শুধু মনে হয় আমায় ভালো রাজা হতে হবে, আমার কাঁধে অনেক দায়িত্ব। কিন্তু বিশ্বাস করো পাখি, আমি কোনওদিন রাজা হতে চাইনি। আমি মেঘেদের মতো যাযাবর হতে চাই।" চোখ দুটো ছলছল করে উঠল অনিন্দ্যর।


পাখি বলল, "স্বপ্নরা কখনও হারায় না গো রাজপুত্র, তারা জমা থাকে স্বপ্নপরীর কাছে।"


"স্বপ্নপরী ! তাকে কোথায় পাবো ?"


"সেই স্বপ্নপরীর দেশ যে ঠিক কোথায় তা কেউ জানে না। কিন্তু শুনেছি যারা স্বপ্নের পথে হাঁটে, স্বপ্নপরী নিজেই তাদের কাছে আসে।"


"তাহলে আমি এখন কী করবো পাখি ?" ব্যাকুল স্বরে জিগ্যেস করল অনিন্দ্য।


পাখি আবার বাঁকা হাসল অনিন্দ্যর দিকে তাকিয়ে, তারপর হঠাৎ কিছু না বলেই ডানা ঝাপ্টে উড়ে গেল আকাশের দিকে। অনিন্দ্য হাত নেড়ে ডাকতে লাগল, "পাখি যেও না, শুনে যাও..."


কিন্তু পাখি আর ফিরে তাকাল না, শুধু যেতে যেতে তার গলা থেকে ভেসে এল সেই গান...


"আমি স্বপ্ন দেখি স্বপ্ন হয়ে বাঁচার,

আমি স্বপ্ন দেখি আবার ভালোবাসার..."


রাজপুত্র কী আর করবে, দু'হাতে চোখের জল মুছতে মুছতে ফিরে এল নিজের ঘরে। কিন্তু পড়ায় আর মন বসল না তার। বহুদূর থেকে ভেসে আসা সেই গানের সুরটাই যেন এখনও বাজছে ওর কানে। সে-ও গুনগুন করে গাইতে চাইল, কিন্তু গলায় সুর আর এল না। রাজনীতি কূটনীতির বইগুলো সরিয়ে ফেলে খাতা খুলে বসল ছবি আঁকবে বলে, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই মনের মতো করে আঁকতে পারল না অনিন্দ্য। বুকের ভেতর ভীষণ একটা কষ্ট হতে লাগল ওর। সে এতদিন কীসের ঘোরে যেন ভুলেই গিয়েছিল নিজের স্বপ্নগুলোকে। আজ যখন বুঝতে পেরেছে, তখন আর কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না সেই সুন্দর বিকেল, সেই উদাসী গানের সুর আর সেই পাহাড়ের ঢালে একলা বসে আঁকা ছবিগুলোকে। সব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। যা সে চায়নি তা পেয়েছে অনেক, কিন্তু যা চেয়েছিল তা যেন আজ বহুদূরে। হয়তো সেই স্বপ্নপরীর দেশে। কিন্তু কোথায় সেই দেশ ?


বড্ড কান্না পেল অনিন্দ্যর। কী যে করবে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। এই কলেজ, এই মোটা মোটা বই, এই শ্রেষ্ঠ রাজপুত্রের তকমা সব যেন অসহ্য লাগছে তার কাছে। ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল সে। বাইরে তখন পূর্ণিমার ভরা জ্যোৎস্না। দূরের ঝাউবনগুলো নীলাভ কালো রঙে কেমন যেন অদ্ভুত মায়াময় হয়ে আছে। আর কিছু না হোক, যাযাবর হয়ে দেশে দেশে তো সে ঘুরতেই পারে; এই ভেবে সেই ঝাউবনের দিকেই পা বাড়াল অনিন্দ্য।


মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছে সে। কোথায় যে যাচ্ছে নিজেও জানে না। বন পেরিয়ে মাঠ, মাঠ পেরিয়ে নদী, হেঁটেই চলেছে সে পাগলের মতো। আকাশের গায়ে ঝিকিমিকি তারা আর এই জ্যোৎস্নাভেজা রাত, কী এক নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন করে রেখেছে অনিন্দ্যকে। যেন কোনও এক অজানা অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়িয়ে তার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে। যেন তারা খুব কাছেই কোথাও আছে, তবু তাদের দেখতে পাচ্ছে না অনিন্দ্য।


এভাবেই অনেকটা হাঁটার পর একসময় আস্তে আস্তে পা দুটো বেশ টনটন করতে শুরু করল। বুকেও বেশ হাঁপ ধরেছে। না, একটু বসতেই হবে এবার। ওই যে ওদিকে একটা দেবদারু গাছ দেখা যাচ্ছে, ওটারই নিচে গিয়ে দু'পা ছড়িয়ে বসে পড়ল অনিন্দ্য। হাঁটতে হাঁটতে বড্ড ঘেমেও গেছে। গায়ে জড়ানো মখমলের উত্তরীয় দিয়ে কপালটা একবার মুছে নিল সে। কী যে হবে কিছুই জানে না। সে কি খুঁজে পাবে তার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোকে?


দূরের ওই চাঁদের দিকে তাকাল অনিন্দ্য। কী সুন্দর এই আলো ! হালকা হালকা বাতাস বইছে উত্তরদিকে। গাছের পাতাগুলো দুলে দুলে উঠছে মাঝে মাঝে। অনিন্দ্যর মনে পড়ল এমনই এক জ্যোৎস্না রাতে অচিনপুরের রাজবাড়ীর ছাদে বসে একটা কবিতা লিখেছিল সে। ছোট্ট একটা কবিতা, পাঁচটে মাত্র লাইন। তবু যেন কী এক অদ্ভুত আনন্দ ছিল সেই সামান্য সৃষ্টিতেও। ওর চোখের পাতা সেই সুদূর জ্যোৎস্নারাতের স্মৃতিতে একটু একটু করে ভারী হয়ে আসতে লাগল।


কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল অনিন্দ্য নিজেও বুঝতে পারেনি। হঠাৎ ঘুম ভাঙলো খুব মিষ্টি একটা গানের সুরে। কিন্তু ঘুম ঘুম চোখে উঠে বসতেই চমকে গেল সে ; এই গানটাই তো সেই সাতরঙা পাখিটা গাইছিল বিকেলবেলা। এখানে এই গান কে গাইছে ? তবে কি সেই পাখিই? আরেকটু ভালোভাবে শোনার চেষ্টা করল অনিন্দ্য। না, এটা তো সেই পাখির গলা নয়, এ যে কোনও বাচ্চা মেয়ের গলা। চোখ রগড়ে সোজা হয়ে উঠে বসল সে। এদিক সেদিক দেখতে লাগল, কিন্তু গানটা যে ঠিক কোন দিক থেকে ভেসে আসছে কিছুতেই ঠাহর করতে পারল না।

এমন সময় হঠাৎ কে যেন ভারী মিষ্টি গলায় বলল, "আমাকে খুঁজছ ?"

চমকে ফিরে তাকাল অনিন্দ্য। একটা বছর পাঁচেকের বাচ্চা মেয়ে ওর ঠিক পাশে, একটা পাথরের ওপর বসে আছে। মুক্তোর মতো দাঁতে একগাল হাসি নিয়ে।

"তুমি কে ?" অনিন্দ্য জিগ্যেস করল।

"বলব না। আগে বলো তুমি কে ?" বাচ্চা মেয়েটা বড়দের মতো ঘাড় বাঁকিয়ে বলল।

"আমি অচিনপুরের রাজপুত্র অনিন্দ্যকুমার।"

"রাজপুত্র ? তা এতো রাতে এই বনে কেন ?"


অনিন্দ্য মনে মনে ভাবল বড্ড পাকা মেয়ে তো। মুখে বলল, "এমনি, ভালো লাগছিল না তাই। কিন্তু তুমি এখানে একা একা কী করছ ?"

"আমারও ভালো লাগছিল না, তাই !" ভারী বিজ্ঞের মতো ঠোঁট উল্টে বলল মেয়েটি।

অনিন্দ্য একটু গম্ভীর গলায় বলল, "এই, বেশি পাকামো কোরো না। এইটুকু একটা পুঁচকে মেয়ে কিনা একা একা রাতবিরেতে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে! তোমার মা-বাবা কোথায় ? সত্যি কথা বলবে কিন্তু।"

"হুহঃ ! তুমি নিজে যেন খুব সত্যি কথা বলো !"

"মানে ?" গলাটা আরেকটু গম্ভীর করার চেষ্টা করল অনিন্দ্য।

"আমি সব জানি। সাতরঙা পাখি আমায় সব বলেছে।" কথাগুলো বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল মেয়েটা।


এবার ভীষণ অবাক হল অনিন্দ্য। "তুমি চেনো সেই সাতরঙা পাখিকে ?"

"চিনব না কেন ? যারা স্বপ্ন দেখে, সেই পাখি তাদের সবার কাছে যায়।"

"আচ্ছা, তাহলে তুমি কি স্বপ্নপরীর ঠিকানাও জানো ?"

অনিন্দ্যর মুখের দিকে তাকিয়ে মেয়েটা এমনভাবে হেসে উঠল যেন সে ভারী বোকার মতো কিছু একটা জিগ্যেস করে ফেলেছে। তারপর হাসি থামলে মেয়েটা বলল, "এই তবে আসল কারণ ! তুমি বুঝি স্বপ্নপরীকে খুঁজতে বেরিয়েছ ?"

কাতর গলায় অনিন্দ্য বলল, "হ্যাঁ গো, আমার স্বপ্নগুলো হারিয়ে গেছে, আমি আবার সেই স্বপ্নগুলোকে ফিরে পেতে চাই।"

"কেন ? তুমি তো রাজপুত্র, রাজবিদ্যার পরীক্ষায় তোমার এতো ভালো ফল, তুমি তো দেশে গিয়ে এক দারুণ রাজা হতে পারো। কী করবে স্বপ্ন দিয়ে ?"

"বাঁচব। স্বপ্ন নিয়ে বাঁচব। সত্যি বলছি মেয়ে, আমি কোনওদিন রাজা হতে চাইনি। আমি স্বপ্ন দেখতাম কবিতা লিখবার, আমি স্বপ্ন দেখতাম ছবি আঁকবার আর সবুজভরা মাঠে মাঠে গান গেয়ে বেড়াবার। কিন্তু কীভাবে যে নিজের সেই সোনালী স্বপ্নগুলো হারিয়ে ফেললাম... । বলো না, সেই স্বপ্নপরীকে কোথায় পাবো? তুমি নিশ্চয়ই জানো তার ঠিকানা!"


মেয়েটি নিজের ছোট্ট কচি-কচি দুটো হাতে অনিন্দ্যর হাতটা ধরে বলল, "স্বপ্নপরীকে বাইরে কোথাও পাবে না গো রাজপুত্র, সে আমাদেরই মনের ভেতর লুকিয়ে থাকে। ছোটবেলা সবাই স্বপ্ন দেখে যেমন তুমি দেখতে; তারপর বড় হতে হতে জীবনের ইঁদুর দৌড়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায় সেই স্বপ্নগুলো, হারিয়ে যায় সেই স্বপ্নপরীও। তখন যে আমরা অনেক বড় হয়ে যাই রাজপুত্র, স্বপ্ন তখন আমাদের কাছে অবাস্তব হয়ে যায়।"

"তাহলে কি তাকে আর কোনওদিন খুঁজে পাব না ?" ছলছলে চোখে জিগ্যেস করল অনিন্দ্য।

"যদি স্বপ্নের টানে বাস্তবকে হেলায় সরিয়ে দিতে পারো, তবেই আবার স্বপ্নপরীকে খুঁজে পাবে। যারা স্বপ্ন দেখে স্বপ্ন হয়ে বাঁচার, স্বপ্নপুরী তাদের কাছেই যায়।" মেয়েটা আবার সেই মিষ্টি সুরে গাইতে শুরু করল,

"আমি স্বপ্ন দেখি স্বপ্ন হয়ে বাঁচার,

আমি স্বপ্ন দেখি আবার ভালোবাসার..."


অনিন্দ্য অবাক হয়ে দেখল সেই মেয়েটার সারা শরীর থেকে রামধনুর সাত রঙ ঠিকরে বেরোচ্ছে। ভরা জ্যোৎস্নার আলোও যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে সেই আলোতে। মেয়েটা একটু একটু করে মিলিয়ে যেতে লাগল সেই আলোর মধ্যে। অনেক অনেক দূর থেকে যেন ভেসে আসছে তার মিষ্টি গলা, "স্বপ্ন হয়ে বাঁচো রাজপুত্র, স্বপ্ন নিয়ে বাঁচো..."


"যেও না স্বপ্নপরী, আমি চিনেছি তোমাকে। যেও না।" কিন্তু অনিন্দ্যর কথাগুলোও যেন কোথায় মিলিয়ে যেতে লাগল সেই রামধনুর স্রোতে। আলোটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগল। অনিন্দ্য শুনতে পেল দূর থেকে কে যেন ডাকছে তাকে..."রাজকুমার, ওঠো।"


হঠাৎ ঘুম ভেঙে হকচকিয়ে জেগে উঠল অনিন্দ্যকুমার। অবাক চোখে চারপাশে তাকিয়ে দেখল, এ যে অচিনপুরের রাজবাড়ী। সে তার নিজের ঘরেই পড়তে পড়তে কখন যেন ওই মোটা বিচ্ছিরি রাজনীতির বইটার ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল।


বাইরে ঝলমল করছে নতুন সকাল। সূর্যের আলোয় সাতরঙা রামধনু ঠিকরে পড়ছে প্রাসাদের দেয়াল থেকে। অনিন্দ্য দেখল তার পাশেই হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা, মহারাজ অচিন্ত্যনারায়ণ। রাজা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "এই দেখো অনিন্দ্য কী এনেছি তোমার জন্যে!"

রাজার হাতের দিকে তাকাতেই যেন একরাশ আনন্দ আর বিস্ময় একসঙ্গে কেঁপে উঠল অনিন্দ্যর চোখে। মহারাজ ওর জন্যে রং, তুলি, ছবি আঁকার ক্যানভাস আর বেশ কিছু কবিতার বই নিয়ে এসেছেন।


"বাবা !"

"হ্যাঁ অনিন্দ্য, তুমি তোমার নিজের মতো করেই এগিয়ে যাও। স্বপ্ন বড় দামি জিনিস, একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যায় না।"

"আর রাজশিক্ষার কলেজ ?"

"কলেজে যাবে বৈকি। কিন্তু রাজশিক্ষার নয়, তুমি সেই কলেজে যাবে যেখানে তোমার মনের মতো জিনিস শিখতে পারবে। যেখানে তুমি জীবনের জালে জড়িয়ে পড়বে না, বরং বাঁচবে স্বপ্নের সোনালী জাল বুনে।"


জল থই-থই চোখে অনিন্দ্য জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে। আজ যেন সে আবার নতুন করে চিনল এই মানুষটাকে। রাজা ওর চুলে আলতো করে আঙুল বোলাতে লাগলেন। তাঁর চোখের কোণেও যেন কিছু একটা চিকচিক করে উঠল। হয়তো শুধুই চোখের জল, কিম্বা হয়তো কোনও হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন।


(সমাপ্ত)


অলঙ্করণ : সুকান্ত মণ্ডল